রবিবার | অক্টোবর ২৪, ২০২১ | ৯ কার্তিক ১৪২৮

সম্পাদকীয়

আন্তর্জাতিক দুর্যোগ প্রশমন দিবস পালিত

ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী ও ঝুঁকি হ্রাসে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে

বাংলাদেশ যেমন অর্থনৈতিক  সামাজিক সূচকে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে এগিয়ে আছে, তেমনিভাবে দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাসেও অগ্রগামী। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দুর্যোগের ধরন প্রকৃতিতে পরিবর্তন এসেছে। আগে বন্যা ঝড়ের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলা করলেই হতো। এখন বজ্র অগ্নিকাণ্ড, অনাবৃষ্টি, অতিবৃষ্টি, ভবনধস, ভূমিকম্পের মতো নতুন নতুন দুর্যোগের বিরুদ্ধে লড়তে হচ্ছে। এমন এক প্রেক্ষাপটে দেশে পালিত হলো আন্তর্জাতিক দুর্যোগ প্রশমন দিবস। দুর্যোগ দুই ধরনের হয়। একটি হলো প্রাকৃতিক, অন্যটি মানবসৃষ্ট দুর্যোগ। প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলা করতে গুরুত্বপূর্ণ কিছু পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে বটে। তবে মানবসৃষ্ট দুর্যোগ বা সামাজিক দুর্যোগ মোকাবেলা করতে বাংলাদেশকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। এবার দিবসটির মূল প্রতিপাদ্য উন্নয়নশীল দেশগুলোর দুর্যোগের ঝুঁকি আর ক্ষয়ক্ষতি কমাতে আন্তর্জাতিক সহাযোগিতা। 

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিষয়ে দক্ষিণ এশিয়া এমনকি আন্তর্জাতিক বিশ্বও বাংলাদেশের দিকে তাকিয়ে থাকে। বাংলাদেশ দুর্যোগ ঝুঁকি মোকাবেলায় আন্তর্জাতিক নীতিমালা তো মানছে; স্থানীয়ভাবেও করণীয় নির্ধারণ বাস্তবায়ন করছে। অর্জনকে ধরে রাখতে হবে। আর ধরে রাখতে হলে সবাই মিলে কাজ করতে হবে। ভবিষ্যতেও যেন আমরা দুর্যোগ মোকাবেলায় নেয়া যেকোনো পদক্ষেপ সবাই মিলে একইভাবে একসঙ্গে বাস্তবায়ন করতে পারে, সেটি নিশ্চিত করতে হবে। দুর্যোগ মোকাবেলা কার্যক্রম একদিনের কোনো বিষয় নয়। আমাদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সারাবছর কাজ চালিয়ে যেতে হবে। যেকোনো দুর্যোগ মোকাবেলায় আমাদের প্রস্তুতি নিতে হবে। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় জলবায়ু পরিবর্তন এর প্রভাব মোকাবেলায় জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণের কথা বলা হয়েছে। অবস্থায় ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙনের পাশাপাশি গুরুত্ব দিতে হবে ভূমিকম্পের বিষয়টিতেও। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ঢাকা-চট্টগ্রাম সিলেটে ভূমিকম্প হলে বিপুলসংখ্যক ভবন অবকাঠামো ভেঙে পড়ার শঙ্কা রয়েছে। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে লাখো মানুষ। তাছাড়া এতগুলো ভবন ভেঙে গেলে সেগুলো থেকে নাগরিকদের উদ্ধার করা এবং ভাঙা অংশ সরানোর মতো সক্ষমতা মুহূর্তে আমাদের নেই। দুর্যোগ প্রস্তুতির অংশ হিসেবে বিষয়টিকে আমলে আনা জরুরি। উন্নয়ন কার্যক্রমে প্রকৃতি পরিবেশের বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেয়া না হলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের ক্ষতির কারণ হওয়ার শঙ্কাও রয়েছে। এর মধ্যে পরিবেশগত আর্থিক ক্ষতি অন্তর্ভুক্ত। উন্নত অনেক দেশের উদাহরণ আমাদের সামনে রয়েছে। যারা পরিবেশ দূষণের বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার না দেয়ার কারণে বর্তমানে বড় ধরনের প্রভাব মোকাবেলা করছে। আমাদের বিদ্যমান উন্নয়ন অগ্রযাত্রায়ও তাই প্রকৃতি পরিবেশের বিষয়গুলো আমলে নেয়া চাই। দুর্যোগ-পরবর্তী বিভিন্ন উদ্ধার পুনর্বাসন কার্যক্রম সম্পাদনের পাশাপাশি দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাসে কার্যকর পদক্ষেপ এবং দক্ষ দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি গড়ে তোলা নীতিনির্ধারকদের মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রাখা জরুরি। দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সঙ্গে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার সমন্বয় করে একে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হবে। এটা আমরা কভিড-১৯ থেকে শিখেছি। এই সমন্বয় সাধন করা গেলে ভবিষ্যতে কভিডের মতো যেকোনো দুর্যোগ মোকাবেলা করা সহজ হবে।

অস্ট্রেলিয়া খরা, ভূমিকম্প সমুদ্রপৃৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির মতো ঝুঁকির মধ্যে থাকা সত্ত্বেও ঝুঁকি সূচকে ভালো অবস্থানে রয়েছে। এর কারণ স্পষ্ট। যথেষ্ট বিনিয়োগের মাধ্যমে দেশটি এরই মধ্যে এসব ঝুঁকি প্রশমনে সফল হয়েছে। জাপানকে প্রতিনিয়ত ভূমিকম্প বন্যার মতো দুর্যোগ মোকাবেলা করতে হলেও উন্নত ব্যবস্থাপনার কারণে দেশটি এখন কম ঝুঁকিপূর্ণ। বাংলাদেশও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় নতুন নতুন পদক্ষেপ নিয়েছে। তবে এর বড় একটি অংশই যে আগাম সতর্কতামূলক, সে কথা স্বীকার করে নেয়া ভালো। দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এমন জনগোষ্ঠীকে সতর্ক করার জন্য মোবাইল ফোনভিত্তিক তিন ধরনের প্রযুক্তিনির্ভর দুর্যোগ সতর্কীকরণ পদ্ধতি সম্প্রতি প্রচলন করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। তবে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করতে বাংলাদেশের একাধিক চ্যালেঞ্জ যে রয়েছে, সে বিষয়টি উঠে আসে কয়েক মাস আগে জাইকার একটি সভায়। এর সুপারিশগুলোর মধ্যে ছিল: নজরদারি আইন প্রয়োগ বৃদ্ধি; বড় দুর্যোগ মোকাবেলার প্রস্তুতি জোরদার করা; জরুরি অবস্থায় সাড়াদান ব্যবস্থা জোরদার করা এবং দক্ষ জনবল তৈরি। এসব দিকেও দৃষ্টি দেয়া প্রয়োজন।

ইতিবাচক বিষয় হলো, দুর্যোগ ঝুঁকি প্রশমন কার্যক্রমে জনগণকে সম্পৃক্ত করে কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ এবং প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রশিক্ষণ কার্যক্রমকে গতিশীল করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। জাতীয় শিক্ষাক্রমের আওতায় তৃতীয় থেকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত পাঠক্রমের বিভিন্ন স্তরে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে দুর্যোগবিজ্ঞান ব্যবস্থাপনা বিভাগ চালু রয়েছে। দুর্যোগে জীবন সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে দুর্যোগ সহনীয় টেকসই নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ত্রাণ মন্ত্রণালয় পরিকল্পিতভাবে কাঠামোগত অকাঠামোগত কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। দুর্যোগ মোকাবেলা ব্যবস্থাপনায় আইনও রয়েছে। এর সুফলও মিলছে। চার দশক আগে ধরনের দুর্যোগে যেখানে লাখ লাখ লোক মারা যেত, সেখানে দুর্যোগ মোকাবেলা সক্ষমতার কারণে এখন প্রাণহানির সংখ্যা অপেক্ষাকৃত কম। দুর্যোগ মোকাবেলায় মানুষের সচেতনতা যেমন বেড়েছে, ঠিক তেমনিভাবে দুর্যোগ মোকাবেলার অবকাঠামোগত উন্নয়ন দুর্যোগ প্রস্তুতির তথ্যও দ্রুত সবার কাছে পৌঁছে যাচ্ছে, যা বাংলাদেশের জন্য একটি বড় সাফল্য। এজন্য ঘূর্ণিঝড় বন্যা মোকাবেলায় অনেক সক্ষমতা অর্জন করায় বিশ্বে বাংলাদেশের সক্ষমতা বেশ প্রশংসিত।

আমাদের মতো ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোয় একটি দুর্যোগের ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার আগেই আরেকটি দুর্যোগ হানা দেয়। ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, জলোচ্ছ্বাস, খরা, ভূমিধসের মতো নানা দুর্যোগের শিকার দক্ষিণ এশিয়া। বৈশ্বিক তাপমাত্রা আর মাত্র দশমিক পয়েন্ট বাড়লে আমাদের অঞ্চলের বিপদ বেড়ে যাবে বহুগুণ। দেশের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আবহাওয়া বিভাগের প্রস্তুতি যথেষ্ট ভালো। তবে একে আরো আধুনিক সময়োপযোগী করে তুলতে হবে। বাংলাদেশের অবস্থান যেহেতু প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ এলাকায় এবং জনগণও রয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের মারাত্মক ঝুঁকিতে, সেহেতু দক্ষতার সঙ্গে দুর্যোগ মোকাবেলার অভিজ্ঞতা আমাদের অর্জন করতেই হবে। মানবসৃষ্ট কাঠামোগত ত্রুটির কারণে সৃষ্ট অগ্নিকাণ্ড, ভবনধসের মতো দুর্ঘটনা কমিয়ে আনতে ব্যবস্থাপনা উন্নত তদারকি জোরদার করা আবশ্যক। দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাসে জীবন সম্পদের সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে দুর্যোগ সহনীয়, টেকসই নিরাপদ দেশ গড়ার লক্ষ্যে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ত্রাণ মন্ত্রণালয়কে পরিকল্পিতভাবে কাঠামোগত অবকাঠামোগত কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে হবে। 

প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলা করার প্রস্তুতি সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিলে অনেক ক্ষতি থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব। এজন্য গণসচেতনতা যেমন দরকার, তেমনি দরকার ঝড়-জলোচ্ছ্বাস বন্যা থেকে রক্ষা পাওয়ার মতো অবকাঠামো নির্মাণ। রাষ্ট্রীয় সুপরিকল্পনার মাধ্যমে জনস্বার্থে প্রয়োজনীয় আশ্রয়কেন্দ্র, আরো বেশি সবুজ বেষ্টনী তৈরি করা যেতে পারে এবং দুর্যোগ মোকাবেলার সক্ষমতা আরো টেকসই দীর্ঘস্থায়ী করার ব্যবস্থা নিতে হবে। নিজেদের স্বার্থেই জলবায়ু মোকাবেলায় আরো অগ্রণী ভূমিকা রাখতে হবে এবং উন্নত বিশ্বের কাছ থেকে তাদের কার্বন নিঃসরণের দায়ে আমাদের ক্ষতিপূরণ তথা জলবায়ু তহবিলের প্রতিশ্রুত অনুদানের অর্থ আদায়ে প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। দুর্যোগের ঝুঁকি হ্রাস সম্পর্কে জানার ক্ষেত্রটা বাড়ানোর সঙ্গে দুর্যোগের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী এবং ঝুঁকি হ্রাসের ক্ষেত্রে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। দুর্যোগের ভয়াবহতা কাটিয়ে উঠতে গেলে পরিবেশ দূষণ রোধ করতে হবে। মানবসৃষ্ট দুর্যোগ মোকাবেলায় দেশীয় যেসব আইন নীতিমালা রয়েছে সেগুলোর বাস্তব প্রয়োগ দরকার।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন