বৃহস্পতিবার | অক্টোবর ২৮, ২০২১ | ১২ কার্তিক ১৪২৮

সম্পাদকীয়

দুই দশকে চালের ভোক্তামূল্যে উৎপাদকের অংশ কমেছে

কৃষিমূল্য কমিশন গঠনের মাধ্যমে কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা হোক

গত দুই দশকে চালের দাম বাড়লেও উৎপাদকের কাছে এর সুফল পৌঁছেনি; বরং ভোক্তামূল্যে কৃষকের অংশ ৬৫ থেকে ৪১ শতাংশে নেমে এসেছে। চালের বাড়তি দামের সুফল ধান ব্যবসায়ী, চালকল মালিক চাল ব্যবসায়ীদের মতো মধ্যস্বত্বভোগীদের পকেটে চলে যাচ্ছে। এতে কৃষকের অবস্থান নাজুক হয়েছে আর চালকল মালিকদের অবস্থান আরো শক্তিশালী হয়েছে। এক্ষেত্রে ধান চাষকে লাভজনক করতে না পারলে ধান উৎপাদন থেকে উৎপাদক মুখ ফিরিয়ে নিলে খাদ্যনিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে। মধ্যস্বত্বভোগীর দৌরাত্ম্য কমাতে কৃষিপণ্যের উৎপাদন ব্যয় সংগ্রহ মূল্য নির্ধারণে কৃষিমূল্য কমিশন গঠন করা এখন সময়ের দাবি।

বাংলাদেশে কৃষি খাতে সহায়তা দেয়া হয় সরকারি বাজেটের মাধ্যমে। তাছাড়া সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ বাণিজ্য সম্প্রসারণ বা সংকোচনের মাধ্যমেও সহায়তা দেয়া হয় অভ্যন্তরীণ কৃষির উৎপাদনকে। কৃষিপ্রধান উন্নয়নশীল দেশগুলোতে উল্লিখিত সব সহায়তা সমর্থনই কম-বেশি বিদ্যমান। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। তবে প্রশ্ন উঠছে সহায়তা বা সমর্থনের মাত্রা এবং সুবিধাভোগীদের নিয়ে। বাজেট সহায়তার ক্ষেত্রে আমাদের কৃষিতে ব্যয়ের পরিমাণ দিনের পর দিন নিরঙ্কুশ টাকার অংকে ক্রমেই বাড়ছে; কিন্তু হ্রাস পাচ্ছে আপেক্ষিক অর্থে। একটি স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে কৃষি খাতে সহায়তা সমর্থন দেয়ার কোনো সীমারেখা বাংলাদেশের জন্য নির্ধারণ করা নেই। অর্থাৎ কৃষিতে স্বদেশী সহায়তা হ্রাসের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের মতো স্বল্পোন্নত দেশগুলোকে পুরোপুরি ছাড় দেয়া হয়েছে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার নীতিমালায়। কৃষিতে সহায়তা দেয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল হচ্ছে পণ্যের মূল্য সমর্থন। এর মাধ্যমে কৃষক তার উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য পান। অপরদিকে ন্যায়সংগত মূল্যে পণ্য ক্রয়ের নিশ্চয়তা পায় ভোক্তা। দেশের শতকরা প্রায় ৮০ ভাগ গ্রামীণ জীবন কৃষিকর্মের ওপর নির্ভরশীল। অপরদিকে গরিব মানুষের শতকরা প্রায় ৬৫ ভাগ পারিবারিক ব্যয় নিয়োজিত হয় খাদ্য কেনার জন্য। এমতাবস্থায় উৎপাদনকারী কৃষক পণ্য গ্রহণকারী ভোক্তা উভয়ের জন্যই একটি ইতিবাচক কৃষি মূল্যনীতি প্রয়োজন। এর মাধ্যমে কৃষকের আয় স্থিতিশীল রাখা যায়, কৃষিপণ্যের মূল্য ওঠানামার মাত্রা সংযত করা যায় এবং পণ্যের উৎপাদন বাড়িয়ে রফতানি বৃদ্ধি আমদানি হ্রাস করা যায়।

কৃষিপণ্যের উৎপাদন খরচ সংগ্রহমূল্য নির্ধারণের জন্য বিভিন্ন দেশে রয়েছে এগ্রিকালচারাল প্রাইস কমিশন ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলংকাসহ পৃথিবীর বিভিন্ন উন্নত দেশে এখন কৃষিমূল্য কমিশন কার্যকর রয়েছে। এক্ষেত্রে ভারতের উদাহরণ আমাদের জন্য খুবই প্রাসঙ্গিক। সেখানে কৃষিমূল্য কমিশন স্থাপিত হয়েছে ১৯৬৫ সালে। এখনো তা অব্যাহতভাবে কাজ করে যাচ্ছে। এতে একজন চেয়ারম্যান, একজন সদস্য সচিব, একজন সরকার কর্তৃক নিয়োগকৃত সদস্য এবং দুজন কৃষক প্রতিনিধিসহ প্রয়োজনীয়সংখ্যক বিশেষজ্ঞ অন্যান্য লোকবল রয়েছে। কমিশনের কাজ হলো পণ্যের উৎপাদন খরচ নির্ণয়, ন্যূনতম সমর্থন মূল্য নির্ধারণ এবং কৃষিপণ্যের রফতানি মূল্য নির্ধারণ আমদানি নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রয়োজনীয় সুপারিশ পেশ করা। মাঠের তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ এবং কৃষি উৎপাদন বিপণনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে আলোচনা করে কমিশন তাদের সুপারিশ পেশ করে থাকে। তাদের সুপারিশ সরকার সংশ্লিষ্ট সবাই মেনে নেয়। বাংলাদেশে এরূপ একটি প্রাইস কমিশন গঠনের দাবি দীর্ঘদিনের। আমাদের জাতীয় কৃষিনীতিতেও একটি প্রাইস কমিশন গঠনের প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করা হয়েছে। কিন্তু তার বাস্তবায়ন হয়নি। বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া দরকার।

সরকার দাবি করছে, চালের দাম বেড়ে ওঠায় কৃষকরা এর সুফল পাচ্ছেন। কিন্তু কর্তৃপক্ষের ধরনের বক্তব্যের পেছনে যে শক্ত যুক্তি তথ্য ছিল না, তার প্রমাণ বাংলাদেশ ধান গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (ব্রি) সংশ্লিষ্ট গবেষণা। কৃষকদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে হলে প্রান্তিক ক্ষুদ্র কৃষকদের সরাসরি বাজারে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে হবে। এক্ষেত্রে নির্দিষ্ট এলাকাভিত্তিক কৃষক সংগঠন তৈরি করে গ্রুপ মার্কেটিংয়ের মাধ্যমে করা যেতে পারে। তবে কাজটি করা কঠিন। অন্যদিকে মধ্যস্বত্বভোগীরা বেশ সংঘবদ্ধ। মাঠ পর্যায়ে কৃষি বিভাগের কর্মীরা উৎপাদনের পেছনে যে পরিমাণ শ্রম সময় ব্যয় করেন, তার কিছুটা সময় যদি ফসল বিক্রয়ে সহায়তা করতে পারতেন, তবে কৃষক কিছুটা লাভবান হতেন। যদিও বিপণন কাজটি করার দায়িত্ব বর্তায় কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের ওপর। কিন্তু কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের কার্যক্রম ইউনিয়ন বা উপজেলা পর্যায়ে নেই। আছে শুধু জেলা পর্যায়ে সীমিত জনবল নিয়ে। জেলা পর্যায়ে বাজার মনিটরিং করতেই তাদের হিমশিম খেতে হয়।

ভারতে পণ্যমূল্য নির্ধারণের মাধ্যমে কৃষকের স্বার্থ রক্ষা করা হয়। এটা প্রতি বছরই নির্ধারণ করা হয় সরকারিভাবে। কৃষকের জন্য উৎপাদিত পণ্যের ন্যূনতম মুনাফা নিশ্চিত করা এর উদ্দেশ্য। ভারতে বর্তমানে ২৩টি কৃষিপণ্যের সমর্থন মূল্য নির্ধারণ করা হয়ে থাকে। নির্ধারিত মূল্যের নিচে যাতে বাজারদর নেমে না যায়, সেজন্য সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে উৎপাদিত পণ্য ক্রয় করে নেয় সরকার। ভারত সরকার বিভিন্ন কৃষিপণ্যের মূল্য নির্ধারণ করেছে উৎপাদন খরচের ওপর শতকরা ৫০ শতাংশ মুনাফা হিসাব করে। মোট উৎপাদিত পণ্যের শতকরা ১৫ শতাংশ ক্রয় করা হচ্ছে এরূপ পূর্বনির্ধারিত মূল্যে। বাংলাদেশে ন্যূনতম সমর্থন মূল্য নির্ধারণের কোনো ব্যবস্থা নেই। তবে প্রচলন আছে ধান-চাল গমের সংগ্রহ মূল্য নির্ধারণের। এটা সাধারণত উৎপাদন খরচের ওপর -১০ শতাংশ মুনাফা দেখিয়ে নির্ধারণ করা হয়। এর পরিধিও সীমিত। মোট উৎপাদনের মাত্র - শতাংশ খাদ্যশস্য সংগ্রহ করা হয় উৎপাদন মৌসুমে। তাও ক্রয় করা হয় ব্যবসায়ী চাতালের মালিকদের কাছ থেকে। কৃষক তাতে সরাসরিভাবে লাভবান হন না। ফলে আমাদের দেশে প্রচলিত উৎপাদিত পণ্যের সংগ্রহ মূল্য স্থানীয় বাজারে তেমন প্রভাব বিস্তার করতে পারে না। তাতে কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হন কৃষক। কৃষিপণ্যের সংগ্রহ মূল্য নির্ধারণের জন্য কিছু নিয়ম প্রচলিত আছে। সেক্ষেত্রে আগের বছরের পণ্যমূল্য, উৎপাদন খরচ, খোলাবাজারে পণ্যমূল্যের চালচিত্র, আন্তর্জাতিক বাজারদর, সরকারি মজুদ মূল্যস্ফীতির হার ইত্যাদি প্রধান বিবেচ্য বিষয়। আমাদের দেশে বর্তমানে ধান-চালের সংগ্রহ মূল্য নির্ধারণ করা হয় মূলত উৎপাদন খরচের ওপর ভিত্তি করে। সরকারের পক্ষ থেকে উৎপাদন খরচ নির্ধারণের জন্য তিনটি সংস্থা নিয়োজিত রয়েছে। তাদের পক্ষ থেকে যে হিসাব উপস্থাপন করা হয়, তাতে ব্যবধান থাকে অনেক। স্বাভাবিকভাবেই পণ্যের সংগ্রহমূল্য নির্ধারণ প্রশ্নবিদ্ধ হয়। ব্যবস্থার পরিবর্তন প্রয়োজন।

কৃষকের যৌক্তিক মূল্যপ্রাপ্তি নিশ্চিত করতে বাজার ব্যবস্থাপনা উন্নয়নের পাশাপাশি মৌসুমের শুরুতে ধানের দাম নির্ধারণ করে দিতে হবে। মৌসুমের শুরুতেই কৃষকরা যাতে ধান মজুদ বা সংরক্ষণ করতে পারেন, সে ব্যবস্থাও নেয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে বাজার তদারকির দায়িত্বে থাকা বিপণন অধিদপ্তরকেও শক্তিশালী করতে হবে। বাজার থেকে ধান না কেনার কারণে ধানের বাজারে একচ্ছত্র আধিপত্য চালকল মালিকদের কাছেই তুলে দেয়া হচ্ছে। ধানের এত বড় বাজার এককভাবে চালকল মালিকদের কাছে রাখা মোটেও যৌক্তিক নয়। কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করাসহ পরিবহন বাজারজাতের প্রতিটি স্তরে নজরদারি বাড়াতে হবে। ভোক্তামূল্যে কৃষকের যৌক্তিক অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এগ্রিকালচারাল প্রাইস কমিশন দ্রুত গঠন করা প্রয়োজন। প্রত্যাশা থাকবে, কৃষি মন্ত্রণালয় বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন