রবিবার | অক্টোবর ২৪, ২০২১ | ৯ কার্তিক ১৪২৮

প্রথম পাতা

ছয় মাসে স্পট মার্কেটে মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে ৪৩৭%

আকাশচুম্বী দাম দিয়ে এলএনজি কিনতে হচ্ছে বাংলাদেশকে

আবু তাহের

আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে ডিসেম্বর পর্যন্ত স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি না কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল জ্বালানি বিভাগ। কিন্তু জ্বালানি সংকটের কারণে শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসা হয়। বর্তমানে দরপত্রের মাধ্যমে স্পট মার্কেট থেকে কেনা হচ্ছে তিন কার্গো এলএনজি। এর মধ্যে এক কার্গো চলতি মাসেই আনা হবে বলে বণিক বার্তাকে জানিয়েছিলেন জ্বালানি বিভাগ-সংশ্লিষ্টরা। এখন পর্যন্ত ক্রয় চুক্তির মূল্য প্রকাশিত হয়নি। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা রয়টার্সের গতকাল প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, সিঙ্গাপুরভিত্তিক ভিটল এশিয়ার কাছ থেকে প্রতি এমএমবিটিইউ ২৯ ডলার ৮৯ সেন্ট মূল্যে এক কার্গো এলএনজি এরই মধ্যে কিনেছে বাংলাদেশ।

বর্তমানে এলএনজির বাজারে ঊর্ধ্বমুখিতা লাগামহীন হয়ে উঠছে। জানুয়ারিতে প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজির দাম ছিল প্রায় ১৪ ডলারে। এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল প্ল্যাটসের তথ্য অনুযায়ী, এরপর পণ্যটির দাম কমে মার্চের শুরুতে নেমে আসে প্রতি এমএমবিটিইউ সাড়ে ডলারের কিছু বেশিতে। স্পট মার্কেট থেকে বাংলাদেশের ক্রয়মূল্য বিবেচনায় নিয়ে দেখা যাচ্ছে, গত ছয় মাসে পণ্যটির দাম বেড়েছে প্রায় ৪৩৭ শতাংশ।

আন্তর্জাতিক বাজার থেকে বাংলাদেশের এখন পর্যন্ত এত বেশি দামে এলএনজি কেনার রেকর্ড নেই। এছাড়া অক্টোবরে সরবরাহের জন্য বাংলাদেশের কাছে প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজি ৩৫ ডলার করে চেয়েছিল আরো একটি প্রতিষ্ঠান। দাম বেশি হওয়ায় প্রতিষ্ঠানটির প্রস্তাবে সাড়া দেয়নি বাংলাদেশ। অক্টোবরের মধ্যে আরো দুই কার্গো সরবরাহের জন্য শিগগিরই দরপত্র জারি করা হবে বলে রয়টার্সের ওই প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে গ্যাস সংকট সামাল দিতে উচ্চমূল্য থাকা সত্ত্বেও এলএনজি কেনা হচ্ছে। এর আগে স্পট মার্কেট থেকে প্রতি এমএমবিটিইউ ১৯-২০ ডলারের মধ্যে কেনা হবে বলে জ্বালানি বিভাগ জানিয়েছিল।

বিষয়ে জ্বালানি বিভাগের সিনিয়র সচিব মো. আনিছুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেছিলেন, সংকট মেটাতে দাম যা- হোক, স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি সংগ্রহ করা হবে। সেক্ষেত্রে বাজার বিবেচনায় দরদাম করেই এলএনজি কেনা হবে।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গত এক সপ্তাহে এশিয়ার বাজারে জ্বালানিপণ্যটির দাম বেড়েছে প্রায় ১০ শতাংশ। দ্রুতই পণ্যটির বাজার স্থিতিশীল হয়ে ওঠার কোনো সম্ভাবনা নেই। বরং ক্রমবর্ধমান চাহিদা সরবরাহ সংকটে স্পট এবং ফিউচার মার্কেটে পণ্যটির দাম আরো বাড়তির দিকে থাকবে।

জ্বালানি বিভাগের তথ্য বলছে, গত বছরও প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজির দাম পড়েছিল দশমিক ৮৩ ডলার। কিন্তু দাম ক্রমেই ঊর্ধ্বমুখী হতে থাকায় চলতি বছরের শুরুতে পণ্যটি আমদানিতে যতি টানা হয়। স্পট মার্কেট থেকে কিনতে না পারায় জানুয়ারির মাঝামাঝি জাতীয় গ্যাস গ্রিডে এলএনজি সরবরাহ অর্ধেকে নেমে আসে। দৈনিক ৮০ কোটি ঘনফুট এলএনজি সরবরাহের বিপরীতে সেই সময় সরবরাহ কমে দাঁড়ায় ৩৯ কোটি ঘনফুট। এলএনজি সরবরাহ কমে যাওয়ায় সেই সময় দেশে অন্তত দুই হাজার মেগাওয়াট সক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ রাখতে হয়। শিল্প-কারখানায় গ্যাসের চাপ কমে যায়। ১৫ পিএসআই (প্রতি বর্গইঞ্চি) চাপে কারখানাগুলোর গ্যাস পাওয়ার কথা থাকলেও তা নেমে যায় - পিএসআই মাত্রায়। রেশনিং করে গ্যাস সরবরাহ করা হলেও হিমশিম খেতে থাকে বিতরণ কোম্পানিগুলো।

দাম বাড়তির দিকে থাকলেও চলতি বছরের জুলাইয়ে জাতীয় গ্রিডে পুনরায় এলএনজি সরবরাহ বাড়ায় পেট্রোবাংলা। ওই সময় উচ্চমূল্যের একটি এলএনজিবাহী কার্গো কিনে পরিস্থিতি সামাল দেয়ার চেষ্টা করা হয়। সেই সময় গ্রিডে এলএনজির সরবরাহ করা হয় প্রায় ৭০ কোটি ঘনফুট। এরপর অব্যাহতভাবে আগস্ট পর্যন্ত ঠিক থাকলেও চলতি মাসের শুরুতে তা আবার নেমে যায় ৬০ কোটি ঘনফুটে। মহামারী পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার প্রেক্ষাপটে শিল্প-কারখানা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেয়া হয়। আবারো বাড়তে থাকে গ্যাসের চাহিদা। চাপকে আরো বাড়িয়ে তোলে বিদ্যুতের উৎপাদন বৃদ্ধি।

চলতি বছরের সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট পাঁচ কার্গো এলএনজি কেনার পরিকল্পনা ছিল জ্বালানি বিভাগের। কিন্তু উচ্চমূল্য থাকায় জুলাইয়ে এক অনুশাসনের মাধ্যমে তা স্থগিত করা হয়। এর পর থেকে এতদিন এলএনজির আমদানি বন্ধ রাখা হয়েছে। অন্যদিকে জাতীয় গ্রিডে গ্যাসের সরবরাহ সংকট আরো বেড়েছে। বিপাকে পড়েছে বিদ্যুৎ খাত। উৎপাদন ঠিক রাখতে কখনো আবাসিক, আবার কখনো শিল্পে গ্যাসের সরবরাহ কমানো হচ্ছে। এর প্রভাব পড়েছে পরিবহন খাতেও। বিদ্যুৎকেন্দ্রে জ্বালানি সরবরাহ বাড়াতে বিদ্যুৎ, জ্বালানি খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের এক নির্দেশনার ভিত্তিতে বর্তমানে প্রতিদিন ঘণ্টা করে সিএনজি স্টেশন বন্ধ রাখা হচ্ছে।

পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণের জন্য কার্গো তিনটি কেনার উদ্যোগ নিয়েছে জ্বালানি বিভাগ। সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, কার্গো তিনটির ক্রয়প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে গ্রিডে এলএনজির দৈনিক সরবরাহ বাড়বে ১০ কোটি ঘনফুট। সে হিসাবে গ্রিডে গ্যাসের দৈনিক মোট সরবরাহের পরিমাণ দাঁড়াবে ৭০ কোটি ঘনফুটে। আমদানীকৃত এই এলএনজি দিয়ে আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত সরবরাহ বজায় রাখার পরিকল্পনা রয়েছে জ্বালানি বিভাগের।

তবে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর দেয়া তথ্য অনুযায়ী, ডিসেম্বরের মধ্যে এলএনজির আন্তর্জাতিক বাজার স্থিতিশীল হয়ে ওঠার কোনো সম্ভাবনা নেই। সরবরাহ সংকটে এলএনজির স্পট মার্কেট ক্রমেই ঊর্ধ্বমুখী হয়ে উঠছে। একই পরিস্থিতি ফিউচার মার্কেটেও। উত্তর-পূর্ব এশিয়ায় নভেম্বরে সরবরাহের চুক্তিতে এলএনজির গড় মূল্য ওঠানামা করছে ২৬ ডলার ৫০ সেন্ট থেকে ২৭ ডলারের মধ্যে। বিষয়ে সিঙ্গাপুরভিত্তিক এক ব্যবসায়ীর বক্তব্য হলো অনেক দেশেই এখন কভিড-পরবর্তী পুনরুদ্ধার কার্যক্রম গতি পেয়েছে। ফলে চাহিদাও ক্রমেই বাড়ছে। এর বিপরীতে এলএনজি সরবরাহকারী কোনো কোনো দেশ এখন সরবরাহ ধরে রাখতেই হিমশিম খাচ্ছে। ফলে পণ্যটির বাজারের বর্তমান পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে শীতকালে পণ্যটির চাহিদা আরো বাড়বে। সে হিসেবে এলএনজির বাজারের বর্তমান অস্থিতিশীলতা আরো বাড়বে।   

রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড (আরপিজিসিএল) সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের ২৫ সেপ্টেম্বর থেকে চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত স্পট মার্কেট থেকে পর্যন্ত মোট ১৩ কার্গো এলএনজি আমদানি করা হয়েছে। পেট্রোবাংলার একটি সূত্র বলছে, গ্যাসের সংকট চলবে আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত। তবে শীতে দেশে বিদ্যুতের প্রয়োজন কমে যায়। গ্যাসের চাহিদাও সেই সময় কম থাকে। বিশ্ববাজারেও সেই সময় এলএনজির দাম পড়তে থাকে। কারণে জানুয়ারিতে আবার স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কেনার পরিকল্পনা রয়েছে সংস্থাটির।

উল্লেখ্য, প্রতি বছর গ্রীষ্মে বিদ্যুৎ উৎপাদনেই সর্বোচ্চ গ্যাস সরবরাহ করে সরকার। কিন্তু এবার তা করা যায়নি। বরং গ্যাস সংকটে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোয় সরবরাহ কমাতে হয়েছে। এখন দেশের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর দৈনিক গ্যাসের চাহিদা ২২৫ কোটি ২০ লাখ ঘনফুট। এর বিপরীতে পেট্রোবাংলা সরবরাহ করতে পারছে ১৩০ থেকে ১৪০ কোটি ঘনফুট।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন