শুক্রবার | সেপ্টেম্বর ২৪, ২০২১ | ৯ আশ্বিন ১৪২৮

সম্পাদকীয়

সময়ের ভাবনা

করোনায় কর্মসংস্থান ও অর্থনীতি

মো. নাফিজুর রহমান

বাংলাদেশের অর্থনীতির যে শক্ত ভিত গত এক যুগে তৈরি হয়েছে, তার সুফল এখন প্রায় এক বছর ধরে লকডাউন, সাধারণ ছুটি এবং বর্তমানে কঠোর লকডাউনের মধ্যেও পাওয়া যাচ্ছে। করোনা পরিস্থিতিতে অর্থনীতির চাকা কিছুটা ধীরগতি ধারণ করলেও স্তব্ধ হয়ে যায়নি। যদিও বিশ্বব্যাংক আইএমএফ উভয় সংস্থা আশঙ্কা প্রকাশ করেছে যে করোনার কারণে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি প্রায় শতাংশ হ্রাস পেতে পারে। বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা আহরণের দুটি বড় উৎস হচ্ছে তৈরি পোশাক শিল্পের রফতানি খাত প্রবাসী শ্রমিকদের পাঠানো রেমিট্যান্স। করোনার কারণে জানুয়ারির প্রায় ২৪ শতাংশ রফতানি ক্রয়াদেশ স্থগিত হয়েছে এবং গত ডিসেম্বর নাগাদ প্রায় বিলিয়ন মার্কিন ডলার রফতানি আদেশ স্থগিত হয়েছে। অবস্থায় একটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক প্রশিক্ষিত কর্মী কর্মহীন হওয়ার আশঙ্কা ছিল। তবে আশ্চর্যজনকভাবে সব অংকের হিসাবনিকাশের বাইরে পোশাক শিল্পের কার্যক্রম চালু রয়েছে এবং সাম্প্রতিক কালে প্রতিবেশী দেশ ভারতে করোনা প্রাদুর্ভাব বৃদ্ধি মিয়ানমারের রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে বাংলাদেশে তৈরি পোশাকের ক্রয়াদেশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। গত বছরেই বাংলাদেশের অনেক তৈরি পোশাক কারখানা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপের দেশগুলোয় ব্যক্তিগত সুরক্ষা পোশাক রফতানি করেছে এবং তাদের নিয়মিত রফতানি আদেশের বাইরে এই নতুন ধরনের পোশাক রফতানির আদেশ পাচ্ছে। এক্ষেত্রে ধরে নেয়া যেতে পারে যে বৈশ্বিক করোনা পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে করোনা মোকাবেলার জন্য সুরক্ষাসামগ্রী বা নতুন ধরনের পোশাক উপকরণের ক্রয়াদেশ বৃদ্ধি পাবে। আমাদের পোশাক শিল্প সাময়িক সমস্যার সম্মুখীন হলেও দীর্ঘমেয়াদে তার উৎপাদন বৈচিত্র্য অভিজ্ঞতা দিয়ে ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম হবে। ২০১৯ সালের এপ্রিলে রেমিট্যান্সের পরিমাণ ছিল প্রায় হাজার ৪৩৪ দশমিক মিলিয়ন মার্কিন ডলার, অন্যদিকে করোনা পরিস্থিতির কারণে ২০২০ সালের একই সময়ে তার পরিমাণ দাঁড়ায় হাজার ৮৬ দশমিক মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা ২০১৯ সালের তুলনায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কম। তবে ২০২১ সালের এপ্রিলে রেমিট্যান্সপ্রবাহ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়ে হাজার ৬৭ দশমিক ৬৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার হয়েছে। জুন নাগাদ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের রেকর্ড সৃষ্টি হয়েছে, যার পরিমাণ ৪৬ হাজার ৩৯১ দশমিক মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা দ্বারা আগামী অন্তত -১০ মাসের রফতানি ব্যয় মেটানো সম্ভব। করোনা মহামারী পরিস্থিতিতে আপাতত রফতানি আয় হ্রাস পেলেও আশা করা যাচ্ছে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স প্রবাহের ধারা মোটামুটি অব্যাহত থাকবে এবং এরই মধ্যে বহির্বিশ্বে করোনা পরিস্থিতি উন্নতির দিকে।

