রবিবার | নভেম্বর ২৮, ২০২১ | ১৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৮

সম্পাদকীয়

খাওয়ার পানি

সবার জন্য সুপেয় পানি নিশ্চিতে ফলপ্রসূ কৌশল নেয়া হোক

১৯৯৬ সালে জাতিসংঘ পানির প্রতি মানুষের অধিকারকে মানবাধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। পাশাপাশি খাবার পানি, জীবন ধারণের জন্য প্রয়োজনীয় শস্য উৎপাদনে পানি পাওয়া মানুষের মানবাধিকার বলে ঘোষণা করে। অথচ দেশের শহর গ্রামের দরিদ্র নিম্নবিত্ত মানুষ সুপেয় পানিপ্রাপ্তিতে বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। গতকাল একটি ওয়েবিনারে পানিসম্পদের সঠিক ব্যবস্থাপনা চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার পাশাপাশি টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিতে জলবায়ুতাড়িত প্রান্তিক নগরে বাসরত দরিদ্র জনগোষ্ঠীর পানির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে ২০৩০ সালের মধ্যে পানির প্রাপ্যতা, প্রবেশগম্যতা, গুণগত মান পানি পাওয়ার আর্থিক সক্ষমতা অর্জন করা জরুরি। অবস্থায় দেশের মানুষের নিরাপদ পানি নিশ্চিত করতে সরকারকে প্রয়োজনীয় কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। সে লক্ষ্যে বিশেষজ্ঞদের নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে টেকসই পানি ব্যবস্থাপনায় কার্যকর কৌশল নেয়া জরুরি।

বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে বিশ্বে জলবায়ুর পরিবর্তন হচ্ছে, যার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের ওপর। এরই মধ্যে সাতক্ষীরায় বিশুদ্ধ খাবার পানির দুষ্প্রাপ্যতা তৈরি হয়েছে। পানিতে লবণাক্ততার মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় খাবার পানির সংকটে ভুগছে এখানের বাসিন্দারা। গ্রামের সবচেয়ে দরিদ্র লোকটাকেও টাকা দিয়ে লিটার দরে পানি কিনে খেতে হচ্ছে। বরেন্দ্র অঞ্চলে পানির স্তর বিপদজনকভাবে নেমে যাচ্ছে। দেশের প্রায় ৪৪ শতাংশ মানুষ নিরাপদ সুপেয় পানির আওতার বাইরে। এদিকে দক্ষিণাঞ্চলের জেলাগুলোয় লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাচ্ছে। আবার দেশের অনেক এলাকার ভূগর্ভস্থ পানিতে আর্সেনিকের মাত্রা বেশি থাকা বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হচ্ছে। সুপেয় পানির সংকট বাড়ছে উপকূলীয় পাহাড়ি অঞ্চলগুলোয়ও। ঢাকাসহ অন্য বড় শহরগুলোয়ও পানি নিয়ে সমস্যা বিদ্যমান। ক্রমেই ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাচ্ছে। অবস্থায় এলাকাভিত্তিক পানি সমস্যার সমাধানে উদ্যোগ নিতে হবে। গুরুত্বারোপ করতে হবে বিতরণের ওপরও। পানির দাম পরিশোধে বিদ্যমান বৈষম্যও দূর করা আবশ্যক।

সুপেয় পানির সংকট সমাধানে শ্রীলংকার সরকার বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে মিলে কয়েকটি উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। যেমন রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং ফোরাম গঠন। এর অধীনে বৃষ্টির পানি ধরে রেখে তা পান করা গৃহস্থালির অন্যান্য প্রয়োজনে ব্যবহারের পাশাপাশি চাষাবাদের কাজে ব্যবহারের বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। বাড়িতে বাড়িতে যেমন ট্যাংক তৈরি করা হয়েছে বৃষ্টির পানি ধারণের জন্য, তেমনি স্থাপন করা হয়েছে কমিউনিটি রেইনওয়াটার হারভেস্টিং ট্যাংক। পাশাপাশি পানি সংরক্ষণ অপচয় রোধে সরকার সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে বিভিন্ন সচেতনতামূলক কর্মসূচিও পালন করা হয়। এদিকে ভারতের রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে শহরের ৫০০ বর্গমিটারের বেশি এলাকাজুড়ে সব জনস্থাপনার জন্য বৃষ্টির পানি সংগ্রহ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। পাশাপাশি এক হাজার বর্গমিটারের বেশি আয়তনের প্লটে নির্মিত সব ভবনের জন্যও বাধ্যতামূলক বৃষ্টির পানি সংগ্রহ করা। চেন্নাই, বেঙ্গালুরু দিল্লির মতো শহরগুলোয় রাজ্যনীতির অংশ হিসেবেই বৃষ্টির পানি ধরা হয়। এদিকে পানির লবণাক্ততা দূরীকরণের জন্য রিভার্স অসমোসিস স্বীকৃত একটি পদ্ধতি। ইংল্যান্ড প্রক্রিয়া ব্যবহার করে পানি ব্যবহারের উপযোগী করে তুলছে। ইসরাইলের তেল আবিবে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে সমুদ্রের পানি পরিশোধনপূর্বক শহরে সরবরাহ করা হচ্ছে। দক্ষিণাঞ্চলে লবণাক্ততা সমস্যা সমাধানে এটা অনুসরণ করা যেতে পারে। অবশ্য দেশের ওই অঞ্চলে আন্তর্জাতিক সংস্থার সহায়তায় কয়েকটি প্রকল্প গড়ে তোলা হয়েছে। রয়েছে বৃষ্টির পানি ধারণ সংরক্ষণ করাবিষয়ক বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কার্যক্রম। তবে ধরনের উদ্যোগের পরিধি বাড়ানো জরুরি।

প্রাকৃতিক জলাধারের ওপর অত্যাচার তথা দখল, ভরাট গতিপথ পরিবর্তন অব্যাহত থাকলে পানিচক্রের ভারসাম্য ন্যায্যতা নষ্ট হয়। পানিপ্রবাহ বন্ধ হয়ে যায়। তাই নিরাপদ পানির উৎস হিসেবে জলাধার রক্ষার পাশাপাশি পরিত্যক্ত পুকুর খনন বা পুনঃখনন করতে হবে। পুকুরভিত্তিক পানি শোধনাগার নির্মাণ করতে হবে। প্রতি বছর পানিসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে দূষিত পানি পানের কারণে লাখ লাখ মানুষ মারা যায়। উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততার পাশাপাশি পানিতে আর্সেনিক একটি বড় সমস্যা। আবার শহরে পাইপলাইনের মাধ্যমে যে পানি সরবরাহ করা হয়, সেখানে ৮০ শতাংশই -কোলাই ব্যাকটেরিয়া যুক্ত। পুকুরের পানিতেও ব্যাকটেরিয়ার অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। কিছু অঞ্চলের টিউবওয়েলের পানিতে ক্ষতিকর অণুজীবের অস্তিত্ব মিলেছে। অথচ রাষ্ট্রের সুনির্দিষ্ট আইন, আদালতের রায় সরকারের নির্দেশনার পরও শিল্প-কারখানায় বর্জ্য পরিশোধন প্লান্ট বসানো হচ্ছে না। ফলে নদী-জলাধার দূষিত হয়েই চলছে। তাছাড়া ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের নদী জলাধারগুলো ব্যাপক দখল দূষণের শিকার। আমাদের দেশে নদী ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের সমস্যা বিদ্যমান। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের স্বচ্ছতা জবাবদিহিতার অভাবে নদী দখল নদীদূষণ বাড়ছে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে সুপেয় পানিপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে।

দেশের সেচ ব্যবস্থা অনেকাংশে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীল। আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতিতে অতিরিক্ত পানি খরচ করা হয়। আবার নগর-মহানগরগুলোয়ও ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভর করেই সরবরাহ বাড়ানো হচ্ছে। তথ্য বলছে, ঢাকা ওয়াসার উত্তোলিত পানির মধ্যে প্রায় ২৫ শতাংশ অপচয় হয়। আবার শহরের অভিজাত এলাকায় অপচয়ের হার বেশি। কুয়েত, জর্ডান ব্যবহূত পানি বা বর্জ্য পানি চাষাবাদসহ বিভিন্ন উৎপাদনমুখী কাজে ব্যবহার করে। এতে পানির অপচয় রোধ হয়। তাছাড়া বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনায় ল্যাবরেটরিতে ওই পানি কৃষিকাজের জন্য নিরাপদ কিনা তা পরীক্ষা করা হয়েছে। আমাদেরও পানি সংকট দূরীকরণ উন্নত পরিবেশ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ব্যবহূত পানি ব্যবহারের বিষয়টি বিবেচনায় নেয়া যেতে পারে।

পানি ব্যবস্থাপনায় সাশ্রয়ী মূল্য নির্ধারণের বিকল্প নেই। বিশেষ করে দেশের প্রান্তিক দরিদ্র মানুষ সুপেয় পানিপ্রাপ্তিতে বৈষম্যের শিকার। বাংলাদেশ পানি আইন অন্যান্য সংশ্লিষ্ট আইন বা নীতিমালায় পানি সংরক্ষণ বিষয়ে অনেক ধারা-উপধারা রয়েছে। এগুলোর সুষ্ঠু প্রয়োগ প্রয়োজন। দেশে প্রকৃতিবান্ধব পানি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সবার জন্য পানি প্রাপ্যতা নিশ্চিত হতে পারে। একই সঙ্গে নদী ব্যবস্থাপনা-সংক্রান্ত কর্মকৌশলের সুষ্ঠু বাস্তবায়ন জরুরি। পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনায় ন্যায়সংগত সুশাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে সুপেয় পানিপ্রাপ্তি পরিবেশগত স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। আমলে নিতে হবে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রভাবগুলোর কথা। সর্বোপরি নিরাপদ খাবার পানি বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা বাড়াতে হবে।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন

×