রবিবার | ডিসেম্বর ০৫, ২০২১ | ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৮

প্রথম পাতা

বিএস-২

বাংলাদেশের দ্বিতীয় স্যাটেলাইট নির্মাণে আগ্রহী তিন দেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক

২০১৮ সালে প্রথম মহাকাশে নিজস্ব স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করে বাংলাদেশ। এর ধারাবাহিকতায় দ্বিতীয়টি উৎক্ষেপণেরও পরিকল্পনা নেয়া হয়। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট (বিএস)- শীর্ষক স্যাটেলাইটটি নির্মাণের বিষয়ে এরই মধ্যে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগ দেয়া হয়েছে। স্যাটেলাইট নির্মাণে তিন দেশের চারটি প্রতিষ্ঠান আগ্রহও প্রকাশ করেছে।

বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেড (বিএসসিএল) সূত্রে জানা গিয়েছে, চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান চায়না গ্রেটওয়াল ইন্ডাস্ট্রি করপোরেশন ফ্রান্সের এয়ারবাস স্যাটেলাইট নির্মাণে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। রাশিয়ার রসকসমসের সঙ্গে নিয়ে আলোচনা চলছে। এছাড়া সম্প্রতি বিএস- নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান ফ্রান্সের থ্যালেস অ্যালেনিয়া স্পেস দ্বিতীয় স্যাটেলাইটটি নির্মাণে আগ্রহ প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে চিঠি দিয়েছে।

বিষয়ে বিএসসিএল চেয়ারম্যান . শাহজাহান মাহমুদ বণিক বার্তাকে বলেন, দ্বিতীয় স্যাটেলাইট নির্মাণের লক্ষ্যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। করোনার কারণে পরামর্শক নিয়োগ কিছুটা পিছিয়ে গেলেও তাদের সঙ্গে এরই মধ্যে চুক্তি করা হয়েছে। বাংলাদেশের দ্বিতীয় স্যাটেলাইট নির্মাণে বেশ কয়েকটি দেশ আগ্রহ প্রকাশ করেছে। এগুলো পর্যালোচনা করে দেখা হচ্ছে।

দ্বিতীয় স্যাটেলাইটের পরামর্শক নিয়োগ করতে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছিল। ২১টি আবেদন জমা পড়ে। সেখান থেকে সাতটি প্রতিষ্ঠানকে দর জমা দিতে বলা হয়। চারটি প্রতিষ্ঠান দর দেয়। সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে প্রাইসওয়াটারহাউজকুপারসকে (পিডব্লিউসি) পরামর্শক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। চলতি বছরের জানুয়ারিতে আনুষ্ঠানিকভাবে পরামর্শক হিসেবে নিয়োগ পায় পিডব্লিউসি। নিয়ে প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে সরকারের লাখ ৮৫ হাজার ডলারের চুক্তি হয়েছে। বাংলাদেশের জন্য কোন স্যাটেলাইটটি উপযোগী, তা পর্যালোচনা করে তিন মাসের মধ্যে বিএসসিএলকে পরামর্শ দেয়ার কথা পিডব্লিউসির।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গিয়েছে, দ্বিতীয় স্যাটেলাইট নির্মাণে বিভিন্ন দেশ আগ্রহ প্রকাশ করলেও রাশিয়ার সঙ্গে চুক্তি হতে পারে। সেক্ষেত্রে দুই দেশের সরকারের মধ্যে জিটুজি চুক্তির আওতায় এটি নির্মাণের সম্ভাবনা রয়েছে।

২০১৮ সালের ১২ মে বিএস- মহাকাশে উৎক্ষেপণের মাধ্যমে বিশ্বের ৫৭তম দেশ হিসেবে স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণকারী দেশগুলোর তালিকায় অবস্থান করে নেয় বাংলাদেশ। স্যাটেলাইটটি উৎক্ষেপণ করা হয় যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা থেকে। উৎক্ষেপণে প্রথমবারের মতো ব্যবহার করা হয় ফ্যালকন রকেটের সর্বশেষ সংস্করণ ব্লক ৫। সাড়ে তিন হাজার কেজি ওজনের স্যাটেলাইটে রয়েছে ৪০টি ট্রান্সপন্ডার, যার ২৬টি কেইউ ব্যান্ডের ১৪টি সি ব্যান্ডের। ট্রান্সপন্ডারের ২০টি সংরক্ষিত রয়েছে নিজস্ব ব্যবহারের জন্য। বাকিগুলো রাখা হয়েছে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে ভাড়া দেয়ার জন্য। স্যাটেলাইটটি নির্মাণ উৎক্ষেপণে ব্যয় হয় হাজার ৯০২ কোটি টাকা। স্যাটেলাইটটি মূলত যোগাযোগ সম্প্রচার কার্যক্রমেই ব্যবহার হচ্ছে। বিএস- থেকে বছরে আয় হচ্ছে ১২০ কোটি টাকা। টেলিভিশন চ্যানেলগুলো সম্প্রচারের জন্য অর্থ দিচ্ছে। স্যাটেলাইটটির ব্যান্ডউইডথ ব্যবহার করে দেশের দুর্গম দ্বীপ, নদী হাওর এবং পাহাড়ি অঞ্চলে টেলিযোগাযোগ সেবা দেয়া হচ্ছে।

স্যাটেলাইটটির নির্মাতা প্রতিষ্ঠান থ্যালেস অ্যালেনিয়া স্পেস সম্প্রতি বিএস- নির্মাণে আগ্রহ প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে চিঠি দিয়েছে। চিঠিতে প্রতিষ্ঠানটির প্রেসিডেন্ট সিইও হার্ভ ডেরি জানান, প্রথম স্যাটেলাইটটি নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত থাকায় দ্বিতীয়টি নির্মাণের সুযোগ দেয়া হলে বেশকিছু সুবিধা পাওয়া যাবে। এছাড়া প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ ইন্টার্নশিপের মাধ্যমে ফ্রান্স থেকে বাংলাদেশে প্রযুক্তিগত দক্ষতা বিনিময় হবে।

একটি স্যাটেলাইট নির্মাণ উৎক্ষেপণে ন্যূনতম দুই বছর সময় প্রয়োজন উল্লেখ করে চিঠিতে বলা হয়, ২০২৩ সালের মধ্যে বিএস- নির্মাণ উৎক্ষেপণের লক্ষ্য অর্জন করতে হলে চলতি বছরের মধ্যে চুক্তি সই করা প্রয়োজন।

জানা গিয়েছে, বিএস- আর্থ অবজারভেশন (ইও) অথবা হাইব্রিড স্যাটেলাইট হতে পারে। এর আওতাধীন এলাকা হবে বাংলাদেশের স্থলভাগ বঙ্গোপসাগর ছাড়াও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চল। তবে ধরন নির্ধারণ না হওয়ায় এখনো এর ব্যয় চূড়ান্ত হয়নি।

ইও স্যাটেলাইটের মাধ্যমে অত্যন্ত উচ্চমানসম্পন্ন (ভিএইচআর) চিত্র পাওয়া সম্ভব। এছাড়া এর সিনথেটিক-অ্যাপারচার রাডারের (এসএআর) মাধ্যমে দ্বিমাত্রিক ছবি পাওয়া যায়। এসব ছবি স্থানিক পরিবেশ বিশ্লেষণে ব্যবহার করা হয়। অভ্যন্তরীণ উপকূলীয় জলজ সম্পদ পরিবেশ, যেমন সমুদ্র নদীর স্তর, তরঙ্গ গতির বিশ্লেষণ, জাহাজ শনাক্তকরণ, জলের গুণমান নিরীক্ষায় ইও স্যাটেলাইট ব্যবহার হয়। এছাড়া বন্যা পর্যবেক্ষণ, বন রক্ষা কর্মসূচি, ভূমিপৃষ্ঠ গতি ঝুঁকি পর্যবেক্ষণ, শহুরে পরিবেশ পর্যবেক্ষণ-পরিবর্তন, প্রতিরক্ষা নিরাপত্তাসহ আরো বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে এসব স্যাটেলাইট কাজ করবে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, চলতি বছরের শেষাংশে বিএস- নির্মাণে দরপত্র আহ্বান করার কথা রয়েছে। সেক্ষেত্রে আগামী বছরের শুরুতে প্রক্রিয়া শেষ হতে পারে। এটির সিস্টেম ক্রিটিক্যাল ডিজাইন নিয়ে পর্যালোচনা হতে পারে ২০২৪ সালে। একই বছর তৃতীয় প্রান্তিকে স্যাটেলাইটটি উৎক্ষেপণ হতে পারে। এর দ্বিতীয় উৎক্ষেপণ হতে পারে পরবর্তী বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালের প্রথমার্ধে।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশের ব্লু ইকোনমির উন্নয়নে ইও স্যাটেলাইট গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। অনুসন্ধান জরিপ, টার্গেট মনিটরিং, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, জরুরি মানবিক সহায়তা স্বাস্থ্য, সম্পদ নিরীক্ষণ আচরণ, বিভিন্ন এলাকার অবকাঠামো ট্রাফিক ব্যবস্থা পর্যবেক্ষণ, বীমা নগর পরিকল্পনা ছাড়াও গোয়েন্দা নজরদারি সীমান্ত রক্ষা কার্যক্রম এটির আওতায় থাকতে পারে।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন