শনিবার | মে ২১, ২০২২ | ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯ 

প্রথম পাতা

ব্যাংকে প্রতারণার নতুন মাত্রা

ওয়ালটন ও ইউনাইটেড গ্রুপের ব্যাংক হিসাব থেকে অর্থ লোপাটের চেষ্টা

নিজস্ব প্রতিবেদক

অভিনব কায়দায় দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্প গ্রুপ ওয়ালটন ইউনাইটেডের ব্যাংক হিসাব থেকে ১৮ কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার চেষ্টা করেছে একটি সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্র। এর মধ্যে ওয়ালটনের ব্যাংক হিসাব থেকে সাড়ে কোটি টাকা স্থানান্তরের জন্য রিয়েল টাইম গ্রস সেটেলমেন্ট বা আরটিজিএসের দুটি ভাউচার জমাও দেয়া হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত শাখা ব্যবস্থাপকের সতর্ক পদক্ষেপে প্রতারণার পরিকল্পনা ভেস্তে গেছে।

উল্টো ঘটনার সঙ্গে যুক্ত ১০ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। এর মধ্যে ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের জাকির হোসেন (৩৫) নামের একজন কর্মকর্তাও রয়েছেন। তিনি ব্যাংকটির কারওয়ান বাজার শাখার এসএমই সেলস টিমের কর্মকর্তা। জাকিরকেই প্রতারণা ঘটনার মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে চিহ্নিত করেছে পুলিশ। পুরো ঘটনাটি ঘটেছে ডাচ্-বাংলা ব্যাংকে। পুলিশের পক্ষ থেকে সংবাদ সম্মেলন করে পুরো ঘটনাটি জানানো হয়েছে।

পুলিশের পক্ষ থেকে দেয়া বক্তব্য সঠিক বলে ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবুল কাশেম মো. শিরিন বণিক বার্তাকে জানিয়েছেন। তিনি বলেন, গ্রেফতারকৃত জাকির হোসেন আমাদের ব্যাংকের কর্মকর্তা। অভিনব কায়দায় প্রতারক চক্র ব্যাংকের টাকা হাতিয়ে নেয়ার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু আমাদের সংশ্লিষ্ট শাখা ব্যবস্থাপকের দায়িত্বশীল ভূমিকায় প্রতারক চক্রের পরিকল্পনা সফল হয়নি।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্যাংকারদের যোগসাজশ সহযোগিতায় এর আগে দেশের ব্যাংক খাতে নানা ধরনের অপরাধ অর্থ লুণ্ঠনের ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। কিন্তু ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের কর্মকর্তার সহযোগিতায় প্রতারণা চেষ্টার যে ঘটনাটি সামনে এসেছে, সেটি একেবারেই অভিনব। নিজ ব্যাংকের গ্রাহকদের ব্যাংক হিসাবের তথ্য সংগ্রহ হিসাবধারীর স্বাক্ষর জালিয়াতির মাধ্যমে অর্থ হাতিয়ে নেয়ার ঘটনা এর আগে  শোনা যায়নি। প্রতারক চক্র ডাচ্-বাংলা ব্যাংকে থাকা ওয়ালটনের হিসাব থেকে কোটি টাকা এবি ব্যাংকের একটি হিসাবে স্থানান্তরের চেষ্টা করেছিল। এর মাধ্যমে দেশের ব্যাংক খাতে নতুন মাত্রার প্রতারণার ঘটনা সামনে এল।

পুলিশ সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্যমতে, ২৫ জানুয়ারি সকালে ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের রাজধানীর বসুন্ধরা শাখায় থাকা ওয়ালটন গ্রুপের হিসাব থেকে আরটিজিএস ফরমে সাড়ে কোটি টাকা ট্রান্সফারের একটি আবেদন আসে। এন আই করপোরেশন বিডি লিমিটেড নামে একটি কোম্পানির এবি ব্যাংকের মতিঝিল শাখার হিসাবে টাকা স্থানান্তরের জন্য আবেদনটি করা হয়। কিন্তু ডাচ্-বাংলার বসুন্ধরা শাখার ব্যবস্থাপকের কাছে আবেদনটি অস্বাভাবিক মনে হয়। তিনি তখন ওয়ালটন গ্রুপের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তখন ওয়ালটন থেকে জানানো হয়, তারা অর্থ স্থানান্তরের জন্য কোনো আবেদন করেনি। পরে ওয়ালটনের কর্মকর্তারা ব্যাংকে গিয়ে বিষয়টি যাচাই করেন। সেখানে গিয়ে তারা বুঝতে পারেন এখানে প্রতারক চক্রের হাত রয়েছে। এরপর টাকা ট্রান্সফারের আবেদনটি স্থগিত করা হয়।

ঘটনার পর বৃহস্পতিবার ওয়ালটন গ্রুপের পক্ষ থেকে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ভাটারা থানায় একটি অভিযোগ করা হয়। পরে বৃহস্পতিবারই রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে জালিয়াত চক্রের ১০ জনকে গ্রেফতার করে ভাটারা থানা পুলিশ। গ্রেফতারকৃতরা হলেন ডাচ্্-বাংলা ব্যাংকের কর্মকর্তা মো. জাকির হোসেন (৩৫), ইয়াসিন আলী (৩৪), মাহবুব ইশতিয়াক ভূঁইয়া (৩৫), আনিছুর রহমান (৪২), মো. দুলাল হোসাইন (৩৫), মো. আসলাম (৫৩), আবদুর রাজ্জাক (৪৮), জাকির হোসেন (৪৪), মো. আনোয়ার হোসেন ভূঁইয়া (৫৬) মো. নজরুল ইসলাম (৫০)

পুলিশ জানায়, চক্রের মূল হোতা জাকির হোসেন ডাচ্-বাংলা ব্যাংকে চাকরি করার সুবাদে ব্যাংকের সার্ভার থেকে বিভিন্ন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবের তথ্য সংগ্রহ করেন। সেখানে যাদের টাকার পরিমাণ বেশি তাদের ব্যাংক হিসাব থেকে স্বাক্ষর জাল করে আরটিজিএসের মাধ্যমে টাকা ট্রান্সফারের পরিকল্পনা করেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী তিনি চক্রের আরেক সদস্য ইয়াসিন আলীকে স্বাক্ষর জালিয়াতির কাজ দেন। পরে ইয়াসিন আলী স্বাক্ষর জাল করে মাহবুব ইশতিয়াক ভূঁইয়ার পরিচালিত ব্যাংক হিসাব এন আই করপোরেশন, বিডি লিমিটেড নামে এবি ব্যাংকের মতিঝিল শাখায় স্থানান্তরের পরিকল্পনা করে জাল ব্যাংক দলিল তৈরি করেন।

পুলিশ বলছে, গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিরা জিজ্ঞাসাবাদে বলেছেন, তারা একটি সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্রের সদস্য। তারা দীর্ঘদিন ধরে ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের সার্ভার থেকে তথ্য সংগ্রহ করে টাকা আত্মসাৎ করার পরিকল্পনা করছিলেন।

ডিএমপির গুলশান বিভাগের উপকমিশনার মো. আসাদুজ্জামান গতকাল নিজ কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, চক্রটির কার্যক্রম ব্যাংকের ভেতর থেকে শুরু। এর বাইরে চক্রটির সঙ্গে আরো অনেকে জড়িত থাকতে পারেন। চক্রটি ইউনাইটেড গ্রুপের একটি ব্যাংক হিসাব থেকে ১২ কোটি টাকা একইভাবে সরানোর চেষ্টা করছিল।

এক প্রশ্নের জবাবে আসাদুজ্জামান বলেন, তারা মূলত বাংলাদেশের বড় বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের মালিক বা গ্রুপের ব্যাংক হিসাব টার্গেট করেন। এমন প্রতিষ্ঠানকে তারা টার্গেট করেন যেখান থেকে রকম টাকা সরালে যেন তাড়াতাড়ি বুঝতে না পারে।

বিষয়ে জানতে চাইলে ওয়ালটন হাই-টেক ইন্ডাস্ট্রিজের মার্কেটিং অ্যান্ড কমিউনিকেশন বিভাগের অ্যাডিশনাল অপারেটিভ ডিরেক্টর মো. মোস্তাফিজুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ব্যাংকের শাখা থেকে টাকা স্থানান্তরের বিষয়ে জানতে চেয়ে টেলিফোন পাওয়ার পর আমরা প্রতারণার বিষয়টি বুঝতে পারি। পরে বিষয়ে ভাটারা থানায় অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। প্রতারক চক্রের সদস্যদের পুলিশ গ্রেফতার করেছে বলে শুনেছি। পরবর্তী করণীয় বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে আমরা রোববার আলোচনা করব।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন