রবিবার | ডিসেম্বর ০৫, ২০২১ | ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৮

শেষ পাতা

স্বাস্থ্য খাতে অর্থায়ন অনেক বাড়াতে হবে

দীর্ঘ সময় বিভিন্ন সংক্রামক রোগ টিকা নিয়ে গবেষণা করেছেন . ফেরদৌসী কাদরী বিভিন্ন রোগের টিকার উন্নয়নে ভূমিকার জন্য চলতি বছর এশিয়ার নোবেল হিসেবে পরিচিত ম্যাগসাইসাই পুরস্কার পেয়েছেন তিনি। কলেরা ডায়রিয়া নিয়ে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশের (আইসিডিডিআর,বি) জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানীর গবেষণায় বহু প্রাণ রক্ষা পেয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) টিকাবিষয়ক বৈজ্ঞানিক উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য ছিলেন তিনি। বাংলাদেশে বিজ্ঞান গবেষণা, রোগ নিয়ন্ত্রণ টিকা নিয়ে সম্প্রতি বণিক বার্তার সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মুহাম্মাদ শফিউল্লাহ

ম্যাগসাইসাই পুরস্কার পাওয়ায় আপনাকে অভিনন্দন। বিজ্ঞান নিয়ে দীর্ঘ পথচলার শুরুটা জানতে চাই।

পুরস্কার পাওয়ার পর আমার জন্য একটু কঠিনই হয়ে গেছে। কারণ আমাকে চিন্তা করতে হচ্ছে, আমি কীভাবে শুরু করলাম। কোথা থেকে শুরু করলাম। অনেক কিছু চিন্তা করি। অনুপ্রেরণা সব সময় বাংলাদেশ। এদেশেই আমার জন্ম। আমি ভাবতাম, সব সময় দেশের জন্যই কিছু করব। আমি প্রাণী নিয়ে কাজ করতে খুব পছন্দ করি। জীবনের সঙ্গে জড়িত কাজগুলো ভালো লাগত। কৃষিক্ষেত্রে যেগুলো হতো, স্বাস্থ্যক্ষেত্রে যেগুলো হতো ছোটবেলা থেকেই সেগুলো পড়াশোনা করতাম। স্বাস্থ্যের যেসব বিভাগ আছে, সেগুলো নিয়ে চিন্তা করতাম। ভাবতাম আমার কিছু একটা করা উচিত। হওয়া উচিত এমন নয়। কারণ অ্যাওয়ার্ডের জন্য কখনো কাজ করিনি। মনে করতাম যেটা করব তা যেন কাজে লাগে।

বাংলাদেশে রোগ প্রতিরোধের দিক থেকে নীতিগত বা অবকাঠামোগত কোনো দুর্বলতা আছে কিনা? আপনি কি দেখছেন?

এক কথায় বলতে পারব না, এটা সত্য। বাংলাদেশ একটি উন্নয়নশীল দেশ, এখানে জনসংখ্যা অনেক। আমাদের দেশে তরুণ জনসংখ্যা অনেক বেশি। এখন মোট প্রজনন হার কমে গিয়েছে। আগে যেটা দশমিক ছিল সেটা এখন দশমিক শূন্য শতাংশে দাঁড়িয়েছে। ওই পর্যায় থেকে বর্তমান অবস্থায় আসতে অনেক কষ্ট করতে হয়েছে। এখন আমরা যে পর্যায়ে এসেছি তাতে স্বাস্থ্যক্ষেত্রে খরচ অনেক। স্বাস্থ্য অন্যান্য মন্ত্রণালয় থেকে ভিন্ন। এখানে অনেক অবকাঠামোগত ব্যবস্থা থাকতে হয়। স্বাস্থ্যের জন্য হাসপাতাল, রোগ নিরীক্ষণের জন্য কেন্দ্র, জরুরি প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ এবং শিক্ষাও উন্নত মানের হতে হয়। স্বাস্থ্যের জন্য কারিগরি শিক্ষাটাও জরুরি। সবকিছু মিলিয়ে আমাদের দেশে চেষ্টা অনেক চলছে। আমাদের অনেক ত্রুটি আছে এটা মনে করি না। তবে আমরা আরো উন্নতি করতে পারব। বাংলাদেশে শিশুদের টিকা নেয়ার হার ৯০ শতাংশের বেশি, প্রত্যেক টিকার ক্ষেত্রেই। অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের তুলনা বাংলাদেশ আগে টিকা পায়। প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে তুলনা করলে আমরা বেশ এগিয়ে রয়েছি। ১৩টি রোগের জন্য ১১টি টিকা আমাদের ব্যবস্থাপনার মধ্যে রয়েছে। আমরা আরো বাড়াচ্ছি।

গ্রামে রোগাক্রান্ত হয়ে মৃত্যুহার বেশি। প্রাকৃতিক পরিবেশে যেগুলো হওয়ার কথা নয়, সেসব রোগের আধিক্য দেখা যাচ্ছে। এর কী কারণ থাকতে পারে?

এখন আমরা কৃত্রিম উপায়ে অনেক কিছু করছি। অনেক নতুন বিষয় গ্রহণ করছি, অনেক ধরনের সার ব্যবহার করছি। যেমন অ্যাজমা বা আর্সেনিকের দূষণ কিন্তু বেশি রয়েছে। সবকিছু মিলিয়ে রোগের হার বেড়েই যাচ্ছে। শহরে তো আছেই। আমি বলব না, শহরে কম রয়েছে। পরিসংখ্যানে হয়তো দেখা গেছে, আগের তুলনায় গ্রামে রোগ বেশি হয়। গ্রামে মানুষের অভ্যাস বদলে গিয়েছে। খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন হয়েছে। গ্রামের মানুষও দোকানের খাবারের প্রতি বেশি ঝুঁকেছে। আগে যে পরিমাণে হাঁটাচলা হতো তা এখন হচ্ছে না। গ্রামে নগরায়ণের ছোঁয়া লেগেছে, পরিবর্তন হয়েছে। আগে ডায়াবেটিস, হাইপারটেনশন, অ্যাজমা জাতীয় রোগ অনেক কম ছিল। এখন অনেক বেড়েছে।

দেশে অসংক্রামক রোগের প্রকোপ কেন বাড়ছে এবং এর থেকে উত্তরণের উপায় কী?

প্রথমত আমাদের মৃত্যুহার কমেছে। জনসংখ্যা বেড়েছে। টিকার কারণে শিশুমৃত্যু কমেছে। তবে জন্মগত রোগের ওপর আমাদের যে ধরন পরিসরের গবেষণা করা উচিত, সেটি নেই। আমাদের জীবনযাপনের পদ্ধতি পরিবর্তন হয়েছে। গ্রামেও আমরা শিল্পায়নের সঙ্গে জড়িত হয়েছি। আমাদের হাঁটাচলা কমেছে। খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন হয়েছে। সবকিছু মিলিয়ে অসংক্রামক রোগ বাড়ায় সহায়ক হচ্ছে। ডায়াবেটিস, হাইপারটেনশন হচ্ছে সবচেয়ে বেশি। অন্যান্য রোগও বেড়েছে।

বাংলাদেশে সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে সফলতা থাকলেও কিছু দুর্বলতা রয়েছে। দুর্বলতাগুলো কী?

বাংলাদেশের জনসংখ্যা অনেক বেশি, রোগও অনেক বেশি। যেগুলো সম্ভব সেগুলো টিকা দিয়ে নির্মূল করতে পারি। কিন্তু সব রোগ নির্মূল করা যায় না। সরকার চেষ্টা করছে না এমন তো নয়। তবে আমার মনে হয়, স্বাস্থ্য খাতে অর্থায়ন অনেক বাড়াতে হবে। স্বাস্থ্যই সব, স্বাস্থ্যই সম্বল। স্বাস্থ্য ঠিক না থাকলে বাকি কোনো কাজ সঠিকভাবে করতে পারব না। গবেষণা বাড়াতে হবে। অবকাঠামো বাড়াতে হবে। রোগ নির্ণয়ের সুবিধা বাড়াতে হবে। সেটা ক্লিনিক্যাল হতে পারে, মাইক্রোবায়োলজিক্যাল হতে পারে। এটা আগামীতে আরো বাড়তে পারে। কারণ এখনো দেখছি অনেক উন্নতমানের যন্ত্রপাতি প্রযুক্তি ব্যবহার শুরু হয়েছে। এর বিকল্প নেই। একই সঙ্গে আরো উন্নতমানের চিকিৎসা বাংলাদেশে আনতে হবে।

কলেরার টিকা ডায়রিয়া নিয়ে গবেষণায় আপনার সফলতা সম্পর্কে বলুন।

ডায়রিয়া কলেরার কথা বললেই আইসিডিডিআর,বি। সহজ কথায় একে বলে কলেরা হাসপাতাল। আইসিডিডিআর,বি বললে মানুষ যতটুকু চেনে, কলেরা হাসপাতাল বললে তার চেয়ে বেশি চেনে। স্যালাইন, ওরাল স্যালাইন, রাইস ওয়্যারেস, আইভি ফ্লুইডসহ এখানে যেসব কিছুরই গবেষণা হয়েছে, সরকার তার সবকিছু দ্রুত বাস্তবায়ন শুরু করেছে। গবেষণার ফলে আমরা জানি, কোন রোগের রকম চিকিৎসা দিতে হয়। বাংলাদেশে প্রয়োগকৃত টিকার অনেকগুলোতেই আইসিডিডিআর,বির গবেষণা রয়েছে। যেমনঅনেক গবেষণার ফলে পাওয়া গেছে, মায়েদের টিকা দিলে বাচ্চাদের জন্মগত টিটেনাস হবে না। সরকারের সঙ্গে আইসিডিডিআর,বির গবেষণা না হলে আমরা এগুলো জানতে পারতাম না। কলেরার টিকা বাংলাদেশে আনার পেছনে অনেক চেষ্টা করেছি। আমি আইসিডিডিআর,বির হয়ে কাজ করি। বাংলাদেশে জাতীয় পর্যায়ে কলেরার বিষয়ে একটি পরিকল্পনা করা হয়েছে। আমরা ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে কলেরা নিয়ন্ত্রণ করব। কলেরা নির্মূল হবে না কারণ পানিতে থাকবে। তবে আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারব। বাংলাদেশ সরকারের একটি পরিকল্পনা ডব্লিউএইচও গ্রহণ করেছে। সে পরিকল্পনা অনুযায়ী আমরা যদি কাজ করি তাহলে শুধু কলেরার টিকা নয়, হাত ধোয়া, পরিষ্কার পানি পাওয়া, পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা উন্নত করা, হাইজিন সম্পর্কে জানা এসব অন্তর্ভুক্ত। তাহলে দুটি বহুমুখী পরিকল্পনায় ইনশা আল্লাহ আমরা কলেরা আরো কমিয়ে আনতে পারব। তবে কলেরার কারণে এখন মানুষ খুব কম মারা যায়। বেশির ভাগ অসুস্থ হয়। একজন কলেরা রোগী যদি হাসপাতালে আসে, তাহলে তার বাড়িতে আরো তিনজনের কলেরার আশঙ্কা থাকে। সেজন্যই কলেরা আমাদের কমাতে হবে।

অধিকাংশ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মৌলিক পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা নেই। ব্যবহূত পানিও শতভাগ বিশুদ্ধ নয়। বিষয়ে আপনি কী বলবেন?

পানি, পয়ঃনিষ্কাশন, হাইজিন ইত্যাদির অবকাঠামো বাংলাদেশে আনার জন্য আমাদের অনেক পরিশ্রম করতে হয়েছে। এটা সহজ নয়। পরিষ্কার পানি, স্যানিটেশন, টয়লেট, হাইজিন বা সচেতনতার বিষয়টি স্কুল-কলেজ সব জায়গায় বলতে হবে। বাড়ি বাড়ি গিয়ে বলতে হবে। সচেতনতা না বাড়ালে যতই নিরাপদ পানি রাখা হোক না কেন, মানুষ খাবে না। যতই হাত ধোয়ার ব্যবস্থা রাখি না কেন মানুষ হাত ধোবে না। শিক্ষা প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শুরু করে আমাদের বাড়িতে বাড়িতে দিতে হবে। টেলিভিশনে, রেডিওতে বলতে হবে। এখন হাত ধোয়ার গুরুত্ব শুধু কলেরা বা টাইফয়েড নয়, কভিড-১৯-এর জন্যও। হাত ধোয়াটা হলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আমাদের অবকাঠামো থাকতে হবে। কোথায় আমি পানি পাব? এটার জন্য ইউনিসেফ অনেক কাজ করছে, বিশ্বব্যাংক সরকারের সঙ্গে অনেক কাজ করছে। আমি আশা রাখি আরো সাত-আট বা দশ বছরের মধ্যে অনেক উন্নতি হবে।

টিকা উৎপাদনে বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে। এর কারণ উত্তরণের উপায় কী?

টিকার জন্য গবেষণা কিছুটা হয়। তবে একটি টিকা উৎপাদন করে বিশ্ববাজারে বিক্রি করতে ডব্লিউএইচওর শর্ত পূরণ করতে হয়। এতে আমাদের ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের জাতীয় নিয়ন্ত্রণ পরীক্ষাগার বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমোদিত হতে হয়। এটা খুব কঠিন একটা বিষয়। এখন বাংলাদেশ অনেক দূরে এগিয়ে এসেছে। সবকিছু শেষ হলে টিকা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান কিন্তু উৎপাদনে যেতে উৎসাহ পাবে। এটা অনেক ব্যয়বহুল বিষয়। টিকা তৈরি ওষুধ তৈরির বিষয়ে অনেক পার্থক্য রয়েছে। গবেষণা করা, খরচ চালানো, উৎপাদন করা এবং দেশে বিশ্ববাজারে বিক্রি করা খুবই কঠিন। গ্যাভি তো কোনো টিকা নেবে না, যদি তা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমোদিত না হয়। বাংলাদেশের টিকা যদি গ্যাভিতে না যায়, তাহলে সব দেশ পাবে না। উন্নত দেশ যদি কিনতেও চায় তারা ডব্লিউএইচওর শর্ত মেনে উৎপাদিত টিকা চাইবে। সরকার, স্বাস্থ্য পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং ঔষধ প্রশাসনের চেষ্টায় বিষয়টি অনেক এগিয়েছে।

পূর্ণাঙ্গ টিকা পরীক্ষাগার নিয়ে সরকার বা সংশ্লিষ্টদের প্রতি আপনার কোনো পরামর্শ রয়েছে?

আমরা ঔষধ প্রশাসনের সঙ্গে কাছাকাছি থেকেই কাজ করি। আমি জানি তাদের চেষ্টা অনেক বেশি। তারা খুব দ্রুত উত্তরণের চেষ্টা করছে। তারা বিভিন্ন পরীক্ষাগারের সহায়তা নিচ্ছে। আইসিডিডিআর,বির ল্যাবের সহায়তাও নিচ্ছে। আমাদের সঙ্গে তাদের সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়েছে। আমরা তাদের সহযোগিতা করছি। সবকিছু গড়ে তোলা কঠিন বিষয়। যেসব দুর্বলতা তাদের রয়েছে, তাতে আমরা সহযোগিতা করছি।

বিশ্বে সবার জন্য করোনার টিকা নিশ্চিত করতে যে সমস্যাগুলো রয়েছে তার থেকে উত্তরণের উপায় কী?

আমরা বাংলাদেশ থেকে অনেক চেষ্টা করছি। আমাদের প্রধানমন্ত্রী সম্প্রতি জাতিসংঘের অধিবেশনে বিষয়ে বক্তব্য রেখেছেন। টিকার সমবণ্টন হচ্ছে না। কোভ্যাক্স ফ্যাসিলিটি তৈরি হয়েছিল করোনা মহামারীর শুরুতে। এতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ অনেক জোট প্রতিষ্ঠান অর্থায়ন করেছিল যেন, করোনার টিকা তৈরির পরপর সেটা কোভ্যাক্স ফ্যাসিলিটির আওতায় আসে এবং তারা সব জায়গায় টিকা বণ্টন করবে। কিন্তু টিকা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো উন্নত দেশের হওয়ায় টিকার বণ্টন সঠিক হচ্ছে না। কোভ্যাক্স ফ্যাসিলিটির মাধ্যমে যে টিকা আমাদের মতো দেশে আসার কথা ছিল তেমন আসেনি। নিম্ন আয়ের দেশে যে পরিমাণে টিকা পাওয়ার কথা ছিল তা কিন্তু পায়নি। নানা কারণে এমনটি হচ্ছে। আমরাও চেষ্টা করছি। আমরা টিকা কিনছি, কোভ্যাক্সের মাধ্যমে পাচ্ছি এবং কিছু দেশ উপহারও দিচ্ছে। এটার হার বাড়াতে হবে। টিকা দেয়ার হার বাড়াতে হলে নিজেদের টিকা উৎপাদন করতে হবে।

বিজ্ঞান গবেষণার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা দূর করতে সহায়ক কোনো নীতি করা যেতে পারে কি?

বিজ্ঞান গবেষণার জন্য বিজ্ঞান প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় রয়েছে। স্বাস্থ্য পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় রয়েছে। সব জায়গায় কিন্তু গবেষণার জন্য টাকা দেয়া হয়। কিন্তু পরিমাণ কম। যদি গবেষণার জন্য কম পরিমাণে টাকা দেয়া হয়, তাহলে সেটা গবেষণার জন্য কাজে লাগে না। গবেষণার মেয়াদ এত কম থাকে যে গবেষণার অর্থায়ন জোগাড় করতে করতে সময় শেষ হয়ে যায়। কম পরিমাণের অর্থ দিয়ে গবেষণা হয় না। তার জন্য আমাদেরকে বিদেশের অর্থায়নও আনতে হবে। গবেষণায় অর্থায়নে সরকারের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। সেক্ষেত্রে বিদেশী দাতাদের কাছ থেকে গবেষণার অর্থ আনতে হবে। যেমনআইসিডিডিআর,বিতে আমরা যারা গবেষক রয়েছি তারা সব সময় বিদেশের অর্থায়ন এনে কাজ করছি। আমাদের নিয়মই এমন। বাইরের অর্থায়ন আনতে হবে, না হলে আইসিডিডিআর,বি আমাদের কতটুকু অর্থায়ন করতে পারবে। গবেষণার টাকা আনার জন্য আমি সব সময় চেষ্টা করি। এতে আমাদের কাজ ভালো হয়। আমি যদি উন্নতমানের কাজ না করি, তাহলে আমাকে কেউ অর্থায়ন করবে না। তারা কাজের ইতিহাস দেখবে। রকম আমাদের সব ইনস্টিটিউটে অর্থায়নের খুব প্রয়োজন।

দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ে তরুণ গবেষকদের তেমন দেখা যাচ্ছে না। এর কারণ কী?

আমি বিষয়টির সঙ্গে একমত নই। প্রথমত, একটি বিষয় রয়েছে দেশের বাইরে চলে যাওয়ার প্রবণতা। আমি আইসিডিডিআর,বির অনেকের সঙ্গে কাজ করছি। বিভিন্ন সরকারি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে কাজ করছি। আমাদেরকে তাদের জন্য উৎসাহ দিতে হবে। আমাদের অনেক দায়িত্ব রয়েছে, তাদেরকে দেশে থাকার জন্য, উন্নতমানের পিএইচডি দেশে করা যাবে এমন উৎসাহ তাদের দিতে হবে। ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠানে অনেকে পিএইচডি করছে। তাদের উন্নতমানের গবেষণায় যুক্ত করতে হবে। অন্যান্য দেশের সঙ্গে যুক্ত হয়ে গবেষণা করতে হবে। একটা ছেলে বা মেয়ে যখন উন্নত গবেষণার মাধ্যমে দেশে পিএইচডি করতে পারে, তখন সে আর বিদেশে যায় না। এমন যদি হয়, স্যান্ডউইচ প্রোগ্রামের (যৌথ ডিগ্রি) মাধ্যমে কেউ দেশের বাইরে চার মাস থাকবে; বাকি সময় দেশে কাজ করবে; তাতে উন্নত কাজের সুযোগ হয়। আর এসব করলে কাজ সাফল্যমণ্ডিত হয়। আমার ল্যাবে যারা আছে, তারা কিন্তু স্যান্ডউইচ প্রোগ্রামের মাধ্যমে কাজের জন্য উপযুক্ত হয়েছেন। তারা গোথেনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে, হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের সঙ্গে, স্যাঙ্গার ইনস্টিটিউটের সঙ্গে পিএইচডি করছে। তারা উন্নতমানের বিষয়ে গবেষণা করছে। তাতে বাংলাদেশে ল্যাবগুলো অনেক ভালো হচ্ছে। এর মাধ্যমে তারা বাইরে চলে যায়, দেশে কাজ করে, বিশ্ববিদ্যালয়েও কাজ করে। তাদের শুধু বললে হবে না যে, দেশে থেকে যাও। তাদের সুযোগ দিতে হবে, উৎসাহ দিতে হবে। আমি করোনা মহামারীতে তরুণ গবেষকদের মধ্যে কাজের অনেক আগ্রহ দেখেছি। যেমনঅনেক সরকারি ইনস্টিটিউট বিশ্ববিদ্যালয়ে করোনার জিনোম সিকোয়েন্সিং হচ্ছে।

নারীদের বিজ্ঞান গবেষণার জন্য পুরোপুরি উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে আপনার কোনো পরামর্শ আছে কিনা?

আমার কাছে মনে হয় পরিবেশটা আমরা নিজেরাই তৈরি করি। আমি আমার পরিবেশ তৈরি করেছি। আমাদের এখানে নারীদের কাজ করার পেছনে একটা শক্তিশালী সমর্থন পাওয়া যায়। নারীদের কাজের ক্ষেত্রে সমর্থন দিতে হবে। তবে নারীদের নিজেই শক্তভাবে আসতে হবে। চেষ্টা থাকতে হবে। কারণ কেউ কখনো কাউকে হাতে তুলে দেবে না। আমাদের সঙ্গে যেসব মেয়ে কাজ করতে আসে; তাদেরকে বলি, তোমার ওপরেই পুরোটা। তোমার হাতেই সবকিছু। তুমি কী করতে চাও। শুধু গবেষণা নয়, যেকোনো ক্ষেত্রে নারীদের যদি নামতে হয়, ঘরের বাইরে আসতে হয়, সেক্ষেত্রে তার নিজের অনেক দায়িত্ব রয়েছে। সে কত দৃঢ়ভাবে করতে পারবে এটা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। এটা উন্নত দেশে নয়, কারণ সেখানে সবকিছু পেয়ে যায়। এদেশে বহুমুখী দক্ষতার অধিকারী হতে হবে। এটা করতেই হবে। এটা নয় যে আমরা বাড়িতে যুদ্ধ করব। আমরা বোঝাব। আমরা বোঝাতে বোঝাতে অনেক দূরে নিয়ে এসেছি। আজকালকের ছেলেরা অনেক সহযোগিতা করে। স্বামীরা অনেক সাহায্য করে। আমাদের সময় কিন্তু এমনটি ছিল না। আমরা মনে হয়, প্রথমে নিজেকে ঠিক করতে হবে।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন