শুক্রবার | সেপ্টেম্বর ২৪, ২০২১ | ৯ আশ্বিন ১৪২৮

দেশের খবর

রামগতি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স

জনবলসহ নানা সংকটে ব্যাহত কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসাসেবা

মো. রাকিব হোসাইন রনি, লক্ষ্মীপুর

নানা সংকটে ধুঁকছে রামগতি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। ইনসেটে বেসিনে জমে থাকা দুর্গন্ধময় নোংরা পানি। এতে ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে বেসিন ছবি: নিজস্ব আলোকচিত্রী

দীর্ঘদিন ধরে পরিষ্কার না করায় ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে গোসলখানা শৌচাগারগুলো। বেসিনে জমে আছে কালো নোংরা পানি, স্যাঁতসেঁতে দেয়াল। সর্বত্র ময়লা দুর্গন্ধময় পরিবেশ। দৃশ্য লক্ষ্মীপুরের রামগতি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের। বিকল্প উপায় না থাকায় বাধ্য হয়ে নোংরা পরিবেশে প্রয়োজন সারতে গিয়ে আরো বেশি অসুস্থ হয়ে পড়ছে রোগীরা।

শুধু তা- নয়, ৩১ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালটির রয়েছে প্রয়োজনীয় চিকিৎসকসহ অর্ধেক জনবল সংকট। উপজেলার প্রায় চার লাখ মানুষের চিকিৎসার জন্য রয়েছে মাত্র চারজন চিকিৎসক। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটির মোট পদ সংখ্যা ১২৩। এর মধ্যে শূন্য ৬৩টি পদ। একাধিক টেকনিশিয়ান পদ খালি থাকায় বন্ধ রয়েছে এক্স-রেসহ প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা। ফলে কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসাসেবা বঞ্চিত হয়ে রোগীদের নিয়ে সদর হাসপাতালসহ জেলার বাইরে ছুটছে স্বজনরা।

জানা যায়, মেঘনা নদীর তীরে অবস্থিত লক্ষ্মীপুরের রামগতি উপজেলা। এখানকার বেশির ভাগ মানুষই নিম্ন আয়ের মৎস্য কৃষিজীবী। উপকূলের প্রায় চার লাখ মানুষের চিকিৎসাসেবার একমাত্র ভরসাস্থল স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি। চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে ১৯৯৩ সালে প্রথমে ২০ শয্যাবিশিষ্ট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স নির্মাণ করা হলেও পরে তা ৩১ শয্যায় উন্নীত করা হয়। কিন্তু উন্নত হয়নি চিকিৎসাসেবার মান।

সরেজমিনে দ্বিতলবিশিষ্ট রামগতি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ভবনের ভেতরে ঘুরে দেখা যায় ওয়ার্ডগুলোতে ছড়িয়ে পড়েছে শৌচাগারের দুর্গন্ধ। যেখানে-সেখানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে ময়লা। দ্বিতীয় তলায় মহিলা ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায় দুটি বেসিনে কালো নোংরা পানি জমে আছে, দুটি গোসলখানা তিনটি শৌচাগার ময়লায় ভর্তি। একই অবস্থা পুরুষ ওয়ার্ডসহ অন্যান্য শৌচাগারের। জরুরি প্রয়োজন সারতে গিয়ে দুর্গন্ধে শাহেদুল নামে এক রোগীর স্বজনকেও বমি করতে দেখা গেছে।

হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, জুনিয়র কনসালট্যান্ট মেডিসিন, সার্জারি অ্যানেসথেসিয়া গাইনি চিকিৎসকসহ চারটি পদ শূন্য। খালি রয়েছে দুজন মেডিকেল অফিসার আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) পদটি। নার্সের ১৩টি পদের মধ্যে খালি রয়েছে দুটি, মিডওয়াইফারি (নরমাল ডেলিভারির জন্য) চারটি পদের মধ্যে তিনটিই শূন্য। এছাড়া দীর্ঘদিন মেডিকেল টেকনোলজিস্ট, রেডিওলজিস্ট এক্স-রে টেকনিশিয়ান পদগুলো খালি, স্বাস্থ্য সহকারী ৪৩টি পদের মধ্যে ১৮টি পদ শূন্য, স্টোরকিপার, অফিস সহকারী (কম্পিউটার অপারেটর), হিসাবরক্ষক, ওয়ার্ডবয়, এমএলএসএস, পিয়ন, সুইপারসহ বিভিন্ন পদ শূন্য। এছাড়া স্বাস্থ্য পরিদর্শক দুটি পদের মধ্যে আছেন একজন। সহকারী স্বাস্থ্য পরিদর্শক নয়টি পদের মধ্যে তিনজনের পদই শূন্য পড়ে আছে।

হাসপাতালটিতে প্রতি মাসে উপকূলের এক হাজারেরও বেশি রোগী চিকিৎসার জন্য ভর্তি হয়। আউটডোরে চিকিৎসার জন্য আসে মাসে প্রায় ১০ হাজার রোগী। এছাড়া ৩০-৪০ জনের নরমাল ডেলিভারি হয়। রোগীর এত চাপ থাকলেও চিকিৎসক জনবল সংকট নিরসনে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেই সংশ্লিষ্টদের।

রোগীর স্বজনরা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, ২০ শয্যা অবকাঠামো দিয়ে চলছে পুরো হাসপাতাল। তবে আগে হাসপাতালের চিকিৎসা দরকার। পরে রোগীদের চিকিৎসা। একদিকে অস্বাস্থ্যকর নোংরা পরিবেশ, অন্যদিকে চিকিৎসক সংকট। অনেকটা খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে হাসপাতালের সেবা কার্যক্রম। সংশ্লিষ্ট কর্তাদের উদাসীনতায় এমন অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। তাই করোনা মহামারীতে উপকূলের বাসিন্দাদের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে পর্যাপ্তসংখ্যক ডাক্তার জনবল নিয়োগের দাবি জানায় তারা।

কর্মরত দুজন নার্স জানান, দুরাবস্থা থাকলেও কিছু করার নেই। পর্যাপ্ত জনবল সংকটের সমস্যা দীর্ঘদিনের। যে হারে প্রতিদিন রোগী বাড়ে, সে হারে সেবা দিতে গিয়ে তাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। তবু অতিরিক্ত সময় নিয়ে সেবা দেয়ার চেষ্টা করছি।

ব্যাপারে রামগতি উপজেলা স্বাস্থ্য পরিবার-পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. কামনাশিস মজুমদার বলেন, যে হারে রোগীর চাপ, সে হারে পরিচ্ছন্নতা কর্মী নেই। যে কজন রয়েছে তাদের দিয়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার চেষ্টা করা হয়। তাছাড়া আটজন মেডিকেল অফিসারসহ ১৩ জন চিকিৎসক থাকার কথা থাকলেও মাত্র চারজন মেডিকেল অফিসার দিয়ে পুরো চিকিৎসা কার্যক্রম চালাতে হয়। করোনাকালে চিকিৎসক জনবল সংকটের কারণে সেবা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ জানে, কিন্তু ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না।

লক্ষ্মীপুর জেলা সিভিল সার্জন ডা. আবদুল গফ্ফার বলেন, চিকিৎসক জনবল শুধু লক্ষ্মীপুরেই সংকট নয়, সারা দেশে একই অবস্থা। তবে চিকিৎসক সংকটের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠির মাধ্যমে জানানো হয়েছে। আশা করি শিগগিরই সমস্যার সমাধান হবে।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন