রবিবার | নভেম্বর ২৮, ২০২১ | ১৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৮

শেষ পাতা

বিমান: বাংলাদেশের পতাকাবাহী উড়ন্ত বলাকা

মনজুরুল ইসলাম

স্বাধীনতার ৫০ বছর পেরিয়েছে বাংলাদেশ। ডিসেম্বরে  উদযাপিত হবে বিজয়ের সুবর্ণজয়ন্তী। সরকারি উদ্যোগে যেসব কোম্পানি দেশ জাতি গঠনে মেরুদণ্ড হিসেবে কাজ করেছে সেগুলোকে নিয়ে বণিক বার্তা রোববারের বিশেষ আয়োজন। আজ বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস 

স্বাধীনতার পর পরই ১৯৭২ সালের জানুয়ারি এয়ার বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল নামে যাত্রা করে দেশের প্রথম রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী উড়োজাহাজ পরিষেবা সংস্থা। পরবর্তী সময়ে যার নামকরণ করা হয় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস লিমিটেড। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নিজ হাতে গড়া প্রতিষ্ঠানটির শুরুতে নিজস্ব কোনো উড়োজাহাজ ছিল না। সরকারের দেয়া বিমানবাহিনীর একটি ডিসি- উড়োজাহাজ নিয়ে শুরু হয় যাত্রা। বর্তমানে বিমানের বহরে রয়েছে ২১টি সর্বাধুনিক প্রযুক্তির উড়োজাহাজ। যেগুলোর মাধ্যমে শিডিউল চার্টার্ড ফ্লাইট পরিচালনার মাধ্যমে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা বহন করে চলেছে তারা।

১৯৭২ সালের মার্চ ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম সিলেটের উদ্দেশে ছেড়ে যায় বিমানের প্রথম দুটি অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি প্রতিষ্ঠানটিকে। সময়ের সঙ্গে অভ্যন্তরীণ আন্তর্জাতিক রুটে নিজেদের পরিধি বাড়িয়েছে তারা।

২০০৭ সালে বিমান পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। ২০০৮ সালে নতুন প্রজন্মের ১০টি উড়োজাহাজের জন্য বিশ্বখ্যাত উড়োজাহাজ নির্মাণ প্রতিষ্ঠান বোয়িংয়ের সঙ্গে একটি চুক্তি করে বিমান। চুক্তির আওতায় ছিল চারটি বোয়িং ৭৭৭-৩০০ ইআর, দুটি বোয়িং ৭৩৭-৮০০ চারটি বোয়িং ৭৮৭। বিমানের ইতিহাসে যা সবচেয়ে বড় চুক্তি। বর্তমানে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের বহরে উড়োজাহাজের সংখ্যা ২১টি। এর মধ্যে ১৬টি নিজস্ব পাঁচটি লিজ নেয়া। নিজস্ব বাহনগুলোর মধ্যে বোয়িং ৭৭৭-৩০০ ইআর চারটি, বোয়িং ৭৮৭- চারটি, বোয়িং ৭৮৭- দুটি, বোয়িং ৭৩৭ দুটি ড্যাশ- চারটি।

ইন্টারন্যাশনাল এয়ার ট্রান্সপোর্ট অথরিটির (আইএটিএ) সদস্য হিসেবে বর্তমানে বিশ্বজুড়ে ১৫টি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক গন্তব্যে ফ্লাইট রয়েছে বিমানের। যেগুলোর মধ্যে লন্ডন, জেদ্দা, রিয়াদ, মাস্কাট, দুবাই, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, কুয়েত অন্যতম। এছাড়া ঢাকা থেকে জাপানের নারিতা হয়ে এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল এবং কানাডার টরন্টো হয়ে উত্তর দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলোর সঙ্গে আকাশপথে যুক্ত হতে চেষ্টা চলছে। কভিড-১৯ মহামারীর কারণে সে পরিকল্পনার গতি কিছুটা ধীর হয়েছে। সবকিছু ঠিক থাকলে মোট ৫২টি দেশে কার্যক্রম সম্প্রসারণের সুযোগ পাবে সংস্থাটি। বেশির ভাগ গন্তব্যেই সরাসরি বা একটি বিরতি নিয়ে যেতে পারবে বিমান।

বেসামরিক বিমান পরিবহন পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো. মাহবুব আলী বণিক বার্তাকে বলেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাতে গড়া প্রতিষ্ঠান বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের উন্নয়নে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সর্বদা এগিয়ে এসেছেন। বিমানের কর্মীদের নিরলস পরিশ্রমের কারণে করোনা মহামারীর মধ্যেও বিমান ভালোভাবে টিকে আছে। বিমান দেশ দেশের প্রয়োজনে কাজ করে যাচ্ছে। বিমানের কর্মীরা লকডাউনের সময়েও নিরলসভাবে কাজ করেছেন।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রতিনিয়ত আকাশপথে কার্গো পরিবহনের চাহিদা বাড়ছে। এজন্য প্রধানমন্ত্রী বিমানের কার্গো পরিবহন সক্ষমতা বাড়াতে নতুন উড়োজাহাজ কেনার বিষয়ে নির্দেশনা দিয়েছেন। খাতে সম্ভাবনা থাকায় অবিলম্বে বিমানের নিজস্ব কার্গো শাখা চালুর বিষয়ে কাজ চলছে। বিমানের নিইউয়র্ক টরন্টো ফ্লাইট চালুর বিষয়ে সব রকম প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।

দীর্ঘদিন ধরেই বিমানের ইন-ফ্লাইট সেবার মান নিয়ে যাত্রীদের মধ্যে অসন্তোষ ছিল। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বহরে সর্বাধুনিক প্রযুক্তির উড়োজাহাজগুলো যুক্ত হওয়ার পর সেবার মান, নেটওয়ার্ক, কেবিনের ইন্টেরিয়র ইন-ফ্লাইট বিনোদনের ক্ষেত্রে অনেক উন্নয়ন হয়েছে। বোয়িং ৭৮৭- ড্রিমলাইনারটিতে সংযুক্ত করা হয়েছে বিশ্বমানের ইন-ফ্লাইট বিনোদন (আইএফই) সিস্টেম। যাত্রীরা ভূমি থেকে ৪৩ হাজার ফুট উঁচুতেও ওয়াই-ফাই সুবিধা উপভোগ করতে পারছেন। এছাড়া জ্বালানি-সাশ্রয়ী ড্রিমলাইনারগুলো অন্য উড়োজাহাজের তুলনায় ২০ শতাংশ কম জ্বালানিতে চলে।

নিজস্ব উড়োজাহাজের পাশাপাশি ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আরো ২৬টি বিদেশী এয়ারলাইনসকে সেবা দিচ্ছে বিমানের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং ইউনিট। গ্রাউন্ড, ফ্লাইট সার্ভিস কারিগরি বিভাগের কর্মীদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ দেয় ইউরোপিয়ান এভিয়েশন সেফটি এজেন্সির (ইএএসএ) সনদপ্রাপ্ত বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস ট্রেনিং সেন্টার (বিএটিসি) এছাড়া বিমান ফ্লাইট ক্যাটারিং সেন্টারের (বিএফসিসি) দিনে হাজার ৫০০টি খাবার তৈরির সক্ষমতা রয়েছে। পাশাপাশি সাভারে প্রায় ৭৫ একর জায়গাজুড়ে রয়েছে বিমানের মুনাফা অর্জনকারী প্রতিষ্ঠান বিমান পোলট্রি কমপ্লেক্স।

দীর্ঘদিন ধরে নিজস্ব জনবলের মাধ্যমেই উড়োজাহাজের ছোটখাটো মেরামত রক্ষণাবেক্ষণ করে আসছে বিমান। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মেরামত রক্ষণাবেক্ষণের সক্ষমতা বেড়েছে সংস্থাটির। আগে বিমান বহরে যুক্ত হওয়া নতুন উড়োজাহাজগুলোর প্রথম সি-চেক বিদেশ থেকে করানো হতো। তবে এখন বিমানের নিজস্ব দক্ষ জনবল দিয়েই কাজটি করা হয়। এতে বিমানের প্রচুর অর্থ সাশ্রয় হচ্ছে।

এছাড়া, উড়োজাহাজের ইঞ্জিন রিপ্লেসমেন্টের সক্ষমতাও রয়েছে বিমানের প্রকৌশলীদের। দেশের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরগুলোতে বিদেশী এয়ারলাইনসকে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং চুক্তির অংশ হিসেবে ইঞ্জিনিয়ারিং হ্যান্ডলিং, লাইন মেইনটেন্যান্স, বেজ মেইনটেন্যান্স টেকনিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স সার্ভিস দেয় বিমান। এজন্য হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে রয়েছে বিমানের নিজস্ব হ্যাঙ্গার।

বিমানবাহিনী, নৌবাহিনী, সেনাবাহিনী ছাড়াও দেশী বেসরকারি এয়ারলাইনসগুলো বিমানের মাধ্যমে প্রকৌশল সেবা নিয়ে থাকে। এখন দীর্ঘমেয়াদি, জটিল উচ্চ কারিগরি মেরামতেও পারদর্শী বিমানের কর্মীরা।

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস সর্বদা দেশের প্রয়োজনে যাত্রী কার্গো পরিবহন সেবা দিয়ে যাচ্ছে। সাশ্রয়ী খরচে টিকা সুরক্ষাসামগ্রী পরিবহনসহ মহামারী অন্যান্য কারণে দেশে-বিদেশে আটকে পড়া বাংলাদেশী নাগরিকদের কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছে দিতে বিভিন্ন জরুরি সেবামূলক ফ্লাইটও পরিচালনা করে তারা।  

গত বছরের মার্চে দেশে নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শুরু হওয়ার পর সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়ে এভিয়েশন খাত। লকডাউনে টানা দুই মাসের বেশি বন্ধ থাকে সব ধরনের অভ্যন্তরীণ আন্তর্জাতিক ফ্লাইট। জুনে আকাশপথ উন্মুক্ত হলেও ফ্লাইট চলেছে সীমিত পরিসরে। সে সময় টিকে থাকতে বিমান চালু করে চার্টার্ড কার্গো ফ্লাইট। দেশে আটকেপড়া প্রবাসী বিদেশী নাগরিকদের জন্য বিভিন্ন দেশে চার্টার্ড ফ্লাইট পরিচালনা করে বড় অংকের অর্থ আয় করেছে বিমান। কার্গো পরিবহনে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৫ শতাংশ। সেই সঙ্গে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন কিছুটা কমিয়ে যথাসময়ে সরকারের দেয়া ঋণ পেয়ে টিকে যায় বিমান।

প্রসঙ্গে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবু সালেহ মোস্তফা কামাল জানান, মূলত চার্টার্ড ফ্লাইট এবং কার্গো ফ্লাইট পরিচালনার মাধ্যমে বিমান করোনার সময় টিকে থাকতে সমর্থ হয়। তিনি জানান, গত অর্থবছরে রাজস্ব আয় করেছে হাজার ৭১০ কোটি টাকা। সেই সময় বিমান ব্যয় করে হাজার ৫৬৯ কোটি টাকা।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন

×