বাংলাদেশ চাল উৎপাদনে বিশ্বের চতুর্থ অবস্থানে আছে এবং গত বছর তুলনামূলক প্রাকৃতিক দুর্যোগ কম হওয়ায় করোনা পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলেও ধানের বাম্পার ফলনে খাদ্য সংকট হয়নি। বছর তেমন কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হওয়ায় ধানের ভালো ফলন হয়েছে, তবে সামনে যদি বড় ধরনের কোনো প্রকার প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হয়, প্রতি বছরের মতো সামনের মৌসুমগুলোয়ও ভালো ফলন হবে বলে আশা করা যায়। অন্যদিকে কৃষক পর্যায়ে উৎপাদিত সবজি সরবরাহের জন্য এরই মধ্যে ডিজিটাল পদ্ধতি অনুসরণ করা হচ্ছে এবং ডাক বিভাগ গত বছরে সবজি খাদ্য পরিবহন কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে নভেল করোনাভাইরাসের ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের আগ্রাসী আক্রমণ ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা নিয়ন্ত্রণ করতে শাটডাউন কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে। করোনা পরিস্থিতি আরো অবনতি দীর্ঘায়িত হলে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষকে সহায়তা কর্মসূচির আওতায় আনা প্রয়োজন হবে। গত কয়েক মাসে দেখা গেছে সরকারের নানামুখী প্রচেষ্টার পরও জনসাধারণের অবহেলা, অসচেতনতা আচরণগত সমস্যার কারণে লকডাউনের কাঙ্ক্ষিত সুফল আমরা পাইনি। সরকারের প্রায় সব দপ্তর-সংস্থা, স্থানীয় মাঠ প্রশাসন তাদের সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা দিয়ে করোনা পরিস্থিতি মোকাবেলার চেষ্টা করেছে। অর্থনীতি জীবিকার তাগিদে সবকিছু দীর্ঘদিন বন্ধ রাখাও বাস্তবসম্মত নয়। তবে করোনা পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক পরিকল্পনা গ্রহণের পাশাপাশি স্থানীয় অর্থনীতির জন্য লাগসই স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন।

তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় অফিস-আদালতে সশরীরে উপস্থিত না হয়ে হোম অফিস বা ভার্চুয়াল অফিস প্রচলন করা হয়েছে। মাঠ প্রশাসনের প্রায় সব দপ্তর-অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা সাধারণ ছুটির মধ্যেও কাজ করছেন, যা সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সহায়ক ভূমিকা রাখছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কর্তৃক প্রাথমিকভাবে করোনা টিকা গ্রহণের ন্যূনতম বয়স ৪০ বছর নির্ধারণ করা হয়েছিল, যা পরবর্তী সময়ে ২৫ বছর নির্ধারণ করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন উৎস থেকে করোনা টিকা প্রাপ্তির পরিপ্রেক্ষিতে ন্যূনতম বয়সসীমা ১৮ বছরে নামিয়ে আনার চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে। দেশের কর্মক্ষম নবীন জনগোষ্ঠীকে করোনা টিকার আওতায় আনতে পারলে করোনা মহামারীর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব থেকে অর্থনীতিকে রক্ষা করা সম্ভব হবে।

লকডাউনের প্রজ্ঞাপনে -কর্মাসকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। গত বছরের মতো এবারো কোরবানির পশু অনলাইনের মাধ্যমে ক্রয়-বিক্রয় হয়েছে এবং -কমার্স অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী বছর প্রায় লাখ ৮৭ হাজার পশু অনলাইনের মাধ্যমে বিক্রি হয়েছে। ফলে প্রচলিত হাটে গিয়ে কেনাবেচায় পরিবর্তন এসেছে। ফলে হাটে ক্রেতা-বিক্রেতার অতিরিক্ত ভিড় এড়ানো সম্ভব হয়েছে। অনলাইনে বাণিজ্য সম্প্রসারণের মাধ্যমে ঢাকাসহ অন্যান্য মহানগরের বাণিজ্যিক বিকেন্দ্রীকরণ হতে পারে। উপশহর গ্রাম পর্যায়ে স্থানীয়ভাবে ব্যবসা-বাণিজ্য বৃদ্ধি পাবে। এরই মধ্যে কিছুসংখ্যক নিম্ন আয়ের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী জীবন জীবিকার প্রয়োজনে পরিবার-পরিজন নিয়ে তাদের নিজ গ্রামে ফিরে যাচ্ছে। তবে তৃণমূল পর্যায়ে সরকারের নানামুখী সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি গ্রহণসহ আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকায় গ্রাম শহর পর্যায়ে বসবাসের সুষ্ঠু পরিবেশ বিরাজমান রয়েছে। করোনার প্রকোপ বৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে স্বাস্থ্য খাতের অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি সার্বিক উন্নয়ন ঘটেছে। স্বাস্থ্য বিভাগ এরই মধ্যে বিভিন্ন জেলা পর্যায়ের হাসপাতালে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র স্থাপন করেছে, অক্সিজেন সরবরাহ ব্যবস্থা নিশ্চিত করেছে। এছাড়া শূন্য পদে নতুন পদ সৃজনের মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ চিকিৎসক, নার্স সহায়ক কর্মচারী নিয়োগ দিচ্ছে। আশা করা যাচ্ছে খুব দ্রুতই স্থানীয় পর্যায়ে সবার জন্য উন্নত চিকিৎসার প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

বাংলাদেশ তৈরি পোশাক রফতানিকারকদের সংগঠন এর আগে আশঙ্কা প্রকাশ করেছিল যে করোনা পরিস্থিতি চলমান থাকলে অদূরভবিষ্যতে কর্মী ছাঁটাই করতে হবে। আশার কথা, সরকারের প্রণোদনা প্যাকেজের ফলে গত দেড় বছরে কর্মী ছাঁটাইয়ের পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়নি। তবে বৈশ্বিক করোনা পরিস্থিতির অবনতির প্রভাবে কর্মী ছাঁটাই হলে তা বেকারত্ব বাড়াবে। এসব দক্ষ কর্মী নতুন কর্মসংস্থানের খোঁজে গ্রাম বা নিজ জেলা শহরগুলোয় ফিরবেন এবং স্বভাবতই কৃষিকাজ স্থানীয় কুটির শিল্পে নিজেদের কর্মসংস্থানের সুযোগ খুঁজবেন। কৃষি গবেষণায় এক যুগ ধরে ধারাবাহিকভাবে অভূতপূর্ব উন্নয়ন হয়েছে। দেশে এখন বিজ্ঞানভিত্তিক উন্নত চাষ পদ্ধতি প্রচলন ঘটেছে, যা স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কৃষিপণ্যের রফতানির সুযোগ সৃষ্টি করেছে। গ্রাম পর্যায়ে আধুনিক কৃষি উৎপাদনের প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি সম্প্রসারণ অর্থায়ন বৃদ্ধি করা যেতে পারে। স্থানীয় পর্যায়ে কৃষিভিত্তিক ক্ষুদ্র শিল্প বিকাশে বিশেষায়িত আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে আসতে হবে, যাতে সেখানে ছোট মাঝারি আকারের শিল্প গড়ে উঠতে পারে। শ্রমিকরা নিজ বাড়ি থেকেই কর্মস্থলে যেতে পারবেন বিধায় তুলনামূলক কম মজুরিতে পণ্য উৎপাদন করা সম্ভব হবে। ফলে উৎপাদন ব্যয় হ্রাস পাবে। স্থানীয় অর্থনীতি বিকাশের জন্য গ্রোথ সেন্টার বা বাণিজ্যিক কার্যক্রম বৃদ্ধির লক্ষ্যে জেলাভিত্তিক শিল্পনগরী এবং স্থানীয় সরকারের আওতায় প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন। উল্লেখ্য, বর্তমানে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা প্রায় ২৩ হাজার ৫৪৮ মেগাওয়াট, যা নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠানে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের নিশ্চয়তা দিতে সক্ষম। সেই সঙ্গে নবায়নযোগ্য জ্বালানিসহ বেশকিছু নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। বিদ্যুৎ খাতের সক্ষমতা নতুন শিল্প প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

করোনা পরিস্থিতি অর্থনীতিতে সাময়িক সমস্যা সৃষ্টির পাশাপাশি নতুন নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিতে পারে। অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে হলে এসব সম্ভাবনার খাত চিহ্নিত করে পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন। করোনা-পরবর্তী সময়ে বৈদেশিক শ্রমবাজারে সাধারণ শ্রমিকের পাশাপাশি দক্ষ স্বল্প দক্ষ চিকিৎসাকর্মী দক্ষ কৃষি কর্মীর চাহিদা বৃদ্ধি পেতে পারে। তাই খাতে সম্ভাবনার নতুন দুয়ার খুলতে পারে। করোনা-পরবর্তী সময়ে কৃষি, স্বাস্থ্য স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষুদ্র মাঝারি শিল্প বিকাশ এবং কৃষি স্বাস্থ্য খাতে প্রশিক্ষিত কর্মী বিদেশে পাঠানোর জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করলে আমরা করোনা পরিস্থিতির ধকল কাটিয়ে উঠে উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে সক্ষম হব। লক্ষ্যে সরকারের সংশ্লিষ্ট যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, কৃষি বিপণন অধিদপ্তর কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র প্রভৃতি প্রতিষ্ঠানের চলমান কার্যক্রম জোরদার করোনা পরিস্থিতির অভিজ্ঞতার আলোকে নতুন কার্যক্রম গ্রহণের মাধ্যমে আমাদের অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে চলমান রাখা সহায়ক হবে। সব গ্রাম উপজেলা পর্যায়ে বাণিজ্যিক কার্যক্রম সম্প্রসারণের জন্য অতি অল্প সুদে ঋণ কার্যক্রম গ্রহণ প্রয়োজনে সামাজিক নিরাপত্তা বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান তৈরির লক্ষ্যে সমাজসেবা অধিদপ্তরের বিদ্যমান সুদমুক্ত ঋণ কার্যক্রমের আওতা বৃদ্ধি করা যেতে পারে। আর এসব পরিকল্পনা গ্রহণের ক্ষেত্রে স্থানীয় পর্যায়ের বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা মাথায় রেখেই পরিকল্পনা গ্রহণ বাস্তবায়ন স্থানীয় পর্যায়েই করতে পারলে অর্থনৈতিক বিকেন্দ্রীকরণ সম্ভব হবে এবং আমার গ্রাম আমার শহর কর্মসূচি বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

 

মো. নাফিজুর রহমান: স্থপতি গবেষক

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন