বুধবার | জানুয়ারি ২৬, ২০২২ | ১২ মাঘ ১৪২৮

সম্পাদকীয়

কৃষি

আলু উৎপাদন, সংরক্ষণ ও রফতানিতে চ্যালেঞ্জ

আবু হেনা ইকবাল আহমেদ

বিশ্বের প্রায় ৪০টি দেশে আলু মানুষের অন্যতম প্রধান খাদ্য এবং বহু দেশে পশুখাদ্য হিসেবে সমাদৃত। আলু উৎপাদনের দিক থেকে বর্তমানে বাংলাদেশ বিশ্বে সপ্তম স্থানে। আমাদের নিত্যকার খাবারে বাণিজ্যে আলু অন্যতম অনুষঙ্গ। পরিসংখ্যান মতে, ২০২০ সালে দেশে আলুর ব্যবহার হয়েছে প্রায় ৪৬ লাখ টন। কেবল পশুখাদ্য হিসেবে আলু ব্যবহার হয়েছে প্রায় সাড়ে ১১ লাখ টন। প্রক্রিয়াজাত শিল্পে ব্যবহার হয় প্রায় হাজার ৫৩০ টন এবং রফতানি হয়েছে প্রায় ৪৫ হাজার টন। নানাভাবে বিনষ্টও হয় এর উল্লেখযোগ্য অংশ। ২০১৯-২০ অর্থবছরে ২৩ দশমিক ৩০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের আলু রফতানি করা হয়।

আলু শুধু খাদ্য হিসেবেই আবাদ করা হয় না, অর্থকরী ফসল হিসেবেও এর কদর যথেষ্ট। জনৈক প্রান্তিক চাষীর তথ্যমতে, ৬০ শতাংশ জমিতে আগাম জাতের গ্রানোলা আলু চাষ করে খরচ বাদে লাভ হয়েছে ৬০ দিনের ফসলে ৫২ হাজার টাকা। কয়েকশ বছর ধরে অর্থকরী ফসল হিসেবে রংপুর, ময়মনসিংহ, কুমিল্লা, বরিশাল, কুষ্টিয়া ফরিদপুর অঞ্চলে পাটের আবাদ হতো বেশি পরিমাণে। ময়মনসিংহের নালিতাবাড়ী, রংপুরের লালমনিরহাটের পাটগ্রাম, গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় পাটগাতি এবং কোস্টার দেশ কুষ্টিয়ার সঙ্গে পাটের নাম জড়িয়ে আছে। ব্রিটিশ আমলে দ্বিতীয় মহাসমরে বিশ্বের পাটের বড় জোগানদার ছিল পূর্ববাংলা। দ্রুত গড়ে ওঠে রেল নৌ-পরিবহন ব্যবস্থা। কৃষকদের আয় মান বাড়তে থাকে সমানতালে। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্মের পর থেকে ধীরে ধীরে অর্থকরী ফসল পাট আখের স্থান দখল করে নিয়েছে আলু। এখন আলুর রমরমা বাণিজ্যে তার জয়জয়কার অবস্থা। আলুর ওপর নির্ভর করে বেঁচে আছে অগণিত কৃষকশ্রমিক, মধ্যস্বত্বভোগী, পরিবহন হিমাগার প্রতিষ্ঠান।

লাভজনক অর্থকরী ফসল আলুর চ্যালেঞ্জও কম নয়। হেক্টরপ্রতি বীজের প্রয়োজন প্রায় দশমিক টন। বিপুল পরিমাণ বীজকন্দ পরিবহন খরচও কম নয়। চাষের প্রায় ৪০ শতাংশ খরচ বীজকন্দ কেনার পেছনে ব্যয় হয়। বীজের চাহিদা বেড়ে গেলে মানসম্পন্ন বীজকন্দ সংগ্রহ করা যেমন সমস্যাসংকুল, তেমনি নীরোগ নবীন প্রজন্মের বীজকন্দের স্বরূপ খোলা চোখে বোঝা অসাধ্য। তাই অনেক সময় বহু কৃষকের আশানুরূপ ফলনের স্বপ্ন দিবাস্বপ্নে পর্যবসিত হয়।

রবি মৌসুমে ফসলি জমিতে অন্য ফসলের সঙ্গে আলুকে জমিন ভাগ করে নিতে হয়। পরিবেশ আবহাওয়ার ওপর কৃষকের হাত থাকে না বিধায় মেঘমুক্ত আকাশ এবং ১৫ ডিগ্রি থেকে ২০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেট তাপমাত্রার হেরফের হলে এর ফলনে বিপর্যয় ঘটে। সময়মতো সেচ, সার প্রয়োগে বিঘ্ন ঘটলে এবং মেঘলা গুমট আবহাওয়ায় জীবণুনাশক প্রয়োগ না করতে পারলে আলু ফসল মাঠে মারা যায়। উদ্ভিদ সংরক্ষণ খাতের ছোট বড় করপোরেট বাণিজ্যের উল্লেখযোগ্য ব্যবসা চলে আলুর মৌসুমে। কিন্তু কৃষককে এজন্য সমুদয় ব্যয় মেটাতে হয় গাঁটের কড়কড়ে কড়ি দিয়ে।

 আগামী পৃথিবীর যে সংকট ঘনিয়ে আসছে, তার অন্যতম হলো লবণমুক্ত সুপেয় পানি। মানুষের ব্যবহূত লবণহীন সুপেয় পানির প্রায় ৩০ শতাংশ সেচাবাদে ব্যয় হয়। আর এর বড় একটা অংশ জানিয়ে বা না জানিয়ে অপচয়ের খাতে চলে যায়। ব্যাপক আবাদি চারটি ফসলের অন্যতম ফসল আলুতে ব্যয় হওয়া সেচ মূল্য সংযোজনে পানির পরিমাণ ধানের পরেই অধিক। রোপা আউশ রোপা আমনে বৃষ্টির পর কিছু পরিমাণে সম্পূরক সেচের প্রয়োজন পড়ে মাত্র। কিন্তু আলুতে বোরো ফসলের মতো পুরোটা সেচই দিতে হয় শুষ্ক মৌসুমে, যখন চলে পানির আকাল মৌসুম। তখন খালে বা ভূ-উপরস্থ পানির চেয়ে বহু যুগ ধরে সঞ্চিত ভূগর্ভস্থ পানির ওপর বেশি চাপ পড়ে। সে পরিমাণ পানি দিয়ে এর দ্বিগুণেরও বেশি জমিতে ভুট্টা, গম বা অন্য প্রায় সব রবি ফসলে সেচ দেয়া সম্ভব। আর বাজারজাত বা রফতানির আগে আলু পরিষ্কারকরণেও দরকার পড়ে বেশি পরিমাণে অমূল্য পানি।

 ক্রমপচনশীল কৃষিপণ্য হিসেবে আলু তাপমাত্রার প্রতি সংবেদনশীল বিধায় সংরক্ষণের জন্য বিশেষ অবকাঠামো নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের প্রয়োজন। পরিবহনে অন্য ফসলের আয়তনের তুলনামূলক ব্যয় স্থান লাগে বেশি। আবাদকালে ১৫ থেকে ২০ ডিগ্রি এবং পরিবহনকালে থেকে ১২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা থাকা চাই। হিমাগারে সংরক্ষণের জন্য আরো নিম্নতাপের প্রয়োজন। বিশেষজ্ঞদের কারো কারো মতে, আলু পরিবহনে কার্গো বিমানের চেয়ে সমুদ্রপথে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা গেলে সাশ্রয়ী মূল্যে তা রফতানি করা সম্ভব। ধারণা যতটা সহজ, বাস্তবে তা কঠিনতর। কার গোয়ালে কে দেবে ধোঁয়া। তার ওপর আমাদের আশেপাশে রয়েছে রফতানি প্রতিযোগী দেশ ভারত, মিয়ানমার, চীন, পাকিস্তান, কম্বোডিয়া প্রভৃতি।

আলুর রফতানির ধারাবাহিক প্রবাহ নিশ্চিত করায় প্রয়োজন একটি সুসংগঠিত টানা সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তোলা। একই প্রজন্ম বারকয়েক এবং একই জমিকে বারবার আলু চাষে এর ফলন মান কমে যায়, তেমনি মাটির গুণাগুণ উত্তম কৃষি ব্যবস্থার অভাবও বাজারজাতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। নির্বিচারে রাসায়নিক সার বালাইনাশক ব্যবহার বিদেশে আলু রফতানির বড় বাধা।

আলুর সব জাত সব লোকে ব্যবহার করে না। আলুর নিজস্ব গুণগত মান তাদের বিবেচ্য। দেশের উত্তাঞ্চলে লাল এবং পূর্বাঞ্চলে হলুদ বা সাদা আলুর জনপ্রিয়তা বেশি। কেউ দেশী আলু পছন্দ করে তো কারো ছোট আলু পছন্দ। কেনোটা ভর্তা, কোনোটা ভাজি আবার কোনোটা মাছ-মাংসের সঙ্গে ভালো জমে। শিল্পজাত আলুর মান রান্নার আলুর চেয়ে ভিন্নতর। বিদেশেও ভোক্তার শ্রেণীভেদ রয়েছে প্রচুর। এশীয় বা দক্ষিণ এশীয় অঞ্চল বিশেষ করে উষ্ণ অবোষ্ণ এলাকার ভোক্তার চাহিদা আর শীতপ্রধান দেশের ভোক্তার চাহিদায় ভিন্নতা রয়েছে। প্রক্রিয়াজাত কারখানা শীতের দেশের মানুষের ৩০ শতাংশ বেশি শুষ্ক পদার্থসম্পন্ন আলুর চাহিদা এবং উষ্ণ অবোষ্ণ এলাকার ভোক্তাদের ২০-২৫ শতাংশ শুষ্ক পদার্থসম্পন্ন আলুর চাহিদার ভিন্নতা বিদ্যমান।

বড় আকারের আলুর ভেতরে ফাঁপা বা মাঝের অংশ কালো হওয়ার প্রবণতা থাকে। রফতানিকারক সমিতির তথ্যমতে, শরীরবৃত্তীয় সমস্যা হলো-হার্ট আলু রফতানির অন্যতম প্রতিবন্ধকতার কারণ। দেশে অধিক উৎপাদিত অতিজনপ্রিয় এবং বিএআরআই উদ্ভাবিত জাত ডায়ামন্ট ভেতর ফাঁপা বা হলো-হার্ট রোগপ্রবণ। জানা যায়, সম্প্রতি রফতানিকারক সমিতি বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইস্টিটিউট রফতানি উপযোগী ১০টি জাতের বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছে। আধুনিক জাতগুলো হলো সানসাইন, প্রাডা, সান্তানা, কুইনঅ্যানি, কুম্বিকা, ডোনেটাডায়ামন্ট, গ্রানোলা, মিউজিকা বারি আলু ৬২। আলুর অভ্যন্তরীণ বাজার, সংশ্লিষ্ট শিল্প-কারখানা এবং বিদেশে চাহিদার বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন জাত নিরূপণে দেশীয় কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় রফতানিকারকদের সঙ্গে চাষীদের সমন্বিত ব্যবস্থাপনার একটি নিবিড় যোগসূত্র গড়ে তোলা সময়ের দাবি।

আলু সংগ্রহের পর এর শ্রেণীবিন্যাসকরণকালে অস্বাভাবিক আকৃতির আলু বাদ প্রাথমিক কর্ম। আলু ধৌতকরণ, ভেসে ওঠা আলু পৃথক করে বাতিলকরণ চলমান প্রযুক্তি। বিদেশে রফতানির জন্য জাহাজীকরণ মোড়কীকরণের আগে আলুকে আধুনিক প্রযুক্তিতে চলমান বেল্টের ওপর তার আলোকপ্রেক্ষণের প্রচ্ছায়া স্ক্যানকরণ অথবা সূক্ষ্ম-শ্রুতি পদ্ধতির মাধ্যম দিয়ে অতিক্রম করিয়ে মাঝ-ফাঁপা অনাক্রান্ত আলু শনাক্তকরণের মাধ্যমে মানসম্পন্ন আলু বাছাই আধুনিক প্রযুক্তি। অবশ্য এসব আধুনিক যন্ত্রের জন্য মোটা অংকের অর্থব্যয় প্রয়োজন। সঙ্গে চাই অবকাঠামো নির্মাণ, বিশুদ্ধ পানির জোগান, সার্বক্ষণিক বিদ্যুৎ, দক্ষ জনবল গড়ে তোলা এবং যুগোপযোগী প্রযুক্তির সমন্বয়করণ।

এক কেজি আম আর সমপরিমাণের আলুর স্থান পরিবহন খরচ এবং তার বিক্রয়মূল্যের তুলনামূলক বিচারে কোনটি লাভজনক তা অর্থনীতির বিষয়। পাল্টা প্রশ্নও আছে, আলুর বিস্তার আর আমের বিস্তার এক রকম নয়। আম মৌসুমি চাহিদাসম্পন্ন, আর আলু সংবৎসরিক নিত্যব্যবহার্য। আলু নিয়ে ভাবনায় নানা প্রশ্ন উদয় হলেও পরিশেষে বলা যায়, প্রতি বছর আলু আবাদের পরিধি পরিমাণ ক্রমবর্ধমান। কিন্তু এর সঙ্গে দেশীয় বাজার, সংশ্লিষ্ট শিল্প এবং রফতানি চাহিদা মানের ন্যূনতম যোগসূত্র নেই। আন্তঃবিভাগীয় সমন্বয়হীনতা এবং তথ্য বিভ্রাট ঘাটতিও প্রচুর। বিপুল পরিমাণে ভূগর্ভস্থ পানি উঠিয়ে সেচ পরিবেশ দূষণকারী রাসায়নিক দ্রব্য খরচ করে শ্রম-ঘামে উত্পন্ন বাণিজ্যিক ফসলটির পরিণতিতে যেন পাট আখ উৎপাদনকারী কৃষকদের মতো কখনো অশ্রু ঝরাতে না হয়। তাই আলু বেশি উৎপাদন করব কি করব নাকৃষকদের প্রশ্নের উত্তর প্রদানে সময় থাকতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আশু দৃষ্টি প্রদান জরুরি।

 আবু হেনা ইকবাল আহমেদ: কৃষিবিদ; সাবেক পরিচালক

বীজ প্রত্যয়ন এজেন্সি, কৃষি মন্ত্রণালয়

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন