বুধবার | জানুয়ারি ২৬, ২০২২ | ১২ মাঘ ১৪২৮

সম্পাদকীয়

আলোকপাত

আমানত খেয়ানতের দায় ব্যাংকাররা এড়াতে পারেন কি

রবিউল হোসেন

দেশী ব্যাংকিংয়ের চলমান অবস্থার ওপর স্বীয় মতামত-সংবলিত আমার সাক্ষাত্কার সম্প্রতি একটি পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। এমন মতামতের ওপর যেকোনো স্তরের ব্যাংকারের বিরূপ মন্তব্য আসা অস্বাভাবিক নয়। কারণ মতামতটি আত্মসমালোচনামূলক বিধায় তা অপ্রিয়। আসলে মানুষের মতামত তার নিজের বিদ্যাবুদ্ধি, জ্ঞানের পরিধি এবং স্বার্থ সীমিত হলেও এটি তার স্বকীয় স্বাধীন গণতান্ত্রিক অধিকার, যা সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত। তাই তো সমাজের খুব কম মানুষই এমন স্বাভাবিক উক্তি করা থেকে কদাচিৎ বিরত থাকেন। অতএব, উল্লিখিত বৃহৎ জনগোষ্ঠীর কথিত অবারিত সমালোচনার ওপর সংক্ষেপে দুটো কথা বলতে চাই

উল্লিখিত সাক্ষাত্কারে প্রকাশিত আমার কথাটি কী ছিল, তা আগে জানা দরকার। কথাটি ছিল ব্যাংকিংয়ের নিম্নমুখী অবস্থার জন্য ব্যাংকাররা দায় এড়াতে পারেন না, বলা যায়, তারাই দায়ী। অভিজ্ঞতা বলে, আমি এমনটাই বিশ্বাস করি। কারণ দায়িত্ব আমার কিন্তু দায় আমার নয়, এমনটি হয় না। বয়স ৭৬ বছর হয়েছে বলে আমি সঠিক বলছি না, এমন ভাবনার গতিবেগ দুর্বল হতে পারে আমাকে সশরীরে দেখলে। কারণ এখনো অধিক মনোযোগ দিয়ে কোনো কাজ করলে, কোনো কথা বললে বা কোনো কথা শুনলে তা সহজে ভুল হয় না।

আট বছর আগে পর্যন্ত প্রায় ৪৫ বছর ধরে ব্যাংকিং কর্মকাণ্ডের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলাম। এখনো বিষয়ে আমার লেখা এবং টকশো ইত্যাদি মাঝেমধ্যে প্রকাশিত হয়। মনোযোগী হয়ে কাজ করেছি বলে হয়তো অনেক ঘটনা এখনো স্মৃতিতে অম্লান হয়ে রয়েছে। এছাড়া সবসময় সব কাজ সঠিকভাবে করার কারণেই কোথায়ও কখনো ঠেকিনি এবং তেমন বিপদেও পড়তে হয়নি। অবশ্য স্বার্থপরী হিংসার ধাক্কা যে একেবারেই খায়নি তা বলা যাবে না। তবে তা সামালও দেয়া গেছে। তাই টিকে গেছি। পাছে এমন সব অবিস্মরণীয় ঘটনা ভুলে যাই অথবা তা আমার শেষ বিদায়ের সঙ্গী হয়ে যায় তাই পরবর্তী প্রজন্মের কাজে লাগার প্রত্যাশায় আমার লেখা দুটি বইকে যথা () জীবন মানুষ : ব্যাংক ব্যাংকিং এবং () একজন ব্যাংকারের দুর্লভ অভিজ্ঞতা এসবের নীরব সাক্ষী করে রেখেছি। অধিকন্তু, ব্যাংকিংয়ের ওপর অনেক সম্মানিত লেখকের অগণিত লেখা অবহেলায় পড়ে রয়েছে, যা নিশ্চিতভাবে ব্যাংকিং খাতের জন্য কল্যাণকর হতে পারে। কিন্তু কম্পিউটারের প্রতি বর্তমান প্রজন্মের ওভারস্মার্ট ভালোবাসা তাদের বই পড়ার আগ্রহে বৈরাগ্য এনে দিয়েছে। তাই হয়তো ব্যাংকিংয়ের দুর্দশা কাটছে না। অতএব, জোর দিয়ে বলা যায়, আমার বইয়ের বাস্তব সব উদাহরণ ব্যাংকিংয়ের চলমান অনেক সমস্যার সহজ সমাধান দিতে পারে। বই দুটি সাবলীল কেস স্টাডি এটা শুধু আমার কথা নয়, আমার বইয়ের একাধিক অপরিচিত পাঠকের ফোনকলের আবেগী অভিব্যক্তি। তাদের সহজ কথা, সরল সুর এবং প্রাণবন্ত স্বর আমাকে অভয় দিয়েছে যে তাদের সদোক্তি তোষামোদি নয়।

ব্যাংকারদের দায়দায়িত্বের ওপর আমার মতামতের স্বপক্ষে তর্কের খাতিরে বলতে হয়, গুদামের নিরাপত্তা প্রহরী যেমন তার নিয়ন্ত্রণাধীন পণ্য চুরির দায় এড়াতে পারেন না, তেমনি ব্যাংক আমানতের একচ্ছত্র হেফাজতকারী হয়ে ব্যাংকাররা সেই আমানত খেয়ানত হয়ে যাওয়ার দায়িত্ব এড়াবেন কী করে? অনস্বীকার্যভাবে ব্যাংকাররা অধিকতর বেতন-ভাতা এবং সুযোগ-সুবিধা পেয়ে থাকেন। ফলে এর গ্রহীতা হিসেবে ব্যাংকারদের সংসার ভালোভাবে চলে, সম্পত্তি বাড়ে অথচ দাতা হিসেবে ব্যাংকের সম্পদ কমে। হিসাববিজ্ঞানের ডাবল এন্ট্রি থিওরি ব্যাংকিংয়ে এমন নেতিবাচক প্রলয় ঘটালে ব্যাংক প্রতিষ্ঠান ধ্বজা ধরে আর কতদিন টিকবে!

পুনরায় বলি, আলোচিত বিষয়ের ওপর একাধিক সফল বাস্তব ঘটনার উপমা আমার উল্লিখিত বই দুটিতে পাওয়া যাবে। কিন্তু দেশের মানুষ বই পড়ে কম এবং তার নির্দেশনা অনুশীলন করতে পারে আরো কম নানান চাপের অজুহাতের সুযোগে। এমন দুর্বিষহ অবস্থার প্রেক্ষাপটে আমার অভিজ্ঞতা থেকে একটি ছোট্ট বাস্তব প্রমাণ হিসেবে এখানে তুলে ধরার তাগিদ অনুভব করছি।  যেমন:

সরাসরি অফিসার গ্রেড- হিসেবে জনতার পূর্বসূরি ব্যাংকে যোগদানের প্রথম ১০ বছর মফঃস্বলে কাজ করতে হয়। এরপর বদলি হই ঢাকার প্রধান কার্যালয়ে। নতুন পরিবেশ। খুব ভয়ে ছিলাম। এরই মধ্যে এক নতুন জিএম সাহেব আমাদের জনতা ব্যাংকে এলেন সোনালী ব্যাংক থেকে পদোন্নতি পেয়ে। খুব কড়া মানুষ। সামনে পড়লেই একটা না একটা শাস্তি। একদিন হঠাৎ আমার ডাক পড়ল তার অফিসে। বুক ধড়ফড়ানি নিয়ে আয়াতুল কুরসি পড়তে পড়তে তিনতলা থেকে দোতলায় নেমে জিএম সাহেবের কেবিনে ঢুকে দেখি তিনজন বহিরাগত অতিথি তার সামনে বসা। আমার উপস্থিতি জানান দিতেই আমার দিকে তাকিয়ে বেশ গম্ভীর স্বরে জিএম সাহেব বললেন, তারা আমার আত্মীয়, দেশ থেকে এসেছেন। দেখলাম, তিনি যথেষ্ট সম্মানের সঙ্গে তাদের খাতির-যত্ন করছেন। এতে আমার বুঝতে বাকি রইল না যে তারা কত কাছের লোক। জিএম সাহেব একটি ঋণ প্রস্তাব আমার দিকে এগিয়ে ধরে বললেন, এটি দেখবেন। আমি বলছি বলে তাড়াহুড়ো করার দরকার নেই। তখন মনে হলো, তিনি যতই বলুন, ঋণের অনুমোদন তাড়াতাড়িই দিতে হবে। কারণ জরুরি না হলে তিনি তো প্রস্তাবটি আমার কাছেই পাঠিয়ে দিতেন। যাহোক, এক নজর দেখেই একটি বিশেষ কারণে বোঝা গেল যে রুল মেনে প্রস্তাব অনুমোদন দেয়া যাবে না। তবে তখনই জিএম সাহেবকে কিছু বললাম না এই ভেবে যে তিনি অপ্রস্তুত হবেন মেহমানদের সামনে এবং আমাকেও সার্কুলার ইত্যাদি দেখে আমার তাত্ক্ষণিক নেতিবাচক অনুমান সম্পর্কে নিশ্চিত হতে হবে। তখন আমি জিএম সাহেবকে অনুনয়ের সুরে বললাম, স্যার, উনাদের নিয়ে আমার অফিসে/টেবিলে যাই। তিনি সম্মতি দিলেন।

অতঃপর দ্বিতীয় তলা থেকে তৃতীয় তলায় আমার অফিসে আসার পর মেহমানদের জন্য চা-নাশতার ব্যবস্থা করালাম। সেই ফাঁকে সার্কুলার, ডেলিগেশন অব পাওয়ার ইত্যাদির সাহায্যে প্রস্তাবটির ওপর আমার সংশয়ী ত্রুটির বিষয়ে যাচাই করে নিশ্চিত হয়ে জিএম সাহেবের কাছে গেলাম। বললাম, স্যার আপনার হয়তো মনে আছে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে সম্প্রতি জারীকৃত একটি বিশেষ সার্কুলার অনুযায়ী থানা/উপজেলা হেডকোয়ার্টার সীমানার বাইরে অবস্থিত কোনো জমির ওপর গৃহনির্মাণ করতে ব্যাংক থেকে ঋণ দেয়া যাবে না। আপনি নিশ্চয়ই মানবেন যে প্রস্তাবিত জমিটির অবস্থান থানা হেডকোয়ার্টার চৌহদ্দির/সীমানার বাইরে। তাই ঋণ দিলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রুল/বিধি ভঙ্গ হবে। আরো দেখা যাচ্ছে, ব্যাংকের ডেলিগেশন অব পাওয়ার অনুযায়ী ঋণ অনুমোদনের ক্ষমতা জিএম অর্থাৎ আপনার। তবে আত্মীয় বলে এমডি সাহেবকে দিয়ে ঋণটি অনুমোদন করানোর সুযোগ রয়েছে। কিন্তু তাতে ভবিষ্যতে ঝুঁকির দায়দায়িত্ব আপনার ওপর বর্তানোর আশঙ্কা থেকে যাবে, যেহেতু প্রস্তাবটি মূলত আইন-নিয়ম পরিপন্থী। জিএম সাহেব তখন সবকিছু দেখে, শুনে এবং বুঝে আমাকে অবাক করে দিয়ে বললেন, Rabiul, they are my relatives, I can’t say them no. You manage, so that they don’t come to me again.’

নামাজের বোঝা হালকা করতে গিয়ে রোজার দায়িত্ব ঘাড়ে চেপে বসার মতো গরম জিএম সাহেবের নরম সুর আমাকে অধিকতর দায়িত্বের ফাঁদে ফেলে দিল। ভীষণ দুশ্চিন্তা মাথায় নিয়ে নিজের অফিসে ফিরে দেখি জিএম সাহেবের আত্মীয়রা মহাখুশিতে চা-নাশতা উপভোগে মগ্ন। কারণ অতিসহজেই তারা লাখ টাকার ঋণ পেয়ে যাচ্ছেন। তাদের খুশির আমেজ আমার মাথায় একটি বুদ্ধি এনে দিল। তাদের বললাম, আপনারা খুবই ভাগ্যবান। আমাদের জিএম সাহেব অর্থাৎ আপনাদের ছেলে সরকারি জয়েন্ট সেক্রেটারি লেভেলের একজন উঁচু পর্যায়ের অফিসার হওয়া সত্ত্বেও আপনাদের মতো গ্রামের আত্মীয়-স্বজনদের যে সম্মান দেখালেন, তা সত্যিই ভাবা যায় না। আমার এমন কথায় তারা আরো পুলকিত হলেন। তাদের সেই বাড়তি খুশির সুযোগ নিয়ে বললাম, আপনারা জিএম সাহেবকে কতটুকু ভালোবাসেন? সগর্ব জবাব পেলামঅনেক। তখন আবারো বললাম, উনার কোনো বিপদ হলে আপনারা কী করবেন? সমস্বর প্রতিজ্ঞ জবাবে তারা বললেন, আমরা রুখে দাঁড়াব। আমি তখন বললাম, আপনাদের ঋণ দিতে গিয়ে যদি উনার কোনো অসুবিধা হয়? তারা অবলীলায় বলে উঠলেন তাহলে এই ঋণই নেব না। তখন আমি বললাম, উনি তো তাতে অনেক কষ্ট পাবেন এবং লজ্জাও পাবেন এই ভেবে যে আপনারা তার কাছে কোনো আবদার নিয়ে আগে কখনো আসেননি। কিন্তু তাকে আপনারা অনেক ভালোবাসেন। অথচ আপনাদের জন্য তিনি কিছুই করতে পারছেন না। তখন তারা দৃঢ়তার সঙ্গে বললেন, আমরা তার কাছে আর যাবই না। তখন মহান আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করলাম। দেখুন, যে চাপের কথা বলা হলো তা কীভাবে ম্যানেজ হয়ে গেল। সাপও মরলো লাঠিও ভাঙল না। আসলে চাপ সাপের মতোই দুর্বল, যা লাঠিকে ভয় পায়। তাই সৎ সাহসী দক্ষতা দিয়ে লাঠিকে বাঁচিয়েও সাপ মারা যায়।

এত সবের পরও সমালোচকরা হয়তো বলবেন, আগের চাপ আর এখনকার চাপ এক নয়। এর জবাবে বলতেই হয়, চাপের কোনো নির্দিষ্ট সময় নেই। যে তাকে দমাতে পারে সেই তার বাপ এবং তখনই হয় তার নিষ্ঠুর শেষ সময় তাই যুক্তিহীন বেপরোয়া Coping Strategy-মূলক কৌশল খাটিয়ে ভালো কাজের বিরোধিতা করা অসমীচীন।

পরিশেষে বলি, অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা নেয়ার সাহসী কৌশল চাপ সামলাতে অবশ্যই সহায়ক হতে পারে যদি কাজের ওপর কর্তার প্রকৃত দখল/দক্ষতা থাকে। তাই বলতে হয়, দক্ষ কর্মীর নিরাপদ হাত মানেই একটি বিজয়ী হাত।

আসুন আমরা কাজের নুক্তা বের না করে মনোযোগ দিয়ে সঠিক কাজ করে তার সর্বজনীন সুফল দিয়ে ব্যাংকিং খাতের গতি ফেরাই।                       

 

রবিউল হোসেন: সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক

সোনালী ব্যাংক লিমিটেড

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন