বুধবার | জানুয়ারি ২৬, ২০২২ | ১২ মাঘ ১৪২৮

প্রথম পাতা

বাংলাদেশে দিগন্ত বড় করছে বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন

বদরুল আলম

বাংলাদেশে সামাজিক উন্নয়নের নানা খাতে নিজেদের উপস্থিতি বড় করে তুলছে বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন। গত দুই দশকে বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক দাতব্য সংস্থার অর্থায়ন পেয়েছে দারিদ্র্য বিমোচন, স্বাস্থ্য পুষ্টি, শিক্ষা, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি নারী উন্নয়নকেন্দ্রিক বিভিন্ন প্রকল্প। তাদের অর্থায়ন পাওয়া সংস্থা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে স্বাস্থ্য খাতে আইসিডিডিআর,বি যেমন রয়েছে, তেমনি শিক্ষা খাতে আছে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ ধনকুবেরের হাতে গড়ে ওঠা ফাউন্ডেশনটির তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যাচ্ছে, তাদের মাধ্যমে পাওয়া অনুদানে গত দুই দশকে বাংলাদেশের সরকারি-বেসরকারি খাত দেশের সামাজিক উন্নয়নে বড় ভূমিকা রাখছে।

ইতালিভিত্তিক উন্নয়ন জোট পার্টনার্স ইন পপুলেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (পিপিডি) জোটটির ১০ প্রতিষ্ঠাতা সদস্যের অন্যতম বাংলাদেশ। পিপিডির মাধ্যমে ২০০০ সালে বাংলাদেশের কোনো প্রকল্পে প্রথম অর্থায়ন করে বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন। ৩০ লাখ ডলারের প্রকল্পটি ছিল মূলত পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রমকে ঘিরে।

পিপিডির পর একে একে দেশের বহু সংস্থা প্রতিষ্ঠান অনুদান পেয়েছে বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন থেকে। এসব সংস্থা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সবচেয়ে বেশি অনুদান পেয়েছে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি) গত দুই দশকে বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন থেকে বাংলাদেশে আসা অনুদানের পরিমাণ ১৯ কোটি ডলারের কিছু বেশি, যার সিংহভাগই পেয়েছে আইসিডিডিআর,বি।

উন্নয়ন জোট স্বাস্থ্য গবেষণা সংস্থার পাশাপাশি বাংলাদেশের ব্যক্তি খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোও বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন থেকে পাওয়া অনুদানের অর্থ বাংলাদেশে উন্নয়নমূলক কার্যক্রমে ব্যয় করছে। এসব সংস্থা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আছে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (পিআরআই), সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি), উদ্যোক্তা উন্নয়ন প্রকল্প ইনোভেশন ডিজাইন অ্যান্ড অন্ট্রাপ্রেনিউরশিপ একাডেমি (আইডিইএ) আরো আছে ব্যাংক এশিয়া লিমিটেড, ওষুধ খাতের প্রতিষ্ঠান ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড।

পিআরআইয়ের নির্বাহী পরিচালক . আহসান এইচ মনসুর বণিক বার্তাকে বলেন, বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশনের সঙ্গে পিআরআইয়ের সহযোগিতা বাংলাদেশে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের প্রচারণার ক্ষেত্রে। বিশ্বব্যাপী সংস্থাটি ক্ষুধা, পরিবেশ জলবায়ু এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তি নিয়ে কাজ করে। অতিসম্প্রতি তারা টিকাদান কর্মসূচিতেও কাজ করছে। তারা কিছু বিনিয়োগ করছে বাংলাদেশে। কার্যক্রমটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ভেঞ্চার ক্যাপিটাল এখন বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জন্য খুব প্রয়োজন।

বাংলাদেশে বেসরকারি ব্যাংক খাতে প্রথম যে ব্যাংকটির সঙ্গে বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন যুক্ত হয়েছে সেটি হলো ব্যাংক এশিয়া লিমিটেড। ব্যাংকটির জন্য বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন প্রতিশ্রুত অনুদানের পরিমাণ ১১ লাখ হাজার ৩৭৭ ডলার। জানতে চাইলে ব্যাংক এশিয়া লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আরফান আলী বণিক বার্তাকে বলেন, ব্যাংক এশিয়া বাংলাদেশের প্রথম ব্যাংক, যাদের সঙ্গে কাজ করছে বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন। নারীকেন্দ্রিক উন্নয়নকে গুরুত্ব দিয়ে সংস্থাটি আমাদের ব্যাংকের সঙ্গে কাজ করছে। নারীর অংশগ্রহণের মাধ্যমে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সংস্থাটির সঙ্গে আমাদের কাজ চলছে।

বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশনের অর্থায়ন পেয়েছে, দেশের এমন সংস্থা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে আরো রয়েছে সাজেদা ফাউন্ডেশন, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন, নারী শিশু স্বাস্থ্য কেন্দ্র (সিডব্লিউসিএইচ), জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) বাংলাদেশ, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি, চাইল্ড হেলথ রিসার্চ ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি (বুয়েট), ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি), ডেভকনসালট্যান্টস লিমিটেড (ডেভকন), শপ ফ্রন্ট লিমিটেড, ইনারগায়া লিমিটেড বাংলাদেশ, মমদা ফাউন্ডেশন বিকাশ লিমিটেড।

গেটস ফাউন্ডেশনের অনুদান পাওয়া সংস্থা প্রতিষ্ঠানগুলো জানিয়েছে, গত এক দশকে বাংলাদেশে ফাউন্ডেশনটির কৌশলে অনেক পরিবর্তন হয়েছে। শুরুতে মনোনিবেশ ছিল জনস্বাস্থ্যকেন্দ্রিক। তখন পুষ্টির বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে কাজ করেছে ফাউন্ডেশন। এখন গবেষণা, নারীকেন্দ্রিক আর্থিক অন্তর্ভুক্তি, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মতো আরো নানা ক্ষেত্রে নিজেদের দিগন্ত বিস্তৃত করেছে তারা।

জানতে চাইলে ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক আসিফ সালেহ বণিক বার্তাকে বলেন, আমি যোগ দেয়ার আগেই ব্র্যাকের সঙ্গে কাজ শুরু হয় বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশনের। শুরুতে শৈশবকাল থেকে শিশুদের পুষ্টিতে যেন কোনো সমস্যা না হয়, সে বিষয়টি নিয়ে কাজ করছিল ফাউন্ডেশনটি। আরেকটি বড় ফোকাসের জায়গা ছিল কমিউনিটি ল্যাট্রিন স্থাপন করা, যা বাস্তবায়নে দেশের ২৪৮টি উপজেলায় আমরা কাজ করেছি। পরবর্তী সময়ে তাদের ফোকাস যায় আর্থিক অন্তর্ভুক্তির দিকে। সে সময় থেকে তারা ক্যাশলেস সোসাইটি তৈরিসহ এতে নারীদের সম্পৃক্ত করার বিষয়ে কাজ শুরু করে।

আর্থিক অন্তর্ভুক্তি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দেয়ার ক্ষেত্রে বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন গত পাঁচ বছর ব্র্যাকের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে উল্লেখ করে আসিফ সালেহ বলেন, এখন বিশেষ করে পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীর মধ্যে ডিজিটাল সাক্ষরতা তৈরির বিষয়ে কাজ হচ্ছে। এতে নারীর অংশগ্রহণও গুরুত্ব পাচ্ছে। পাশাপাশি লিঙ্গবৈষম্য কমিয়ে আনতে ব্র্যাককে সহযোগিতা করছে বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন। অংশীদারিত্বের ক্ষেত্রে বিকাশের প্রারম্ভিক পর্যায়ের বিনিয়োগকারী হিসেবেও ভূমিকা রয়েছে তাদের।

মাইক্রোসফট প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস তার সাবেক স্ত্রী মেলিন্ডা গেটসের যৌথ উদ্যোগে গড়ে উঠেছে বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন। যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনের সিয়াটলে ২০০০ সালে কার্যক্রম শুরু করে বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন। গেটস লার্নিং ফাউন্ডেশনের সঙ্গে উইলিয়াম এইচ গেটস ফাউন্ডেশন একীভূত করে এটি প্রতিষ্ঠা করা হয়। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এখন পর্যন্ত ৫৩ দশমিক বিলিয়ন ডলার জনহিতকর নানা কার্যক্রমে ব্যয় করেছে ফাউন্ডেশন।

দারিদ্র্য বিমোচনই ছিল বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশনের মূল উদ্দেশ্য। প্রতিষ্ঠার সময় বিভিন্ন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা (এনজিও) তাদের সঙ্গে কাজ করেছিল। ম্যালেরিয়া এইডসের মতো প্রাণঘাতী সংক্রামক রোগ দূর করতে সহযোগিতাও করে এসব সংস্থা। গেটস ফাউন্ডেশনের অন্যতম আর্থিক সহযোগী গ্যাভি-দ্য ভ্যাকসিন অ্যালায়েন্স ২০০০ সালে গরিব দেশগুলোয় টিকা সুবিধা সহজে পাওয়ার ব্যবস্থা করে। সে সময় ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে ৪০০ কোটি ডলার দেয়া হয়, যা এখন করোনা টিকা নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে।

এছাড়া দরিদ্র দেশগুলোয় স্যানিটেশন উন্নত করাও ফাউন্ডেশনের অন্যতম লক্ষ্য। সংস্থাটির ওয়েবসাইট থেকে জানা যায়, গেটস দম্পতি ১৯৯৪ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত নিজেদের সম্পদ থেকে হাজার ৬০০ কোটি ডলার দান করেছেন। আরেক ধনকুবের ওয়ারেন বাফেট ২০০৬ সালে গেটস ফাউন্ডেশনকে গিভিং প্লেজ ক্যাম্পেইনে হাজার কোটি ডলার দিয়েছিলেন। গেটস ফাউন্ডেশন মূলত প্রভাবক হিসেবে কাজ করে। ২০১৮ সালে তারা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থায় সবচেয়ে বেশি অনুদান দিয়েছিলেন। চলমান করোনা মহামারীতে স্বাস্থ্য খাতেও বিল গেটস ভূমিকা রাখছেন।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন