শনিবার | মে ২১, ২০২২ | ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯ 

শেষ পাতা

উৎপাদন ও বিপণন

প্রতিবন্ধকতা সবচেয়ে বেশি পাঁচ ফসলে

সাইদ শাহীন

ছবি : মো.মানিক

কভিডকালে বাংলাদেশের কৃষক কেমন পরিস্থিতি মোকাবেলা করছেন, তা নিয়ে গবেষণা করেছে জাতিসংঘের খাদ্য কৃষি সংস্থা। শস্য উৎপাদন বৃদ্ধিতে কৃষকের আত্মবিশ্বাসের মাত্রা, কভিড-১৯-এর কারণে কৃষকের আয়ে নেতিবাচক প্রভাব বিপণন প্রতিবন্ধকতা নিয়ে ধারাবাহিক শেষ পর্ব

দেশে প্রধান খাদ্যশস্য ধান উৎপাদন বিপণন নিয়ে অনেক প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হয় কৃষকদের। ধানের মতো বহুল আলোচিত না হলেও অন্যান্য ফসলেও তাদের একই ধরনের প্রতিবন্ধকতা মোকাবেলা করতে হয়। বিশেষ করে পাট তেলবীজের ক্ষেত্রে ধানের মতোই বিপণন প্রতিবন্ধকতা নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকতে হয় কৃষকদের। আবার উৎপাদনসংশ্লিষ্ট নানা প্রতিবন্ধকতা মোকাবেলা করতে হয় সবজি, পাট ডালশস্য আবাদ করতে গেলে। দেশের কৃষকদের উৎপাদন বিপণন প্রতিবন্ধকতা ধান, পাট, তেলবীজ, ডালশস্য সবজিমোটাদাগে পাঁচ ফসলেই সবচেয়ে বেশি বলে জানিয়েছে জাতিসংঘের খাদ্য কৃষি সংস্থা (এফএও)

কৃষিপণ্য উৎপাদন বিপণন করতে গিয়ে দেশের প্রায় ৬০ শতাংশ কৃষককে নানা ধরনের কঠিন প্রতিবন্ধকতার মোকাবেলা করতে হয় বলে এফএওর এক সাম্প্রতিক জরিপভিত্তিক গবেষণায় উঠে এসেছে। গবেষণায় পাওয়া ফলাফলের ভিত্তিতে বাংলাদেশ: শকস, এগ্রিকালচারাল লাইভলিহুড অ্যান্ড ফুড সিকিউরিটি মনিটরিং রিপোর্ট ২০২২ শীর্ষক এক গবেষণা প্রতিবেদনে পর্যবেক্ষণ দিয়েছে এফএও। গত বছরের এপ্রিল মে মাসে সংগৃহীত সারা দেশের প্রায় হাজার ৭১৬ জন কৃষক সংশ্লিষ্ট খানার তথ্যের ভিত্তিতে গবেষণাটি পরিচালিত হয়েছে। এতে উঠে এসেছে, প্রতিবন্ধকতাগুলোর কারণে আগ্রহ উদ্যম সত্ত্বেও ফসল উৎপাদন বিপণনে পিছিয়ে পড়ছেন কৃষক, যার নেতিবাচক প্রভাব দেখা যাচ্ছে গোটা কৃষি খাতের সামগ্রিক উৎপাদনে।

এফএওর জরিপের তথ্য অনুযায়ী, ডালজাতীয় শস্য আবাদ করতে গিয়ে উৎপাদনসংশ্লিষ্ট প্রতিবন্ধকতা মোকাবেলা করতে হয় দেশের ৬৬ শতাংশ কৃষককে। শাকসবজির ক্ষেত্রে হার ৬৪ শতাংশ। সোনালি আঁশখ্যাত পাট উৎপাদনে প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হয়েছেন ৬৩ শতাংশ কৃষক। প্রধান খাদ্যশস্য ধান উৎপাদন করতে গিয়ে নানা মাত্রার বাধার সম্মুখীন হওয়ার কথা জানিয়েছেন ৬১ শতাংশ। এছাড়া ৪৬ শতাংশ কৃষক ভুট্টা, ৪৩ শতাংশ গম ৩৭ শতাংশ কৃষক আলু উৎপাদন করতে গিয়ে বাধার সম্মুখীন হওয়ার কথা জানিয়েছেন।

কৃষি খাতের উৎপাদন বৃদ্ধিতে গত কয়েক বছরে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ থাকলেও বিপণনের ক্ষেত্রে অবহেলা থেকে গিয়েছে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। তাদের ভাষ্যমতে, কৃষি খাতে উৎপাদন আবাদ এলাকা বাড়ানোর নানামুখী পরিকল্পনা এর বাস্তবায়ন করতে সচেষ্ট অনেক প্রয়াসই দেখা যায়। কিন্তু সরবরাহ বিপণন ব্যবস্থা উন্নয়নের মাধ্যমে কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। কৃষক বর্তমানে কয়েকশ কৃষিপণ্য উৎপাদন করলেও সরকারিভাবে সংগ্রহ করা হয় মাত্র কয়েকটি পণ্য। সরকারের সবচেয়ে বড় সংগ্রহ কার্যক্রম চলে ধান নিয়ে। সে কার্যক্রমে কৃষকের চেয়ে মিলাররা বেশি সুবিধা পান। কৃষকের পণ্য বিপণন সহজ করতে কৃষি মার্কেট গড়ে তোলা হলেও যথাযথ স্থানে না হওয়ায় সেগুলোর সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে না। আবার ফসলের দামের সিংহভাগই চলে যাচ্ছে মধ্যস্বত্বভোগীদের পকেটে। ফলে উৎপাদনকারী হিসেবে কৃষিতে ক্রমেই আগ্রহ হারাচ্ছেন কৃষক।

আবহাওয়া জলবায়ুসংশ্লিষ্ট দুর্যোগকে এখন উৎপাদন বাড়ানোর পথে বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে দেখছেন কৃষকরা। শুষ্ক মৌসুম বা খরার কারণে উৎপাদন বিপর্যয়ের মুখে পড়ার কথা জানিয়েছেন ৪৩ শতাংশ কৃষক। কৃষি উপকরণের মূল্য নিয়ে ভোগান্তি পোহাতে হয় ৪১ শতাংশ কৃষককে। ৩৯ শতাংশ কৃষক কীটপতঙ্গ বা রোগের প্রাদুর্ভাবে দুর্ভোগে পড়ার কথা জানিয়েছেন। শিলাবৃষ্টি, ঝড় বা প্রবল বাতাসের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার তথ্য দিয়েছেন শতাংশ কৃষক। এছাড়া শতাংশ কৃষক কীটনাশক শতাংশ কৃষক সার প্রাপ্তিতে সমস্যার কথা জানিয়েছেন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট পরিস্থিতি বিবেচনায় দেশের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতে মুহূর্তে কৃষকরাই সবচেয়ে বড় ভরসা। কারণে কৃষকের ন্যায্য প্রতিদান নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই। উপকরণ সরবরাহ পর্যায়ে সরকারের সফলতা রয়েছে। এখন সময় এসেছে বিপণন পর্যায়েও সে সফলতার উদাহরণ তৈরি করার। এক্ষেত্রে সরকারের নীতি আর্থিক প্রণোদনা প্রকৃত কৃষকের কাছে পৌঁছানোর বিষয়টি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এর সঙ্গে কৃষিবিজ্ঞানী, সম্প্রসারণকর্মী বেসরকারি খাতকেও যুক্ত করতে হবে।

উৎপাদন মৌসুমের শুরুতেই বিপণনসংক্রান্ত নানা বাধা কৃষকদের সামনে প্রকট হয়ে উঠতে থাকে। ওই সময় তাদের বিভিন্ন ধরনের ঋণ ধারে উপকরণ সংগ্রহ করতে হয়। ঋণ ধারের অর্থ পরিশোধের আর্থিক অসংগতি মজুদক্ষমতা না থাকায় বাধ্য হয়েই তারা স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কাছে মৌসুমের শুরুতেই ফসল বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। এর সুযোগ নিচ্ছেন মধ্যস্বত্বভোগী ফড়িয়ারা। কৃষক উৎপাদিত ফসল বিক্রি করছেন কম দামে। সে ফসলই আবার সরবরাহ চেইনের বিভিন্ন পর্যায় ঘুরে উচ্চমূল্যে বিক্রি হচ্ছে সাধারণ ভোক্তাদের কাছে। চেইনে মধ্যস্বত্বভোগীদের অপ্রত্যাশিত মুনাফার ফলে বঞ্চিত হচ্ছেন কৃষক। আবার ব্যয় বাড়ছে সাধারণ ভোক্তাদেরও।

সমস্যা নিরসনে বিশেষজ্ঞদের অভিমত হলো কৃষকের যৌক্তিক মূল্যপ্রাপ্তি নিশ্চিত করতে বাজার ব্যবস্থাপনা উন্নয়নের পাশাপাশি মৌসুমের শুরুতে বিভিন্ন ফসলের দাম নির্ধারণ করা যেতে পারে। মৌসুমের শুরুতেই কৃষকরা যাতে মজুদ বা সংরক্ষণ করতে পারেন, সে ব্যবস্থাও নেয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে বাজার তদারকির দায়িত্বে থাকা বিপণন অধিদপ্তরকেও শক্তিশালী করতে হবে। সেক্ষেত্রে দাম নির্ধারণে একপক্ষীয় ভূমিকা কমে আসতে পারে।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. বেনজীর আলম বণিক বার্তাকে বলেন, কৃষকের উৎপাদন পর্যায়ের বাধা দূর করে কৃষিপণ্যের উৎপাদন বৃদ্ধিই আমাদের অন্যতম প্রধান কাজ। বাণিজ্যিক কৃষির আবাদ বাড়ানোর মাধ্যমে কৃষক যাতে লাভবান হতে পারেন, সে চেষ্টা করা হচ্ছে। সার্বিকভাবে কৃষক পর্যায়ে সব সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়াই আমাদের  প্রধান লক্ষ্য।

কৃষককে ক্ষতির হাত থেকে সুরক্ষা দিতে কৃষিপণ্য রফতানি বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে উল্লেখ করে তিনি আরো বলেন, প্রক্রিয়াজাত বাণিজ্যিকীকরণের মাধ্যমে কৃষিকে লাভজনক করতে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ রয়েছে। কৃষিপণ্যের রফতানি আরো বাড়ানোর বিভিন্ন উপায় নিয়ে কাজ হচ্ছে। এজন্য কৃষি খাতে প্রক্রিয়াজাত শিল্প স্থাপন উদ্যোক্তাদের সহায়তা দেয়ার জন্য বিভিন্ন ধরনের প্রকল্প নেয়া হচ্ছে। উৎপাদিত কৃষিপণ্য স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে বিপণন করতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। কৃষিপণ্যকে রফতানিমুখী করতে নীতিসহায়তা বাড়ানোরও উদ্যোগ রয়েছে।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন