বৃহস্পতিবার | অক্টোবর ২৮, ২০২১ | ১২ কার্তিক ১৪২৮

শেষ পাতা

থার্মেক্স, ক্রিসেন্ট ও এননটেক্স

বড় তিন ঋণ পুনঃতফসিল হলে জনতা ব্যাংকের খেলাপি অর্ধেকে নামবে

নিজস্ব প্রতিবেদক

রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংকের খেলাপি ঋণের সিংহভাগই আটকে আছে হাতে গোনা কয়েকটি শিল্প গ্রুপের কাছে। বর্তমানে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে থার্মেক্স, ক্রিসেন্ট এননটেক্স গ্রুপের ঋণই রয়েছে হাজার কোটি টাকার বেশি। গ্রুপগুলোর খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল হলে জনতা ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ অর্ধেকে নামবে। তিনটি গ্রুপেরই খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিলের সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে বলে ব্যাংকটির বার্ষিক সাধারণ সভায় (এজিএম) তুলে ধরা হয়েছে।

সম্প্রতি রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংকের ১৪তম এজিএম অনুষ্ঠিত হয়। সভায় ২০২০ সালের আর্থিক প্রতিবেদন অনুমোদনসহ ব্যাংকটির সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। জনতা ব্যাংকের চেয়ারম্যান . এস এম মাহফুজুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভার কার্যবিবরণীর অনুলিপি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২০২০ সালে ৭০৯ কোটি টাকা পরিচালন মুনাফা করা জনতা ব্যাংক ২০১৯ সালে ৯৮১ কোটি টাকা পরিচালন মুনাফা অর্জন করেছে। গত বছর খেলাপি ঋণ থেকে নগদ ১৯৭ কোটি টাকা আদায়ের পাশাপাশি অবলোপনকৃত ঋণ থেকেও ৪৮ কোটি টাকা আদায় করতে পেরেছে ব্যাংকটি। তবে খেলাপি ঋণের পরিমাণ নিয়ে এজিএমে ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আব্দুছ ছালাম আজাদ অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।

আব্দুছ ছালাম আজাদ বলেন, খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনার জন্য আমরা সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাচ্ছি। গত বছর ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৮৬৭ কোটি টাকা কমেছে। তার পরও আমাদের ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৩ হাজার ৭৩৬ কোটি টাকা। খেলাপি হওয়া ঋণের অর্ধেকের বেশি মাত্র কয়েকটি শিল্প গ্রুপের কাছে। এর মধ্যে থার্মেক্স, ক্রিসেন্ট, এননটেক্স আরএসআরএম গ্রুপের খেলাপি ঋণ নিয়মিত করার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সহযোগিতা দরকার। মাত্র চারটি গ্রুপের ঋণ নিয়মিত হলে জনতা ব্যাংকের কোনো পিছুটান থাকবে না।

তবে মুহূর্তে জনতা ব্যাংকের বড় সংকট হিসেবে সঞ্চিতি ঘাটতির বিষয়টি এজিএমে উঠে এসেছে। খেলাপি ঋণ বেশি হওয়ায় বড় ধরনের সঞ্চিতি ঘাটতিতে পড়েছে জনতা ব্যাংক। ২০২০ সাল শেষে ব্যাংকের সঞ্চিতি সংরক্ষণের প্রয়োজন ছিল ১৬ হাজার ৮৩ কোটি টাকা। একই সময়ে মাত্র হাজার ৩৬৭ কোটি টাকা সঞ্চিতি সংরক্ষণ করতে পেরেছে ব্যাংকটি। হিসেবে জনতা ব্যাংকের সঞ্চিতি ঘাটতির পরিমাণ ১১ হাজার ৭১৬ কোটি টাকা। বিপুল ঘাটতি পূরণে অ্যাকশন প্ল্যান বাস্তবায়ন করা হচ্ছে বলে জনতা ব্যাংকের এমডি এজিএমের বক্তব্যে তুলে ধরেন।

আর্থিক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে অডিট আপত্তি বড় অন্তরায় উল্লেখ করা হয়। বর্তমানে জনতা ব্যাংকের অডিট আপত্তির সংখ্যা হাজার ৬১০, যার সঙ্গে জড়িত টাকার পরিমাণ ৪৬ হাজার ২৩৯ কোটি। আর্থিক সংশ্লিষ্টতায় যা রাষ্ট্রায়ত্ত অন্য ব্যাংকগুলোর তুলনায় সবচেয়ে বেশি। সভায় আপত্তির সংখ্যা দ্রুত কমিয়ে আনার তাগাদা দেয়া হয়। ২০১৯ সালে ব্যাংকের লোকসানি শাখা ছিল ৫০টি, ২০২০ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫১টিতে। সুশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে লোকসানি শাখাগুলোকে দ্রুত লাভজনক শাখায় পরিণত করতে সঠিক কর্মসূচি পরিকল্পনা গ্রহণ এবং তা বাস্তবায়ন করতে বলা হয়।

এজিএমে আব্দুছ ছালাম আজাদ ব্যাংকটির সামগ্রিক পরিস্থিতি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ২০২০ সালে ব্যাংকের পরিচালন মুনাফা বেড়েছে। নভেল করোনাভাইরাসের কারণে ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত না হলে খেলাপি ঋণের হার আরো কমানো যেত। গত এক বছরে কৃষি খাতে জনতা ব্যাংকের ঋণ হাজার ৮৩১ কোটি টাকা বেড়ে হাজার ৬৯ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। সিএসএমই খাতের ঋণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১ হাজার ২৭৯ কোটি টাকা। ২০২০ সালে জনতা ব্যাংক করপোরেট আয়কর বাবদ ২১৬ কোটি টাকাসহ বিভিন্ন উৎসে কর, ভ্যাট আবগারি শুল্ক হিসেবে সরকারি কোষাগারে মোট ৭৩৮ কোটি ৭৩ লাখ টাকা জমা দিয়েছে।

অর্থঋণ মামলা, পিডিআর অ্যাক্ট, দেউলিয়া আদালত আবুধাবির আদালত মিলিয়ে জনতা ব্যাংক ১৮ হাজার ৪৪৭টি মামলা পরিচালনা করছে। এসব মামলায় সম্পৃক্ত অর্থের পরিমাণ ১৬ হাজার ৪২ কোটি টাকা। এজিএমে জনতা ব্যাংক এমডি বিষয়ে বলেন, করোনার কারণে ২০২০ সালের উল্লেখযোগ্য সময় দেশের আদালতগুলো বন্ধ ছিল। পরবর্তী সময়ে ভার্চুয়াল মাধ্যমে আদালত চালু হলেও কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে মামলার সংখ্যা কমিয়ে আনা সম্ভব হয়নি। তবে বিভিন্ন আদালতে ব্যাংকের বিদ্যমান মামলাগুলো তদারকি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার জন্য ডিজিটাল লিটিগেশন ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম নামে নতুন একটি সফটওয়্যার চালু করা হয়েছে।

নভেল করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে এখন পর্যন্ত জনতা ব্যাংকের ২০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী মারা গেছেন। সভায় মৃত্যুবরণকারী কর্মীদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানানো হয়। এজিএমে জনতা ব্যাংকের পরিচালক অজিত কুমার পাল, মেশকাত আহমেদ চৌধুরী, কেএম সামছুল আলম, মোহাম্মদ আসাদ উল্লাহ, জিয়াউদ্দিন আহমেদ, মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন মো. হারুন অর রশিদ মোল্লা অংশ নেন। এছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মো. হুমায়ুন কবির, জনতা ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. জসিম উদ্দিন, মো. আব্দুল জব্বার, একেএম শরীয়ত উল্যাহ ডিজিটাল মাধ্যমে সংযুক্ত ছিলেন।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন