বুধবার | জানুয়ারি ২৬, ২০২২ | ১২ মাঘ ১৪২৮

প্রথম পাতা

মার্জিন ঋণে ডুবছে ইউনিয়ন ক্যাপিটাল

মেহেদী হাসান রাহাত

পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইউনিয়ন ক্যাপিটাল লিমিটেডের বিরুদ্ধে আর্থিক প্রতিবেদনে মিথ্যা ঘোষণা দেয়ার প্রমাণ পেয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। অন্যদিকে ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিলের (এফআরসি) পর্যবেক্ষণে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে হিসাবমান লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া গেছে। এদিকে ইউনিয়ন ক্যাপিটাল বলছে, মার্জিন ঋণের অর্থ আটকে যাওয়ার পাশাপাশি তারল্য সংকটের কারণে তাদের আর্থিক অবস্থা দুর্বল হয়ে পড়েছে। এতে দুই বছর ধরে প্রতিষ্ঠানটিকে বড় অংকের লোকসান গুনতে হয়েছে।

ইউনিয়ন ক্যাপিটালের সর্বশেষ সমাপ্ত ২০২০ সালের আর্থিক বিবরণী চূড়ান্ত করার ক্ষেত্রে সংস্থান সংরক্ষণের বিষয়ে মিথ্যা ঘোষণা দেয়ার বিষয়ে বছরের ১৭ নভেম্বর এফআরসির কাছে একটি চিঠি পাঠায় বাংলাদেশ ব্যাংক। চিঠিতে বাংলাদেশ ব্যাংক জানায়, প্রতিষ্ঠানটির ওপর ২০১৯ সালে চালানো বিশেষ পরিদর্শনে সাবসিডিয়ারি কোম্পানি ইউনিক্যাপ ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডের কাছ থেকে পাওনা অর্থ আদায়, অর্থের হিসাবায়ন, শ্রেণীকরণ সংস্থার সংরক্ষণের ক্ষেত্রে কিছু গুরুতর অনিয়ম উদ্ঘাটিত হয়েছে। ইউনিয়ন ক্যাপিটাল এর সাবসিডিয়ারি কোম্পানি ইউনিক্যাপ ইনভেস্টমেন্টের অনুকূলে দেয়া ঋণের বিপরীতে সুদ সরাসরি সংশ্লিষ্ট ঋণ হিসাবে আরোপ করেনি। বরং প্রতিষ্ঠানটি প্রাপ্য অর্থ সাবসিডিয়ারির সঙ্গে ২০১৭ সালের ১৪ ডিসেম্বর করার চুক্তি অনুসারে পোর্টফোলিও ম্যানেজমেন্ট ইনকাম বা প্রসেস শেয়ারিং রিসিভেবল হিসাব নামে বিশেষ হিসাব তৈরি করে হিসাব বাদ দিয়ে পাওনা অর্থ যথাযথভাবে আদায় না করেই সেটি আয় খাতে স্থানান্তর করেছে। পাশাপাশি হিসাব অন্যান্য সম্পদ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শনে বিষয়টি উদ্ঘাটনের পর প্রতিষ্ঠানটির ঋণ, লিজ অন্যান্য সম্পদের বিপরীতে ৫৪ কোটি টাকা সংস্থান ঘাটতি সংরক্ষণ করাসহ আদায় না করেই আয় খাতে স্থানান্তর করা ৩২ কোটি টাকা স্থগিত সুদ হিসাবে এন্ট্রি রিভার্স করে ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং স্ট্যান্ডার্ডস (আইএফআরএস) পরিপালন করে আর্থিক বিবরণী চূড়ান্ত করার পরামর্শ দেয়া হয়। নির্দেশনা পাওয়ার পর ইউনিয়ন ক্যাপিটালের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে ৫৪ কোটি টাকার সংস্থান ঘাটতি সংরক্ষণে দুই বছরের মোরাটরিয়াম পিরিয়ডসহ ১০ বছরের সময় চায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রতিষ্ঠানটিকে ২০১৯ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত সমহারে অর্থ সমন্বয়ের সুযোগ দেয়। পরবর্তী সময়ে প্রতিষ্ঠানটির আরেক দফায় আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০২০ থেকে ২০২৮ সালের মধ্যে ইউনিয়ন ক্যাপিটালকে সমহারে ১৪৯ কোটি টাকা সংস্থান ঘাটতি সংরক্ষণের সুযোগ দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এর মধ্যে ২০২০ সালে ১৮ কোটি টাকার সংস্থান সংরক্ষণের কথা ছিল।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছ থেকে দুই দফায় সংস্থান সংরক্ষণের জন্য বিলম্বিত সুবিধা নেয়ার পরও প্রতিষ্ঠানটি সংস্থান সংরক্ষণ না করেই ২০২০ সালে নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণীতে সংস্থান সংরক্ষণ করা হয়েছে বলে ঘোষণা দিয়েছে। ঘোষণা দেয়ার কারণে প্রতিষ্ঠানটিকে বছরের অক্টোবর বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে কারণ দর্শানোর নোটিস দেয়া হয়। নোটিসের পরিপ্রেক্ষিতে ইউনিয়ন ক্যাপিটাল জানায়, সাবসিডিয়ারির কাছে পাওয়া অর্থ মওকুফ করার কারণে সংস্থান সংরক্ষণের বিষয়টি সমন্বয় করা হয়েছে। সংস্থান সংরক্ষণের পরিবর্তে পাওনা অর্থ মওকুফের কারণে সৃষ্ট লাভ-ক্ষতি হিসাবে কোনো ধরনের হেরফের হয়নি বলে দাবি করে প্রতিষ্ঠানটি।

এর পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বাজার বিভাগ থেকে দুই দফায় বিলম্বিত সুবিধা নিয়েও সংস্থান ঘাটতি সংরক্ষণ না করেই বিষয়ে আর্থিক প্রতিবেদনে ঘোষণা দেয়া এবং আর্থিক প্রতিবেদন নিরীক্ষক কর্তৃক প্রত্যয়ন করার বিষয়টি যথাযথ হয়েছে কিনা সে বিষয়ে এফআরসির মতামত জানতে চায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছ থেকে চিঠি পাওয়ার পর এফআরসি বিষয়টি পর্যালোচনা করে সংস্থান সংরক্ষণ থেকে বাঁচতে অভিনব কৌশল অবলম্বনের প্রমাণ পেয়েছে। বিষয়ে গত ২৮ নভেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বাজার বিভাগের মহাব্যবস্থাপকের কাছে এফআরসি তাদের মতামত পাঠিয়েছে। সংস্থাটির মতামতে বলা হয়েছে, ইউনিয়ন ক্যাপিটাল তার সাবসিডিয়ারি কোম্পানির সঙ্গে যে চুক্তি করে আয় ব্যয় হিসাবভুক্ত করেছে সেটি আন্তর্জাতিক হিসাবমানের (আইএএস) সঙ্গে সাংঘর্ষিক। আইএএস অনুসারে কোনো প্রতিষ্ঠান অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দিলে সেটি ঋণদাতার হিসাব বইয়ে আর্থিক সম্পদ ঋণগ্রহীতা হিসাব বইয়ে আর্থিক দায় হিসেবে দেখাতে হবে। প্রতি বছর আর্থিক সম্পদের বিপরীতে সুদ আয় এবং আর্থিক দায়ের বিপরীতে সুদ ব্যয় বকেয়া ভিত্তিতে হিসাবভুক্ত করতে হবে। সুদ আয় সুদ ব্যয় আদায় না হওয়া পর্যন্ত আর্থিক সম্পদ আর্থিক দায়ের সঙ্গে যোগ করে ঋণদাতা ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠানের নিজ নিজ ব্যালান্স শিটে দেখাতে হবে। এক্ষেত্রে প্রতি বছর শেষে ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান আইএএস অনুসারে এর ক্ষতি পর্যালোচনা করবে এবং এর বিপরীতে যথাযথ সংস্থান সংরক্ষণ করতে হবে।

আন্তর্জাতিক হিসাবমানের বিধানের ব্যত্যয় ঘটিয়ে ইউনিয়ন ক্যাপিটালের সাবসিডিয়ারির সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে যে হিসাব করেছে সেটির মূল কারণ হিসেবে এফআরসি তিনটি বিষয়কে চিহ্নিত করেছে। এগুলো হচ্ছে সাবসিডিয়ারি কোম্পানির মাধ্যমে সরকারের রাজস্ব ফাঁকি দেয়া, মূল কোম্পানি সাবসিডিয়ারি কোম্পানির আর্থিক অবস্থা কৃত্রিমভাবে ভালো দেখানো এবং ঋণের বিপরীতে যে সুদ দেয়া কিংবা পাওয়া-সংক্রান্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা কৌশলে অমান্য করা।

এফআরসি তাদের পর্যবেক্ষণে আরো জানিয়েছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছ থেকে বিলম্বিত সুবিধা নেয়া সত্ত্বেও ২০২০ সালে ১৩ কোটি টাকা আয় বিবরণীতে ব্যয় হিসেবে না দেখিয়ে আয়ের সঙ্গে সমন্বয় করেছে ইউনিয়ন ক্যাপিটাল, যা আন্তর্জাতিক হিসাবমানের লঙ্ঘন।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে ইউনিয়ন ক্যাপিটালের কোম্পানি সচিব তৌহিদুল আশরাফ বণিক বার্তাকে বলেন, মূলত ২০১০ সালের পুঁজিবাজার ধসের কারণে আমাদের গ্রাহকের কাছে মার্জিন ঋণের অর্থ আটকে যায়। পরবর্তী সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশে মার্চেন্ট ব্যাংকিং সাবসিডিয়ারি ইউনিক্যাপ ইনভেস্টমেন্ট গঠন করে এর অনুকূলে সব সম্পদ দায় হস্তান্তর করা হয়। কিন্তু পুঁজিবাজার পরিস্থিতি প্রতিকূল থাকার কারণে সাবসিডিয়ারিকে দেয়া মূল প্রতিষ্ঠানের ঋণের সুদ আদায় করা সম্ভব হয়নি। এতে বছর বছর পুঞ্জীভূত সুদসহ পাওয়া অর্থের পরিমাণ বেড়েছে। তার ওপর ২০১৮ সালে বেশ কয়েকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের দুরবস্থার বিষয়টি জানাজানি হলে গ্রাহকরা খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোতে অর্থ রাখতে অনাগ্রহী হয়ে ওঠেন। এতে তারল্য সংকটে পড়তে হয় আমাদের। শেষ পর্যন্ত সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠানকে টিকিয়ে রাখার স্বার্থে সম্পদ থেকে দায় বাদ দিয়ে হিসাব করা হয়েছে। বিষয়ে প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে সবকিছু বিশদভাবে ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে।

২০০৭ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ইউনিয়ন ক্যাপিটালের গত পাঁচ বছরের আর্থিক ফলাফল পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০১৬ সালে প্রতিষ্ঠানটির ২০ কোটি টাকা কর-পরবর্তী নিট মুনাফা হয়েছিল। এর পরের বছর এটি কমে ১৫ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। ২০১৮ সালে এটি আরো কমে কোটি টাকা হয়। এর পরের দুই বছর অর্থাৎ ২০১৯ ২০২০ সালে প্রতিষ্ঠানটির যথাক্রমে ১০৫ কোটি ৫৩ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে। দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় ইস্ট কোস্ট গ্রুপের কাছে  ইউনিয়ন ক্যাপিটালের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ শেয়ার রয়েছে। গ্রুপটির মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান ইসি সিকিউরিটিজের প্রতিনিধি হিসেবে চৌধুরী তানজিম করিম বর্তমানে ইউনিয়ন ক্যাপিটালের চেয়ারম্যানের দায়িত্বে রয়েছেন। প্রতিষ্ঠানটির বিষয়ে জানতে চাইলে ইস্ট কোস্ট গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তানজিল চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, আমরা যে প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বে থাকি সেখানে সব সময় স্বচ্ছতা জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার বিষয়টিকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকি। ইউনিয়ন ক্যাপিটালের দুরবস্থার পেছনে বেশকিছু বিষয় রয়েছে। এর মধ্যে ব্যবস্থাপনা দক্ষতার ঘাটতি অন্যতম। তাছাড়া তারল্য সংকট তো রয়েছেই। তবে এটি বলতে পারি এখানে কোনো ধরনের আর্থিক কেলেঙ্কারি হয়নি। আমরা চেষ্টা করছি প্রতিষ্ঠানটিকে কীভাবে আবারো ভালো অবস্থানে নিয়ে আসা যায়।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন