শনিবার | মে ২১, ২০২২ | ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯ 

প্রথম পাতা

ডায়াডিকের সঙ্গে সমঝোতা সইয়ের প্রক্রিয়া শুরু

দেশেই হবে টিকা উৎপাদন পরীক্ষামূলক প্রয়োগ

নিজস্ব প্রতিবেদক

বাংলাদেশে কভিড-১৯ প্রতিরোধী টিকা উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো প্রস্তুত করা হচ্ছে। চলতি বছরেই দেশে টিকা উৎপাদন করতে চায় সরকার। মূলত বিদেশ থেকে প্রযুক্তিগত সহযোগিতা নিয়ে টিকা উৎপাদন করবে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান এসেনশিয়াল ড্রাগস কোম্পানি লিমিটেড (ইডিসিএল) সম্প্রতি লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ডায়াডিক ইন্টারন্যাশনালের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। মার্কিন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এমওইউ সই হলে তাদের প্রযুক্তিতে উৎপাদিত টিকার ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল বা পরীক্ষামূলক প্রয়োগ করা হবে বাংলাদেশে। পাশাপাশি চলবে বিপণনও। সমঝোতা স্মারকের খসড়াটি বর্তমানে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে যাচাই-বাছাই চলছে বলে একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে।

স্বাস্থ্য পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের আওতাধীন এসেনশিয়াল ড্রাগস কোম্পানি লিমিটেডের মাধ্যমে কভিড-১৯ নিয়ন্ত্রণ মোকাবেলায় দেশে কার্যকর নিরাপদ টিকা উৎপাদন কার্যক্রম হাতে নেয়া হয়েছে। লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ডায়াডিক ইন্টারন্যাশনালের সঙ্গে বাংলাদেশে টিকা উৎপাদনের জন্য অপ্রকাশযোগ্য বা নন-ডিসক্লোজার এগ্রিমেন্ট (এনডিএ) স্বাক্ষর করেছে ইডিসিএল। তবে এনডিএটি মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।

জানা গেছে, ডায়াডিক ইন্টারন্যাশনাল এরই মধ্যে নভেল প্রোটিন সাব-ইউনিট ভ্যাকসিন নামে একটি টিকার উন্নয়ন করেছে। সেটির বিষয়েই বাংলাদেশের সঙ্গে তাদের চুক্তি হচ্ছে। ইডিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা স্বাক্ষরিত খসড়া সমঝোতা স্মারকে বেশকিছু শর্ত সহযোগিতার কথা বলা হয়েছে। এর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠান দুটি পারস্পরিক গবেষণা, প্রশিক্ষণ কারিগরি জ্ঞান বিতরণ করবে।

এমওইউতে বলা হয়, সিআই প্রযুক্তিতে উৎপাদিত টিকার জন্য ইডিসিএল ডায়াডিককে সহযোগিতা করবে। বিপণন টিকা ব্যবস্থাপনা থেকে শুরু করে প্রতিটি পর্যায়ে একসঙ্গে কাজ করবে প্রতিষ্ঠান দুটি। টিকা বাংলাদেশে উৎপাদনের পর তা দেশেই পরীক্ষামূলক প্রয়োগ বা ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল হবে। প্রথম থেকে তৃতীয় পর্যায়ের পরীক্ষামূলক প্রয়োগে বাংলাদেশ অর্থায়ন করবে। পরীক্ষামূলক প্রয়োগে অংশ নেয়ার কারণে বাংলাদেশ বাণিজ্যিকভাবে টিকা বিপণনের সুযোগ পাবে ডায়াডিক। খসড়ায় বছরে ১০০ কোটি ডোজ টিকা উৎপাদনের কথা বলা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডায়াডিকের যে প্রযুক্তি ব্যবহার করে ইডিসিএল টিকা উৎপাদন করবে তা নিরাপদ সহজে বানানো যায়। অক্সফোর্ড যেমন টিকার প্রযুক্তি দিয়েছে আর অ্যাস্ট্রাজেনেকা তা উৎপাদন করে বাজারজাত করেছে। তেমনি ডায়াডিক প্রযুক্তি দেবে আর ইডিসিএল উৎপাদন করবে। ডায়াডিক উৎপাদক প্রতিষ্ঠান নয়। প্রোটিন সাব-ইউনিট টিকার সুবিধা হলো তা দ্রুত সময়ের মধ্যে উৎপাদন করা যায়। দুই মাসে কয়েকশ কোটিও উৎপাদন করা যায়। এমআরএনএ প্রযুক্তিতে উৎপাদিত ফাইজার বা মডার্নার টিকার মতো সময়সাপেক্ষ জটিল নয়। প্রোটিন সাব-ইউনিট টিকার বিষয়ে অনেক গবেষণা করা হয়েছে। সহজলভ্য হলেও বড় বড় টিকা প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান এগিয়ে না আসায় তা তেমন উৎপাদন হয়নি। বর্তমান নোভাভ্যাক্স প্রযুক্তির টিকা উৎপাদন করছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন টিকা প্রযুক্তিবিদ জানান, এর আগে চীন প্রযুক্তির টিকা বাংলাদেশে ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের জন্য অনুমতি চেয়েছিল। কিন্তু সরকার তা দেয়নি। গবেষণা, লোকবল, বিপণন থেকে শুরু করে সব দিক থেকে সহযোগিতা না পেলে কেউ চুক্তিতে আসবে না। ডায়াডিক এখন মার্কিন ওষুধ টিকা প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান জনসন অ্যান্ড জনসনের সঙ্গে চুক্তিতে আগ্রহী বলে জানা গেছে। ফলে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আরো দ্রুত অগ্রসর হওয়া প্রয়োজন।

বাংলাদেশ ফার্মাকোলজিক্যাল সোসাইটির সভাপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মাকোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. মো. সায়েদুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ডায়াডিকের প্রযুক্তি ব্যবহার করে উদ্ভাবিত টিকা বাংলাদেশে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল পরিচালনা করে ইতিবাচক ফল পেলে আশা করা যায় সেই টিকাটি দেশেই উৎপাদিত হবে। তাই অতীতের মতো টিকা গবেষণার সামর্থ্য বৃদ্ধি উৎপাদন প্রযুক্তি স্থানান্তরের সুযোগসংবলিত ধরনের চুক্তি সম্পাদনের সম্ভাবনা হাতছাড়া করা ঠিক হবে না। তবে ধরনের চুক্তি সম্পাদনের ক্ষেত্রে সরকারের উচিত হবে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন উৎপাদকদের পাশাপাশি দেশীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠান গবেষকদের যুক্ত করে অত্যাধুনিক অগ্রসর প্রযুক্তির বহুমুখী ব্যবহারের সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দেয়ায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করা।

ইডিসিএলের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, টিকা উৎপাদনের লক্ষ্যে গোপালগঞ্জে সাত একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। সেখানে এখন চলছে প্রাথমিক ভূমি উন্নয়নের কাজ। এরপর স্বল্প সময়ের মধ্যে বিদেশ থেকে টিকা উৎপাদনের জন্য ল্যাব স্থাপন প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি আনা হবে। ডায়াডিকের প্রযুক্তিগত সহযোগিতায় বাংলাদেশে টিকা উৎপাদন হবে। এরপর ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল হবে। সব ঠিক থাকলে বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদনে যাবে এসেনশিয়াল ড্রাগস। বছরে ১০০ কোটি ডোজ উৎপাদনের মাধ্যমে নিজেদের চাহিদা মিটিয়ে রফতানিও করতে পারবে বাংলাদেশ। সেজন্য ডায়াডিককে রয়্যালিটি দেয়া হবে, যা পরবর্তী সময়ে দুই দেশের সরকার আলোচনার মাধ্যমে ঠিক করবে। এছাড়া কভিড প্রতিরোধী টিকার কাঁচামাল বোতলজাত তা আমদানিতে আরো কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা চলছে।

টিকা উৎপাদনের জন্য গোপালগঞ্জে অধিগ্রহণ করা জমিতে কিছু জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে বলে জানিয়েছেন টিকা উৎপাদন-সংক্রান্ত কারিগরি কমিটির আহ্বায়ক স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাশার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, জমিসংক্রান্ত জটিলতা নিরসনে স্থানীয় প্রশাসন কাজ করছে। প্রোটিন সাব-ইউনিটের টিকা উৎপাদন অন্যান্য টিকার উৎপাদনের চেয়ে সহজ। এর কাঁচামাল দেশেই পাওয়া যায়। দেশের স্বাভাবিক তাপমাত্রায় এসব টিকা সংরক্ষণও করা যায়। স্বল্প সময়ে উৎপাদনে যাওয়া যায়। ফলে ডায়াডিকের সঙ্গে চুক্তিতে বাংলাদেশের আগ্রহ রয়েছে।

তিনি জানান, সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী ছয় থেকে সাত মাসের মধ্যে উৎপাদনে যাওয়া সম্ভব হবে। এজন্য কার্যক্রম শুরু হয়েছে। টিকা উৎপাদন প্রকল্পের অর্থায়নের জন্য শুরুতে অভ্যন্তরীণভাবে অর্থের জোগান দেবে সরকার। তবে বিদেশী কোনো সংস্থাকে সঙ্গে নেয়া হতে পারে।

চুক্তির বিষয়ে কাজ চলছে জানিয়েছেন এসেনশিয়াল ড্রাগস কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা অধ্যাপক ডা. এহসানুল কবির। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, চুক্তির বিষয়ে এখনো কিছু হয়নি। আমরা সমঝোতা স্মারকের একটি খসড়া করেছি। খসড়াটি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে দিয়েছি। সেখান থেকে এটি আইন মন্ত্রণালয় হয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যাবে। যাচাই-বাছাই চলছে। চুক্তিতে কী কী আছে, কী হবে অথবা কী হবে না তা বলার সময় এখনো আসেনি।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন