রবিবার | নভেম্বর ২৮, ২০২১ | ১৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৮

সম্পাদকীয়

বৈশ্বিক উষ্ণায়ন

অভিঘাত মোকাবেলায় প্রয়োজন বৈশ্বিক জলবায়ু সমৃদ্ধি পরিকল্পনা

শেখ হাসিনা

আমাদের সময়ের অপ্রিয় সত্য হলো একদিকে আমরা জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলার পদক্ষেপগুলো এখনো অধিক জরুরি অর্জনযোগ্য করতে পারিনি; অন্যদিকে নিজেদের দেশ-প্রাকৃতিক উৎসগুলো নিরাপদ রাখতে যথেষ্ট দ্রুতগতিতে কার্বন নিঃসরণ হারও কমাতে পারছি না।

বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে কয়েক মিলিয়ন মানুষ প্রতি বছর হিমালয়ের হিমবাহে সঞ্চিত মিঠাপানির ওপর নির্ভর করে থাকে। বৈশ্বিক উষ্ণায়ন তপ্ত বাতাস এখন হিমবাহগুলো অস্থিতিশীল করে তুলছে; সেগুলো অব্যাহতভাবে গলছে। এটা একটা চিত্র। আবার তার উল্টো চিত্রে দেখা যাচ্ছে, দক্ষিণাঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি উপকূলীয় অঞ্চলে প্লাবনের হুমকি সৃষ্টি করছে। এর মধ্যে শস্যের ফলন কমে আসাটা আরেকটা ধ্বংসাত্মক পরিবর্তন, যা আমরা জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত হিসেবে অনুমান করতে পারি।

বৈশ্বিক উষ্ণতায় বাংলাদেশের অবদান অনুল্লেখযোগ্য, সামান্য মাত্র। তার পরও আমরা জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সমস্যা সমাধানের একটি পথ সন্ধানে গভীরভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এটা শুধু কারণে নয় যে জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে খারাপ অভিঘাত আমরা বদলাতে চাই; বরং এজন্য যে অর্থনৈতিক সুফলের দিক থেকেও এটি ভীষণ প্রয়োজন। অর্থনীতিজুড়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং আমাদের দেশ-জাতিকে আরো সমৃদ্ধ করার সর্বোত্তম উপায় হলো শূন্য কার্বন প্রবৃদ্ধিতে বিনিয়োগ করা। আমরা এটি করছি।

চলতি বছরের প্রথম দিকে আমাদের সরকার কয়লাভিত্তিক ১০টি বিদ্যুৎকেন্দ্র বাতিল করেছে। তবে সেটি ছিল আপেক্ষিকভাবে বেশ ছোট প্রয়াস। পরবর্তী সময়ে বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলন কপ২৬ মাথায় রেখে আমরা বিশ্বের প্রথম জাতীয় জলবায়ু সমৃদ্ধি পরিকল্পনা প্রণয়ন করেছি। এটি এমন এক রূপকল্প, যার অধীনে জলবায়ু পরিবর্তনের ওপর গৃহীত কর্মযজ্ঞকে ক্যাটালিস্ট হিসেবে ব্যবহার করে আমরা স্থায়িত্বশীলতা, অর্থনীতির প্রসারণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং আমাদের নাগরিকদের জন্য সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে পারব।

আলোচ্য পরিকল্পনা অনুসারে আমরা চলতি দশকের শেষের দিকে মোট জ্বালানি-বিদ্যুতের ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে নিশ্চিত করব। আমরা বিশ্বাস করি, উপকূলজুড়ে তৈরিকৃত বায়ুচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো প্যারাবন পুনরুজ্জীবিত করবে। আর এটি আমাদের বদলে যাওয়া সমুদ্রতট-বেলাভূমিকে স্থিতিশীল এবং উপকূলীয় অঞ্চলকে ঘূর্ণিঝড় জলোচ্ছ্বাস থেকে সুরক্ষিত করতে সাহায্য করবে। একই সঙ্গে জীবাশ্ম-জ্বালানিমুক্ত অবকাঠামো প্রকল্পে অনুকূল সহজ শর্তে অর্থায়ন করতে আমরা ব্যাংকগুলোকে ক্ষমতায়িত করব এবং গ্রিন হাইড্রোজেনের মতো ক্ষেত্রগুলোয় উন্নত দেশগুলোর সঙ্গে কাজ করতে পারস্পরিক সহযোগিতার পথ সন্ধান করব।

টেকসই শূন্য কার্বনভিত্তিক উন্নয়নে বিনিয়োগের মাধ্যমে আমরা গতানুগতিক ব্যবসায়িক প্রক্রিয়ার চেয়ে প্রায় দশমিক মিলিয়ন বেশি লোকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারব। আলোচ্য পরিকল্পনা শুধু জলবায়ু পরিবর্তন নয়, যুগপত্ভাবে অব্যাহত অনুৎপাদনশীল (পড়ুন -অর্থনৈতিক) জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক অবকাঠামো সৃষ্ট দশমিক শতাংশ পর্যন্ত ক্ষয়ক্ষতি প্রতিরোধ করবে। আমরা প্রাক্কলন করেছি যে এতে সার্বিক সুফলসহ আমাদের জিডিপি ৮৫০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হবে। আমি মনে করি ক্লাইমেট ভালনারেবল ফোরামের সদস্যগুলোর নেতৃত্বে সামনের মাস বছরগুলোয় আরো কিছু উন্নয়নশীল দেশ ধরনের পরিকল্পনা গ্রহণে ব্রত হবে।

বাংলাদেশ পরিকল্পনা অন্য দেশগুলোর ওপর নির্ভর না করে বাস্তবায়ন করতে পারে, যদিও আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়ন তহবিল কাজগুলোকে আরো বেগবান করবে। তবে এও ঠিক, আমরা যদি প্যারিস চুক্তির লক্ষ্যমাত্রা অনুসারে বৈশ্বিক উষ্ণতা প্রাক শিল্প যুগের চেয়ে দশমিক ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি যেন না বাড়ে। এটি নিশ্চিতে আমাদের জলবায়ু সমৃদ্ধি পরিকল্পনার একটা বৈশ্বিক সংস্করণ প্রয়োজন হবে। চলতি বছর যুক্তরাজ্যের গ্লাসগোতে অনুষ্ঠিতব্য কপ২৬ জলবায়ু সম্মেলনই আমাদের জন্য এটিকে বাস্তবে রূপ দেয়ার সবচেয়ে সেরা সুযোগ হতে পারে।

তবে বিষয়গুলো যেভাবে এগোচ্ছে তাতে মনে হচ্ছে, ব্যর্থতার সম্ভাবনাই বেশি। তিন দশক আগে অনুষ্ঠিত রিও ধরিত্রী সম্মেলনে জলবায়ু প্রকৃতি সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে বিশ্বনেতারা দৃঢ় অঙ্গীকার করেছিলেন। অথচ পর্যন্ত উন্নত দেশগুলো তাদের সম্মিলিত গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণ কমিয়েছে প্রতিশ্রুতিরও অনেক কম। এটা তো নেতৃত্বের পরিচায়ক নয়।

শুধু তা- নয়, তাত্ক্ষণিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর ক্ষতিপূরণের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিতেও তারা উপর্যুুপরি অস্বীকৃতি জানিয়ে এসেছে। জলবায়ু পরিবর্তনসৃষ্ট ক্ষতি লোকসান মোকাবেলায় সবচেয়ে দরিদ্র দেশগুলোকে সমর্থন দেয়ার একটি চুক্তি হয়েছিল। সেটি বাস্তবায়ন এখনো অনেক দূর। এদিকে ইইউ, যুক্তরাষ্ট্র অন্য দেশগুলো সাম্প্রতিক সময়ে শূন্য কার্বন নিঃসরণের প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছে। এটা নিঃসন্দেহে অভিনন্দনযোগ্য। কিন্তু প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে দেশগুলো যে আমাদের মধ্যে আস্থা জোগাবে এমন নীতি-পদক্ষেপ এখনো দৃশ্যমান নয়। ১২ বছর আগে করা প্রতি বছর ১০০ বিলিয়ন ডলার জোগানোর প্রতিশ্রুতিও এখনো পূরণ করা হয়নি। সেটি অপূরণীয় রয়ে গেছে।

শূন্য কার্বনের এক ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে উন্নয়নশীল দেশগুলোর যা প্রয়োজন হবে তার তুলনায় এই ১০০ বিলিয়ন ডলার যৎসামান্য, বেশ অপ্রতুল। আমাদের সরকারি বেসরকারি উভয় প্রতিষ্ঠানগুলো  জলবায়ু পরিবর্তনের পদক্ষেপগুলোয় বিনিয়োগ করতে চায়, কিন্তু আমরা মূলধনের উচ্চ ব্যয়ের এক ব্যাপক বোঝার মুখোমুখি, এখন কভিড-সংশ্লিষ্ট ঋণ যা আরো বাড়িয়ে দিয়েছে।

যদি উন্নত দেশগুলো সাহায্য করতে চায়, তাহলে তাদের বিষয়টি অবশ্যই আমলে নিতে হবে। মূলধন ব্যয় কমানো গেলে দক্ষিণ গোলার্ধজুড়ে কার্বন নিঃসরণ কার্যক্রম (ডি-কার্বনাইজেশন) লক্ষণীয়ভাবে বেগবান করা  যাবে এবং এতে বিশ্বজুড়ে সুফল নিশ্চিত করা যাবে। এর যুক্তিটি যদি পশ্চিমা নেতারা দেখতে না পান, তাহলে নিজের দেশে ঘটা কিছু সাম্প্রতিক ঘটনা তাদের বোধোদয়ে সাহায্য করবে বৈকি। উত্তর আমেরিকা এবং অস্ট্রেলিয়ায় চরম দাবানল কিংবা জার্মানির ভয়াবহ বন্যাএসব কি জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বেশী দায়ীদের অঞ্চলে বেজে ওঠা সতর্ক ঘণ্টা নয়?

চলতি বছর বাংলাদেশ স্বাধীনতার ৫০ বছরে পদার্পণ করেছে। একটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে আমাদের দেশটি স্বাধীন হয়েছে। আমার বাবা, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আমাদের দেশের মানুষকে স্বাধীনতার জন্য উদ্বুদ্ধ করেছেন এবং আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতৃত্ব দিয়েছেন। তার স্মরণে আমরা আমাদের জলবায়ু সমৃদ্ধি পরিকল্পনাকে মুজিব পরিকল্পনা নাম দিয়েছি। তিনি যে ধরনের শত্রুর মুখোমুখি হয়েছিলেন তা থেকে জলবায়ু পরিবর্তন অনেকটা ভিন্ন ধরনের শত্রু, কিন্তু শত্রুকে মোকাবেলায় আমাদের প্রয়োজন অনিঃশেষ মনোবল, কল্পনা, আশা দৃঢ় নেতৃত্ব। যদি পশ্চিমা নেতারা বিজ্ঞান যা দাবি করে তার ভিত্তিতে কথা শোনেন, আমাদের সঙ্গে সম্পৃক্ত হন এবং স্থির সংকল্পে কাজ করেন তাহলে কপ২৬ সম্মেলনকে সফল করার এখনো সময় আছে এবং এটাই খুব জরুরি।

[ইংরেজি থেকে ভাষান্তর: হুমায়ুন কবির]

 

শেখ হাসিনা: প্রধানমন্ত্রী, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন

×