শনিবার | সেপ্টেম্বর ২৫, ২০২১ | ১০ আশ্বিন ১৪২৮

সম্পাদকীয়

প্রস্তাবিত নতুন শিক্ষাক্রম

বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ চাহিদার আলোকে চূড়ান্ত করা হোক

সাম্প্রতিক বছরগুলোয় চেনা বিশ্বটা অনেকখানি বদলে গেছে। জোরালো প্রযুক্তিগত রূপান্তরে জীবনের সর্বস্তরে এসেছে আমূল পরিবর্তন। বদলে গেছে কাজের বিন্যাস, ধরন দক্ষতা। কিন্তু আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় এর ছোঁয়া খুব একটা নেই। বিশেষ করে দেশে প্রাথমিক থেকে উচ্চমাধ্যমিক স্তরের শিক্ষা এখনো চলছে পুরনো পাঠ্যক্রমেই। আলোচ্য স্তরের শিক্ষা কার্যক্রম সর্বশেষ পরিমার্জন করা হয়েছিল ২০১২ সালে। সাধারণত পাঁচ বছর পরপর শিক্ষা কার্যক্রম পরিমার্জন করাটাই রীতি। সে হিসাবে ২০১৭ সালে নতুন শিক্ষা কার্যক্রম প্রবর্তনের কথা। অনেক সময় পেরোলেও নানা কারণে সেটি হয়নি। অবশেষে সম্প্রতি নতুন শিক্ষা কার্যক্রমের একটা খসড়া রূপরেখা প্রস্তুত করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। প্রধানমন্ত্রী তাতে প্রাথমিক অনুমোদন দিয়েছেন বলেও খবর মিলছে। বিশেষজ্ঞদের মতামত নিয়ে অভ্যন্তরীণ বৈশ্বিক জনসম্পদের চাহিদার আলোকে প্রস্তাবিত শিক্ষাক্রম চূড়ান্ত করাটাই কাম্য।

সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া, চীন, জাপানসহ এশিয়ার প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলোও নিয়মিত শিক্ষাক্রমে পরিমার্জন আনে। দ্রুত আগুয়ান বিশ্বে নিকট ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক সামাজিক চ্যালেঞ্জগুলো কী সেটি বিবেচনায় নিয়ে যুগোপযোগী করা হয় শিক্ষাক্রম। যাতে নতুন প্রজন্ম সময়ের চাহিদা অনুযায়ী নিজেদের গড়ে তুলতে পারে, প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করতে পারে। সর্বোপরি শিক্ষার সঙ্গে শিল্পের বিযুক্তি যেন না ঘটে। ফলে তারা উন্নয়নের সব পর্যায়ে একটি দক্ষ মানবসম্পদ পেতে সমর্থ হয়েছে। ওইসব দেশের অভিজ্ঞতা আমাদের জন্য অনুসরণীয়।

কিছুটা দেরিতে হলেও আমাদের দেশে শিক্ষাক্রম যুগোপযোগী করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, এটা ইতিবাচক। প্রাথমিক থেকে উচ্চমাধ্যমিকশিক্ষার ধাপ শিক্ষার্থীর জীবন গঠন মৌলিক দক্ষতাগুলো অর্জনের ভিত্তিকাল। কিন্তু বিরাজমান ব্যবস্থায় সময় বয়স অনুযায়ী যে ধরনের শিখনফল দক্ষতা অর্জন হওয়ার কথা, তা অনেক ক্ষেত্রে হচ্ছে না। বিশেষ করে ইংরেজি, বিজ্ঞান অংকের মতো বিষয়গুলোর ক্ষেত্রে শিখন ঘাটতি প্রবল। এর কারণ কর্ম অভিজ্ঞতার বিপরীতে পরীক্ষানির্ভর মূল্যায়ন পদ্ধতিতে অত্যধিক প্রাধান্য। অভিযোগ রয়েছে সুচিন্তিত কোনো পরিকল্পনা ছাড়াই পঞ্চম, অষ্টম, দশম দ্বাদশ শ্রেণীতে প্রবর্তন করা হয়েছে পাবলিক পরীক্ষা। শিক্ষার্থীদের কাঁধে চাপিয়ে দেয়া হয়েছে বইয়ের ব্যাগের বোঝা। শ্রেণীভেদে পড়ানো হচ্ছে ১২-১৪টি বিষয়। কোনো কোনো স্কুলে পড়ানো হচ্ছে তার চেয়েও বেশি। আবার পরীক্ষা পদ্ধতিতেও নেই কোনো নতুনত্ব। মুখস্থ নির্ভরতাই সই। সুনির্দিষ্ট কিছু প্রশ্নের উত্তর মুখস্থ করে পরীক্ষার খাতায় লিখলেই কৃতকার্য। সৃজনশীলতার কোনো সুযোগ নেই। ঘাটতি রয়েছে ভালো দক্ষ শিক্ষকেরও। গুটিকয়েক শিক্ষক বাদে বেশির ভাগই পড়াচ্ছেন গতানুগতিকভাবে। সব মিলিয়ে শিক্ষার্থীদের কাছে শিক্ষাটা নিরানন্দ মানসিক চাপের একটা বিষয়ে পরিণত হয়েছে। আরো উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, বিদ্যমান ব্যবস্থায় পাসের দিক থেকে বড় উল্লম্ফন ঘটলেও শিক্ষার মানে বড় ধরনের প্রশ্ন রয়ে গেছে। এমন এক প্রেক্ষাপটে সরকার যে নতুন শিক্ষা কার্যক্রম প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে, এটা সময়োপযোগী পদক্ষেপ বৈকি। 

প্রস্তাবিত শিক্ষাক্রমে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হচ্ছে প্রথম থেকে দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত শিক্ষা পদ্ধতিতে। এতে পরীক্ষার চেয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীর শিখনকালীন মূল্যায়নে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। নতুন শিক্ষাক্রমে তৃতীয় শ্রেণী পর্যন্ত কোনো পরীক্ষা রাখা হচ্ছে না। শিক্ষার্থীরা বিজ্ঞান নাকি অন্য কোনো শাখায় পড়বে, তা নির্ধারণ করা হবে একাদশ শ্রেণীতে গিয়ে। দশম শ্রেণীর আগে আর কোনো পাবলিক পরীক্ষা থাকবে না। শুধু দশম শ্রেণীর কারিকুলামের ওপর ভিত্তি করে অনুষ্ঠিত হবে এসএসসি সমমান পরীক্ষা। বাদ যাবে পিইসি জেএসসি পরীক্ষা। পরীক্ষার পরিবর্তে শ্রেণীকক্ষে দক্ষতাভিত্তিক ধারাবাহিক মূল্যায়ন চালু করা হবে। প্রতি বিষয়ে পূর্ণমান ১০০ নম্বর থাকলেও চূড়ান্ত পরীক্ষায় বিষয় শ্রেণীভেদে ৪০ থেকে ৫০ নম্বরের পরীক্ষা নেয়া হবে। বাকি নম্বরের শিখনকালীন মূল্যায়ন করবেন শিক্ষকরা। এটিকে বলা হচ্ছে ধারাবাহিক মূল্যায়ন। প্রস্তাবিত শিক্ষাক্রমকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন শিক্ষাবিদরা। এখন এর সুষ্ঠু বাস্তবায়নই মূল চ্যালেঞ্জ।

এখনো কাজ অনেক বাকি। নতুন শিক্ষা কার্যক্রমটি একটা খসড়া রূপ পেয়েছে মাত্র। এটিকে পাঠ্যবইয়ে রূপ দিতে হবে। কোর্স কনটেন্ট কী হবে, সেটি ঠিক করতে হবে। এক্ষেত্রে শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ গ্রহণ জরুরি। কনটেন্ট বিন্যাসের ক্ষেত্রে অবশ্যই বিষয়ভিত্তিক বিশেষজ্ঞকে সম্পৃক্ত করতে হবে। অতীতে পাঠ্যবইয়ের লেখক নির্বাচনে অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিবেচনা কাজ করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। নেতিবাচক প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। লেখক নির্বাচনে রাজনীতি নয়, এক্ষেত্রে প্রাধান্য দিতে হবে ব্যক্তির বিষয়ভিত্তিক পারঙ্গমতা দক্ষতাকে। আমাদের শিক্ষা কার্যক্রমের আওতায় মাঝেমধ্যে পাঠ্যবইয়ে এমন কিছু বিষয় সন্নিবেশ করা হয়, যা শ্রেণীভিত্তিক বয়সের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। এসব বিষয় কেবল ভারাক্রান্ত নয়, শিক্ষার্থীদের জন্য রীতিমতো বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। বর্তমানে শিক্ষাটা নিরানন্দ হওয়ার এটিও একটা কারণ। প্রস্তাবিত শিক্ষাক্রম অনুসারে পাঠ্যবই তৈরির ক্ষেত্রে বিষয়টি বিশেষভাবে মাথায় রাখা চাই।

মূল্যায়ন বিষয়েও অনেক অস্পষ্টতা রয়ে গেছে। বলা হচ্ছে, নতুন শিক্ষা কার্যক্রমে স্কুলেই ধারাবাহিক মূল্যায়ন করা হবে। স্কুল থেকে নম্বর যাবে বোর্ডে। ট্রান্সক্রিপ্টে তা লেখাও থাকবে কিন্তু সে নম্বর যোগ হবে না, কোনো সুফলও পাবে না শিক্ষার্থীরা। চতুর্থ বিষয়ও নেয়া যাবে কিন্তু তার ফলও শিক্ষার্থীর কাজে আসবে না! তাহলে মূল্যায়নে স্বচ্ছতা থাকবে তো? আবার ধারাবাহিক মূল্যায়নে দুর্বল শিক্ষার্থীর জন্য নিরাময়মূলক কী কী ব্যবস্থা থাকবে, সেটিও স্পষ্ট নয়। প্রস্তাবিত শিক্ষা কার্যক্রমে মূল্যায়নের প্রধান ভূমিকাতেই থাকছেন শিক্ষকরা। আমাদের মতো সমাজে সচ্ছল পরিবারের শিক্ষার্থীদের প্রতি শিক্ষকদের বিশেষ দৃষ্টি থাকে। অনেকটা উপেক্ষিত থাকে দরিদ্র পরিবারের শিক্ষার্থীরা। সেক্ষেত্রে শিক্ষকদের হাতে মূল্যায়নের ক্ষমতা বেশি থাকলে দরিদ্র শিক্ষার্থীরা বৈষম্যের শিকার হবে কিনা, সেটিও একটা প্রশ্ন। আরেকটা বিষয় হলো, নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের সুনাম বাড়াতে শিক্ষকরা নিজেদের শিক্ষার্থীদের বেশি নম্বর দেবেন। ফলে শিখন দক্ষতার প্রকৃত মূল্যায়ন অনেক দুরূহ হবে বৈকি। কাজেই মূল্যায়ন বিষয়ে এসব অস্পষ্টতা দূর করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া জরুরি।

শিক্ষা কার্যক্রমের কার্যকারিতা বহুলাংশে নির্ভর করে শিক্ষকদের ওপর। কেননা পাঠদানের মূল ভূমিকায় রয়েছেন তারা। সময়ান্তরে শিক্ষকদের দক্ষতা বাড়ানো না গেলে যুগোপযোগী শিক্ষাক্রমেও খুব একটা সুফল মিলবে না। প্রথমে বিষয়বস্তু শিক্ষক নিজে বুঝলে পরে শিক্ষার্থীদের ভালোভাবে বোঝাতে বা পড়াতে পারবেন। এজন্য শিক্ষকদের ব্যাপকতর প্রশিক্ষণ দরকার। প্রাথমিক স্তরে সরকারিভাবে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা থাকলেও মাধ্যমিক বা উচ্চ মাধ্যমিক প্রশিক্ষণ সুবিধা অপ্রতুল। এটা বাড়াতে হবে। শিক্ষকদের বিস্তারিত ম্যানুয়াল তৈরি করে কিংবা প্রশিক্ষণ বাড়িয়ে তাদের নতুন শিক্ষা কার্যক্রমের সঙ্গে অভ্যস্ত করে তুলতে হবে, নইলে কাঙ্ক্ষিত সুফল মিলবে না। 

সার্বিক বৈশ্বিক পরিস্থিতি এখন অনেক বেশি প্রতিযোগিতামূলক। অভ্যন্তরেও ঘটছে নানা পরিবর্তন। আমরা যদি মধ্যম আয়ের দেশ হতে চাই, তাহলে বৈশ্বিক পরিস্থিতি এবং বিশ্ব নাগরিক হওয়ার যে বিষয়গুলো আছে, সেগুলো যথাযথভাবে  আত্মস্থ করতে হবে। সন্দেহ নেই, প্রস্তাবিত শিক্ষাক্রম এক্ষেত্রে বড় উল্লম্ফন। এটি বাস্তবায়নে সঠিক পরিকল্পনা যথাযথ পদক্ষেপ নেয়াটাই প্রত্যাশিত।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন