বুধবার | জানুয়ারি ২৬, ২০২২ | ১২ মাঘ ১৪২৮

সম্পাদকীয়

আলোকপাত

পূর্ব এশিয়ার অর্থনীতিগুলোর বড় চ্যালেঞ্জ এখন অসমতা

কিউন লি

নেটফ্লিক্সে রিলিজ হওয়া দক্ষিণ কোরিয়ার একটি ভিন্নধর্মী নাটকস্কুইড গেমবিশ্বের সবচেয়ে বেশি দেখা টেলিভিশন সিরিজের একটি। প্যারাসাইটের মতোযেটি ২০২০ সালে অস্কারে সেরা ছবি হিসেবে বিজয়ী হয়েছিলস্কুইড গেমেও দক্ষিণ কোরিয়ার ধনী দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে ক্রমবর্ধমান বৈষম্যের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। ধরনের বৈষম্য এখন সব না হলেও অনেক উন্নত দেশেই বিরাজ করছে।

এটি বিস্ময়কর মনে হলেও দক্ষিণ কোরিয়াও ধরনের অসমতায় ভুগছে। কারণ দেশটির আগের উচ্চ প্রবৃদ্ধি এবং নিম্ন বৈষম্য ছিল পূর্ব এশীয় বিস্ময়ের কেন্দ্রীয় বিষয়। ১৯৬০ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত ওই অঞ্চলের অর্থনীতিগুলো তথাকথিত কুজনেৎস হাইপোথিসিস সমর্থন করেছিল এজন্য যে, শিল্পায়নমুখী দেশগুলোয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি প্রাথমিকভাবে অসমতা বাড়াবে, কিন্তু পরবর্তী সময়ে স্থিত সম্প্রসারণের মধ্যে এটি কমতে থাকবে। তবে ধরনের সমতাধর্মী প্রবৃদ্ধি প্রাথমিকভাবে না হলেও চলতি শতকের শূন্য দশকের দিকে অনেকটা রুদ্ধ হয়ে গিয়েছিল।

বর্তমানে দক্ষিণ কোরিয়ার পুঁজিবাদ মনে হয় আরো বেশি অপ্রীতিকর অবস্থায় পৌঁছাচ্ছে। সম্ভবত কারণে যে এটি উদার অ্যাংলো-স্যাক্সন মডেলের দিকে ধাবিত হয়েছেযা দুর্বল বিনিয়োগ, ধীর প্রবৃদ্ধি এবং উচ্চ অসমতার সঙ্গে যুক্ত। উদাহরণস্বরূপ বিশ্বজুড়ে বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে এবং পূর্ব এশিয়ায় জাতীয় আয়ে শীর্ষ ১০ শতাংশ ধনিক গোষ্ঠীর হিস্যা বেড়েছে। ২০১০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রে অনুপাত ছিল সবচেয়ে বেশি, ৪৫ শতাংশের উপরে। দক্ষিণ কোরিয়ায় এটি ছিল ৪৫ শতাংশের কাছাকাছি এবং জাপানে ছিল ৪০ শতাংশের কাছাকাছি।

কনভারজেন্স থিসিসের আরো সমর্থন পাওয়া যায় ওয়ার্ল্ড ইনইকুয়ালিটি ল্যাব প্রণীত ওয়ার্ল্ড ইনইকুয়ালিটি রিপোর্ট ২০২২-এ। ওই প্রতিবেদনের তথ্যমতে, বর্তমানে দক্ষিণ কোরিয়ার মাথাপিছু আয় ৩৩ হাজার ইউরো, যা যুক্তরাজ্যের কাছাকাছি (৩২ হাজার ৭০০ ইউরো) এবং ফ্রান্সের চেয়ে কিছুটা কম (৩৬ হাজার ৩০০), তবে ইতালি (২৯ হাজার ১০০ ইউরো) জাপানের (৩০ হাজার ৫০০ ইউরো) চেয়ে বেশি। কিন্তু আয়বৈষম্যের প্রসঙ্গ যখন আসে তখন দেখা যায় যে, দক্ষিণ কোরিয়ার শীর্ষ ১০ শতাংশ ধনিক গোষ্ঠী নিচের ৫০ শতাংশ জনগোষ্ঠীর চেয়ে ১৪ গুণের বেশি আয় করে; যেটি যুক্তরাষ্ট্রে ১৭ গুণ, জাপানে ১৩ গুণ, ইতালিতে আট গুণ, ফ্রান্সে সাত গুণ সুইডেনে ছয় গুণ।

অধিকন্তু অনেকটা জাপানি অভিজ্ঞতার মতো দক্ষিণ কোরিয়ার জিডিপি প্রবৃদ্ধি ধীরে ধীরে কমেছে। ১৯৮০ ১৯৯০-এর দশকে বার্ষিক - শতাংশ সম্প্রসারণের পর দেশটির সম্ভাব্য প্রবৃদ্ধি হার চলতি শতকের শূন্য দশকের প্রথম দিকে প্রায়ই দশমিক শতাংশে নেমে এসেছিল, তারপর একই দশকের শেষের দিকে দশমিক শতাংশে, ২০১০ সালের প্রথম দিকে দশমিক শতাংশ এবং ২০১০ সালের শেষের দিকে দশমিক শতাংশে নেমে আসে। আমার সহকর্মী সে জিক কিম বরং একটিসূত্রউত্থাপন করেছে যে, দক্ষিণ কোরিয়ার প্রবৃদ্ধি হার প্রতি পাঁচ বছরে শতাংশীয় পয়েন্ট কমেছে।

মার্কিন মডেলের দিকে কনভারজেন্সের দিকে পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোকে কীসে আসলে চালিত করছে? একটা উত্তর হতে পারে আর্থিকীকরণ (ফাইন্যান্সিয়ালাইজেশন), যেখানে জিডিপিতে আর্থিক খাতের অবদান বাড়ছে এবং পুনর্বিনিয়োগকৃত করপোরেট মুনাফা ডিভিডেন্ড পেমেন্টকে ছাড়িয়েছে।


যেহেতু দক্ষিণ কোরিয়া ১৯৯৭ সালে এশীয় আর্থিক সংকটের সময় আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের বেইলআউট প্যাকেজের শর্ত হিসেবে আর্থিকীকরণ বাস্তবায়ন করেছে, সেহেতু দেশটির অর্থনৈতিক মডেল মার্কিন স্টাইল শেয়ারহোল্ডার পুঁজিবাদের দিকে এগিয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার অন্যতম প্রথম সংস্কার ছিল আর্থিক বাজারের মৌলিক উন্মোচন, যা পূর্ব এশিয়ায় পুনর্বিনিয়োগের জন্য মুনাফা ধরে রাখার আগের প্রতিষ্ঠিত চর্চার বিপরীতে শেয়ার বাইব্যাক তুলে দেয়া আরো ডিভিডেন্ড পেমেন্ট দেয়া উৎসাহিত করেছিল।

ফলে দক্ষিণ কোরিয়ার জিডিপিতে বিনিয়োগের অংশ তখন থেকে শতাংশীয় পয়েন্ট কমে এসেছিল এবং সেটি হয়েছে অভ্যন্তরীণ প্রবৃদ্ধি কর্মসংস্থান কমিয়ে। এরই মধ্যে বিদেশী বিনিয়োগকারীদের শেয়ারধারণ ১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝিতে শতাংশের কম থেকে শূন্য দশকের প্রথম দিকে ৪০ শতাংশে উন্নীত হয়েছিল।

যদিও অনেক আগে নিম্ন লভ্যাংশ পরিশোধকে কোম্পানি ভ্যালুয়েশনেকোরিয়া ডিসকাউন্টস’-এর অন্যতম কারণ মনে করা হয়েছিল, এখন স্যামসাংয়ের মতো শীর্ষ প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের মোট মুনাফার প্রায় ৪০ শতাংশ শেয়ারহোল্ডারকে পরিশোধের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের চর্চা গ্রহণ করছে। ২০১৭ সালে স্যামসাং প্রতি বছরের বিপরীতে প্রতি প্রান্তিকে লভ্যাংশ দেয়া শুরু করেছে। এটা বড় ধরনের পরিবর্তন বৈকি।

তবে পূর্ব এশীয় পুঁজিবাদের এখন পুনর্ভারসাম্য প্রয়োজন। এখানে নীতিনির্ধারকরা ইউরোপ থেকে শিখতে পারে, যা শেয়ারহোল্ডার ক্যাপিটালিজমে নেতিবাচক প্রভাব কমাতে কিছু সংস্কার উদ্যোগ নিয়েছে। উদাহরণস্বরূপ ইউরোপিয়ান পার্লামেন্ট ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের মধ্যে অধিক ভোটিং অধিকার কিংবা দুই বছরের বেশি যারা শেয়ার ধরে রেখেছে তাদের উচ্চতর লভ্যাংশ দেয়ার সুযোগ প্রদানকারী করপোরেট গভর্ন্যান্স সংস্কার কার্যকর করেছিল।

একইভাবে যুক্তরাষ্ট্র নতুন তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোকে ডুয়াল ক্লাস শেয়ার ইস্যু করার অনুমতি দেয়, যা তাদের প্রতিষ্ঠাতাদের বিশেষ ভোটিং ক্ষমতা দেয়। গুগল ফেসবুকসহ অনেক হাই-টেক কোম্পানিকে একটা দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থাপনা দৃষ্টিভঙ্গিতে এবং আগ্রাসীভাবে অভিনবমূলক নতুন নতুন প্রজেক্টে নিয়ে সমর্থ করে তুলেছে।

ধরনের সুবিধাগুলো আংশিকভাবে ব্যাখ্যা করে কেন দক্ষিণ কোরিয়ার -কমার্স প্লাটফর্ম কোপ্যাং চলতি বছরের প্রথম দিকে দেশীয় কসদাক মার্কেটের বিপরীতে নিউইয়র্ক স্টক মার্কেটে তালিকাভুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর প্রতিক্রিয়ায় অবশ্য দক্ষিণ কোরিয়ার আইন পরিষদ-জাতীয় সংসদ অবশেষে বড় কোম্পানি  (পড়ুন চেবল) নয়; স্টার্টআপ বা ক্ষুদ্র-মাঝারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে ডুয়াল ক্লাস শেয়ার ছাড়ার অনুমতি দেয়ার দীর্ঘ প্রলম্বিত আইন পাস করতে যাচ্ছে।

পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর উচিত আর্থিকীকরণ খর্ব করে এবং তাদের উৎপাদন খাতের শক্তি ফিরিয়ে এনে (যা আগে উচ্চ প্রবৃদ্ধি বৃহত্তর সমতা এনেছিল) তাদের অর্থনীতিগুলোকে পুনর্গঠনে কভিড-১৯ সংকটকে সুযোগ হিসেবে দেখা। তবে নিছকই অতীতে ফেরার পরিবর্তে অঞ্চলের অর্থনীতিগুলোর উচিত একটি হাইব্রিড মডেলকে স্বাগত জানানো, যা শেয়ারহোল্ডার স্টেকহোল্ডার মডেলের উপাদান অন্তর্ভুক্ত করবে। ধরনের সংস্কার বৈশ্বিক ইএসজি মূলনীতিগুলোর (পরিবেশগত, সামাজিক সুশাসনগত) সঙ্গেও সংগতিপূর্ণ, যা দক্ষিণ কোরিয়ার করপোরেট খাত জোরালোভাবে সমর্থন করে।

যদিও অ্যাংলো-স্যাক্সন পুঁজিবাদের দিকে পূর্ব এশিয়ার কনভারজেন্স পীড়াদায়ক মনে হতে পারে, তবে তথ্য মিথ্যা বলে না। সঠিক পদক্ষেপ নেয়ার মাধ্যমে নীতিনির্ধারকরা অঞ্চলের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ তার সাম্প্রতিক প্রবণতার চেয়ে সমুজ্জ্বল করতে সাহায্য করতে পারে বৈকি।

[স্বত্ব:
প্রজেক্ট সিন্ডিকেট
]

 

কিউন লি: ভাইস চেয়ার, ন্যাশনাল ইকোনমিক অ্যাডভাইজরি কাউন্সিল ফর দ্য প্রেসিডেন্ট অব সাউথ কোরিয়া; অর্থনীতির ডিশটিংগুইশড অধ্যাপক, সিউল ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি

ভাষান্তর: হুমায়ুন কবির

 

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন