রবিবার | নভেম্বর ২৮, ২০২১ | ১৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৮

প্রথম পাতা

চট্টগ্রামে ফ্লাইওভারের নকশাবহির্ভূত র‍্যাম্পের পিলারে ফাটল

দেবব্রত রায়, চট্টগ্রাম ব্যুরো

চট্টগ্রামে এজি রোডের শুলকবহর-নতুন চান্দগাঁও থানা অংশে নির্মিত বহদ্দারহাট ফ্লাইওভারের কাজ শেষ হয় ২০১৩ সালে। এর তিন বছর পরে একটি র‍্যাম্প তৈরি করে ফ্লাইওভারটিকে আরাকান রোডের সঙ্গেও যুক্ত করা হয়। মূল নকশার বাইরে নতুনভাবে নির্মিত র‍্যাম্পের একটি পিলারে এখন ফাটল দেখা দিয়েছে। ফাটলের কারণে সেখান দিয়ে যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। নির্মাণের মাত্র চার বছরের মাথায় র‍্যাম্পটির পিলারে ফাটল দেখা দেয়ায় নির্মাণকাজের মান নিয়ে সংশ্লিষ্টরা প্রশ্ন তুলছেন।

তারা বলছেন, ত্রুটি নানা অভিযোগ নিয়ে নির্মিত ফ্লাইওভারে কোনো ধরনের সমীক্ষা এবং সঠিক পরিকল্পনা ছাড়াই নির্মাণ করা হয়েছিল র‍্যাম্পটি। এর ওপর দিয়ে ভারি যানবাহনও চলাচল করেছে অনিয়ন্ত্রিতভাবে। আগেও ফ্লাইওভারটির নির্মাণ চলাকালেই দুবার বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটেছিল। এর মধ্যে ২০১২ সালে ফ্লাইওভারের গার্ডার ধসে অন্তত ১৫ জনের মৃত্যু হয়েছিল।

দেশে ফ্লাইওভার নির্মাণকাজে অদক্ষতা নকশার ত্রুটির এটিই প্রথম অভিযোগ নয়। এর আগে ফ্লাইওভারে ধরনের ত্রুটি দেখা দিয়েছিল রাজধানী ঢাকায়ও। ২০১১ সালে খিলগাঁও ফ্লাইওভারের তিনটি ফ্ল্যাপ দেবে যাওয়ার ঘটনা ঘটে। ওই সময় ফ্লাইওভারটি বন্ধ রেখে প্রয়োজনীয় সংস্কার করা হয়েছিল। অন্যদিকে মগবাজার-মৌচাক ফ্লাইওভারেও রয়েছে নকশাগত ত্রুটি। বর্তমানে ত্রুটি নিয়েই ফ্লাইওভারটি দিয়ে যানবাহন চলাচল করছে। দুর্ঘটনা এড়াতে সতর্কতা হিসেবে রাখা হয়েছে সিগনাল বাতির ব্যবস্থা।

বহদ্দারহাট ফ্লাইওভারের একটি পিলারের ওপরের অংশে ফাটল ধরার খবর ছড়িয়ে পড়ে গত সোমবার রাতে। পরে ফ্লাইওভারের আরাকান রোডের অংশে যান চলাচল বন্ধ করে দেয় চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) ফাটল ধরা অংশটি ফ্লাইওভার নির্মাণকালীন মূল নকশায় ছিল না।

বহদ্দারহাট ফ্লাইওভারের নির্মাণকাজ ২০১০ সালে শুরু হয়ে শেষ হয় ২০১৩ সালে। সিডিএর তত্ত্বাবধানে ফ্লাইওভারটি নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ১০৬ কোটি টাকা। মূল ফ্লাইওভারটি তৈরি করেছে পারিশা এন্টারপ্রাইজ মীর আক্তার এন্টারপ্রাইজ নামের দুটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। অন্যদিকে ২০১৬ সালে শুরু হয়ে ২০১৭ সালে শেষ হয় আরাকান রোডের সঙ্গে সংযোগকারী র‍্যাম্পের কাজ। র‍্যাম্পটি তৈরি করেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ম্যাক্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড। র‍্যাম্পটি নির্মাণের ব্যয় সম্পর্কে সিডিএ বা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা কোনো ধরনের তথ্য জানাতে অপারগতা প্রকাশ করেছেন। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, র‍্যাম্পটি নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ১০ কোটি টাকার কিছু বেশি।

ম্যাক্সের তৈরি করে দেয়া র‍্যাম্পটিতেই এখন ফাটল দেখা দিয়েছে। বর্তমানে র‍্যাম্প নির্মাণকারী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নিম্নমানের নির্মাণকাজ, ভুল পরিকল্পনা সমীক্ষা না করার অভিযোগ তুলছেন সংশ্লিষ্টরা। যদিও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বাস্তবায়নকারী কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তারা দায়ী করছেন ভারী যানবাহন চলাচলকে।

নির্মাণকাজে ত্রুটি থাকার কারণে বহদ্দারহাট ফ্লাইওভারে ফাটলের সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে করছেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরী। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ফ্লাইওভারের নির্মাণকাজটি করেছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) আমরা সিডিএকে চিঠি দেব পিলারে ফাটলের ব্যাপারে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়ার জন্য। কারণ যেকোনো সময় বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। ফাটলের বিষয়টি অধিকতর তদন্ত করে দেখতে হবে। কাজে গাফিলতি ছিল কিনা, নকশায় ভুল ছিল কিনা বা যেসব ঠিকাদার এখানে কাজ করেছে তাদের ত্রুটি আছে কিনা তা খুঁজে বের করতে হবে সিডিএকে।

সরেজমিনে বহদ্দারহাটে নির্মিত চট্টগ্রামের প্রথম ফ্লাইওভারে গিয়ে দেখা যায়, ফ্লাইওভারটি স্বাভাবিকভাবে চালু রাখা হলেও নতুন নির্মিত র‍্যাম্পটি গাড়ি চলাচলের জন্য বন্ধ রাখা হয়েছে। ফ্লাইওভারের ওপরে সড়কের অংশে পিচ উঠে গার্ডারের বিভিন্ন অংশ দৃশ্যমান হয়ে পড়েছে।

স্থানীয়রা বলছেন, ফ্লাইওভারটি নির্মাণের সময় দুবার বড় ধরনের দুর্ঘটনার ঘটনা ঘটেছে। পরবর্তী সময়ে নকশার বাইরে গিয়ে নতুন করে আরাকান রোডমুখী র‍্যাম্পটি নির্মাণ করা হয়েছে। অন্যদিকে র‍্যাম্পটির প্রস্থ সাড়ে ছয় মিটার হলেও এরপর দিয়ে বড় বড় লরি ট্রাক চলাচল করে। ফ্লাইওভারটি বর্তমানে বড় ধরনের ঝুঁকিতে আছে। মাঝে মাঝে ভারী ভারী লরি-ট্রাক চলাচলের সময়ে ফ্লাইওভারটিতে কম্পন শুরু হলেও বিষয়টিকে তেমন একটা আমলে নেয়া হয়নি।

ভারী এসব যানবাহন চলাচলকেই র‍্যাম্পের পিলারে ফাটলের জন্য দায়ী করছেন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা। জানতে চাইলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ম্যাক্স গ্রুপের প্রকল্প ব্যবস্থাপক মনির হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, বহদ্দারহাট ফ্লাইওভার নির্মাণের সময় যে র‍্যাম্পটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সেটি মূল নকশায় ছিল না। পরে প্রকল্পে যুক্ত করে আমরা কাজটি শেষ করেছি। ফ্লাইওভারটির র‍্যাম্পের নকশা সিডিএ আমাদের যেভাবে দিয়েছে আমরা সেভাবে কাজ করেছি। নকশায় কোনো ত্রুটি ছিল কিনা সেটা সিডিএ ভালোভাবে বলতে পারবে। কারণ র‍্যাম্পটি নির্মাণের সময় আরাকান রোডের নিচে বিভিন্ন ধরনের আন্ডারগ্রাউন্ড লাইনেজ থাকায় আমাদের ১৩ মিটারের বক্স গার্ডার বসিয়ে কাজ করতে হয়েছে। নির্মাণের সময় আমরা র‍্যাম্প দিয়ে কোনো ভারী গাড়ি চলাচল করতে পারবে না বলে সিডিএর তত্কালীন চেয়ারম্যানকে জানিয়েছিলাম। তার নির্দেশেই আমরা কাজটি শেষ করি এবং র‍্যাম্পটি ওঠার সময় ভারী গাড়ি চলাচল নিষেধ উল্লেখ করলেও পরে সে নির্দেশনা মানা হয়নি।

সিডিএর প্রকল্প পরিচালক নির্বাহী প্রকৌশলী মাহফুজুর রহমানও মনে করছেন, ভারী যানবাহন চলাচলের কারণে ফাটল দেখা দিতে পারে। তিনি বলেন, বিশেষজ্ঞদের পরামর্শের ভিত্তিতে এটি মেরামত করা হবে। আমরা নকশা প্রণয়নকারীদের সঙ্গে আজ বসে পরবর্তী কাজের সিদ্ধান্ত নেব।

তবে র‍্যাম্পটি নির্মাণের সময় নকশা বা কাজের ত্রুটি ছিল না বলে দাবি করেন কর্মকর্তা।

২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে ফ্লাইওভারটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ২০১০ সালের জানুয়ারি নির্মাণকাজ শুরু করে সিডিএ। সংস্থাটির নিজস্ব অর্থায়নে ১০৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ফ্লাইওভারের মূল কাজ করেছে পারিশা এন্টারপ্রাইজ মীর আক্তার এন্টারপ্রাইজ নামে দুটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। উড়াল সড়কটি উদ্বোধন করা হয় ২০১৩ সালের অক্টোবরে। অন্যদিকে আরাকান সড়কমুখী ?্যাম্পটি নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয় ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে। ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে ৩২৬ মিটার দীর্ঘ দশমিক মিটার চওড়া র‍্যাম্পটি নির্মাণ শেষে যান চলাচলের জন্য খুলে দেয় সিডিএ।

ফ্লাইওভারটির নির্মাণকাজ চলাকালে ২০১২ সালের ২৯ জুনের পর থেকে ১৩০ ফুট দীর্ঘ একটি কংক্রিটের গার্ডার ভেঙে পড়ে। এতে একজন রিকশাচালক আহত হলেও কেউ মারা যাওয়ার ঘটনা ঘটেনি। একই বছরের ২৪ নভেম্বর সন্ধ্যায় নির্মাণাধীন ফ্লাইওভারের ১২ ১৩ নম্বর পিলারের মধ্যবর্তী স্থানে তিনটি গার্ডার ধসে পড়ে। পুলিশের দেয়া তথ্যমতে, দুর্ঘটনার পর গার্ডারের নিচ আশপাশ থেকে আটটি এবং বহদ্দার পুকুর থেকে চারটিসহ মোট ১২টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এছাড়া চিকিৎসাধীন অবস্থায় চমেকে মৃত্যু হয় আরো তিনজনের।

বিশ্লেষকরা বলছেন, অর্থনৈতিক হাব হিসেবে দক্ষিণ চট্টগ্রাম কালুরঘাটে যাতায়াতে সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করা হয় এই বহদ্দারহাট ফ্লাইওভার। অন্যদিকে ঠিকাদারদের সতর্কতা সত্ত্বেও ফ্লাইওভার দিয়ে চলাচল করেছে ভারী যানবাহন। যার কারণে ফ্লাইওভারে ফাটল দেখা দিয়েছে। এর দায় এড়িয়ে যেতে পারে না সংশ্লিষ্ট কোনো দপ্তরই।

সার্বিক প্রসঙ্গে নগর পরিকল্পনাবিদ প্রকৌশলী সুভাষ বড়ুয়া বণিক বার্তাকে বলেন, চট্টগ্রামে বহদ্দারহাট ফ্লাইওভার নির্মাণে যথাযথ পরিকল্পনা নেয়া হয়নি। স্কেল ম্যানেজমেন্ট না থাকায় ফ্লাইওভার দিয়ে কত লোডের গাড়ি চলাচল করবে সেটাও নির্ধারণ করা হয়নি। ভারী গাড়ি চলাচলের কারণে ফাটলের সৃষ্টি হয়েছে। নকশায় ত্রুটি থাকার কারণে এমনটা হতে পারে। তবে সংস্কারের জন্য বুয়েটের সঙ্গে ফিজিবিলিটি টেস্ট করে সমস্যা বের করে সমাধানের চেষ্টা করতে হবে। ভবিষ্যতে এভাবে অপরিকল্পিতভাবে কোনো প্রকল্প না নেয়াই সমীচীন হবে।

 

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন

×