বৃহস্পতিবার | ডিসেম্বর ০২, ২০২১ | ১৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৮

টকিজ

যে চিত্রনাট্যে যুক্ত ছিলেন গল্পের চরিত্ররা

ফিচার প্রতিবেদক

নোনা জলের কাব্য চলচ্চিত্রের দৃশ্য

আজ মুক্তি পাচ্ছে রেজওয়ান শাহরিয়ার সুমিত পরিচালিত সিনেমা নোনা জলের কাব্য। এক বছর ধরে আন্তর্জাতিক উৎসব মাতিয়ে সিনেমাটি আজ দেশের প্রেক্ষাগৃহে আসছে। লন্ডন, বুসান, গুটেনবার্গ, সাও পাওলো, তুরিন, সিয়াটল, সিঙ্গাপুরসহ বেশকিছু আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে দর্শক সমালোচকদের প্রশংসা কুড়িয়েছে সিনেমাটি।

নোনা জলের কাব্যে অভিনয় করেছেন ফজলুর রহমান বাবু, শতাব্দী ওয়াদুদ, তিতাস জিয়া তাসনোভা তামান্না। আবহসংগীত পরিচালনা করেছেন শায়ান চৌধুরী অর্ণব। ছবিটি প্রযোজনা করেছেন রেজওয়ান শাহরিয়ার সুমিত ফরাসি প্রযোজক ঈলান জিরাদ। জিরাদ মার্চ অব দ্য পেঙ্গুইন, গুডবাই বাফানা, ফাইনাল পোর্ট্রেটের মতো বিখ্যাত কিছু চলচ্চিত্র প্রযোজনা করেছেন। চলচ্চিত্রটির সিনেমাটোগ্রাফি করেছেন লস অ্যাঞ্জেলেসে বসবাসরত থাই শিল্পী চানানুন চতরুংগ্রোজ। এছাড়া বাংলাদেশ থেকে ছবিটির নির্মাণ সহযোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবে ছিল নির্মাতা অমিতাভ রেজা চৌধুরীর হাফ স্টপ ডাউন। সম্পাদনা করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের ক্রিস্টেন স্প্রাগ, রোমানিয়ার লুইজা পারভ্যু ভারতের শঙ্খ। শব্দ রঙ সম্পাদনার কাজটি হয়েছিল প্যারিসের দুটি বিখ্যাত স্টুডিওতে।

কিছুদিন আগে একটি সংবাদ সম্মেলন ডেকে নোনা জলের কাব্য নির্মাণের পেছনের সংগ্রাম নানা ঘটনার কথা সাংবাদিকদের সামনে তুলে ধরেন পরিচালক সুমিত। বণিক বার্তার পাঠকদের জন্য রেজওয়ান শাহরিয়ার সুমিতের বক্তব্যটি এখানে তুলে ধরা হলো:

সংগ্রামের পথে আমি কখনো একা ছিলাম না। ইন্ডাস্ট্রির অনেক নামকরা প্রথিতযশা ব্যক্তি সঙ্গে ছিলেন। কিন্তু আমি ইনডিপেনডেন্ট ফিল্ম মেকার হওয়ায় কিছু সময় একাই পাথরটা টানতে হয়েছে। সিনেমার ইকোসিস্টেমে ক্যামেরার পেছনের মানুষ দর্শকদের যেমন, সাংবাদিকদেরও তেমনি প্রয়োজন। এছাড়া এতে সমালোচকদেরও প্রয়োজন।

২০০৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএর তৃতীয় বর্ষে থাকাকালীন সেমিস্টার ব্রেকে বন্ধুদের সঙ্গে কুয়াকাটায় ঘুরতে গিয়েছিলাম। সময়টা ছিল সিডরের ঠিক তিন মাস পর। যখন আমরা কোথাও ঘুরতে যাই তখন শুধু পর্যটককেন্দ্রের মধ্যেই থাকি। কখনো আমরা এটা ভেদ করে ওই অঞ্চলের মানুষ সম্পর্কে জানতে চাই না। কিন্তু আমার ছবি তোলার নেশা থাকায় ট্যুরিস্ট বিচ ছেড়ে এক মাইল দূরে জেলেদের পল্লীতে যাই। সেখানে ১৫-২০ ঘর জেলে বাস করেন। যাওয়ার পথে চোখে পড়ে সিডরের রেখে যাওয়া ধ্বংসযজ্ঞ। একই সঙ্গে দেখছিলাম জেলেরা পুনরায় তাদের বাসস্থান ঠিকঠাক করছেন এবং অনেকে সমুদ্রের পানে যাত্রা করছেন।

এরপর আমি চলচ্চিত্র নির্মাণের ওপর নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যাই। সে সময় আমাকে ফিচার স্ক্রিপ্ট লেখার চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন প্রফেসররা। তখন আমার মন চলে যায় জনপদে। পরে ওই অঞ্চলে গিয়ে তাদের ওপর স্টাডি করা শুরু করি। ফলে স্ক্রিপ্টের প্রথম খসড়াটা লিখতে বেগ পেতে হয়নি। স্ক্রিপ্ট লেখার পর সেই জেলেপল্লীর মানুষদের দেখালে তারা আমাকে বিভিন্ন পরামর্শ উপদেশ দেয়া শুরু করেন। তখন ভেবে দেখলাম তাদের যে পারস্পেক্টিভ, সেগুলো যুক্ত করলে চিত্রনাট্য আরো প্রাণ পাবে। একজন বহিরাগত হিসেবে তাদের চিত্রনাট্যে যুক্ত করতে পেরে আমার মধ্যে একটা আত্মবিশ্বাসও জন্ম নেয় তখন। কারণ জনপদের গল্প বলার সিনেমাটিক যে লাইসেন্স লাগে, সেটা আমি তাদের কাছ থেকে পাব বলে আশা করি।

তাদের সাহায্য ছাড়া প্রতিকূল পরিবেশে শুটিং চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে পারতাম না। জোয়ার তো ছিলই, সঙ্গে ঝড়ো আবহাওয়ায় চোখে বালি ঢুকে যাচ্ছিল। তার পরও অভিনয়শিল্পীদের পারফর্ম করতে হয়েছে। এখানে তামান্নাকে একজন গ্রামের মেয়ে হয়ে উঠতে হয়েছে। নৌকা চালানো শিখতে হয়েছে। সব মিলিয়ে আমি সবার প্রতি কৃতজ্ঞ।

দুই মাসের পথচলায় সবচেয়ে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছি তিতাস জিয়ার সঙ্গে। সিনেমায় তিনি রুদ্র নামের চরিত্রে অভিনয় করেছেন। ছবিটির দু-তিনটা দৃশ্য ছাড়া অন্য সবগুলোতেই রুদ্র আছেন। এটাকে বলা হয় সিঙ্গুলার পারস্পেক্টিভ সিনেমা। এখানে অনেকেই প্রশ্ন করেন, রুদ্র নামের চরিত্র, যিনি শহর থেকে এসে সেখানে থেকে গেছেন, তিনি কি আপনি? সিনেমা দেখলে এর উত্তর পাওয়া যাবে। সিনেমায় চেয়ারম্যানের (বাবু ভাই) একটা সংলাপ আছেশহর থেকে শিল্পী আসছে এখানে, আপনি কি আমাদের সম্মান বিক্রি করে বিদেশ থেকে সম্মান কিনে আনবেন? এখানে তিনি শিল্পীকে চ্যালেঞ্জ করেছেন। আমারই লেখা সংলাপ আমাকেই ভাবায়আসলে কি বিদেশ থেকে সম্মান কিনে আনছি, নাকি জনপদের গল্প বলছি

তাই সিনেমা শুধু মানুষকে দেখানোর মাধ্যমে আমার দায়বদ্ধতা শেষ হয়ে যাবে না। আমি জনপদের জন্য কিছু করতে চাই। এজন্য জলবায়ু পরিবর্তন জনপদের আর্থসামাজিক অবস্থা নিয়ে বিভিন্ন মহলে সচেতনতা বৃদ্ধির চেষ্টা করছি। শুধু সচেতনতা বৃদ্ধি নয়, তাদের কীভাবে আর্থিকভাবে সাহায্য করা যায়, সে চেষ্টাও করছি। একই সঙ্গে সিনেমায় দাদন প্রথার প্রভাব দেখানো হয়েছে, যেটা নিয়ে জেলেরা বছরের পর বছর ধরে মহাজনের কাছে আটকে থাকেন। এটা থেকে তারা কীভাবে বেরিয়ে আসতে পারেন, তা নিয়েও সচেতনতা বৃদ্ধি পলিসি লেভেলে কাজ করছি।

পরিবেশক, নির্মাতা, সমালোচক, সাংবাদিক কলাকুশলীসবাইকে নিয়েই সিনেমার ইকোসিস্টেম গঠিত। তাই আমরা সবাই কনসেনট্রেড স্ট্রিমলাইন ওয়েতে কাজ করলে বাংলাদেশের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি ঘুরে দাঁড়াবে এবং আশা করছি ২০২২ সাল বাংলা সিনেমার জন্য আলোকিত বছর হবে। আমি মনে করি, যাত্রা শুরু হবে নোনা জলের কাব্যের মাধ্যমে।  

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন