বৃহস্পতিবার | অক্টোবর ২৮, ২০২১ | ১২ কার্তিক ১৪২৮

সম্পাদকীয়

আলোকপাত

স্বাস্থ্যসেবায় উপেক্ষিত গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্ট

ড. মো. শাহ এমরান

কভিড-১৯ মহামারীর কারণে পুরো বিশ্বের মতো বাংলাদেশও একটি কঠিন সময় পার করছে। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে গণচীনের উহান প্রদেশে নভেল করোনাভাইরাস করোনাভাইরাসজনিত রোগ কভিড-১৯ মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়ার পর ১৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সারা বিশ্বে প্রায় কোটি ২৮ লাখ ২১ হাজার ৯১৩ জন আক্রান্ত হয়েছে এবং প্রায় ৪৬ লাখ ৯২ হাজার ৯৩৭ জনের মৃত্যু হয়েছে এই করোনা রোগে, আর সুস্থ হয়েছে ২০ কোটি ৫০ লাখ ৮০৩ জন। বাংলাদেশে ২৭ হাজার ১৪৭ জন মানুষের মৃত্যু হয়েছে এবং ১৫ লাখ ৪০ হাজার ১১০ জন মানুষ আক্রান্ত হয়েছে। আমাদের স্বাস্থ্যসেবা খাতের বিভিন্ন দুর্বলতা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে এই কভিড-১৯। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো, স্বাস্থ্যসেবা খাতে গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্টদের অনুপস্থিতি।

২০১০ সাল থেকে প্রতি বছর সারা বিশ্বে ২৫ সেপ্টেম্বর বিশ্ব ফার্মাসিস্ট দিবস পালিত হয়ে আসছে। এবারো সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও দিবসটি কম-বেশি যথাযোগ্য মর্যাদায় পালিত হবে। ফার্মাসিস্টদের আন্তর্জাতিক সংগঠন ফার্মাসিউটিক্যাল আন্তর্জাতিক ফেডারেশন (এফআইপি) এবারের বিশ্ব ফার্মাসিস্ট দিবসের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় নির্ধারণ করা হয়েছে—‘Pharmacy: Always trusted for your health. আমরা বাংলা অনুবাদ করেছি রকম—‘ফার্মেসি: আপনার স্বাস্থ্যসেবায় সর্বদা বিশ্বস্ত গত বছরগুলোয় বিশ্ব ফার্মাসিস্ট দিবসের মূল প্রতিপাদ্য ছিল—‘পরিবর্তিত বিশ্ব স্বাস্থ্য (২০২০), সবার জন্য নিরাপদ কার্যকর ওষুধ (২০১৯), ফার্মাসিস্টই আপনার ওষুধ বিশেষজ্ঞ (২০১৮) এবং গবেষণা থেকে স্বাস্থ্যসেবাফার্মাসিস্টরা আপনার সেবায় নিয়োজিত (২০১৭) ইত্যাদি।

আমরা জানি, উন্নত জীবন সমৃদ্ধ জাতি গঠনের জন্য চাই সুস্থ সবল মানুষ আর সুস্থ সবল জীবনের জন্য জরুরি হলো সুস্থ থাকা। দৈনন্দিন জীবনে অনেক চাওয়া-পাওয়ার মাঝে একটি বড় চাওয়া হলো শারীরিক-মানসিক সুস্থতা। মানুষের মৌলিক চাহিদা পাঁচটি তার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হলো স্বাস্থ্যসেবা। আর উপযুক্ত ওষুধসেবা ছাড়া স্বাস্থ্যসেবা খাত পূর্ণরূপ লাভ করতে পারে না। ১৯৭২ সালে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৫() অনুসারে, জীবন ধারণের মৌলিক উপকরণের ব্যবস্থা করা রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব এবং অনুচ্ছেদ ১৮() অনুসারে, জনগণের পুষ্টি-উন্নয়ন জনস্বাস্থ্যের উন্নতি সাধনকে রাষ্ট্রের অন্যতম প্রাথমিক কর্তব্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। এই করোনাকালে বাংলাদেশের জনগণ সরকারি বেসরকারি খাতে যে স্বাস্থ্যসেবা পাচ্ছে, তার পরিসর গুণগত মানের দিক আরো ভালো করা প্রয়োজন। ২০১১ সালের জাতীয় স্বাস্থ্যনীতির মূলমন্ত্র ছিল সবার জন্য প্রাথমিক স্বাস্থ্য জরুরি চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭৬ সালে ফার্মেসি অধ্যাদেশ (The Pharmacy Ordinance, 1976) জারির মাধ্যমে ফার্মেসিকে একটি পেশাগত বিষয় এবং ফার্মাসিস্টদের পেশাজীবী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়। অধ্যাদেশের ১৩ ধারায় ওষুধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান, ওষুধ বিপণন খাতে ফার্মাসিস্টদের চাকরির নিশ্চয়তা প্রদান করা হয়। পাশাপাশি The Pharmacy Practice Act জারি করে গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্টদের হসপিটাল ফার্মেসি কমিউনিটি ফার্মেসি সেবায় নিয়োগের বিধান না করায় গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্টরা দুটি গুরুত্বপূর্ণ খাতে সেবা প্রদান করে স্বাস্থ্যসেবা খাতকে সমৃদ্ধ করতে পারছেন না। আর বাংলাদেশের সাধারণ মানুষও উপযুক্ত স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। অথচ কে না জানে যে স্বাস্থ্যসেবা খাতে ডাক্তার, নার্স হেলথ টেকনোলজিস্টদের ভূমিকা যেমন অপরিসীম, ঠিক তেমনিভাবে হাসপাতালে ওষুধের সংরক্ষণ, গুণগত মান নিয়ন্ত্রণ, সঠিক ওষুধ নির্বাচন, ওষুধের যৌক্তিক ব্যবহার নিশ্চিতকরণ ওষুধ সেবন-পরবর্তী পর্যবেক্ষণ কার্যক্রমের জন্য গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্টের ভূমিকাও অপরিহার্য। সারা বিশ্বে স্বাস্থ্যসেবা খাত মানেই ডাক্তার, ফার্মাসিস্ট, নার্স হেলথ টেকনোলজিস্টদের সমন্বয়ে গঠিত স্বাস্থ্যসেবা টিম। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা খাতে গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্টরা একেবারেই উপেক্ষিত। করোনা মহামারীর কালে হাজার হাজার ডাক্তার, নার্স হেলথ টেকনোলজিস্ট নিয়োগের উদ্যোগ নিলেও সরকারের তরফ থেকে প্রজ্ঞাপন জারির পরেও স্বাস্থ্যসেবা খাতে গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্ট নিয়োগের কোনো উদ্যোগ পরিলক্ষিত হচ্ছে না।

বাংলাদেশের গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্টরা নিজেদের অর্জিত জ্ঞান, পেশাগত মেধা, দক্ষতা অভিজ্ঞতা দিয়ে ওষুধ শিল্পের বিভিন্ন বিভাগে, যেমন উৎপাদন, মান নিয়ন্ত্রণ, মানের নিশ্চয়তা বিধান, গবেষণা উন্নয়ন, বিপণন, উৎপাদন পরিকল্পনা, ডিসপেন্সিং, রেগুলেটরি অ্যাফেয়ার্স, বিজনেজ ডেভেলপমেন্ট রফতানি খাতে ব্যাপক অবদান রাখছে। এছাড়া সরকারি সংস্থায়, বেসরকারি হাসপাতালে, কমিউনিটি ফার্মেসিতে এবং শিক্ষা গবেষণা প্রতিষ্ঠানে কাজ করে যাচ্ছেন গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্টরা। বাংলাদেশের গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্টরা দেশের ওষুধ শিল্পের বিকাশে আমূল পরিবর্তন এনেছেন। একটি ওষুধ আমদানিনির্ভর দেশকে ওষুধ রফতানিমুখী দেশে পরিণত করেছেন। বর্তমানে দেশের চাহিদার ৯৮ শতাংশ ওষুধ দেশে উৎপাদন হচ্ছে এবং ইউরোপ-আমেরিকাসহ বিশ্বের ১৬০টি দেশে রফতানি হচ্ছে বাংলাদেশের ওষুধ। গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্টরা দেশের বড় ওষুধ কোম্পানিগুলোয় উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে এগুলোকে বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছেন। এমনকি আমাদের বড় ওষুধ কোম্পানিগুলো বিদেশেও তাদের উৎপাদন-বিপণন কার্যক্রম সম্প্রসারিত করছে। আর সেখানে গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্টরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন।

২০১৬ সালের ডিসেম্বর ২০১৭ সালের জানুয়ারি থেকে স্বাস্থ্য পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে ওষুধ প্রশাসন, ফার্মেসি কাউন্সিল বিপিএসের সক্রিয় সহযোগিতায় ওষুধের অপব্যবহার রোধ যৌক্তিক ব্যবহার নিশ্চিতের জন্য বাংলাদেশ মডেল ফার্মেসি ইনিশিয়েটিভস প্রকল্পের আওতায় ম্যানেজমেন্ট সায়েন্স ফর হেলথ নামে বিদেশী সাহায্য সংস্থার অর্থ সহায়তায় আফ্রিকার দেশ তানজানিয়ার মডেল অনুসরণ করে দেশে মডেল ফার্মেসি চালু করা হয়েছে। মডেল ফার্মেসিতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্ট কর্তৃক ওষুধ সংরক্ষণ, ডিসপেন্সিং ওষুধ সম্পর্কে তথ্যাদি দেয়ার পাশাপাশি তারা ওষুধ সেবনবিধি সম্পর্কে পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছেন। বর্তমানে ২০০টির বেশি মডেল ফার্মেসিতে গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্টরা কাজ করে যাচ্ছেন। তবে তাদের কর্মপরিবেশ দায়িত্ব পালনের জন্য ফার্মেসি ইনচার্জ বা ফার্মেসি ম্যানেজার হিসেবে পদায়নের জন্য ফার্মেসি কাউন্সিল উদ্যোগ গ্রহণ করছে। এছাড়া দেশের কিছুসংখ্যক বেসরকারি হাসপাতালে এরই মধ্যে উন্নত মানের স্বাস্থ্যসেবা তথা ওষুধের যৌক্তিক ব্যবহার নিশ্চিত করার মাধ্যমে গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্টরা দক্ষতার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছেন। একথা সুবিদিত যে আধুনিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় হসপিটাল ফার্মাসিস্ট ক্লিনিক্যাল ফার্মাসিস্ট ছাড়া গুণগত স্বাস্থ্যসেবা প্রদান আদৌ সম্ভব নয়। তবে অনেক ঢাকঢোল পিটিয়ে মডেল ফার্মেসি চালু হলেও এটি তেমন কার্যকরী হয়নি। বলা চলে এটি ব্যর্থ হতে চলেছে। কারণ শুধু ওষুধের দোকানের মালিকের পক্ষে মডেল ফার্মেসিতে  কর্মরত একজন গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্টকে উপযুক্ত বেতন-ভাতা-প্রমোশন দিয়ে রাখা একেবারেই অসম্ভব। মডেল ফার্মেসি সিস্টেমকে সরকারি রাজস্ব খাতের আওতায় না আনলে কোনো গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্টের পক্ষে সেখানে সম্মানের সঙ্গে কাজ করা সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে আমাদের অনেক দক্ষ অভিজ্ঞ সিনিয়র গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্ট রয়েছেন, যারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে হসপিটাল রিটেইল ফার্মাসিস্ট হিসেবে কাজ করেছেন, তাদের সমন্বয়ে একটি কমিটি করে রিটেইল ফার্মেসি সেবা খাতকে একটি পূর্ণাঙ্গ রূপ দেয়ার ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

আমাদের দেশে আনাচে কানাচে প্রায় দুই লাখ ওষুধের দোকান (রিটেইল ফার্মেসি) রয়েছে। এসব রিটেইল ফার্মেসিতে গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্ট ছাড়াই ওষুধ সংরক্ষণ, ডিসপেন্সিং এবং ওষুধ বিতরণ করা হয়। গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্ট হাসপাতালে নিযুক্ত হলে দেশের হাসপাতালে ডাক্তার, নার্স গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্ট তাদের পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম হবেন। গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্টদের সরকারি বেসরকারি হাসপাতাল এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা এবং তাদের পদোন্নতির সুযোগ করে স্বাস্থ্যসেবাকে আরো উন্নতকরণের বিষয়টি এখন সময়ের দাবি। বর্তমানে দেশে গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্টের সংখ্যা প্রায় ১৯ হাজার। বর্তমানে ১৪টি সরকারি ২৭টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রতি বছর গড়ে চার হাজার ফার্মেসি গ্র্যাজুয়েট বের হচ্ছেন এবং বাংলাদেশ ফার্মেসি কাউন্সিল থেকে গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্ট হিসেবে রেজিস্ট্রেশন পাচ্ছেন। তবে দেশের স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্টদের কর্মক্ষেত্র বিস্তৃত হচ্ছে না। ২০১১ সালের জাতীয় স্বাস্থ্যনীতির ৩২টি রণকৌশলের মধ্যে ২৪ নম্বর রণকৌশলে স্বাস্থ্যবিষয়ক মানবসম্পদ থেকে জ্ঞান দক্ষতার সর্বোচ্চ সুফল অর্জনের লক্ষ্যে সর্বস্তরের জন্য একটি সঠিক চাহিদাভিত্তিক মানবসম্পদ উন্নয়ন পদ্ধতি গড়ে তোলা এবং চাহিদা অনুযায়ী স্বাস্থ্য জনশক্তির সব স্তরে নিয়োগ, পদোন্নতি-পদায়ন বদলির নীতিমালা বাস্তবায়নের দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়েছে। তাছাড়া জাতীয় ওষুধ নীতি ২০১৬-এর . অনুচ্ছেদে ওষুধের যৌক্তিক নিরাপদ ব্যবহার সম্পর্কে আলোকপাত করা হয়েছে। উল্লেখ্য, . অনুচ্ছেদের () উপ-অনুচ্ছেদে দেশে পর্যায়ক্রমে সব সরকারি বেসরকারি হাসপাতালে গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্টের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে আন্তঃবিভাগ বহির্বিভাগে হসপিটাল ফার্মেসি কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়ে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের হাসপাতালে কর্মরত ফার্মাসিস্টদের অবস্থান বিচার করলে আমরা দেখি যে মালয়েশিয়ায় ফার্মাসিস্ট জনসংখ্যার আনুপাতিক হার :২৩১৫, সিঙ্গাপুরে :২১৩০ ইংল্যান্ডে :১০০০। থাইল্যান্ডে ২০ শয্যার বিপরীতে দুজন ফার্মাসিস্ট, ৩০ শয্যার বিপরীতে তিনজন ফার্মাসিস্ট, ৬০ শয্যার বিপরীতে তিনজন ফার্মাসিস্ট, ৯০-১২০ শয্যার বিপরীতে পাঁচজন ফার্মাসিস্ট কর্মরত। আর বাংলাদেশের চিত্র কেমন? গত ৩০ জুলাই দৈনিক বণিক বার্তায় চিড় ধরা স্বাস্থ্যনীতির কারণে কভিডে নাজেহাল বাংলাদেশ শিরোনামে একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়। সেখানে দেখানো হয়, দেশে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, সেকেন্ডারি টারশিয়ারি পর্যায়ের সরকারি হাসপাতালের সংখ্যা ৬৫৪। এসব হাসপাতালে মোট শয্যা সংখ্যা ৫৩ হাজার ৪৪৮। প্রতি দশ হাজার জনসংখ্যার বিপরীতে দশমিক ৫৫ জন চিকিৎসক রয়েছেন। তবে প্রতি দশ হাজার জনসংখ্যার বিপরীতে ডাক্তার আছেন দশমিক ৭৩ জন। অন্যদিকে প্রতি দশ হাজার জনসংখ্যার বিপরীতে সরকারি হাসপাতালে দশমিক ৩০টি শয্যা আর বেসরকারি হাসপাতালে দশমিক ৫৩টি শয্যা আছে। দেখা যাচ্ছে, এসব সরকারি বেসরকারি হাসপাতালে পর্যাপ্তসংখ্যক দক্ষ অভিজ্ঞ ডাক্তার, নার্স হেলথ টেকনোলজিস্ট থাকলেও নেই কোনো গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্ট। আর বিশ্বের সব উন্নত উন্নয়নশীল দেশে মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা মানেই সেখানে ডাক্তার নার্সদের পাশাপাশি গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্টরা স্বাস্থ্যসেবা টিমের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিনিধি হিসেবে উপস্থিত থাকেন। আর বাংলাদেশে এটি বলতে গেলে শূন্যের কোটায়।

অবস্থায় দেশে সরকারি (ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র, উপজেলা হেলথ কমপ্লেক্স, জেলা হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, বিশেষায়িত হাসপাতাল, মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতাল) বেসরকারি হাসপাতালগুলোয় ওষুধের নিরাপদ সংরক্ষণ, ওষুধের অপব্যবহার রোধ যৌক্তিক ব্যবহার নিশ্চিতকরণের জন্য ফার্মাসিস্টের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রান্তিক পর্যায়ে ওষুধ বিপণন ডিসপেন্সিং ব্যবস্থায় গুণগত পরিবর্তন আনার লক্ষ্যে সরকারি হাসপাতালগুলোয় উন্নত বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে বহির্বিভাগ ফার্মেসিতে একজন গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্ট আন্তঃবিভাগে প্রতি ৫০ শয্যার বিপরীতে দুজন গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্ট নিয়োগদান এবং নিয়োগকৃত ফার্মাসিস্টদের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি তাদের অভিজ্ঞতার আলোকে জনশক্তির সব স্তরে পদোন্নতির লক্ষ্যে হাসপাতাল ফার্মেসিতে নিম্নলিখিত পদবিন্যাস করা যেতে পারে. ফার্মাসিউটিক্যাল অফিসার (যা পিএসসির ক্যাডার সার্ভিস বিবেচনায় নবম গ্রেড সমতুল্য হবে), . ফার্মাসিউটিক্যাল অফিসার (যা ক্যাডার সার্ভিস বিবেচনায় ৮ম-৭ম গ্রেড সমতুল্য হবে), . উপপ্রধান ফার্মাসিউটিক্যাল অফিসার (যা ক্যাডার সার্ভিস বিবেচনায় ৬ষ্ঠ-৫ম গ্রেড), . প্রধান ফার্মাসিউটিক্যাল অফিসার (যা ক্যাডার সার্ভিস বিবেচনায় ৪র্থ-১ম গ্রেড সমতুল্য হবে)

কাগজপত্রে বাংলাদেশে স্বাস্থ্যসেবা খাতে ডাক্তার, ফার্মাসিস্ট, নার্স হেলথ টেকনোলজিস্ট চার শ্রেণীর পেশাজীবী রয়েছেন। ডাক্তারদের জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং নার্সদের জন্য নার্সিং মিডওয়াইফারি অধিদপ্তর রয়েছে। অধিদপ্তর দুটির মাধ্যমে নিয়োগকৃত ডাক্তার নার্সদের সার্ভিস-সংক্রান্ত মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সব পরিকল্পনা প্রণয়ন, বাস্তবায়ন, মূল্যায়নসহ যাবতীয় প্রশাসনিক আর্থিক কার্যক্রম পরিচালনা বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা হয়। অবস্থায় প্রস্তাবিত পদবিন্যাসের আলোকে হাসপাতালগুলোয় হসপিটাল ফার্মাসিস্ট নিয়োগ কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার লক্ষ্যে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং নার্সিং মিডওয়াইফারি অধিদপ্তরের মতো ফার্মেসি সার্ভিসেস অধিদপ্তর গঠন করে ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র, উপজেলা হেলথ কমপ্লেক্স, জেলা হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, বিশেষায়িত হাসপাতাল, মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্ট নিয়োগদানের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করার এখনই সবচেয়ে ভালো সময়। কেননা বাংলাদেশে এখন ১৯ হাজার রেজিস্টার্ড গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্ট (এর মধ্যে একটা উল্লেখযোগ্যসংখ্যক বিদেশে কর্মরত), হাজার ৭০০ জন ডিপ্লোমা ফার্মাসিস্ট এবং লাখ ২৫ হাজার সি গ্রেড ফার্মাসিস্ট রয়েছেন। এই দক্ষ জনগোষ্ঠীকে দেশের কাজে লাগাতে হলে গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্টদের বেশি করে হসপিটাল ফার্মাসিস্ট হিসেবে সরকারি কাঠামোয় নিয়োগ দেয়া খুবই জরুরি। গ্রিক চিকিৎসক গ্যালেনকে বলা হয় ফাদার অব ফার্মাসিস্ট তিনি সে সময়ই বুঝতে পেরেছিলেন চিকিৎসাবিজ্ঞানে ফার্মাসিস্টের ভূমিকা কতটা জরুরি। আধুনিককালে এসে যুক্তরাষ্ট্রের ডাক্তার জন মরগানকে মেডিকেল সায়েন্স থেকে ফার্মেসিকে আলাদা করা এবং ফার্মাসিস্টদের আলাদা পেশাজীবী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার কৃতিত্ব দেয়া হয়। কারণ তিনিও বুঝেছিলেন উৎপাদন, মান নিয়ন্ত্রণ, মানের নিশ্চয়তা বিধান, গবেষণা উন্নয়ন, বিপণন, উৎপাদন পরিকল্পনা, ডিসপেন্সিং, রেগুলেটরি অ্যাফেয়ার্স, বিজনেজ ডেভেলপমেন্ট রফতানি করা আর হাসপাতালে বা ওষুধের দোকানে ওষুধ সংরক্ষণ, ডিসপেন্সিং ওষুধ সম্পর্কে তথ্যাদি দেয়ার পাশাপাশি ওষুধ সেবনবিধি সম্পর্কে পরামর্শ প্রদান এসব ডাক্তারদের কাজ নয়, একান্তই গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্টদের কাজ।

 

. মো. শাহ এমরান: অধ্যাপক চেয়ারম্যান

ফার্মাসিউটিক্যাল কেমিস্ট্রি বিভাগ

ফার্মেসি অনুষদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন