শনিবার | অক্টোবর ২৩, ২০২১ | ৮ কার্তিক ১৪২৮

প্রথম পাতা

কয়লা সরবরাহ কমে যাওয়ায় বিদ্যুৎ সংকটে ভারত

বণিক বার্তা ডেস্ক

এ বছর ব্যাপক বৃষ্টিপাত ভারতে কয়লা উৎপাদনে প্রভাব ফেলেছে ছবি: এপি

চীনের পর ভয়াবহ বিদ্যুৎ সংকটের মুখে বিশ্বের অন্যতম জনবহুল দেশ ভারত। সেই সঙ্গে কয়লার মজুদ নজিরবিহীনভাবে কমে আসায় দেশটির অনেক রাজ্য এখন বিদ্যুিবহীন হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছে। সংকটের মুখে থাকা রাজ্যগুলো সতর্কবার্তা জারি করেছে যে তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে কয়লার সরবরাহ বিপজ্জনকভাবে কমে গেছে। 

ভারতের কেন্দ্রীয় বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুসারে বর্তমানে প্রায় ৮০ শতাংশ কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র সংকটে অথবা মহাসংকটে রয়েছে। এর অর্থ হলো তাদের মজুদ থাকা কয়লা পাঁচদিনেরও কম সময়ে ফুরিয়ে যাবে।

সপ্তাহখানেক আগে দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বরাবর একটি চিঠি দিয়েছেন। এতে তিনি লিখেছেন, যদি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে আরো কয়লা সরবরাহ করা না হয়, তাহলে পুরো রাজধানী নয়াদিল্লি বিদ্যুিবহীন হয়ে পড়তে পারে।

ভয়াবহ বিদ্যুৎ সংকটে রয়েছে রাজস্থান, ঝাড়খণ্ড বিহার রাজ্য। এসব রাজ্যে দিনে ১৪ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকে না। মহারাষ্ট্রে ১৩টি তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ হয়ে গেছে। এজন্য রাজ্যটির জনগণকে বিদ্যুৎ কম ব্যবহার করতে বলা হয়েছে। পাঞ্জাবে তিনটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন স্থগিত করা হয়েছে। এতে রাজ্যটির নাগরিকদের ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুিবহীন অবস্থায় কাটাতে হচ্ছে, যা ক্ষোভ উসকে দিচ্ছে।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদ্যুৎ সংকটের বিষয়টি দেশীয় কয়লা উৎপাদন ঘাটতির কারণে নয়। দুই দশকের বেশি সময় ধরে ভারতের কয়লা উৎপাদন বেড়েই চলেছে। যদিও করোনা মহামারীর কারণে ২০১৯ সালের তুলনায় উৎপাদন সামান্য পরিমাণে মাত্র শতাংশ কম হয়।

জ্বালানি সরবরাহকারী এবং ভারতের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কয়লা উৎপাদক প্রতিষ্ঠান কোল ইন্ডিয়া লিমিটেডকে অনুমিত বাড়তি চাহিদার লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থতার জন্য দুষছেন অনেকে।

সেন্টার ফর রিসার্চ অন এনার্জি অ্যান্ড ক্লিন এয়ারের বিশ্লেষক সুনীল দাহিয়া বলছেন, বর্তমান সংকটের পেছনে কয়লা উৎপাদন সক্ষমতার ঘাটতি নয়, এটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদক প্রতিষ্ঠানের মজুদ নিয়ে যথাযথ দূরদর্শিতা পরিকল্পনার অভাব।

পরিস্থিতির জন্য বৃষ্টিপাতকেও অভিযুক্ত করা হয়। বলা হচ্ছে, বছর ব্যাপক বৃষ্টিপাতও দেশীয় কয়লা উৎপাদনে প্রভাব ফেলেছে। প্রবল বৃষ্টিপাত খনি থেকে কয়লা উৎপাদন ব্যাহত করেছে। প্রতি বছরই উৎপাদনের সঙ্গে প্রয়োজনীয় চাহিদার ঘাটতি পূরণ করা হয় আমদানি করা কয়লা দিয়ে। কিন্তু বছর বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারমূল্য রেকর্ড পরিমাণ বেড়ে গেলে বাড়তি কয়লা আমদানি আর্থিকভাবে চ্যালেঞ্জে পড়ে যায়।

ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের প্রধান অর্থনীতিবিদ বিভূতি গর্গ বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে করোনার লকডাউন শেষে বিদ্যুৎ চাহিদা ব্যাপক বেড়েছে। কারণে বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলোর অবস্থায় অবাক হওয়ার কিছু নেই। অবস্থার জন্য বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারকে দোষারোপ করা হচ্ছে। গর্গ পরিস্থিতিকে ভীতিকর বলছেন। তবে দ্রুতই ঠিক হয়ে যাবে বলে আশাবাদী তিনি।

বিভূতি গর্গ মনে করেন, নির্মাতারা নিরাপদ থাকতে চান, কারণ তারা ভাবছেন বছরের সময়ে কভিডের আরেক ঢেউ আঘাত হানার সম্ভাবনা রয়েছে, যা চাহিদাকে আবার কমিয়ে দিতে পারে। সুতরাং বছরের শেষে এসে যথেষ্ট পরিমাণ কয়লা মজুদ করতে সচেষ্ট হচ্ছেন না। সুতরাং গত কয়েক মাসে কয়লা যখন সহজলভ্য তখন উৎপাদকরা তাদের পক্ষ থেকে যথেষ্ট মজুদ রাখছেন না। এটিই বর্তমানে সংকটজনক পরিস্থিতি তৈরি করছে।

অর্থনীতিবিদ গর্গ বলেন, গত বছরের তুলনায় নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রতিস্থাপন কমে এসেছে। যদি ভারত সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানি যেমন সোলার, বায়ু জল বিদ্যুৎকেন্দ্রে মনোযোগ দেয়, নবায়নযোগ্য জ্বালানি দিয়ে চাহিদার কিছু অংশ মেটানো যায়, তাহলে বিদ্যুৎ খাতে কয়লার সংকটজনিত সমস্যা এড়ানো সম্ভব হবে।

তবে এসব আশঙ্কাকে পাত্তা দিচ্ছে না ভারত সরকার। বিদ্যুৎ সংকটের আশঙ্কা প্রসঙ্গে ভারতের বিদ্যুত্মন্ত্রী আরকে সিং বলেছেন, কয়লা সংকট সম্পর্কে অযথা আতঙ্ক তৈরি করা হচ্ছে। আর কয়লামন্ত্রী প্রহ্লাদ যোশী অবশ্য সংকটের জন্য ভারী বৃষ্টিপাতকে দুষছেন। মন্ত্রী বলেন, এর সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে কয়লার উচ্চমূল্য সরবরাহকে বাধাগ্রস্ত করছে। তিনি আশা করেন, তিন-চারদিনের মধ্যেই সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে।

কয়লার সংকট মোকাবেলায় দেশী কয়লা উৎপাদন বাড়ানোর দিকে নজর দেয়া হয়েছে। কয়েকটি রাজ্য সরকার সংরক্ষিত এলাকার কয়লা খনিতে নতুন করে অনুসন্ধানে দ্রুত অনুমতি দেয়ার জন্য চাপ দিচ্ছে।

এরই মধ্যে ভারত সরকার দেশীয় কয়লা উৎপাদন ২০২৪ সালের মধ্যে এক বিলিয়ন টনে উন্নীত করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। দাহিয়া বলছেন, কিছু স্টেকহোল্ডার পরিস্থিতিকে ব্যবহার করছেন। যাতে কম মজুদের দোহাই দিয়ে আরো কয়লাক্ষেত্র উন্মুক্ত করে দেয়া হয়।

কয়লা উত্তোলনক্ষেত্র বাড়ানো হলে সবচেয়ে ঝুঁকিতে ফেলবে বনে বাস করা উপজাতি জনগোষ্ঠীকে, যেখানে রয়েছে ভারতের সবচেয়ে বেশি কয়লার মজুদ। যারা কয়লা খনির কারণে এরই মধ্যে পরিবেশগত বিপর্যয়ের শিকার। সামনের বছরগুলোতে যদি ভারত জলবায়ু লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে চায়, তাহলে বিদ্যুেক্ষত্রে কয়লানির্ভরতা ছাড়তে হবে। মোট বিদ্যুতের ৭০ শতাংশই আসে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে।

বিভূতি গর্গ মনে করেন, কয়লাক্ষেত্র উন্মুক্ত করে দেয়া কিংবা কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর জন্য সরকার সুযোগ কাজে লাগাতে চায়। তিনি বলেন, আমাদের উচিত অসহায় অবস্থায় পরিত্যক্ত হওয়ার আগেই কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষেত্রে অর্থ বিনিয়োগ এড়িয়ে চলা। কয়লাভিত্তিক উৎপাদন অত্যন্ত ব্যয়বহুল। দিন দিন যার খরচ বাড়তেই থাকে। অন্যদিকে নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎপাদন খরচ কম এবং যার খরচ দিন দিন আরো কমিয়ে আনা সম্ভব।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন