শনিবার | মে ২১, ২০২২ | ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯ 

সম্পাদকীয়

খেলাপি গ্রাহকের সম্পত্তিতে নিরপেক্ষ রিসিভার নিয়োগে অর্থঋণ আদালতের আদেশ

ঋণখেলাপি মামলার দ্রুত নিষ্পত্তিতে বিচারক নিয়োগ ও আদালতের সংখ্যা বাড়ানো হোক

সংশ্লিষ্ট এক বাণিজ্যিক ব্যাংকের করা মামলার পরিপ্রেক্ষিতে খেলাপি গ্রাহকের মর্টগেজ রাখা সম্পত্তিতে নিরপেক্ষ রিসিভার নিয়োগের আদেশ দিয়েছেন চট্টগ্রামের অর্থঋণ আদালত। খেলাপি ঋণ আদায়ে মর্টগেজ রাখা সম্পত্তি বিক্রি করে অর্থ উদ্ধারে দীর্ঘ সময় আমলাতান্ত্রিক জটিলতা থাকার প্রেক্ষাপটে ধরনের পদক্ষেপ তাত্পর্যপূর্ণ বৈকি। এতে মর্টগেজ বিক্রি করে ঋণ আদায়ের মধ্যবর্তী সময়ে ভাড়া আদায়ের মাধ্যমে ঋণের কিছু অর্থ ব্যাংক উদ্ধার করতে পারে। তবে খেলাপি ঋণ আদায়ে এটি স্থায়ী সমাধান দেয় না। এর আগে এমন আদেশ বাস্তবায়নে ব্যাংককে বেগ পেতে হয়েছে, পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা যায়নি কর্তৃপক্ষের অসহযোগিতায়। এক্ষেত্রে খেলাপি ঋণসংক্রান্ত মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন।

খেলাপি ঋণ বিশ্বের প্রায় সব দেশেই কমবেশি হয়। তবে বাংলাদেশের মতো সমসাময়িক অর্থনীতির দেশে লাখ কোটি টাকার ঋণখেলাপি হওয়ার নজির নেই বললেই চলে। খেলাপি ঋণের স্ফীতি একদিনে তৈরি হয়নি। দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত সমস্যা সঠিকভাবে তদারকির অভাবে ধীরে ধীরে মহীরুহ হয়েছে। এর সূত্রপাত ঋণ প্রদানে দুর্বলতা থেকেই। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ সঠিকভাবে যাচাই-বাছাই না করে বা চাপে পড়ে যথাযথ মর্টগেজ ঋণ প্রপোজাল খতিয়ে দেখা ছাড়াই ঋণ প্রদান করায় খেলাপি ঋণ তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ঋণের মনিটরিংয়ের দুর্বলতার কারণেও খেলাপি ঋণ বেড়েছে। কয়েকটি ধাপ পার হয়ে তবে একটি ঋণ খেলাপি হয়। প্রথমেই এটি সাবস্ট্যান্ডার্ড, পরে ডাউটফুল এবং সর্বশেষ লস হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। প্রথম দ্বিতীয় স্তরে ঋণটি নিয়ে ব্যাংক সতর্ক হয়ে তদারকি বাড়ালে অধিকাংশ ঋণের খেলাপি হওয়া রোধ করা সম্ভব বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। ঋণ প্রদানে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ এবং খেলাপি হওয়ার আগেই তার রাশ টেনে ধরা জরুরি। এর পরের ধাপ অর্থ আদায়ে মামলা দায়ের। খেলাপি ঋণ আদায় বাংলাদেশের বাস্তবতায় বাণিজ্যিক ব্যাংকের জন্য কঠিন এক পরীক্ষা। অধিকাংশ ক্ষেত্রে খেলাপিরা উচ্চ আদালতের রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বছরের পর বছর পার পেয়ে যান। এক্ষেত্রে ব্যাংকের দুর্বলতা হলো, সঠিক আইনজীবী নিয়োগ না করা এবং আইনজীবীদের যথাযথ ফি প্রদান না করা। অনেক সময় ব্যাংকের আইনজীবী খেলাপির পক্ষে কাজ করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। নানা কারণে অর্থঋণ আদালতের মামলাজট তৈরি হচ্ছে। খেলাপি ঋণ আদায়ে ব্যাংকারদের হয়রানি বাড়ছে। মামলা ঝুলে থাকায় গ্রাহকরাও আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। দেশের ব্যাংকিং খাতকে খেলাপি ঋণের সংস্কৃতি থেকে বের করে আনতে হলে দ্রুতগতিতে ঋণখেলাপির বিচার নিষ্পত্তি করতে হবে।

দেশের আইনে খেলাপি ঋণ আদায় যেহেতু কঠিন সেহেতু উন্নত দেশগুলো, বিশেষত মালয়েশিয়া অন্যান্য দেশ কীভাবে ঋণখেলাপিদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে এবং অন্যান্য উপায়ে খেলাপি ঋণের লাগাম টেনে ধরেছে তা পর্যালোচনা করে বাংলাদেশ অগ্রসর হতে পারে। বন্ধকি সম্পত্তির সমস্যা একই জমি একাধিক ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়ার ক্ষেত্রে কীভাবে ব্যবহার হতে পারে তা বোধগম্য নয়। ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে আইনি প্রক্রিয়া ভালোভাবে অনুসরণ আন্তর্জাতিক মানসম্মত আইন তৈরির মাধ্যমে খেলাপি ঋণের লাগাম টেনে ধরা যেতে পারে। খেলাপি ঋণ আদায়সংক্রান্ত যেসব আইন আছে তা সংস্কার সংশোধন করতে হবে। ইংল্যান্ড, আমেরিকা বা অন্যান্য উন্নত দেশে কেউ যদি বাড়ি বা সম্পদ ব্যাংকের কাছে বন্ধক দেন এবং পরবর্তী সময়ে ঋণখেলাপি হয়ে যান তাহলে ব্যাংক সেই সম্পদ সরাসরি বিক্রি করে দিতে পারে। এমনকি ঋণগ্রহীতা যদি কোর্টেও যান, তিনি সম্পত্তি বিক্রি ঠেকাতে পারবেন না। কিন্তু আমাদের দেশে এটা করা সম্ভব হয় না। কিন্তু ঋণখেলাপিদের বন্ধককৃত সম্পদ বিক্রির ব্যাপারে অতি উদারতার পরিচয় দেয়ার কোনো সুযোগ নেই। কাজেই -বিষয়ক আইন পরিবর্তন-সংশোধন করা খুবই জরুরি। বন্ধকি সম্পত্তি বিক্রির ব্যবস্থাসংক্রান্ত আইনটি উন্নত দেশের আদলে পরিবর্তন হওয়া উচিত।

দেশের ফাস্টট্র্যাক আইন হিসেবে ২০০৩ সালে অর্থঋণ আদালতের যাত্রা। আইনের কার্যকারিতাকে দেশের অন্য সব আইনের ওপর প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। খেলাপি ঋণের লাগাম টেনে দেশের আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়েই স্থাপন করা হয়েছিল অর্থঋণ আদালত। কিন্তু সময়ের বিবর্তনে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ না কমে উল্টো বহুগুণ বেড়েছে। আইন অনুযায়ী দেশের সব জেলায় অর্থঋণ আদালত থাকার কথা। তবে সারা দেশে কেবল অর্থঋণ বিষয়ের ওপর বিচার করে ধরনের আদালতের সংখ্যা বর্তমানে ১১। যেসব জেলায় অর্থঋণ আদালত নেই, সেখানে যুগ্ম জেলা জজ আদালত একই সঙ্গে ফৌজদারি, দেওয়ানি অর্থঋণ মামলার বিচার পরিচালনা করেন। এতে অর্থঋণ আদালতের পাশাপাশি অন্য আদালতের বিচারকাজেও দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হচ্ছে। সাধারণত ঋণখেলাপিরা খেলাপির ওপর উচ্চ আদালত থেকে রিট করেন। অর্থাৎ ঋণখেলাপিকে সাময়িক সময়ের জন্য ঋণখেলাপি বলা যাবে না। উচ্চ আদালত থেকে খেলাপি ঋণের ওপর স্থগিতাদেশ নিয়ে ব্যাংক থেকে আবারো নতুন করে ঋণ নিচ্ছেন। আবার নতুন করে ঋণ নিয়ে তা পরিশোধ না করে খেলাপি হয়ে যাচ্ছেন। এভাবে একেকটি ব্যবসায়ী গ্রুপের নামে হাজার হাজার কোটি টাকার খেলাপি ঋণ সৃষ্টি হয়েছে। প্রক্রিয়ায় ঋণখেলাপিরা যেন সুযোগ না পান সেজন্য আইন সংশোধনের উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে। যেমন যারাই উচ্চ আদালতে রিট করবেন তাদেরকে আগে খেলাপি ঋণের ৫০ শতাংশ পরিশোধ করতে হবে। এভাবে আইন সংশোধন করলে ঋণখেলাপিরা আর সচরাচর উচ্চ আদালতের শরণাপন্ন হতে পারবেন না।

খেলাপী ঋণে সমস্যা সমাধানে আরবিট্রেশন বড় ভূমিকা রাখতে পারে। বিশ্বে কমার্শিয়াল বিরোধের ৮০ শতাংশ নেগোশিয়েশন, মেডিয়েশন আরবিট্রেশনের মাধ্যমে নিষ্পত্তি হচ্ছে। কিন্তু দেশে সব বিরোধই আদালতে চলে যাচ্ছে। দেশে আরবিট্রেশন-সংক্রান্ত আইনের সীমাবদ্ধতা আছে। ইউরোপ-আমেরিকায় আরবিট্রেশনের দায়িত্ব পালনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে সরকার অর্থ দেয়। কিন্তু বাংলাদেশে ধরনের কোনো সহায়তা দেয়া হয় না। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র, মালয়েশিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মন্দ ঋণ বেসরকারি কোম্পানির কাছে বিক্রি করে দেয়া হয়। বেসরকারি কোম্পানিগুলো ব্যাংকের কাছ থেকে খেলাপি ঋণ অর্ধেক বা এর চেয়ে কম মূল্যে কিনে নেয়। এতে ব্যাংকের খাতায় খেলাপি ঋণ কমে যায়। আর বেসরকারি কোম্পানি ঋণখেলাপির জামানতকৃত সম্পদ বিক্রি করে অর্থ আদায় করে। বিদেশের আদলে দেশের মন্দ ঋণ বেসরকারি কোম্পানির কাছে বিক্রি করে দেয়া হতে পারে। ভারত, পাকিস্তানসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে খেলাপি মন্দ ঋণ আদায়ে ধরনের ডেট রিকভারি এজেন্ট রয়েছে। ব্যাংকের পক্ষে তারা ঋণ আদায় করে। এক্ষেত্রে আদায় করা ঋণের বিপরীতে কমিশন নেয় এজেন্ট কোম্পানিগুলো। ঋণ আদায় করতে না পারলে এজেন্টগুলোকে কোনো কমিশন বা ফি দিতে হয় না। বিভিন্ন দেশের এজেন্ট ব্যাংকের কাছ থেকে খেলাপি ঋণও কিনে নেয়। মাঝে একটি আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেয়া হলেও পরবর্তী সময়ে সেটি আর এগোয়নি।

চট্টগ্রামের অর্থঋণ আদালত যে আদেশ দিয়েছেন তা বাস্তবায়নেও কয়েকটি পর্যায় পার হতে হবে। রায় বাস্তবায়নে আবারো আদালতে যাওয়া এবং নিরপেক্ষ রিসিভার নিয়োগ দিতে হবে। রিসিভার সরকারি তালিকাভুক্ত ব্যক্তিদের দিতে হবে কিনা, তাও বিবেচনার বিষয়। সবসময় নিরপেক্ষ সৎ রিসিভার মিলবে কিনা, তাও গুরুত্বপূর্ণ। রিসিভারের কাজ সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে সহায়তাকারী নিয়োগ এবং আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তা প্রয়োজন হবে। এক্ষেত্রে তা মিলবে কিনা, আর মিললেও কত দিন মিলবে তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। আদালতের রায় দ্রুত সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়নে যেসব প্রতিবন্ধকতা রয়েছে, তা দূর করা প্রয়োজন। অর্থঋণ আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে রিট করে স্থগিত রাখা হলে ব্যাংকের কোনো লাভ হবে না। এক্ষেত্রে ব্যাংকের লিগ্যাল বিভাগের সক্রিয়তা প্রয়োজন। দেখা যায়, অধিকাংশ ব্যাংকের লিগ্যাল বিভাগ অত্যন্ত দুর্বল এবং আইনজীবী নিয়োগের ক্ষেত্রে দক্ষতার চেয়ে পরিচিতিকেই বেশি প্রাধান্য দেয়া হয়। এক্ষেত্রে ব্যাংকের লিগ্যাল বিভাগকে আরো শক্তিশালী করা প্রয়োজন। সবচেয়ে জরুরি খেলাপি ঋণসংক্রান্ত মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি। এর জন্য পর্যাপ্ত অর্থঋণ আদালত প্রতিষ্ঠা, দক্ষ বিচারক নিয়োগ আদালতকে বিশেষ ক্ষমতা দিতে হবে।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন