বৃহস্পতিবার | ডিসেম্বর ০২, ২০২১ | ১৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৮

সম্পাদকীয়

নগর পরিকল্পনা

ঢাকা অনুসরণ করতে পারে মেলবোর্ন ও ডুসেলডর্ফের দৃষ্টান্ত

রুহিনা ফেরদৌস

একটি টেকসই উন্নত নগরের সত্যিকারের দৃশ্য কী? চারপাশজুড়ে বিশালাকৃতির ইমারত, সড়কভর্তি সারি সারি ব্যক্তিগত গাড়ি, যানজটে বসে থাকা ক্লান্ত মানুষ? নাকি অনেকটা সবুজ, প্রশস্ত ফুটপাত, প্রয়োজনীয় গণপরিসরযেখানে হাত-পা ছড়িয়ে বসে আছে নগরের বাসিন্দারা, শিশুরা খেলছে, কেউ কেউ আবার ল্যাপটপে জরুরি কাজ গুছিয়ে নিচ্ছে।

পশ্চিম জার্মানির ডুসেলডর্ফ শহরটি ১৯৯০ সালের দিকে দেখতে ছিল অনেকটা আমাদের রাজধানী ঢাকার মতো। সড়কজুড়ে সারি সারি গাড়ি। একপাশে ফ্লাইওভার। পাশে রাইন নদী। নদীপাড়ে অল্প খানিকটা জায়গা থাকলেও সেখানে জনমানুষের উপস্থিতি নেই বললেই চলে। তবে ২০১৯ সালে এই একই জায়গায় ঠিক ভিন্ন চিত্র দেখা যায়।

রাইন নদীর তীরজুড়ে প্রশস্ত জায়গা। রাস্তার ওপর ফ্লাইওভারটি ভেঙে ফেলা হয়েছে। সেখানে দাঁড়িয়ে রয়েছে সারি সারি সবুজ গাছ। আর নদীর পাড়টি জমে উঠেছে নগরের মানুষদের প্রাণবন্ত উপস্থিতিতে কিংবা ক্যালিফোর্নিয়ার সানফ্রান্সিসকোর এম্বারকাডেরো উপকূলের কথাই যদি ধরা হয়। ১৯৯২ থেকে ২০০৩মাত্র ১১ বছরের ব্যবধানে প্রশস্ত ফুটপাতসমেত চমত্কার একটি গণপরিসরে রূপ দেয়া হয়েছে জায়গাটিকে।

১৯৯০ সালে পশ্চিম জার্মানির ডুসেলডর্ফ শহর।

   ২০১৯ সালের ডুসেলডর্ফ। রাইন নদীর তীরজুড়ে প্রশস্ত জায়গা। রাস্তার ওপর ফ্লাইওভারটি ভেঙে ফেলা হয়েছে।

পর্যায়ে প্রশ্ন তৈরি হয়, তাহলে জার্মানির ডুসেলডর্ফ শহর কিংবা সানফ্রান্সিসকোর এম্বারকাডেরো কি উন্নত হয়েছে নাকি অনুন্নত?

১৯৮০-এর দশকের মেলবোর্ন; অপরিকল্পিত নগরায়ণ, যানজট আর অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ঘিরে শহর ছাড়তে শুরু করেছে এর বাসিন্দারা। তাদের শহরত্যাগের কারণে মেলবোর্ন রীতিমতো ভুতুড়ে নগরে পরিণত। অফিসগুলো ফাঁকা পড়ে আছে। বিপর্যয় নেমে এসেছে আবাসন খাতে। মেলবোর্ন রীতিমতো ধুঁকছে।

১৯৮৩ সালে শহরের পৌর প্রশাসনে কাজ করতে আসেন রব অ্যাডামস। তার জন্ম জিম্বাবুয়েতে। দক্ষিণ আফ্রিকার কেপটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি পড়েছেন স্থাপত্য নিয়ে। মেলবোর্নকে পতিত দশা থেকে রক্ষা করতে অ্যাডামস অনেক উদ্যোগ নেন। সে সময়ে মেলবোর্নের মূল বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনা হতো সোমবার থেকে শুক্রবার সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত। বিশ্বজুড়ে বাণিজ্যিক অঞ্চলগুলোর জন্য যা স্বাভাবিক। কিন্তু মেলবোর্নের বাস্তবতায় অ্যাডামসের কাছে তা স্বাভাবিক মনে হয়নি। অ্যাডামস ২৪ ঘণ্টা খোলা রাখার নীতি গ্রহণ করেন।

তাছাড়া আধুনিক নগর পরিকল্পনায় ব্যাণিজ্যিক অফিস আর এলাকাগুলোকে বিচ্ছিন্ন রাখার যে নিয়ম, তা অ্যাডামসের পছন্দ নয়। অ্যাডামসের মনে হয়েছিল, এভাবে কার্যক্রম পরিচালনার মাধ্যমে মেলবোর্ন তার সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার করতে সমর্থ হচ্ছে না। তিনি তার নতুন পরিকল্পনার মাধ্যমে শহরটির শূন্য অফিস ভবনগুলোকে নতুন আবাসিক স্থানে পরিণত করেন। সাংস্কৃতিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য নতুন কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করেন। আর তা হলো, বিভিন্ন স্থানে গণপরিসর তৈরি। উদ্দেশ্য, নিরুদ্যম শহরের গতি ফেরানো।

ধারাবাহিকতায় ২০০২ সালে ফেডারেশন স্কয়ার নির্মাণ করা হয়। ফেডারেশন স্কয়ার হচ্ছে একটি পুরনো রেলস্টেশনের জায়গায় নির্মিত প্রশস্ত গণপরিসর। আগে যেখানে জায়গাটিতে জনমানুষের চিহ্ন খুঁজে পাওয়া যেত না, এখন সেখানে সবসময়ই লোকসমাগম। ফেডারেশন স্কয়ারের পেছনের সরু আর অন্ধকার গলিগুলোও আজ আধুনিক ক্লাব আর রেস্তোরাঁয় ছেয়ে গেছে। কারণ সবাই জানে, এখানে এখন আর লোকের অভাব হবে না।