রবিবার | অক্টোবর ২৪, ২০২১ | ৯ কার্তিক ১৪২৮

শেষ পাতা

ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে

অর্থ ছাড়ে জটিলতা বাস্তবায়ন বিলম্বিত হওয়ার শঙ্কা

শামীম রাহমান

রাজধানীর উত্তরা থেকে পল্লবী, আগারগাঁও, ফার্মগেট, শাহবাগ, টিএসসি হয়ে মতিঝিল যাবে মেট্রোরেল। এরই মধ্যে উত্তরা-আগারগাঁও অংশের কাজ প্রায় শেষ। চলছে আগারগাঁও থেকে মতিঝিল অংশের কাজ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি এলাকা থেকে তোলা ছবি: মো. মানিক

চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত এক্সিম ব্যাংক বেসরকারি ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড কমার্শিয়াল ব্যাংক অব চায়নার (আইসিবিসি) কাছ থেকে নেয়া ৮৬ কোটি ১০ লাখ ডলারে ঢাকার প্রথম এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ করছে তিন বিদেশী প্রতিষ্ঠান। ব্যাংক দুটি এরই মধ্যে দুই কিস্তিতে সাড়ে ১২ কোটি ডলারের বেশি অর্থ ছাড়ও করেছে। তবে প্রথম কিস্তির পর অর্থ ছাড় স্থগিত রেখেছে আইসিবিসি। প্রদেয় ঋণের সুদের ওপর কর অব্যাহতি না পাওয়ায় ব্যাংকটি অবস্থান নিয়েছে বলে জানিয়েছেন সেতু বিভাগের কর্মকর্তারা। এতে প্রকল্পটির বাস্তবায়ন বিলম্বিত হওয়ারও শঙ্কা প্রকাশ করেছেন তারা।

সরকারি-বেসরকারি অংশীদারির (পিপিপি) ভিত্তিতে ঢাকার বিমানবন্দর থেকে চট্টগ্রাম মহাসড়ক সংলগ্ন কুতুবখালী পর্যন্ত প্রায় ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ করা হচ্ছে। মূল এক্সপ্রেসওয়ে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ করছে থাইল্যান্ডভিত্তিক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ইতালিয়ান-থাই ডেভেলপমেন্ট লিমিটেড, চীনের শ্যাংডং ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিক অ্যান্ড টেকনিক্যাল করপোরেশন গ্রুপ লিমিটেড (সিএসআই) দেশটির রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন সিনো-হাইড্রো করপোরেশন লিমিটেড। এজন্য ফার্স্ট ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে (এফডিইই) নামে একটি বেসরকারি কোম্পানিও গঠন করা হয়েছে। অন্যদিকে প্রকল্পের ভূমি অধিগ্রহণ ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনে সহায়তা করছে বাংলাদেশ সরকার।

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান তিনটি এক্সিম ব্যাংক অব চায়নার কাছ থেকে ৪৬ কোটি ১০ লাখ ডলার আইসিবিসির সঙ্গে আরো ৪০ কোটি ডলার ঋণের জন্য চুক্তি করেছে। এখন পর্যন্ত এক্সিম ব্যাংক কোটি ৭০ লাখ হাজার আইসিবিসি কোটি ৮১ লাখ ৯০ হাজার ডলার প্রকল্পটির জন্য ছাড় করেছে।

সেতু বিভাগে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাংলাদেশ চীনের মধ্যে দ্বৈত কর পরিহারের বিদ্যমান চুক্তির আলোকে চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত এক্সিম ব্যাংককে প্রদেয় কর কর্তন অব্যাহতি সুবিধা দেয়া হয়েছে। অন্যদিকে আইসিবিসির প্রদেয় ঋণের সুদের ওপর ১০ শতাংশ উৎসে কর আরোপ করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)

সেতু বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, জাতীয় শিল্প নীতি, ২০১৬-এর পরিশিষ্ট - নির্মাণ শিল্প এবং পরিবহন যোগাযোগ খাতকে সেবা শিল্প হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সে হিসেবে এফডিইই কর্তৃক বাস্তবায়নাধীন ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ প্রকল্পটি ইন্ডাস্ট্রিয়াল প্রজেক্ট হিসেবে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) অনুমোদন নিবন্ধন পেয়েছে। তাই প্রকল্পটিকে ইন্ডাস্ট্রিয়াল আন্ডারটেকিং হিসেবে বিবেচনার সুযোগ রয়েছে, যার মাধ্যমে বিদেশী ঋণের সুদের ওপর কর অব্যাহতি পাওয়ার যোগ্য।

বিষয়টি নিয়ে এনবিআরের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগও করেন সেতু বিভাগের কর্মকর্তারা। শুরুতে ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পটিকে ইন্ডাস্ট্রিয়াল আন্ডারটেকিং হিসেবে বিবেচনা করে আইসিবিসি থেকে গৃহীত সুদের ওপর উৎসে কর কর্তন অব্যাহতি প্রদানের জন্য এনবিআরের চেয়ারম্যান বরাবর একটি আধা সরকারি পত্র দেন সেতু বিভাগের সচিব। পরে বিভাগের সচিবের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল এনবিআরের চেয়ারম্যানের সঙ্গে সাক্ষাৎও করেন। তবে আইসিবিসির প্রদেয় ঋণের সুদের ওপর উৎসে কর অব্যাহতি সুবিধা দিতে অপারগতা প্রকাশ করে এনবিআর।

পরবর্তী সময়ে বিষয়টি নিয়ে সরকারের পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ কর্তৃপক্ষের (পিপিপিএকার্যালয়ে একটি সভাও অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে সিদ্ধান্ত হয় সুদের ওপর কর অব্যাহতির জন্য পুনরায় এনবিআরে আবেদন করার। আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এনবিআর জানায়, এফডিইইকে ইন্ডাস্ট্রিয়াল আন্ডারটেকিং হিসেবে বিবেচনার সুযোগ নেই। আইসিবিসি বেসরকারি ব্যাংক হওয়ায় প্রদেয় সুদের ক্ষেত্রে ১০ শতাংশ উৎসে কর কর্তন হবে মর্মে একটি পত্রে জানিয়ে দেয় এনবিআর।

এদিকে ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের জন্য সুদের ওপর কর অব্যাহতি সনদ না পাওয়ায় প্রথম কিস্তিতে কোটি ৮১ লাখ ৯০ হাজার ডলারের পর আর কোনো অর্থ ছাড় করেনি আইসিবিসি। এমন পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পটির বাস্তবায়ন বিলম্বিত হওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

সম্প্রতি সড়ক পরিবহন সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের ২০২২ সালের ডিসেম্বরে এক্সপ্রেসওয়েটির বিমানবন্দর থেকে তেজগাঁও পর্যন্ত অংশটি চালুর লক্ষ্যের কথা জানিয়েছেন। তবে প্রকল্পের কর্মকর্তারা বলছেন, যথাসময়ে ঋণের কিস্তির অর্থ ছাড় না হলে আংশিকভাবে এক্সপ্রেসওয়েটি উন্মুক্ত করার যে পরিকল্পনা, তা বাস্তবায়ন করা কঠিন হয়ে দাঁড়াবে।

সম্প্রতি অনুষ্ঠিত প্রকল্পটির স্টিয়ারিং কমিটির (পিএসসি) সভাতেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। সভায় আইসিবিসি থেকে গৃহীত ঋণর ওপর উৎসে কর কর্তন বিষয়ে অব্যাহতির জন্য এনবিআর থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ পর্যন্ত অপেক্ষার করার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

বিষয়টি সম্পর্কে যোগাযোগ করা হলে সেতু বিভাগের সচিব আবু বকর ছিদ্দীক বণিক বার্তাকে বলেন, চীন-বাংলাদেশের মধ্যে করা দ্বিপক্ষীয় চুক্তির কারণে চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত এক্সিম ব্যাংক কর অব্যাহতি সুবিধা পেয়ে আসছে। কিন্তু সুবিধা কোনো বেসরকারি ব্যাংকের পাওয়ার কথা নয়। কিন্তু বেসরকারি আইসিবিসি সুদের ওপর কর অব্যাহতি না পাওয়ায় অর্থ ছাড় করছে না। আইসিবিসির অর্থায়ন এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রকল্প বাস্তবায়নের সুবিধার্থে আমরা এনবিআরের কাছে কর অব্যাহতির অনুরোধ জানিয়েছি। আমরা প্রত্যাশা করছি, বিষয়টি নিয়ে এনবিআর যথাযথ পদক্ষেপ নেবে।

প্রসঙ্গত, হাজার ৯৪০ টাকা ব্যয়ে নির্মিত হচ্ছে ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে। বাস্তবায়ন হচ্ছে তিনটি ধাপে। প্রথম অংশ বিমানবন্দর-বনানীর অগ্রগতি ৬৬ দশমিক ২৫ শতাংশ। দ্বিতীয় অংশ বনানী-মগবাজারের অগ্রগতি ২১ দশমিক ৫০ শতাংশ আর তৃতীয় অংশ মগবাজার-কুতুবখালীর অগ্রগতি দশমিক ৩৩ শতাংশ। গড় অগ্রগতি ৩০ দশমিক ৫০ শতাংশ।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন