শনিবার | মে ২১, ২০২২ | ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯ 

সম্পাদকীয়

দরিদ্র-প্রান্তিক ও আদিবাসীদের জন্য বাজেটে বরাদ্দ বাড়ানোর তাগিদ

বিবেচনায় নিক অর্থ মন্ত্রণালয়

স্বাভাবিক পরিস্থিতিতেই জাতীয় বাজেটে দরিদ্র, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য পর্যাপ্ত ন্যায়সংগত বরাদ্দ থাকে না। মহামারী উদ্ভূত পরিস্থিতিতে এবারের বাজেট সংকুচিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অবস্থায় বাজেটে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ন্যায্য হিস্যা থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বৃহস্পতিবার বণিক বার্তা, এএলআরডি এইচডিআরসি আয়োজিত এক অনলাইন বৈঠকে এটি উঠে এসেছে। আলোচনায় গ্রামীণ নারী, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, কৃষক-শ্রমিক আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে বরাদ্দ বাড়ানোর দাবিও জানানো হয়েছে। বিদ্যমান আর্থসামাজিক রাজনৈতিক কাঠামোয় বাজেটে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সুরক্ষার জন্য হয় বরাদ্দ হ্রাস পাবে নয়তো কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় উন্নীত হবে না; কারণ জনগোষ্ঠী আর্থসামাজিক রাজনৈতিকভাবে দুর্বল, তাদের কণ্ঠস্বর জোরালো নয়। করোনার প্রভাবে প্রান্তিক এসব জনগোষ্ঠীর আয়ে ব্যাপক প্রভাব পড়েছে, কাজ হারিয়েছেন অনেকে। এছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন তারা। যদিও করোনার সময়ে সরকার উচ্চবিত্ত নিম্নবিত্তদের জন্য প্রণোদনা সহায়তা প্যাকেজ ঘোষণা করেছিল। এক্ষেত্রেও বৈষম্য স্পষ্টতই দৃশ্যমান হয়েছে। উচ্চবিত্তদের প্যাকেজ পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন হলেও প্রান্তিক মানুষের অর্থ বণ্টনই করা যায়নি বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতায়। আগামী বাজেটে প্রান্তিক মানুষদের জন্য বিশেষ কার্যক্রম গ্রহণ করা জরুরি।

বাংলাদেশের কৃষিতে খুদে কৃষক আর পারিবারিক বা গার্হস্থ্য কৃষিরই প্রাধান্য। দেড় কোটির বেশি খুদে কৃষকখানার বেশির ভাগই পারিবারিক কৃষির ওপর নির্ভরশীল, অর্থাৎ খানাগুলোর বেশির ভাগ সদস্যই নিজ নিজ খানার আওতাধীন কৃষি খামারের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। অল্প কিছু মাঝারি কৃষিখানাও পারিবারিক কৃষিচর্চায় জড়িত। গত বাজেটে তাদের জন্য তেমন কোনো উদ্যোগ পরিলক্ষিত হয়নি। আগামী বাজেটে তাদের দিকে দৃষ্টি দেয়া প্রয়োজন। কারণ তারাই কৃষিকে বাঁচিয়ে রেখেছে। যদিও বলা হচ্ছে, কৃষিকে এখান থেকে বেরিয়ে এসে লাভজনক খাত হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। একথা সত্য, কৃষিতে বৃহৎ করপোরেট গ্রুপ যুক্ত হলেও প্রান্তিক কৃষক উপকৃত হননি; বরং কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের উপযুক্ত দাম না পাওয়ার খবরই মিলছে। অন্যদিকে করোনা মহামারীতে নারীর প্রান্তিকতা আরো গভীরতর হয়েছে। নারী দিনমজুরদের বড় অংশ কর্মহীন হয়ে দুর্বিষহ জীবন কাটিয়েছেন। গ্রামের ক্ষুদ্র নারী উদ্যোক্তারা পড়েছেন মহাবিপাকে, দীর্ঘ লকডাউনে তাদের আয়ের পথ ছিল রুদ্ধ। গ্রামীণ নারী উদ্যোক্তারা সাধারণত ব্যক্তিগত বা পরিবারের সঞ্চয়, ধার-দেনা বা এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে ক্ষুদ্র ব্যবসা (সবজি চাষ, হাঁস-মুরগি পালন ইত্যাদি) করেন; দীর্ঘ লকডাউন তাদের এসব আয়ের পথ রুদ্ধ করে দিয়েছিল। মহামারীতে দেশের যুবকদের একটি অংশ কর্মহীন হয়ে পড়েছে। নিম্ন মজুরি অনানুষ্ঠানিক খাতে ভুগতে থাকা যুব নারী কর্মীরাই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। কিন্তু তাদের জন্য আগের বাজেটে কিছু ছিল না। আদিবাসীরা মানবসত্তার মর্যাদা মানব উন্নয়নের সম্ভাব্য সব মাপকাঠিতেই অতি দরিদ্র-অতি প্রান্তিক-বহিস্থ মানুষ। করোনার আগে যখন জাতীয় দারিদ্র্যের হার ২১ দশমিক শতাংশ ছিল, তখন আদিবাসী অধ্যুষিত জেলাগুলোয় তা ছিল ৬০ শতাংশের ওপরে। সমতলের দুই-তৃতীয়াংশ আদিবাসী কার্যত ভূমিহীন। পার্বত্য আদিবাসী মানুষের ভূমি অধিকার বলে তেমন কিছু নেই; বনভূমি-কৃষিজমি-জলাভূমির নির্বিচার অধিগ্রহণ নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার।

কৃষি খাতের চিরায়ত সমস্যাগুলো (যেমন কৃষি উপকরণের উচ্চদাম, অপ্রাপ্যতা, নিম্নমান, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, সংরক্ষণ সমস্যা, উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য না পাওয়া প্রভৃতি) দ্বারা বৃহৎ মাঝারি কৃষকরাতাদের শক্ত আর্থসামাজিক-রাজনৈতিক অবস্থানের কারণেই তেমন একটা প্রভাবিত হন না। বিদ্যমান বাস্তবতায় বাজেটে পারিবারিক কৃষির সঙ্গে জড়িত প্রান্তিক কৃষক, বর্গাচাষীদের জীবন জীবিকা সুরক্ষার জন্য বরাদ্দ এবং প্রান্তিক কৃষকের জন্য ভর্তুকি মূল্যে প্রয়োজনীয় কৃষি উপকরণ বাজেটে বরাদ্দ দিতে হবে। সঠিকভাবে বাধাহীন প্রাপ্তির ব্যবস্থা করতে হবে। যেকোনো দুর্যোগে ফসলের ক্ষতি হলে কৃষককে দ্রুত এবং সরাসরি ক্ষতিপূরণ দেয়ার জন্য বরাদ্দ রাখা জরুরি। কৃষকদের জন্য বিভিন্ন ধরনের বীমা চালু করতে উদ্যোগও নেয়া প্রয়োজন। কৃষি ব্যবস্থা উজ্জীবিত করতে সরকারকে মধ্যস্বত্বভোগীদের পরিত্যাগ করে প্রকৃত কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি ফসল ক্রয় করতে হবে। করোনা সম্ভাব্য খাদ্য সংকটের কথা মাথায় রেখে সরকারি শস্য ক্রয়ের পরিমাণ এখনকার তুলনায় বাড়ানো জরুরি। এক্ষেত্রে সরকারি গুদামের সর্বোচ্চ ব্যবহার, নতুন গুদাম নির্মাণ এবং একই সঙ্গে বেসরকারি গুদাম ভাড়ায় নেয়া যেতে পারে। আদিবাসী মানুষের গোষ্ঠী সংখ্যা এবং তাদের জনসংখ্যা নিয়ে সঠিক কোনো পরিসংখ্যান নেই। চলমান আদমশুমারিতে আদিবাসীদের গোষ্ঠীভিত্তিক সঠিক জনগণনা নিশ্চিত করতে বাজেটে বরাদ্দ দিতে হবে। পার্বত্য সমতলের আদিবাসীদের জন্য ওই বরাদ্দ ভিন্ন ভিন্ন দেখানো স্বচ্ছতার নিরিখে যুক্তিসংগত হবে। যেসব প্রান্তিক গ্রামীণ ভূমিহীন, খামারি, কুটির শিল্প ক্ষুদ্র অকৃষি কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত নারী কভিড-১৯ সংকটের শিকার হয়ে দুরবস্থায় রয়েছেন, তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে বাজেটে পর্যাপ্ত বরাদ্দ রাখা দরকার। নারী কৃষকদের তালিকা প্রণয়ন স্বীকৃতি, তাদের জন্য বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ প্রদান এবং কৃষিক্ষেত্রে গৃহীত প্রকল্পগুলোয় নারীর জন্য সুনির্দিষ্ট কোটা রাখতে হবে। গ্রামীণ নারী যাতে খামার খামারবহির্ভূত কর্মকাণ্ডের জন্য দ্রুত ঝামেলাহীনভাবে ঋণ পেতে পারেন তার জন্য পৃথক বাজেটীয় পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন।

বাংলাদেশের জনসংখ্যার অর্ধেকই নারী। গৃহস্থালির পাশাপাশি গ্রামীণ নারীদের অধিকাংশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষিকাজে যুক্ত। গ্রামীণ নারীর বৃহদংশই দরিদ্র, প্রান্তিক, ভূমিহীন। আপাতদৃষ্টিতে কৃষিতে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধিকে নারীর ক্ষমতায়ন মনে হলেও এর নেপথ্যে রয়েছে স্বল্প মজুরি দিয়ে দীর্ঘক্ষণ কাজ করানোর সুবিধা। আলাদাভাবে জেন্ডার বাজেট করা হলেও গ্রামীণ নারীর জন্য সুনির্দিষ্ট বাজেট বরাদ্দের উদাহরণ নেই। গ্রামীণ নারীরা সাধারণত মহিলা শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং অন্যান্য মন্ত্রণালয় বিভাগের নারী উন্নয়নের জন্য গৃহীত প্রকল্পের সুবিধাভোগী হন। এছাড়া সামাজিক সুরক্ষা কল্যাণ খাতের বরাদ্দে অতি দরিদ্র প্রান্তিক গ্রামীণ নারীর কিছু হিস্যা থাকে। চলমান বাজেটে নারীকে কৃষক হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে, সেই স্বীকৃতিকে কার্যকর করার বাজেটীয় পদক্ষেপ অনুপস্থিত।

আগামী অর্থবছরের বাজেট এমন সময়ে আসছে যখন নিত্যপণ্যের মূল্য বাড়ছে, বহিঃখাত চাপে রয়েছে এবং বিদেশী উৎস থেকে সরকারের ঋণ গ্রহণের প্রবণতা বাড়ছে। তাই এবারের বাজেট হওয়া উচিত সাধারণ মানুষের কথা ভেবে তাদের আয় বৃদ্ধিতে সহায়তার বাজেট। যুগ যুগ ধরে চলে আসা বঞ্চনার অবসান করতে হলে প্রয়োজন কিছু স্বল্পমেয়াদি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং তার বাস্তবায়ন। স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনাগুলোর মধ্যে হলো খাদ্য কৃষিবাজারের সাপ্লাই চেইন কার্যকর করা, চাকরি হারানো নতুন বেকার, দেশে ফেরত আসা প্রবাসী শ্রমিকদের স্বল্প সুদে সহজ শর্তে ঋণ দেয়া, ক্ষতিগ্রস্ত ক্ষুদ্র মাঝারি শিল্প মালিকদের প্রণোদনা দেয়া, হতদরিদ্রদের সহায়তার জন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতা বাড়ানো এবং এমপ্লয়মেন্ট গ্যারান্টি স্কিম চালু করা। নারী, আদিবাসী পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে বিশেষ দৃষ্টি দেয়া আবশ্যক।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন