শনিবার | অক্টোবর ২৩, ২০২১ | ৮ কার্তিক ১৪২৮

সম্পাদকীয়

বিশ্লেষণ

জাতীয় অর্থনৈতিক হিসাব বনাম জাতীয় পরিবেশগত হিসাব

উইলিয়াম নরডহাউস

একবার নিউ মেক্সিকোর আলবুকার্কি শহর ছেড়ে যাওয়ার সময় বিমানে এক সুনন্দ ম্যাগাজিন নিয়েছিলাম। সেখানে মোট জাতীয় উৎপাদন (জিএনপি) বিষয়ে পড়ছিলাম সমালোচনাধর্মী একটি চমত্কার নিবন্ধ। ওই নিবন্ধ পড়তে পড়তে একতরুণ বিপ্লবীরনিম্নোক্ত উদ্ধৃতির মুখোমুখি হয়েছিলাম: ‘আমাকে জিএনপি সম্পর্কে বলো না। আমার কাছে সত্যিই এটি মোট জাতীয় দূষণ ছাড়া আর কিছু নয়।

মনে মনে ভেবেছিলাম, এটা বেশ চমত্কার চিন্তা বটে, তবে এটা কি ঠিক?

আসলে এটি সর্বৈব মিথ্যা। আমাদের উৎপাদনের (আউটপুট) হিসাব প্রক্রিয়ায় দূষণের বিষয়টি গণনা করা হয় না। সেখানে গাড়ির মতো পণ্য সেবাগুলো অন্তর্ভুক্ত করা হয় কিন্তু সেগুলো বাতাসে কতটুকু কার্বন মনো-অক্সাইড নিঃসরণ করে তা হিসাব করা হয় না। এখানে একটা বিষয় বিবেচনায় রাখা জরুরি যে জাতীয় উৎপাদনের পরিমাপকগুলো দূষণ বা অর্থনীতিতে এর অন্য বাড়তি প্রভাব নির্ণয়ে যথেষ্ট সঠিক নয়। সেজন্য এসব অনুঘটক যথাযথভাবে প্রতিফলন ঘটায় এমন পরিমাপকগুলো উন্নয়নে একটা জোরালো প্রচেষ্টা নেয়া হয়েছে। তার মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিমাপক হলোগ্রিন ন্যাশনাল অ্যাকাউন্টিং অবশ্য গ্রিন ন্যাশনাল অ্যাকাউন্টিং একটা আপাত সমাধান বটে, তবে সেটি বর্তমানে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি।

জাতীয় উৎপাদনের অধিকাংশ আলোচনায় মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) কথা বারবার উল্লেখ করা হয়। আর জিডিপি মানে হলো উৎপাদনে ব্যবহূত পণ্য সেবার মূল্য বাদে একটি অর্থনীতিতে উৎপাদিত মোট পণ্য সেবার মূল্য। জিডিপি এভাবে খাদ্যের মতো ভোগ্যপণ্য, নতুন বাড়ি নির্মাণের মতো বিনিয়োগ, সরকারি উৎপাদন বৈদেশিক বাণিজ্যের সমন্বয়সংক্রান্ত বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করে।

জিডিপির ব্যাপারে অনেক সমালোচনা আছে। এর একটি প্রাথমিক সমস্যা এই যে এতে মোট বিনিয়োগ যোগ করা হয়, অথচ অবচয় বাদ দেয়া হয় না। কাজেই এটি এক বছরে নির্মিত সব বাড়িই অন্তর্ভুক্ত করে বটে, কিন্তু অগ্নিদুর্ঘটনায় পুড়ে যাওয়া বা ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িগুলোকে সেখান থেকে বাদ দেয় না। একটা ভালো পরিমাপক মোট উৎপাদনের অংশ হিসেবে কেবল নিট বিনিয়োগ অন্তর্ভুক্ত করবে। এটি নাগরিকদের আয়ের ওপর দৃষ্টি দিতেও সহায়ক, যা দেশজ উৎপাদনের বিপরীতে জাতীয় উৎপাদনকে প্রতিনিধিত্ব করবে। জিডিপি থেকে অবচয় বাদ দিয়ে এবং নাগরিকদের আয়ের ওপর নজর দিয়ে আমার নিট জাতীয় উৎপাদন (এনএনপি) পেতে পারি। 

এখানে প্রশ্ন উঠতে পারে, যদি এএনপি দেশের উৎপাদন নির্ণয়ে অধিকতর ভালো পরিমাপক হয়, তাহলে কেন জাতীয় হিসাবগুলো জিডিপির ওপর নির্ভরশীল? এর একটা কারণ অবচয় হিসাব করা কঠিন, অন্যদিকে মোট বিনিয়োগ আবার খুব সঠিকভাবে হিসাব করা যায়। অধিকন্তু, এনএনপি দেশের সব নাগরিকের উৎপাদিত পণ্য সেবা অন্তর্ভুক্ত করলেও সেসব পণ্য-সেবার গুরুত্বপূর্ণ ব্যয় বাদ দেয়, যা বাজারে বিক্রি হয় না। যেমন একটি ইলেকট্রিক ইউটিলিটির উৎপাদিত বিক্রীকৃত বিদ্যুৎ এটি অন্তর্ভুক্ত করলেও ওই ইউটিলিটি কর্তৃক সৃষ্ট দূষণের স্বাস্থ্য ক্ষতি/ঝুঁকি অন্তর্ভুক্ত করা হয় না।

কাজেই জিডিপি এনএনপির সমস্যা হলো, সেগুলো দূষণের ক্ষতি বাদ দেয়ার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করে না। বিপরীতে, সবুজ উৎপাদনের (গ্রিন আউটপুট) একটি পরিমাপক নেতিবাচক বহিস্থ অভিঘাতসহ (এক্সটার্নিলিটি) বাজারবহির্ভূত পণ্য, সেবা এবং বিনিয়োগ অন্তর্ভুক্ত করবে। 

বাজারবহির্ভূত ফ্যাক্টরগুলো হিসাব প্রক্রিয়ায় মূল্যায়ন

অধিকাংশ বিশেষজ্ঞ সম্মত হবেন যে দূষণ, জলবায়ু পরিবর্তন, অন্য বাজারবহির্ভূত কর্মকাণ্ড এবং বহিস্থ অভিঘাত কমানো-সংশোধনের জন্য অর্থনৈতিক হিসাবগুলোয় সেগুলোর নির্ণয় প্রক্রিয়ার অন্তর্ভুক্তি জরুরি। কিন্তু বাস্তবে এটা কীভাবে করা যেতে পারে? আমরা খাদ্য বাসস্থানের মূল্যশৃঙ্খল-সৃষ্ট পানির দূষণ বা কার্বন নিঃসরণের অর্থনৈতিক ক্ষতি বাদ দেয়ার উপায় কীভাবে বের করতে পারব?

এটা একটা অসম্ভব কাজ মনে হতে পারে কিন্তু হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়াত অধ্যাপক মার্টিন এল ওয়েইটজম্যান এর পথটা আমাদের দেখিয়েছেন। ওয়েইটজম্যানের অ্যাপ্রোচ (যেটি গ্রিন অ্যাকাউন্টিং কিংবা পূর্ণ আয়ের অ্যাকাউন্টিংয়ে একীভূত হয়েছে) আসলে বেশ স্বজ্ঞামূলক। ধারণাটি হলো, বাজারবহির্ভূত কর্মকাণ্ড বা প্রক্রিয়াগুলো স্ট্যান্ডার্ড জাতীয় অর্থনৈতিক হিসাবগুলোয় (যা এখন কেবল বাজার লেনদেনগুলো অন্তর্ভুক্ত করে) অন্তর্ভুক্ত করা। স্ট্যান্ডার্ড হিসাবগুলো উৎপাদনের পরিমাণ মূল্যের (আপেল, কাঠ, গ্যাস, গাড়ি প্রভৃতি) ওপর তথ্য সংগ্রহ করে, দাম হিসেবে পণ্যের মূল্য পরিমাণ হিসাব করে এবং তারপর ভোক্তা অন্য খাতে বিক্রি হওয়া চূড়ান্ত উৎপাদনের মূল্যের সমষ্টি হিসেবে জাতীয় উৎপাদন হিসাব করে।

ওয়েইটজম্যান অ্যাপ্রোচে ক্ষতিকর বহিস্থ অভিঘাতের একটা আনুমানিক দাম নির্ধারণ করা হয় এবং তারপর সেগুলোর মূল্য সার্বিক মূল্যের সঙ্গে যোগ করা হয়। তবে এখানে ক্ষতিকর কর্মকাণ্ডগুলোর একটা ঋণাত্মক মূল্য (নেগেটিভ প্রাইস) আছে, কারণ সেগুলো ভালোর চেয়ে খারাপ। যদি এক বছরে পাঁচ মিলিয়ন টন বায়ুদূষণ হয় এবং বায়ুদূষণসৃষ্ট ক্ষতির পরিমাণ যদি প্রতি টনে ১০০ ডলার হয়, তাহলে জাতীয় উৎপাদন থেকে ৫০০ মিলিয়ন ডলার বাদ দিতে হবে।   

প্রক্রিয়া মনে হয় সরল-সিধাই হবে, ‘দূষণের মূল্যধারণাটি বাদে। মুদির দোকানে গেলে আলুর দাম জানা যায় কিন্তু একটি ট্রাক থেকে নিঃসরিত কার্বনের মূল্য কত, তা কি সহজেই জানা সম্ভব? প্রতিষ্ঠান এবং তার ব্যবসায়িক হিসাবের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে এর মূল্য শূন্য, কারণ জাতীয় অর্থনৈতিক হিসাবেসেলস অব সিও এয়ার পলিউশননামে কোনো আইটেম নেই। কিন্তু মানুষের ক্ষতি তো শূন্য নয়। কেননা কার্বন দূষণ অব্যাহতভাবে জনস্বাস্থ্যের ক্ষতি বাড়ায়।

ওয়েইটজম্যান অ্যাপ্রোচ অনুযায়ী, যদি প্রতি টন কার্বন ১০০ ডলারের ক্ষতি করে তাহলে গ্রিন আউটপুট হিসেবে দূষণের ব্যয়/ক্ষতি অন্যান্য বহিস্থ অভিঘাত বাদ দেয়ার সময় ব্যবহার করতে সেটিই হলো যথাযথ মূল্য। তবে ধরনের দূষণ অন্য বহিস্থ অভিঘাতগুলো হিসাব করা আসলে বেশ কঠিন। কারণ এক্ষেত্রে তথ্য পাওয়া দুষ্কর বলা চলে। 

সমস্যা এবং অন্য পরিমাপকের জটিলতার কারণে কোনো দেশেই ব্যাপকভিত্তিক সমন্বিত পরিবেশগত হিসাবের অস্তিত্ব নেই। তবে আমরা ঘাটতিকে কাজে লাগিয়ে গ্রিনহাউজ (জিএইচজি) নিঃসরণ বায়ুদূষণের মতো দায়ী বিষয়গুলো চিহ্নিত করার মাধ্যমে পরিবেশগত ক্ষয়ক্ষতির হিসাব নির্ণয়ে আরো গবেষণা করতে পারি।    

ধারণাগত দৃষ্টিকোণ থেকে একটি সূচনাবিন্দু হতে পারে এনএনপি। একটি প্রাক্কলন দাঁড় করাতে আমরা এনএনপি থেকে নেতিবাচক বহিস্থ অভিঘাত অন্য ভুলভ্রান্তি যোগ-বিয়োগ করাসহ একটি লেভেল কারেকশন এবং গ্রোথ কারেকশন উভয়ই হিসাব করতে পারি। এসব বহিস্থ অভিঘাত বাড়লে বোঝা যাবে সবুজ প্রবৃদ্ধি হার কমবে, আর ওইসব অভিঘাত কমলে বোঝা যাবে সবুজ প্রবৃদ্ধি হার বাড়বে। 

কার্বনের হিসাব

এবার কিছু প্রকৃত ঘটনা সমীক্ষায় দৃষ্টি দেয়া যাক। এক্ষেত্রে প্রথম উদাহরণ হলো জলবায়ু পরিবর্তনের বহিস্থ অভিঘাতের প্রভাব, বিশেষভাবে কার্বন নিঃসরণ। এটা এত সহজ যে একটি স্প্রেডশিটের ওপর যে কেউ হিসাব করতে পারবে। এক্ষেত্রে মূল বিষয় হলো পরিমাণ দামের প্রথমে হিসাব সংগ্রহ করা, তারপর পূর্ণাঙ্গ তথ্যের সঙ্গে ওই হিসাব সমন্বয় করা। কার্বনের ক্ষেত্রে আপনি প্রথমে জিএইচজি নিঃসরণের হিসাব দিয়ে শুরু করতে পারেন এবং তারপর পরিমাণটা নিঃসরণের মূল্য (যেমনটা যুক্তরাষ্ট্রের সরকারকার্বনের সামাজিক ক্ষতিরহিসাব নির্ণয় করেছে) দিয়ে গুণ করতে পারেন।                     

প্রতি টনে ৪৪ ডলার সমপরিমাণ প্রাক্কলিত সামাজিক ক্ষতির ভিত্তিতে ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র দশমিক বিলিয়ন টন কার্বন নিঃসরণ করেছে। মানে হলো, ওই বছরে দেশটির ১৫ দশমিক ট্রিলিয়ন ডলারের উৎপাদন (আউটপুট) থেকে ২৩৩ দশমিক বিলিয়ন ডলার বাদ দিতে হবে। অর্থাৎ লেভেল কারেকশনের হার দশমিক শতাংশ।

এবার প্রবৃদ্ধির প্রভাবেও নজর দেয়া যাক। তথ্যে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের জলবায়ু-শোধিত এএনপি আসলে বেড়েছিল ১৯৭৩ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে। তবে এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার, ওই সময় পর্বে উৎপাদনের তুলনায় প্রতি বছর নিঃসরণ কমেছে দশমিক শতাংশ হারে। গ্রিন এনএনপি গতানুগতিক এনএনপি থেকে দ্রুতগতিতে বেড়েছে।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, অধিক উচ্চাকাঙ্ক্ষী জলবায়ু পরিবর্তনের লক্ষ্যমাত্রার (প্যারিস জলবায়ু চুক্তিতে নির্ধারিত বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ডিগ্রি সেলসিয়াসের সীমায় নিয়ে আসা) সঙ্গে গ্রোথ কারেকশন কতটা সংগতিপূর্ণ হবে? এটা নিশ্চয়ই অধিক উচ্চতর সামাজিক ক্ষতির ইঙ্গিত দেবে। অতএব, হিসাবে কার্বনের মূল্যও বেশি দেখা যাবে। একটি আনুমানিক হিসাব বলে যে অধিক রক্ষণশীল জলবায়ু টার্গেটেও কার্বনের দাম পাঁচ গুণের বেশি হবে।

যখন পরিবেশগত ক্ষতি বেশি হয় তখন এটি ইঙ্গিত দেয় যে প্রকৃত উৎপাদনও গতানুগতিকভাবে নির্ণীত উৎপাদনের চেয়ে কম। তবে যখন পরিবেশগত ক্ষতি অবনতিশীল তখন গ্রোথ কারেকশন একই সঙ্গে ধনাত্মক বেশি থাকে।  

দূষণের দাম ক্ষতি 

এবার আমি আরো অধিক জটিল একটি সমস্যার ব্যাপারে আলোকপাত করছি। আর সেটি হলো বায়ুদূষণ। বায়ুদূষণের মধ্যে কয়লা পোড়ানো অন্য কর্মকাণ্ডের মতো কিছু মরণঘাতী ক্ষতিকর বহিস্থ অভিঘাত যুক্ত। এসব কর্মকাণ্ডের বেশির ভাগই নিয়ন্ত্রিত হয় যুক্তরাষ্ট্রে, কিন্তু সেখানে কেবল গুটিকয় কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রেই পরিবেশগত ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ করা হয়েছে, যা সামাজিক ব্যয়ের প্রতিফলন ঘটায়।

২০১১ সালে আমিসহ নিকোলাস মুলার রবার্ট মেন্ডেলসনের একটি গবেষণায় আমরা বায়ুদূষণের ক্ষতির একটি মানসম্মত হিসাব নির্ণয় করেছি। সেটি করেছি দশ হাজার উৎসের প্রধান পাঁচ দূষকের (নাইট্রোজেন অক্সাইডস, সালফার ডাই-অক্সাইড, সূক্ষ্ম পার্টিকুলেট ম্যাটার, অ্যামোনিয়া উদ্বায়ী অর্গানিক উপাদান) পরিমাণকে এর দাম (দূষণের প্রতি ইউনিটে ক্ষতি) দিয়ে গুণ করে। আমরা যা পেয়েছি তা হলো, এনএনপির শতাংশ হিসেবে সার্বিক ক্ষতি ১৯৯৯ সালে মোট উৎপাদনের দশমিক শতাংশ থেকে ২০০৮ সালে দশমিক শতাংশে নেমে এসেছে।

আবার প্রবৃদ্ধিতেও এর প্রভাব ছিল নেতিবাচক। কারণ ওই একই সময় পর্বের শেষে দূষণের বিয়োজন (যেমনটা কার্বনের ক্ষেত্রে) ছিল শুরুর চেয়ে কম। দূষণে হ্রাস সার্বিক এনএনপি প্রবৃদ্ধি বাড়াতে (প্রতি বছর দশমিক শূন্য শতাংশ থেকে দশমিক ৪৫ শতাংশ) বড় প্রভাব রেখেছিল, যা দূষণের অর্থনীতির আলোচনায় জোরালোভাবে তেমনটা আসেনি। 

গ্রিনহাউজ গ্যাস বায়ুদূষণ দুটি উদাহরণ গ্রিন অ্যাকাউন্টিংয়ের ক্ষেত্রগুলোয় আগ্রহ নিঃশেষ হওয়ার কথা বলে না। অন্য সংশ্লিষ্ট খাতের সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত হবে বন, পানি, সড়ক-মহাসড়কে যানজট, বিষাক্ত বর্জ্য প্রভৃতি। তবে সেগুলোর ব্যাপারে প্রাক্কলন আছে খুব কমই। এরই মধ্যে বর্ধিত হিসাবের প্রাক্কলনগুলো তৈরি হয়েছে স্বাস্থ্য, রান্না, পারিবারিক সেবা অবসরের মতো অন্য খাতগুলোয়। কিন্তু সার্বিক আউটপুট প্রবৃদ্ধির ওপর এসব খাতের লক্ষণীয় প্রভাব থাকলেও সেগুলো সাধারণত গ্রিন অ্যাকাউন্টিংয়ের এলাকার বাইরে পড়ে যায়।  

গ্রিন অ্যাকাউন্টিং আমাদের আসলে কী দেখায়

এখানে গ্রিন ন্যাশনাল আউটপুটের একটা সারাৎসার টানার চেষ্টা করছি। বর্তমানে গতানুগতিক জাতীয় হিসাবগুলোয় আমরা যখন সম্পদ পরিবেশের হিসাবের প্রভাব অন্তর্ভুক্ত করি, তখন উৎপাদনের মাত্রার দিক থেকে লক্ষণীয় পার্থক্য হতে পারে। একটি খসড়া প্রাক্কলন হলো, বহির্ভূত খাতগুলোর (যেগুলো পর্যালোচনা করা হয়েছে) অন্তর্ভুক্তি খোদ যুক্তরাষ্ট্রে ১০ শতাংশের উৎপাদন বিয়োজন করবে। তবে অসম্পূর্ণ গবেষণার কারণে পুরোটা নিশ্চয়ই আরো বেশি হবে। 

ভুলত্রুটির সংশোধন অবশ্য গ্রিন আউটপুটের প্রবৃদ্ধির হার বাড়তে থাকবে, যুক্তরাষ্ট্রে গত অর্ধশতক পর্যন্ত অন্তত তা- হয়েছে। এর কারণ এই যে সার্বিক অর্থনীতির অনুপাতে দূষণের অধিকাংশ সূচকই কমেছে। সেটা মূলত হয়েছে পরিচ্ছন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্র, কারখানা অটোমোবাইলের কারণে। পণ্য সেবার তুলনায় এটিই হলো দূষণের প্রবৃদ্ধি, যা প্রবৃদ্ধির হার প্রভাবিত করে। নিরীক্ষিত সময় পর্যন্ত খাতগুলোয় প্রবৃদ্ধির প্রভাব প্রতি বছর দশমিক শতাংশীয় পয়েন্টের কিছু বেশি। এটিও সত্য, হিসাব থেকে প্রধান খাতগুলো বাদ পড়েছে। কিন্তু আনুমানিক হলেও এসব সংখ্যা অবশ্য অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ বহিস্থ অভিঘাতগুলো কিছুটা ধারণ করে। 

যুক্তরাষ্ট্রের পরিবেশগত নীতিগুলোর পর্যবেক্ষণ যে প্রকৃত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে যোগ করা হচ্ছে, সেটি পরিবেশগত নীতি সম্পর্কে আলোচনা-বিতর্কের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। আমি এটিকে পরিবেশ আন্দোলনের একটি বড় বিজয় হিসেবে মনে করি। এই বিস্ময়কর পর্যবেক্ষণ বেশ মজার। আমরা যদি যুক্তরাষ্ট্রে পরিবেশগত বিধিবিধান প্রণয়ন শুরু হওয়া থেকে পরবর্তী অর্ধশতকে ফিরে আসি, তাহলে দেখব প্রান্তিক ব্যয়ের চেয়ে বহিস্থ অভিঘাতসহ দূষণ কমানের প্রান্তিক সুফল অনেক বেশি ছিল। প্রকৃতপক্ষে পরিবেশগত নীতি ছিল নিচে ঝুলে থাকা সস্তা ফলের মতো, যা বেশ ন্যূনতম ব্যয়ে স্বাস্থ্য অন্য ক্ষতি কমিয়েছে। 

যদি শুধু স্ট্যান্ডার্ড অর্থনৈতিক হিসাবগুলোর দিকে তাকাই, তাহলে আমরা নিচে ঝুলে থাকা পরিবেশগত ফল তোলার সঙ্গে যুক্ত অর্থনৈতিক কল্যাণে অগ্রগতিগুলো বড় মাত্রায় হারাব। তবে আমরা যদি বহিস্থ সুফলগুলো অন্তর্ভুক্ত করতে আমাদের দিগন্ত সম্প্রসারণ করি তাহলে দেখব গত অর্ধশতকের পরিবেশভিত্তিক নীতিগুলো আসলে প্রবৃদ্ধি লক্ষণীয় মাত্রায় উন্নয়ন ঘটিয়েছে।   

কাজেই তরুণ বিপ্লবীরা যদি পুরনো বিপ্লবী হিসেবে আজকে পরিভ্রমণ করেন তাহলে জাতীয় হিসাবগুলোর ব্যাপারে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণ ভিন্ন হতে পারে। যারা দাবি করেন যে পরিবেশগত বিধিবিধানগুলো অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ক্ষতি করে, তা পুরোপুরিভাবে ভুল। কারণ তারা ভুল মানদণ্ড ব্যবহার করছেন। নেতিবাচক সংকেত সত্ত্বেও দূষণ আমাদের উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ পরিমাপক হতে পারে। আমাদের মান হিসেবে আমরা যদি গ্রিন ন্যাশনাল আউটপুট ব্যবহার করি তাহলে বলতে হবে পরিবেশগত নিরাপত্তা বিধিমালা সাম্প্রতিক বছরগুলোয় সত্যিকার অর্থে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্য মাত্রায় বাড়িয়েছে।

[স্বত্ব:
প্রজেক্ট সিন্ডিকেট
]

   

উইলিয়াম নরডহাউস: নোবেলজয়ী মার্কিন অর্থনীতিবিদ, ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক

দ্য স্পিরিট অব গ্রিন: দি ইকোনমিকস অব কলিজন অ্যান্ড কনটেজিয়নস ইন ক্রাউডেড ওয়ার্ল্ড গ্রন্থের লেখক

ভাষান্তর: হুমায়ুন কবির

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন