শনিবার | অক্টোবর ২৩, ২০২১ | ৭ কার্তিক ১৪২৮

শেষ পাতা

চট্টগ্রামের পরীর পাহাড়

স্থাপনা নির্মাণ নিয়ে মুখোমুখি প্রশাসন ও আইনজীবীরা

সুজিত সাহা, চট্টগ্রাম ব্যুরো

পরীর পাহাড়ে আইনজীবী সমিতির নির্মিত ভবনগুলোর অধিকাংশেই কার পার্কিংয়ের সুযোগ না থাকায় রাস্তায় এমন দৃশ্য দেখা যায় ছবি: নিজস্ব আলোকচিত্রী

চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী পরীর পাহাড়। ব্রিটিশ আমলে স্থানীয় জেলা প্রশাসন আদালত ভবন গড়ে উঠেছিল এখানেই। পরে বিভিন্ন সময়ে সরকারি বিভিন্ন স্থাপনাসহ গড়ে উঠেছে আইনজীবীদের পাঁচটি ভবন। সম্প্রতি ১২ তলাবিশিষ্ট আরো দুটি ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে স্থানীয় আইনজীবী সমিতি। এতে আপত্তি তুলে স্থানীয় জেলা প্রশাসন বলছে, সরকারি খাস খতিয়ানভুক্ত জমি দখল করে অনুমোদনহীনভাবে স্থাপনা দুটি নির্মাণ করছে আইনজীবী সমিতি।

নিয়ে সম্প্রতি মাঠ প্রশাসনের পক্ষ থেকে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগকে একটি প্রতিবেদন দেয়া হয়েছে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের পক্ষ থেকে উত্থাপন করা হলে পরীর পাহাড় সংরক্ষণে পদক্ষেপ নেয়ার বিষয়টিতে প্রধানমন্ত্রীও অনুমোদন দিয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গিয়েছে। এর ভিত্তিতে শিগগিরই মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের পক্ষ থেকে পাহাড়সংলগ্ন এলাকায় স্থাপনা নির্মাণ বন্ধে আইন বিচার বিভাগকে নির্দেশনা দেয়া হতে পারে।

-সংক্রান্ত নথিতে বলা হয়েছে, চট্টগ্রাম নগরের কেন্দ্রস্থলে পাহাড়ের চূড়ায় প্রশাসনিক প্রাণকেন্দ্র চট্টগ্রাম কোর্ট বিল্ডিং অবস্থিত। অংশে রয়েছে বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, জেলা দায়রা জজ আদালতসহ মোট ৭১টি আদালত। জেলা প্রশাসকের নামে এখানে সরকারের নম্বর খাস খতিয়ানভুক্ত ১১ দশমিক ৭২ একর জায়গা রয়েছে। সরকারি ভবনের বাইরে নম্বর খাস খতিয়ানভুক্ত জায়গায় পাহাড় টিলা কেটে অবৈধভাবে পাঁচটি ঝুঁকিপূর্ণ বহুতল ভবন নির্মাণ করেছে চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতি। ফায়ার সার্ভিস সিভিল ডিফেন্স কর্তৃপক্ষও স্থাপনাগুলো পাহাড়ধস, ভূমিকম্প, অগ্নিকাণ্ড ইত্যাদি দুর্যোগের ক্ষেত্রে অতিঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে বলে চিহ্নিত করেছে।

চিঠিতে আরো বলা হয়, সম্প্রতি চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতি আবারো সরকারের কোনো সংস্থার অনুমোদন না নিয়ে বঙ্গবন্ধু আইনজীবী ভবন একুশে আইনজীবী ভবন নামে দুটি ১২ তলাবিশিষ্ট ভবন নির্মাণের জন্য দরপত্র আহ্বান করে। ভবন দুটির ৬০০টি চেম্বার বরাদ্দের জন্য এরই মধ্যে আইনজীবীদের কাছ থেকে লাখ টাকা করে ১২ কোটি টাকা আদায়ও করা হয়েছে। এছাড়া কোর্ট বিল্ডিংয়ের চারপাশে আইনজীবীদের অর্ধশতাধিক অবৈধ ঝুঁকিপূর্ণ দোকানপাটহোটেল, ছাত্রাবাস, বস্তি মুদি দোকান তৈরি করে ভাড়া আদায় করা হচ্ছে, যার মাধ্যমে স্থাপনাটিকে একটি অপরাধীদের স্বর্গরাজ্যে পরিণত করা হয়েছে। এখানকার অরাজকতার সুযোগ নিয়ে ২০১২ সালে কোর্ট বিল্ডিং এলাকায় জঙ্গি হামলা হয়েছিল। সম্প্রতি বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয় জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে নিরাপত্তা রক্ষার্থে স্থাপিত সিসিটিভি ক্যামেরাগুলোও আইনজীবী নেতারা অপসারণ করেছেন, যার কারণে অপরাধীরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। আইনজীবীদের এসব স্থাপনার অনেক বিদ্যুৎ লাইন পানির লাইনের সংযোগও অবৈধভাবে নেয়া হয়েছে।

বিষয়গুলো উল্লেখ করে ওই নথিতে বলা হয়, সরকারি খাস খতিয়ানভুক্ত পাহাড় শ্রেণীর জমিতে স্থাপিত সম্পূর্ণ অবৈধ ঝুঁকিপূর্ণ বহুতল স্থাপনাগুলো অপসারণ করা এবং চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতি যাতে অবৈধভাবে খাস জমি দখল করে কোর্ট বিল্ডিংয়ের সম্মুখভাগের একমাত্র ফাঁকা জায়গায় কোনো অবকাঠামো নির্মাণ করতে না পারে, সে বিষয়ে ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন বলে মনে করছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ।

বিষয়ে পরিবেশ, বন জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় এবং ভূমি মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতা নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে আইন বিচার বিভাগকে নির্দেশনা দেয়ার বিষয়ে মতামত দিয়েছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক এএইচএম জিয়া উদ্দিন বণিক বার্তাকে বলেন, আইনজীবী সমিতি বৈধভাবে খাস জমি দীর্ঘমেয়াদি বন্দোবস্ত নিয়ে ভবন নির্মাণ করেছে। নতুন নির্মীয়মাণ ভবন দুটির জন্যও সিডিএসহ সরকারি সংস্থাগুলোর অনুমোদন নেয়া হয়েছে। কোর্ট বিল্ডিং আদালত আইনজীবীদের জন্যই। আগের জেলা প্রশাসকদের নির্ধারিত করে দেয়া সীমানার মধ্যেই আমরা ভবন নির্মাণ করছি। যেকোনো বাধা আসুক না কেন, আমরা ভবন নির্মাণে পিছপা হব না।

অন্যদিকে জেলা প্রশাসনের অভিযোগ হলো, আইনজীবী সমিতি অবৈধভাবে ভবন নির্মাণ করে পরীর পাহাড়কে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। ছোট একটি পাহাড়ের তিনগুণ ভার তৈরি করেছে আইনজীবীদের স্থাপনাগুলো। তাদের নির্মিত পাঁচটি ভবনের চারটিতেই কোনো পার্কিং নেই। প্রায় ছয় হাজার আইনজীবী আদালত প্রাঙ্গণে আসা মানুষসহ যানবাহনের চাপে পরীর পাহাড় এখন ঝুঁকিপূর্ণ স্থান হয়ে উঠেছে। যেকোনো ধরনের অগ্নি দুর্ঘটনা বা পাহাড় ধসের মতো সংকট তৈরি হলে জানমালেরও ব্যাপক ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

পরীর পাহাড়ে নতুন স্থাপনা নির্মাণের বিষয়ে সম্প্রতি স্থানীয় সংবাদপত্রে একটি সতর্কীকরণ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে জেলা প্রশাসন। এরপর বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে শুরু করেন আইনজীবীরা। যদিও জেলা প্রশাসন বলছে, বিজ্ঞপ্তি কাউকে উদ্দেশ করে প্রকাশ করা হয়নি।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, পরীর পাহাড়ে পরিকল্পনাহীন বেশকিছু অবৈধ ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনা এরই মধ্যে নির্মাণ করা হয়েছে। এসব স্থাপনার কারণে মানবিক বিপর্যয় হতে পারে এবং ঐতিহাসিক পাহাড়টি রক্ষা করা সাংবিধানিক দায়িত্ব।

সরকারি খাস জমিতে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণকে দণ্ডনীয় অপরাধ উল্লেখ করে বিষয়ে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেয়ার হুঁশিয়ারিও দেয়া হয় বিজ্ঞপ্তিতে।

প্রসঙ্গত, সপ্তদশ শতাব্দীতে আরাকানি শাসনে ফেয়ারি হিল ছিল পর্তুগিজদের দখলে। ঊনবিংশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে ব্রিটিশ শাসনামলে এর মালিকানা আসে বাঙালি জমিদার অখিল চন্দ্র সেনের হাতে। ১৮৮৯ সালে অখিল চন্দ্রের কাছ থেকে পাহাড়টি কিনে নেয় ব্রিটিশ সরকার। ১৮৯৩-৯৪ সালে লাখ টাকা ব্যয়ে কলকাতার রাইটার্স বিল্ডিংয়ের আদলে দুইতলা আদালত ভবন নির্মাণ করা হয়। ওই সময় ধরেই ভবনটিতে বিচারিক কার্যক্রম চলছে। এছাড়া বিভাগীয় কমিশনার জেলা প্রশাসকের কার্যালয়সহ অন্যান্য প্রশাসনিক কার্যালয়ের কার্যক্রমও এখান থেকেই পরিচালিত হচ্ছে। নির্মাণের পর এখন পর্যন্ত বিভিন্ন সময় ভবনটি সংস্কার করা হয়েছে। ২০১০ সালে পুরনো আদালত ভবনের পেছনে চারতলা নতুন আদালত ভবন নির্মাণ করা হয় ৩২ কোটি টাকা খরচে। সেখানে বর্তমানে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়, নতুন আদালত ভবন, চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ভবন আইনজীবীদের পাঁচটি ভবনসহ বেশকিছু সরকারি কার্যালয় রয়েছে।

আইনজীবী সমিতির নেতারা বলছেন, এসব জমি সত্তরের দশকে সরকারের কাছ থেকে লিজ নিয়ে যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন সাপেক্ষে আইনজীবীদের জন্য ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে নিয়ে তিনটি মামলা হলে আদালত আইনজীবীদের পক্ষে রায় দেন। এরপর সরকারের পক্ষ থেকেও নিয়ে কোনো আপিল করা হয়নি।

সার্বিক বিষয়ে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মোমিনুর রহমান বলেন, পরীর পাহাড় প্রশাসনিক বিচারিক কার্যক্রমের প্রয়োজনে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান। অবৈধ দখল, অব্যবস্থাপনাসহ বিভিন্ন কারণে পাহাড়টি চরম ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। সরকারের বিভিন্ন সংস্থার অংশগ্রহণের ভিত্তিতে ঐতিহ্যবাহী পরীর পাহাড়কে সুশৃঙ্খল অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে প্রশাসন চেষ্টা করছে। প্রক্রিয়ায় সবার প্রচেষ্টা সহযোগিতা জরুরি। আইনকে সম্মান করে যানজট নিরসন, অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ, পাহাড় ধস ঝুঁকিমুক্ত আদালত প্রাঙ্গণের প্রয়োজনে আইনজীবীসহ সবার সহযোগিতা করা উচিত।

জেলা প্রশাসনের ভাষ্য হলো, পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ২০০৮ অনুযায়ী, নতুন ভবন নির্মাণের জন্য পাহাড় বা টিলা শ্রেণীর জমির কোনো পরিবর্তন করা যাবে না। আইনি বাধ্যবাধকতার ভিত্তিতে বাঁশখালী, মিরসরাই, লোহাগাড়ায় অনেক পাহাড় কাটা বন্ধ করেছে বর্তমান প্রশাসন। চট্টগ্রামের অবৈধ ১৫৬টি ইটভাটা বন্ধ করা হয়েছে পাহাড় শ্রেণীর জমিতে হওয়ার কারণে। পরীর পাহাড় পাহাড়-শ্রেণীর জমি হওয়ায় আইনের ব্যত্যয় ঘটিয়ে যত্রতত্র স্থাপনা নির্মাণের মাধ্যমে পাহাড়টিকে ঝুঁকিপূর্ণ করা যাবে না।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন