শনিবার | নভেম্বর ২৭, ২০২১ | ১৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৮

শেষ পাতা

কাপ্তাই হ্রদে বিলুপ্ত ৯ প্রজাতির মাছ

প্রাকৃতিক চার প্রজনন কেন্দ্রের দুটিই নষ্ট

প্রান্ত রনি, রাঙ্গামাটি

কারেন্ট জাল, ছোট ফাঁসের জাল ব্যবহারসহ বেশকিছু কারণে কাপ্তাই হ্রদে মাছ উৎপাদন কমছে ছবি: নিজস্ব আলোকচিত্রী

ষাটের দশকে প্রমত্তা কর্ণফুলী নদীতে বাঁধ দেয়ার ফলে রাঙ্গামাটির বিস্তৃত এলাকাজুড়ে সৃষ্টি হয় ৩৫৬ বর্গমাইলের কৃত্রিম কাপ্তাই হ্রদ। জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করে বিদ্যুৎ উৎপাদনই ছিল এর মূল উদ্দেশ্য। তবে পরবর্তী সময়ে হ্রদ হয়ে ওঠে অনেকের জীবিকার প্রধান উৎস। শুরু থেকেই হ্রদে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ উৎপাদন শুরু হয়। তখন পাওয়া যেত নানা ধরনের বড় বড় মাছ। কিন্তু সময়ের বিবর্তনে জৌলুশ হারিয়েছে মাছের প্রজননকেন্দ্র। কিছু প্রজাতির মাছ বিলুপ্ত হয়েছে, কিছু বিলুপ্তপ্রায়। সাম্প্রতিক এক গবেষণার তথ্য বলছে, হ্রদের চারটি প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজননকেন্দ্রের মধ্যে দুটিই নষ্ট হয়ে গিয়েছে। পরিস্থিতি পরিবর্তনে দীর্ঘমেয়াদি কিছু পদক্ষেপের সুপারিশ করেছেন মৎস্য বিজ্ঞানীরা।

কাপ্তাই হ্রদ নিয়ে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএফআরআই) একটি গবেষণা চলমান। সেখানে এখন পর্যন্ত যে তথ্য উঠে এসেছে তাতে দেখা গেছে, এর চারটি মৎস্য প্রজননস্থলের দুটিই নষ্ট হয়ে গেছে। এমনকি ভরা বর্ষায়ও দুটি প্রজননক্ষেত্রে পানি থাকে হাঁটুসমান, যা মা-মাছের চলাফেরা প্রজননের জন্য উপযুক্ত নয়। সংস্থাটি বলছে, কাপ্তাই হ্রদের কাচালং, চেঙ্গী, বরকল রীক্ষ্যং প্রজননস্থলের মধ্যে পলি ভরাট নাব্য সংকটসহ নানা কারণে চেঙ্গী রীক্ষ্যং চ্যানেল দুটি নষ্ট হয়ে গেছে। বর্তমানে কাচালং বরকলের জগন্নাথছড়া চ্যানেলে রুইজাতীয় মাছ কিছুটা উৎপাদন হয়। তবে সেগুলোর অবস্থাও যে খুব ভালো তা বলা যাচ্ছে না। পুরো বিষয়টিই প্রভাব ফেলেছে হ্রদের বাস্তুতন্ত্রে।

গবেষকরা বলছেন, কাপ্তাই হ্রদের বাস্তুতন্ত্রের মধ্যে ৪০ শতাংশ হার্বিভোর (যেসব প্রাণী কেবল উদ্ভিদ খায়), ৩০ শতাংশ ডেট্রিটিভোর (কেঁচো, ছোট কাঁকড়াসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণী), ২০ শতাংশ কার্নিভোর (মাংসাশী প্রাণী) ১০ শতাংশ ওমনিভোর (যেসব প্রাণী উদ্ভিদ প্রাণীর মাংস খায়) থাকা প্রয়োজন। সেখানে হার্বিভোর রয়েছে ৪৮ দশমিক ৯১ শতাংশ, ওমনিভোর ৪৭ দশমিক ৭৭, কার্নিভোর দশমিক ১৫ ডেট্রিটিভোর দশমিক ১৭ শতাংশ। অর্থাৎ গোটা বাস্তুতন্ত্রই পরিবর্তিত হয়ে গিয়েছে।

বিএফআরআইয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯১ সালে কাপ্তাই হ্রদ দুই প্রজাতির চিংড়ি দুই প্রজাতির কচ্ছপ ছাড়াও ৭১ প্রজাতির মাছের আবাসস্থল ছিল। এর মধ্যে ৬৬ প্রজাতির ছিল দেশী পাঁচ প্রজাতির বিদেশী মাছ। এরপর সর্বশেষ ২০০৬ সালে মাছের শুমারি করা হয়। সে তথ্য অনুযায়ী, এখন হ্রদে ৬২ প্রজাতির মাছ রয়েছে, যার মধ্যে দেশী মাছের সংখ্যা ৫২ বিদেশী মাছের সংখ্যা ১০। ১৫ বছরে বিলুপ্ত হয়েছে সিলন, দেশী সরপুঁটি, ঘাউরা, বাগাড়, মোহিনী বাটা দেশী পাঙাশ মাছ। বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতির মধ্যে রয়েছে মহাশোল, মধু পাবদা, পোয়া, ফাইস্যা, গুলশা ঘনিয়া মাছ। ক্রমহ্রাসমান প্রজাতির মধ্যে রয়েছে রুই, কাতল, মৃগেল, বাঁচা, পাবদা চিতল। হ্রদে এখন কেচকি, চাপিলা, কাটা মলা, তেলাপিয়া, কালিবাউশ, আইড়, বাটা, ফলি মলা মাছ পাওয়া যাচ্ছে। তবে আধিক্য বেশি ছোট মাছের (কেচকি, চাপিলা মলা) আবার আরেকটি তথ্য বলছে, ১৯৬৫-৬৬ সালে হ্রদে যেখানে রুইজাতীয় মাছের উৎপাদন ছিল ৮১ শতাংশ, সেটি ২০১৯-২০ সালে এসে দাঁড়িয়েছে দশমিক ৫১ শতাংশে।

মাছের প্রজাতি বিলুপ্ত হওয়ার পেছনে প্রজননক্ষেত্রগুলো নষ্ট হয়ে যাওয়ার পাশাপাশি আরো বেশকিছু কারণের কথা উল্লেখ করছেন গবেষকরা। তারা বলছেন, হ্রদে কারেন্ট জালছোট ফাঁসের জাল ব্যবহার, জাঁক তৈরিসহ বেশকিছু কারণে মাছ উৎপাদন কমছে। কেচকি জালের এক টানেই ২৭-৩২ প্রজাতির মাছ পোনা ধরা পড়ে। আবার জাঁক দিয়ে মাছ শিকারের ফলে ডিমওয়ালা পোনা ধরা পড়ে। এসব মাছের ২৫ শতাংশ শুঁটকি উৎপাদনে ব্যবহার হয়। জাঁকে প্রতি শতকে গড় উৎপাদন মাত্র ১৫ কেজি।

তাই মাছ উৎপাদন বাড়াতে বেশকিছু সুপারিশ করেছে বিএফআরআই। এর মধ্যে রয়েছে কারেন্ট জালের ব্যবহার নিষিদ্ধ করা, কেচকি জালের ব্যবহার নিষিদ্ধের মেয়াদ তিন থেকে বাড়িয়ে ছয় মাস করা, কেচকি জালের দৈর্ঘ্য ৩৭৫-২২০০ ফুট থেকে কমিয়ে ৭০০ ফুট প্রস্থ ৪২-৭৫ ফুট থেকে কমিয়ে ২০ ফুট করা। হ্রদে প্রজননকালীন মৌসুম মে থেকে জুলাই পর্যন্ত তিন মাস মাছ ধরা বন্ধ থাকে। গবেষকরা এটি বাড়িয়ে চার মাস অর্থাৎ আগস্ট পর্যন্ত করার সুপারিশ করছেন। পাশাপাশি হ্রদের যেসব এলাকায় সারা বছর পানি থাকে সেসব এলাকায় আরো বেশি অভয়াশ্রম গড়ে তোলার পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। এছাড়া পরিকল্পিত জাঁক ব্যবহার করে মাছ আহরণ বন্ধ করা, রুইজাতীয় মাছ রক্ষায় বড়শির ব্যবহার নিষিদ্ধ করা, পলিতে ভরাট হয়ে যাওয়া প্রজননক্ষেত্রগুলো খনন করার কথাও বলা হয়েছে। একই সঙ্গে হ্রদের ওপর নির্ভরশীল জেলেদের বিকল্প কর্মসংস্থান সহায়তা দিতেও সুপারিশ করছেন গবেষকরা।

প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বিএফআরআইয়ের রাঙ্গামাটি নদী উপকেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. আজহার আলী বণিক বার্তাকে বলেন, হ্রদে ছোট প্রজাতির মাছ উৎপাদন ব্যাপক হারে বাড়লেও কার্পজাতীয় মাছ উৎপাদনে ধস নেমেছে। আবার অনেক প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে গেছে। আমরা হ্রদের সেই পুরনো জৌলুশ ফিরিয়ে আনতে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছি। এরই মধ্যে আমরা বেশকিছু পদক্ষেপ নিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে সুপারিশ করেছি। যদি এগুলো বাস্তবায়ন করা যায় তাহলে হ্রদে আবারো মাছ উৎপাদন বাড়বে। বিলুপ্তির পথে যে মাছগুলো রয়েছে সেগুলোকেও রক্ষা করা যাবে।

কাপ্তাই হ্রদ পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে বাংলাদেশ মৎস্য উন্নয়ন করপোরেশন (বিএফডিসি) প্রতিষ্ঠানটির রাঙ্গামাটি বিপণনকেন্দ্রের ব্যবস্থাপক লেফটেন্যান্ট কমান্ডার তৌহিদুল ইসলাম বলেন, মাছ উৎপাদন বাড়াতে আমাদের কিছু কর্মপরিকল্পনা রয়েছে। সেগুলো বাস্তবায়নের পাশাপাশি হ্রদের জন্য প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপই নেয়া হচ্ছে। প্রতি বছরই কাপ্তাই হ্রদে প্রজননকালীন মৌসুমে আমরা কার্পজাতীয় মাছের পোনা ছাড়ি। চলতি বছরও ৪০ টনের বেশি পোনা ছাড়া হয়েছে। এসব পদক্ষেপের ফলে ধীরে ধীরে পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে আমাদের প্রত্যাশা।

প্রসঙ্গত, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সর্ববৃহৎ কৃত্রিম জলাধার রাঙ্গামাটির কাপ্তাই হ্রদ। এটি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বদ্ধ জলাশয়গুলোর মধ্যে সর্ববৃহৎ। কাপ্তাই হ্রদের আয়তন বাংলাদেশের পুকুরগুলোর মোট জলাশয়ের প্রায় ৩২ শতাংশ অভ্যন্তরীণ মোট জলাশয়ের প্রায় ১৯ শতাংশ। জলাশয়ের ওপর নির্ভরশীল প্রায় ২৫ হাজার জেলে। এছাড়া মাছ ব্যবসার মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করে লক্ষাধিক মানুষ। এশিয়ার বৃহত্তম কৃত্রিম হ্রদ থেকে সর্বশেষ ২০২০-২১ অর্থবছরে রাজস্ব আয় হয়েছে ১২ কোটি ১১ লাখ টাকার বেশি। ফলে দেশের অর্থনীতির জন্যও এটি গুরুত্বপূর্ণ।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন