বুধবার | অক্টোবর ২০, ২০২১ | ৫ কার্তিক ১৪২৮

সম্পাদকীয়

আলোকপাত

কৃষির পরবর্তী চ্যালেঞ্জ শস্য নিবিড়তা বাড়ানো

ড. মো. রমিজ উদ্দিন, ড. মোহাম্মদ মোজাহিদুল ইসলাম

মোট দেশজ উৎপাদনে কৃষি খাতের অবদান ১৪ দশমিক শতাংশ। জিডিপিতে কৃষির অবদান দিন দিন কমছে, বাড়ছে শিল্প খাতে, আরো বাড়ছে সেবা খাতে। ধরনের পরিবর্তন প্রত্যাশিত। গত পাঁচ দশকে কৃষিতে আমূল পরিবর্তন এসেছে, যেখানে স্বাধীনতার পর থেকে ২০২০-২১ সালে দানাদার খাদ্যশস্যের উৎপাদন বেড়েছে তিন গুণ।

দেশের জাতীয় উন্নয়ন কাঙ্ক্ষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে খাদ্যনিরাপত্তা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতের লক্ষ্যে কয়েকটি ধাপে একগুচ্ছ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। যার মধ্যে রয়েছে খাদ্যের সহজলভ্যতা বৃদ্ধি, বিশেষ করে দুর্বল জনগোষ্ঠীর জন্য খাদ্যের ভৌত অর্থনৈতিক প্রাপ্যতা নিশ্চিত এবং খাদ্যনিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা হ্রাস করা।

১৯৭১ সালে সাত কোটি জনগোষ্ঠীর থেকে বাংলাদেশের জনসংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়ে বর্তমানে প্রায় সাড়ে ১৭ কোটিতে পৌঁছেছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির উচ্চ হার, সম্পদের সীমাবদ্ধতা ব্যাপক অনিশ্চয়তা সত্ত্বেও বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন অর্জনে সক্ষম হয়েছে। জনগণের মাথাপিছু আয় ক্রমাগত বৃদ্ধির পাশাপাশি মৌলিক মানব উন্নয়ন সূচকের মান বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও আমাদের সাফল্য লক্ষণীয়। যদিও দেশের উন্নয়ন প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে এখনো আমাদের গুরুত্বপূর্ণ কিছু চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হচ্ছে। যেমন উচ্চমাত্রার দারিদ্র্য, বৈষম্য বৃদ্ধি খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা।

সময়ের পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে খাদ্যনিরাপত্তা ধারণার পরিবর্তন হয়েছে, বিশেষ করে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে খাদ্য পুষ্টি বিষয়ে সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিসর অনেকটাই বিস্তৃত হয়েছে। সত্তরের দশকের আগে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন কিংবা আমদানির মাধ্যমে জাতীয় পর্যায়ে খাদ্য সরবরাহ বা প্রাপ্যতার বিষয়টিকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়া হতো। ১৯৭৪ সালে অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড ফুড সামিটে অভ্যন্তরীণ বাজারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্য সরবরাহ এবং তার মূল্য সাধারণ মানুষের ক্রয়সীমার মধ্যে রাখার ওপর জোর দেয়া হয়। সময় অনেক দেশ সবুজ বিপ্লবের মাধ্যমে লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছতে সফল হয়, বিশেষ করে উচ্চফলনশীল জাতের প্রযুক্তির ব্যবহার করে অধিক শস্য উৎপাদনের মাধ্যমে অন্যান্য দেশ খাদ্যনিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়। তবে সবুজ বিপ্লবের মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অতি দ্রুত যে বিরাট সাফল্য অর্জিত হয় তাতে সবাই যে লাভবান হয়েছে তা কিন্তু নয়, বিশেষ করে এটি নিম্ন আয়ের দেশগুলো থেকে ক্ষুধা অপুষ্টি নির্মূল করতে সক্ষম হয়নি। খাদ্যনিরাপত্তা দুর্ভিক্ষবিষয়ক গবেষণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান যা চারটি মৌলিক বিষয়ের ওপর নির্ভর করে, উৎপাদনভিত্তিক উপাদান, যা উৎপাদনশীল সম্পদের মালিকানার ওপর নির্ভর করে, বাণিজ্যনির্ভর উপাদান, যেটি খাদ্যের বাজারের ওপর নির্ভরশীল, স্বশ্রমের মাধ্যমে অর্জিত স্বত্ব, যা উৎপাদন ব্যক্তিমালিকানাধীন শ্রমশক্তির সুযোগ ব্যয়ের ওপর নির্ভর করে এবং উত্তরাধিকার ক্রয়ক্ষমতার হস্তান্তর, যা সরকারের কাছ থেকে প্রাপ্ত ত্রাণ ভর্তুকির অন্তর্ভুক্ত।

সাধারণত খাদ্যনিরাপত্তা নিরীক্ষণে সবচেয়ে উপযুক্ত পদ্ধতি হচ্ছে, কী সংখ্যক জনগণ ক্ষুধার্ত আছে তাদের সংখ্যা নিরূপণ। এক্ষেত্রে দুটি প্রধান নিয়ামক হচ্ছে অপুষ্টিতে আক্রান্ত জনগণের সংখ্যা নিরূপণ এবং বয়সের তুলনায় ওজনহীন শিশুদের ব্যাপকতা গণনা। এই পরিমাপকগুলো বাংলাদেশের যে চিত্র তুলে ধরে তা আশাব্যঞ্জক।

জনসংখ্যা বৃদ্ধি সত্ত্বেও খাদ্যের প্রাপ্যতা পরিমাপের ক্ষেত্রে দৈনিক গড় মাথাপিছু ক্যালরি এবং গড় মাথাপিছু প্রোটিন গ্রহণের পরিমাণ সত্তরের দশক থেকে ক্রমাগত বৃদ্ধি পেয়েছে। এক্ষেত্রে কৃষির দ্রুত উৎপাদন বৃদ্ধি দেশের জনগণের মাথাপিছু খাদ্য গ্রহণের মানোন্নয়নে ভূমিকা রেখেছে। বর্তমানে কৃষি গবেষণা উন্নয়নে এসব সমস্যাসহ জিংকসমৃদ্ধ, খরা লবণাক্ততা উপযোগী ফসলের জাত উদ্ভাবন করার দিকে মনোযোগ দেয়া হয়েছে। কভিড-১৯-এর প্রভাবে বিশ্বজুড়ে নেমে এসেছে মানবিক দুর্যোগ, খাদ্যনিরাপত্তায় প্রভাব ফেলেছে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ অন্যান্য দেশের তুলনায় ভালো করেছে।

বাংলাদেশ বিগত পাঁচ দশকে খাদ্যনিরাপত্তা পুষ্টি পরিস্থিতির টেকসই উন্নতি সাধন করেছে। জনসংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হওয়া সত্ত্বেও সময়কালে খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধির হার জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারের তুলনায় বেশি ছিল। জাতীয় পর্যায়ে মাথাপিছু ক্যালরিপ্রাপ্তির নিরিখে বাংলাদেশ খাদ্যশস্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। আয় বৃদ্ধি দারিদ্র্য হ্রাস এই ইঙ্গিত দেয়, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দেশে খাদ্যপ্রাপ্তির সুযোগ বেড়েছে।

খাদ্যনিরাপত্তার জন্য ফসলের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করা অত্যন্ত জরুরি। বর্ধিত ফসল উৎপাদন করার জন্য প্রয়োজন উচ্চফলনশীল জাত, উন্নত ফসল ব্যবস্থাপনা এবং একক জমিতে ফসলের নিবিড়তা বৃদ্ধি করা। ফসলের নিবিড়তা বৃদ্ধি উন্নত ফসল ব্যবস্থাপনার একটি অঙ্গ হচ্ছে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ। কৃষি যান্ত্রিকীকরণের মাধ্যমে ফসলের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার, ফসলের উৎপাদন খরচ ফসল কর্তনোত্তর ক্ষতি কমানোর মাধ্যমে দেশের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব।

স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে দেশে খাদ্যশস্য উৎপাদিত হয়েছিল এক কোটি ১০ লাখ টন। আবাদি জমি প্রায় ৩০ শতাংশ কমে যাওয়ার পরও খাদ্যশস্য উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে তিন থেকে পাঁচ গুণ। ১২টি কৃষিপণ্য উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বের শীর্ষ ১০টি দেশের মধ্যে রয়েছে। খাদ্যশস্য উৎপাদন বাড়ানোর গতিতে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় তালিকায় এখন বাংলাদেশ।

সাফল্যের ধারাবাহিকতায় গত এক দশকে লাভজনক বাণিজ্যিকীকরণের অগ্রযাত্রায় রয়েছে কৃষি। উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির ধারাবাহিকতায় ২০১৮-১৯ অর্থবছরে দানাদার খাদ্যশস্যের উৎপাদনের (৪৩২ দশমিক ১১ লাখ টন) লক্ষ্যমাত্রা (চার কোটি ১৫ লাখ ৭৪ হাজার টন) ছাড়িয়ে গেছে। ধান উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে তৃতীয়। ভুট্টা উৎপাদন বেড়ে হয়েছে ৪৬ লাখ টন। নিবিড় চাষের মাধ্যমে বাংলাদেশ সবজি উৎপাদনের প্রবৃদ্ধিতে বিশ্বে তৃতীয় অবস্থানে উন্নীত হয়েছে। সবজি উৎপাদন বেড়ে এক কোটি ৭২ লাখ ৪৭ হাজার টন হয়েছে। আলু উৎপাদনে বাংলাদেশ উদ্বৃত্ত এবং বিশ্বে সপ্তম। বছর আলু উৎপাদিত হয়েছে এক কোটি লাখ টন। দেশে ফল উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে। আম উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে সপ্তম এবং পেয়ারায় অষ্টম। আম উৎপাদন প্রায় ২৪ লাখ টনে উন্নীত হয়েছে। এসবের প্রভাবে বাংলাদেশ খাদ্যনিরাপত্তায় এগিয়ে গেছে অনেক গুণ।

দেশের খাদ্যনিরাপত্তা পুষ্টি নিশ্চিতকরণে কৃষি বড় ভূমিকা রাখছে। অর্থাৎ মূল লক্ষ্য হচ্ছে সামগ্রিকভাবে কৃষি উৎপাদন উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে স্বাভাবিক আবহাওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন বৈরী আবহাওয়ার উপযোগী জাত উদ্ভাবন এবং উন্নয়নে বিশেষ ভূমিকা রাখছে এবং বিভিন্ন প্রযুক্তি ব্যবহার করে কৃষি এগিয়ে যাচ্ছে।

জনবহুল বাংলাদেশের ৬০ শতাংশ মানুষ গ্রামে বাস করে যারা কোনো না কোনোভাবে কৃষির সঙ্গে জড়িত। অপরিকল্পিতভাবে নির্মিত রাস্তঘাট, যেখানে-সেখানে কলকারখানা নির্মাণ, নতুন নতুন বসতবাড়ি নির্মাণ, সরকারি-বেসরকারি স্থাপনা নির্মাণ করে প্রতি বছর দশমিক ৭৩ শতাংশ হারে জমির পরিমাণ কমছে, যাতে আবাদি জমির পরিমাণ কমে আসছে। এতে কৃষিতে লক্ষ্য অর্জন বাধার সম্মুখীন হচ্ছে। অন্যদিকে অতিবৃষ্টি, অসময়ে বৃষ্টি, বন্যা, খরা, জলোচ্ছ্বাস, ভূমিকম্প, উচ্চতাপমাত্রাসহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগ সবই জলবায়ু পরিবর্তনে অধিক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

১৯৭১ সালে দেশের খাদ্য উৎপাদন ছিল ৯৯ লাখ ৩৬ হাজার টন। ১৯৭২ সাল থেকেই কৃষিকে গুরুত্ব দেয়ায় এক কোটি ১০ লাখ টন দাঁড়ায়, যা মোট সাত কোটি জনসংখ্যার জন্য অপ্রতুল ছিল। নিম্নলিখিত তথ্য থেকে এটা পরিষ্কার চাল, ভুট্টা, সবজি, আলু, গমের ১০ বছরের গড় ফলন গুণিতক হারে বেড়েই চলছে।

পাঁচ দশকের কৃষি পণ্যেও গড় উৎপাদন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় কৃষিতে অভাবনীয় সাফল্য এসেছে। ধান উৎপাদনে তিন গুণ, আলুতে ১০ গুণের বেশি, সবজিতে নয় গুণ আর ভুট্টার উৎপাদন ১০০ গুণ বেশি। এটা সম্ভব হয়েছে কৃষিবান্ধব নীতি প্রণয়নের মাধ্যমে।

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএআরআই), বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিআরআরআই), বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিআইএনএ), বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (বাকৃবি), বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (বশেমুরকৃবি), রাবি (রাজশাহী বিশ্বিবিদ্যালয়)

বাংলাদেশ বর্তমানে ইন্দোনেশিয়াকে পেছনে ফেলে ধান উৎপাদনে চীন ভারতের পরই তৃতীয় অবস্থানে চলে আসছে। বাংলাদেশে ২০১৯-২০ সালে চাল উৎপাদিত হয়েছে ৩৮৬ দশমিক ৯৫ লাখ টন, যা ২০২০-২১ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৯৫ লাখ টনে। চাল বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তাই সবসময় সব পর্যায় থেকে ধান চাষকে গুরুত্ব দিয়ে বিভিন্ন নীতি-নির্ধারণ করা হয়।

উল্লেখ্য, ১৯৭১-৭২ সালে যেখানে হেক্টরপ্রতি ধানের গড় ফলন ছিল - টন, এখন গড় প্রায় সাড়ে চার টন। এক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২১ সালে চালের চাহিদা ১৭ কোটি জনসংখ্যার বিপরীতে ৩৭০ লাখ টন। বাংলাদেশ একটি জনবহুল দেশ। বর্তমানে বাংলাদেশের জনসংখ্যা প্রায় ১৭ কোটি এবং প্রতি বর্গকিলোমিটারে বসবাস করে হাজার ১০০ জন। প্রতি বছর জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার দশমিক ৪২ শতাংশ। পরিসংখ্যান অনুযায়ী মোট আবাদি জমির পরিমাণ প্রায় ৮৫ দশমিক লাখ হেক্টর। জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে প্রতি বছর জমির পরিমাণ কমছে প্রায় শতাংশ হারে। এক ফসলি জমির পরিমাণ ২৪ দশমিক লাখ হেক্টর, দুই ফসলি জমির পরিমাণ ৩৮ দশমিক ৪১ লাখ হেক্টর, তিন ফসলি জমির পরিমাণ ১৬ দশমিক ৪২ লাখ হেক্টর এবং শস্যের নিবিড়তা হলো ১৯১ শতাংশ। বর্ধিত জনগোষ্ঠীর খাদ্যচাহিদা মেটানোর জন্য খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি জরুরি। আর বর্ধিত খাদ্য উৎপাদন করার জন্য প্রয়োজন উচ্চফলনশীল জাত, উন্নত ফসল ব্যবস্থাপনা এবং একক জমিতে ফসলের নিবিড়তা বৃদ্ধি করা। ফসলের নিবিড়তা ১৯১ শতাংশ থেকে ৪০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো সম্ভব একমাত্র উন্নত ফসল ধারার প্রবর্তনের মাধ্যমে। ধানভিত্তিক ফসল ধারায় স্বল্পমেয়াদি অন্য ফসল সমন্বয় করে ফসলের নিবিড়তা উৎপাদনশীলতা বাড়ানো সম্ভব।

একজন মানুষকে সুস্থ জীবন-যাপন করার জন্য প্রয়োজন সুষম খাদ্যের। তাই কার্বহাইড্রেটের পাশাপাশি তেল আমিষ জাতীয় খাবারের প্রয়োজন। সরিষা, মসর, ছোলা, খেসারি আলু খুবই গুরুত্বপূর্ণ ফসল, যা শুধু রবি মৌসুমে চাষ করা হয়। সেচ সুবিধা বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে যেসব জমিতে সরিষা, ডাল আলু চাষ হতো সেসব জমিতে এখন বোরো ধান সম্প্রসারিত হয়েছে। ফলে দিন দিন ডাল, সরিষা আলু ফসলের জন্য আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ কমে যাচ্ছে। তাই জমির পরিমাণ বাড়িয়ে এসব ফসলের উৎপাদন বাড়ানো সম্ভাবনা খুবই কম। একমাত্র ফসল বিন্যাসের মাধ্যমে সমন্বয় করে এসব ফসলের উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট কর্তৃক কিছু স্বল্পমেয়াদি সরিষা, আলু ডালের জাত এবং ব্রি বিনা কর্তৃক স্বল্পমেয়াদি ধানের জাত উদ্ভাবন করা হয়েছে, যা দিয়ে শস্য বিন্যাস উন্নয়নের মাধ্যমে নতুন ফসল ধারা প্রবর্তন সম্ভব। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট রোপা আমন ধান-সরিষা-মুগডাল-রোপা আউশ ধান চার ফসলের শস্য বিন্যাসটি সফলতার সঙ্গে সম্পন্ন করেছে।

ভুট্টার নানামুখী ব্যবহার বৃদ্ধির ফলে দিন দিন ব্যাপক চাহিদা বাড়ছে। এর মধ্যে পশুখাদ্য, মাছের খাদ্য হিসাবে ব্যাপকভাবে ব্যবহারের ফলে আমিষ জাতীয় খাদ্যের নিরাপত্তায় পরোক্ষ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। যেখানে ১৯৭১ সালে ভুট্টা উৎপাদন ছিল হাজার টন, তা ২০২০ সালে ৫৪ লাখ টন। তেমনিভাবে আলু ২০২০-২১ সালে উৎপাদন ছিল ১১০ লাখ টন। তাতে আমাদের নিজস্ব চাহিদা ৭০ লাখ টন পূরণ করে প্রায় ৪০ টন রফতানিতে ইতিমধ্যে কাজ করছে সরকারি পর্যায়ে। অপরদিকে সবজি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টিকর খাদ্য, যা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাসহ রোগ নিরাময়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। উল্লেখ্য যে, স্বাভাবিক সুস্থতার জন্য দৈনিক মাথাপিছু গড় ২২০ গ্রাম পরিমাণ সবজি খাওয়া উচিত কিন্তু আমাদের চাহিদা অনুসারে তা গড়ে প্রায় ৬০ গ্রাম সবজি কম খাওয়া হচ্ছে। সবজির জাত উন্নয়নে বর্তমানে সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ব্যাপক কাজ করছে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যে আলু, ডাল তেল বীজ, শাক-সবজি ফুল-ফল মসলাসহ বিভিন্ন ফসলের ৬০০টির বেশি উচ্চফলনশীল জাত হাইব্রিডসহ উদ্ভাবন করেছে। এদিকে বিআইএনএসহ সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও নতুন নতুন জাত আবিষ্কার করার মাধ্যমে কৃষিতে অবদান রাখছে। 

কৃষি খাতে অগ্রগতির মূল উপাদান হলো উন্নত জাতের বীজের ব্যবহার। এক্ষেত্রে কৃষিবিজ্ঞানীদের বিশেষ অবদান রেখে চলছে। বীজের গুণাগুণ ঠিক রেখে ভালো বীজ সরবরাহ করতে সরকারিভাবে একটি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেন নিরলসভাবে কাজ করছে। ওই প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান প্রায় ২০০টি প্রতিষ্ঠান উন্নত বীজ সরবরাহ নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। শুধু বিএডিসির ৩৪টি ভিত্তি বীজবর্ধন উৎপাদন খামার লাখ হাজার একরের বেশি ৭৫টি কন্ট্র্যাক্ট গ্রোয়ার জোনে প্রায় ৪০ হাজার চুক্তিবদ্ধ চাষী যুক্ত আছেন। ১৭০ হাজার টন ধারণক্ষমতাসম্পন্ন ৫২টি আধুনিক বীজ প্রক্রিয়াজাতকরণ সংরক্ষণ কেন্দ্র এবং ডিহিউমিডিফায়েড গুদামসহ কেন্দ্রীয় বীজ পরীক্ষাগার কেন্দ্র রয়েছে। অন্যদিকে সরকারি-বেসরকারি বীজ প্রতিষ্ঠানগুলোর আধুনিক বীজ পরীক্ষা কেন্দ্র আছে যার মাধ্যমে গুণগত মানসম্মত বীজ সরবরাহ করে খাদ্যনিরাপত্তা পুষ্টি নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে।

টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় ২০৩০ সালের মধ্যে ক্ষুধার অবসান, খাদ্যনিরাপত্তা উন্নত পুষ্টিমান অর্জনে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। একই সঙ্গে টেকসই কৃষির প্রসারের অংশ হিসেবে কৃষিজ উৎপাদনশীলতা এবং ক্ষুদ্র পরিসর খাদ্য উৎপাদকদের আয় দ্বিগুণ করার লক্ষ্য রয়েছে। সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সাফল্য লাভের ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশও সংশ্লিষ্ট সবাইকে সমতার আওতায় এনে উন্নয়নের স্রোতধারায় যুক্ত করার প্রত্যয় নিয়ে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নের পথে কাজ করছে।

জমির উৎপাদনশীলতা তথা ফলন বৃদ্ধিতে বাংলাদেশের কৃষি খাতের সাফল্য বিশ্বের জন্য অনুকরণীয়। আয়তনের দিক থেকে বিশ্বের ৯৪তম হলেও বাংলাদেশ খাদ্য উৎপাদনে বিশ্বে ১১তম এবং শস্যের উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবনে বিশ্বে প্রথম স্থানে রয়েছে। কৃষির যান্ত্রিকীকরণ, প্রাকৃতিক দুর্যোগজনিত ঝুঁকির টেকসই মোকাবেলায় বাংলাদেশ কাজ করে যাচ্ছে।

২০৫০ সালে সম্ভাব্য ২০ কোটি মানুষের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতের জন্য চালের উৎপাদন কোটি লাখ টনে উন্নীত করা এবং উদ্বৃত্ত চালের পরিমাণ ৬৫ লাখে উন্নীত করতে পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। উৎপাদনশীলতা দ্বিগুণ করতে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) ইতোমধ্যে ডিআরপি কৌশলপত্র প্রণয়ন করেছে। উন্নত জাত, পতিত অনাবাদি জমি চাষের আওতায় আনা, প্রযুক্তি উদ্ভাবন, বিদ্যমান উৎপাদন গ্যাপ হ্রাস, ব্যাপক হারে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ নিশ্চিত, ধানের গুণগতমান বৃদ্ধি, ধান চালের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত ধান উৎপাদনের ঝুঁকি কমানো এবং সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে। ডিআরপি হলো ৩০ বছরের জন্য চালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কৌশলপত্র। এই কৌশল বাস্তবায়নের মাধ্যমে চালের উৎপাদন ২০৩০ সালে কোটি ৬৯ লাখ, ২০৪০ সালে কোটি ৪০ লাখ এবং ২০৫০ সালে কোটি লাখ টনে উন্নীত করা সম্ভব। কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের ফলে ২০৩০ সালে ৪২ লাখ, ২০৪০ সালে ৫৩ লাখ ২০৫০ সালে ৬৫ লাখ টন চাল দেশে উদ্বৃত্ত থাকবে। ফলে যে কোনো দুর্যোগে বছরে ৪০ লাখ টন পর্যন্ত চালের উৎপাদন কমলেও খাদ্যনিরাপত্তা অক্ষুণ্ন থাকবে। সর্বোপরি মূল খাদ্যশস্য চাল ছাড়া সবজি ফলের উৎপাদন বাড়ানোর জন্য সরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বেসরকারিভাবে কৃষির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম অব্যাহত রাখা বিশেষ প্রয়োজন।

 

. মো. রমিজ উদ্দিন: অধ্যাপক, কৃষিতত্ত্ব বিভাগ

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ

. মোহাম্মদ মোজাহিদুল ইসলাম: কৃষি গবেষক

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন