শনিবার | নভেম্বর ২৭, ২০২১ | ১৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৮

প্রথম পাতা

তিন বছর পর আবারো রাজপথে শিক্ষার্থীরা

নিজস্ব প্রতিবেদক

নিরাপদ সড়কের দাবিতে রাজধানীতে বিক্ষোভরত শিক্ষার্থীরা ছবি: নিজস্ব আলোকচিত্রী

সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনায় দ্বিতীয় দিনের মতো রাজপথে নেমেছে শিক্ষার্থীরা। রাজধানী ঢাকার মতিঝিল, ফার্মগেট, শান্তিনগর, উত্তরাসহ বিভিন্ন জায়গায় সড়কে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা। নিরাপদ সড়কসহ ছয় দাবিতে বিক্ষোভ করেছে তারা। তিন বছর আগে রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কে দুই বাসের প্রতিযোগিতায় শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থী বাসচাপায় নিহত হয়। নিরাপদ সড়কের দাবিতে রাজপথে নেমে আসে সারা দেশের শিক্ষার্থীরা। ২০১৮ সালের ২৯ জুলাই থেকে দেড় সপ্তাহ ধরে চলে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন।

গত বুধবার গাড়িচাপায় নটর ডেম কলেজের দ্বাদশ শ্রেণীর ছাত্র নাঈম হাসানের মৃত্যুতে শিক্ষার্থীরা আবারো রাজপথে নেমে এসেছে। বিক্ষোভরত শিক্ষার্থীদের দেয়া ছয় দাবির মধ্যে রয়েছে সবার জন্য সড়ক নিরাপদ করা, ২০১৮ সালে নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে পাস হওয়া আইন বাস্তবায়ন, নাঈমের মৃত্যুতে দায়ীদের শাস্তির আওতায় আনা ক্ষতিপূরণ দেয়া, গুলিস্তানে পদচারী সেতু সব সড়কে কঠোরভাবে ট্রাফিক আইন বাস্তবায়ন করা।

নাঈম হাসানের মৃত্যুর প্রতিবাদে গতকাল সকালে মিছিল নিয়ে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে অবস্থান নেয় নটর ডেম কলেজের শিক্ষার্থীরা। তারা নাঈম হাসানের মৃত্যুর বিচার নিরাপদ সড়কের দাবিতে রাস্তা অবরোধ করে রাখে। এতে যান চলাচল বন্ধ হয়ে গেলে সড়কের দুই পাশে দীর্ঘ যানজট তৈরি হয়।

বেলা ১১টা থেকে কয়েকশ ছাত্র বেলা ২টা পর্যন্ত সড়ক অবরোধ করে রাখার পর তারা নগর ভবনে যায়। এছাড়া দুপুরে শিক্ষার্থীদের একাংশ গুলিস্তান জিরো পয়েন্টে অবস্থান নেয়।

নগর ভবনের গেট খুলে শিক্ষার্থীরা ভেতরে ঢুকে পড়ে। সময় তারা মেয়র তোমার দেখা চাই, নাঈম হত্যার বিচার চাই স্লোগান দিতে থাকে। পরে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মেয়র ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপস শিক্ষার্থীদের সামনে আসেন। সময় সংক্ষিপ্ত সমাবেশে তিনি বক্তব্য রাখেন। শিক্ষার্থীদের দাবির প্রতি একাত্মতা জানিয়ে তিনি অভিযুক্ত গাড়িচালককে চাকরি থেকে বরখাস্তের ঘোষণা দেন। শিক্ষার্থীদের দাবি মেনে মেয়র বলেন, সড়ক দুর্ঘটনায় কারো মৃত্যু মেনে নেয়া যায় না। চালকসহ নাঈম হত্যায় জড়িত সবার সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করি। নিরাপদ সড়ক, নাঈম হত্যার বিচারসহ শিক্ষার্থীদের দাবিগুলো তার নিজেরও দাবি বলে উল্লেখ করেন ফজলে নূর তাপস। মেয়রের বক্তব্যের পর নগর ভবন ছেড়ে যায় শিক্ষার্থীরা।

নটর ডেমের শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে সংহতি জানিয়ে রাস্তায় নামে ঢাকা বিজ্ঞান কলেজ, হলি ক্রস, ঢাকা রেসিডেন্সিয়াল মডেল কলেজ, তেজগাঁও কমার্স কলেজ, আইডিয়াল কমার্স কলেজ, সেন্ট জোসেফ উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়, মোহাম্মদপুর মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ, ন্যাশনাল পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট বিএএফ শাহীন কলেজের শিক্ষার্থীরা। দাবির প্রতি একাত্মতা জানিয়ে ফার্মগেট এলাকার সড়কে অবস্থান নেয় কয়েকটি কলেজের শিক্ষার্থী। সময় শিক্ষার্থীরা একটি পুলিশের গাড়ির লাইসেন্স দেখতে চায়। চালক তা দেখাতে না পারলে ঘণ্টা খানেক গাড়িটি আটকে রাখে শিক্ষার্থীরা। পরে নয় দফা দাবি জানিয়ে একদিনের আলটিমেটাম দিয়ে রাস্তা ছাড়ে শিক্ষার্থীরা। ঘোষণা দেয়া হয় আজকের মধ্যে দাবি মানা না হলে আগামীকাল বেলা ১১টা থেকে আবারো রাস্তার নামার। দাবির মধ্যে রয়েছে নাঈমসহ সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত সব ঘটনার বিচার, ক্ষতিপূরণ, আহতদের ক্ষতিপূরণ পুনর্বাসন, ঢাকাসহ সারা দেশে বাস, ট্রেন নৌপথে হাফ ভাড়া পাস ইত্যাদি।

শান্তিনগর বেইলি রোডে প্রতিবাদ বিক্ষোভ করে ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ছাত্রীরা। উত্তরায় বিক্ষোভ করে রাজউক উত্তরা কলেজ মাইলস্টোন কলেজের শিক্ষার্থীরা। সময় তারাও সড়ক অবরোধ করলে যান চলাচল ব্যাহত হয়।

সপ্তাহের শেষ কার্যদিবসে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের কারণে যানজটে চরম দুর্ভোগে পড়ে যাত্রীরা। দীর্ঘ সময় যানবাহনে বসে অপেক্ষা করার পর অনেকে হেঁটেই গন্তব্যে যায়। ব্যাপারে পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার বিপ্লব কুমার সরকার সাংবাদিকদের জানান, পুলিশ শিক্ষার্থীদের সরিয়ে যান চলাচল স্বাভাবিক করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়েছে।

এদিকে কয়েকদিন ধরে বাসে হাফ ভাড়া পাসের দাবিতে বেশ কয়েকটি কলেজের শিক্ষার্থীরা আন্দোলন চালিয়ে আসছিল। এর মধ্যেই গত বুধবার গুলিস্তানে রাস্তা পার হওয়ার সময় ডিএসসিসির একটি ময়লাবাহী গাড়ি নটর ডেম কলেজের দ্বাদশ শ্রেণীর শিক্ষার্থী নাঈম হাসানকে ধাক্কা দেয়। হাসপাতালে নেয়ার পর তাকে মৃত ঘোষণা করেন কর্তব্যরত চিকিৎসক।

জানা গেছে, সিটি করপোরেশনের ময়লাবাহী অনেক গাড়িই চলছে নিয়োগপ্রাপ্ত চালক ছাড়া। যে গাড়িটি নাঈমকে চাপা দিয়েছিল, সেটির চালক সংস্থাটির একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী। এছাড়া গতকাল পান্থপথে গণমাধ্যমকর্মীকে চাপা দেয়া ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) ময়লার গাড়িও চালাচ্ছিলেন এক পরিচ্ছন্নতাকর্মী।

নাঈম হাসানের মৃত্যুর ঘটনায় তিন সদস্যের কমিটি গঠন করেছে ডিএসসিসি কর্তৃপক্ষ। সংস্থাটির প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা সিতওয়াত নাঈমের নেতৃত্বে কমিটি করা হয়েছে। কমিটিকে সাত কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।

এরই মধ্যে চালক মো. হারুন মিয়া তার সহকারী মো. আব্দুর রাজ্জাককে বরখাস্ত করেছে ডিএসসিসি। পাশাপাশি বরাদ্দকৃত গাড়ি নিজে না চালিয়ে নিয়মবহির্ভূতভাবে অন্যকে চালাতে দেয়ায় করপোরেশনের গাড়িচালক (ভারী) মো. ইরান মিয়ার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করা হয়েছে। তাকে সাময়িক বরখাস্তও করেছে কর্তৃপক্ষ।

অন্যদিকে পান্থপথের দুর্ঘটনা তদন্তেও কমিটি গঠন করেছে ডিএনসিসি। সরেজমিন তদন্ত করে তিন কার্যদিবসের মধ্যে মতামতসহ প্রতিবেদন দাখিল করবে কমিটি। ডিএনসিসি মেয়র আতিকুল ইসলাম জানান, ঘাতক চালকের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে। এরই মধ্যে ডিএনসিসির প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা কমডোর এসএম শরিফ-উল ইসলামের নেতৃত্বে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে।

এদিকে বাসে শিক্ষার্থীদের ভাড়া হাফ পাস-বিষয়ক সভা শেষ হয়েছে কোনো সমাধান ছাড়াই। সরকারি পরিবহন সংস্থা বিআরটিসি ভাড়া ছাড় দিতে সম্মত হলেও তা কতটা, সেটি আজ জানানোর কথা রয়েছে। এছাড়া বেসরকারি পরিবহন মালিকরা জানিয়েছেন, তাদের পক্ষে ভাড়া কম নেয়া সম্ভব নয়। গতকাল বিকালে বনানীর বিআরটিএ কার্যালয়ে বিষয়ে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে অংশ নেন শিক্ষা মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বিআরটিসির চেয়ারম্যান, বিআরটিএর কর্মকর্তা পুলিশের প্রতিনিধিরা। পরে ব্যাপারে ব্রিফ করেন সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব নজরুল ইসলাম।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন