শুক্রবার | সেপ্টেম্বর ২৪, ২০২১ | ৯ আশ্বিন ১৪২৮

সম্পাদকীয়

সংকটে পারিবারিক কৃষি

ক্ষুদ্র ও বর্গাচাষীদের সুরক্ষায় স্বতন্ত্র আইন প্রণয়ন করা হোক

দেশে কৃষির ওপর নির্ভরশীল পরিবারের প্রায় ৪০ শতাংশই বর্গাচাষী। তারাই দেশের কৃষির মেরুদণ্ড। উৎপাদন বৃদ্ধি খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতে তাদের বড় অবদান রয়েছে। তার পরও সরকারি সুযোগ-সুবিধা প্রাপ্তিতে সবসময়ই পিছিয়ে রয়েছেন তারা। বণিক বার্তা এএলআরডি আয়োজিত এক অনলাইন বৈঠকে অংশগ্রহণকারীরা ক্ষুদ্র বর্গাচাষীদের সুরক্ষায় দ্রুত আইন প্রণয়ন এবং সরকারের পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানান। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি কৃষিমন্ত্রীও একই সুরে কথা বলেছেন। একথা সত্য, কৃষির সম্প্রসারণে যেভাবে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ হওয়া প্রয়োজন ছিল, সেটি হয়নি। তবে গ্রামীণ অবকাঠামো বিশেষ করে সড়কে যে বিনিয়োগ হয়েছে, তাতে কৃষি উপকৃত হয়েছে। কৃষকের যখন কৃষিপণ্য বাজারে নেয়ার প্রয়োজন পড়ল, তখন ওই সড়ক ব্যবহার করে কৃষক বাজারে সহজে যেতে সক্ষম হন। তবে এর সুফল ঘরে তুলেছে মধ্যস্বত্বভোগীরা। এতদিন চ্যালেঞ্জ ছিল কৃষির উৎপাদন বাড়ানোর, এখন কৃষকের সুরক্ষা উৎপাদিত পণ্যের যৌক্তিক দাম নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এজন্য ক্ষুদ্র, বর্গাচাষীসহ যারা সরাসরি কৃষিতে জড়িত তাদের সুরক্ষায় দৃষ্টি দিতে হবে। হতাশাজনক বিষয় হলো, কৃষিতে বর্গাচাষীদের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়লেও তাদের সুরক্ষায় পূর্ণাঙ্গ কোনো আইন নেই। কৃষি কৃষকের সুরক্ষায় দ্রুতই আইন, নীতি বিধিবিধান প্রণয়ন করা প্রয়োজন।

বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে ভাগচাষ বর্গা প্রথার অন্য সব চুক্তি মৌখিকভাবে হয়। লিখিত চুক্তির অনুপস্থিতিতে বর্গাদারদের বর্গাচাষের কোনো নিরাপত্তা থাকে না। জমির মালিক নিজ প্রয়োজনে যেকোনো অজুহাতে অথবা কোনো ধরনের অজুহাত ছাড়াই যেকোনো সময়ে বর্গাদারদের উচ্ছেদ করতে পারেন। বর্গাদারদের দৃষ্টিকোণ থেকে জনসংখ্যার অধিক চাপ, বেকারত্ব, অকৃষি খাতে বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগের অভাব ইত্যাদি কারণে প্রতিকূলতা সত্ত্বেও তারা জমি চাষ করতে বাধ্য হন। জমিস্বল্পতার কারণেও অনেক সময় বর্গাদাররা জমির মালিকের ওপর অসহায়ভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। অন্যদিকে বর্গাদাররা বর্গা চাষে ব্যর্থ হলে অনেক ক্ষেত্রে তাদের কৃষি শ্রমিক হিসেবে নিয়োজিত থাকতে হয়। এই নিগৃহীত অবস্থা থেকে নিজেদের রক্ষার জন্য বর্গাদাররা তাদের উদ্বৃত্ত শ্রম মালিকদের জমিতে নিয়োজন করেন এবং মালিকদের উচ্চহারে খাজনার আকারে উদ্বৃত্ত আহরণের সুযোগ সৃষ্টি করে দেন। এক্ষেত্রে তাদের সুরক্ষায় ন্যূনতম ব্যবস্থা নেই। ভূমি সংস্কার অধ্যাদেশে যেটুকু বিধিবিধান রয়েছে, তারও প্রয়োগ নেই। এতে ক্ষুদ্র কৃষকরা বঞ্চিত হচ্ছেন।

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের অপারেশন বর্গা কেরালা মডেল থেকে শিক্ষা নিয়ে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, কৃষক নারীদের অধিকার সুরক্ষার জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে। বর্গাদারদের ভূমিস্বত্বের নিরাপত্তা জোরদারকরণ এবং জবরদস্তিমূলক উচ্ছেদের আশঙ্কা নিরসন করা, গ্রামীণ ভিটেমাটিতে বসবাসরতদের দখলি-স্বত্ব প্রদান, ভূমিহীন পরিবারগুলোকে বসতবাটির জন্য প্লট প্রদান, কোনো পরিবারকে আট হেক্টরের বেশি জমির মালিকানা রাখতে না দেয়া, ভাগচাষী বর্গাদার কৃষকদের তাদের চাষকৃত জমির কার্যকর মালিকে পরিণত করা। কিন্তু দেশে বিভিন্ন সময়ে সরকার বর্গাচাষী ভূমিহীন চাষীদের জন্য বিনা সুদে ঋণ দেয়ার কথা বললেও প্রকৃত চিত্র সম্পূর্ণ আলাদা। আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে আনুষ্ঠানিক উৎস থেকে ঋণপ্রাপ্তি থেকে তারা বঞ্চিত হচ্ছেন। ঋণ পাওয়ার শর্ত হিসেবে বর্গা চুক্তিপত্র জমা দিতে হয়, যা তাদের পক্ষে জমা দেয়া প্রায় অসম্ভব। কারণ লিখিত চুক্তির মাধ্যমে কোনো চাষীকে মালিক জমি বর্গা দেন না। প্রান্তিক কৃষক বর্গাচাষীদের লিখিত চুক্তিপত্র বদলে প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই সক্ষমতার ভিত্তিতে ঋণ সহায়তা দিতে হবে। পাশাপাশি প্রণোদনায় শস্য ফসল আবাদের সব ধরনের কৃষকদের প্রণোদনা নিশ্চিত করতে হবে। আবার জলবায়ু পরিবর্তন প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ফসল নষ্ট হলে তাদের ঋণের বোঝা বাড়ার শঙ্কাও রয়েছে। সরকার ঘোষিত সুবিধা, বিশেষ করে ভর্তুকিতে সার-বীজ কৃষি উপকরণ প্রাপ্তিতেও তারা বৈষম্যের শিকার হন। সর্বোপরি দেনার দায়, সংরক্ষণাগারের অভাব পারিবারিক চাহিদা মেটানোর জন্য দ্রুত ফসল বিক্রির কারণে ন্যায্যমূল্য থেকে ছোট কৃষকরা বঞ্চিত হন।

প্রতি বছর শতাংশ হারে কৃষিজমি কমছে। দুই তিন ফসলি জমিতে শিল্প-কারখানা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বসতবাড়ি গড়ে উঠছে। উর্বর জমিতে ইটভাটাও গড়ে উঠছে। এতে ভবিষ্যতে খাদ্যনিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়তে পারে। কৃষিজমি রক্ষায় সরকার কৃষিজমি সুরক্ষা ভূমি ব্যবহার আইন, ২০১১ (খসড়া) প্রণয়ন করলেও আজও তা আলোর মুখ দেখেনি। তাছাড়া অনেক আইন নীতির মধ্যে সমন্বয়হীনতা রয়েছে। ফলে আইন নীতির প্রকৃত সুবিধা সাধারণ জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছাচ্ছে না। চাষাবাদ ঝুঁকিপূর্ণ কর্মকাণ্ড। এখানে পুঁজির ঝুঁকি আছে, উপকরণের ঝুঁকি আছে, আরো আছে পরিবেশ আবহাওয়ার ঝুঁকি। সময়ের সঙ্গে ধানের যে উৎপাদন বেড়েছে, তার বড় ঝুঁকিটা নিয়েছেন প্রান্তিক ক্ষুদ্র চাষীরা। এসব চাষীর অধিকাংশই দরিদ্র, আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নিয়ে চাষাবাদে পুঁজি বিনিয়োগ করেন। বন্যা, জলোচ্ছ্বাস আর বিরূপ আবহাওয়ায় ফসলহানি হলে তাদের আর দাঁড়ানোর জায়গা থাকে না। এক্ষেত্রে শস্যবীমার মতো পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে।

প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, এক ইঞ্চি জমিও যেন খালি পড়ে না থাকে এবং কৃষিজমি অকৃষি কাজে ব্যবহার করা যাবে না। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ বাস্তবায়ন করতে হলে প্রশাসনকে সক্রিয় হতে হবে। খাদ্য সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করতে এবং ভবিষ্যতে কৃষিকে লাভজনক খাত হিসেবে অব্যাহত রাখতে খাসজমি বণ্টন, জোনিংসহ বেহাত হওয়া কৃষিজমি উদ্ধার সুরক্ষার পাশাপাশি ছোট, পারিবারিক চাষী, বর্গাচাষীদের রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক থেকে স্বল্প সুদে ঋণ সুবিধা জোগানো জরুরি। একই সঙ্গে ছোট বর্গাচাষীদের বাজারে অভিগম্যতা নিরাপত্তা অগ্রাধিকার হিসেবে কৃষিনীতিতে অন্তর্ভুক্ত করা এবং জেলা উপজেলা পর্যায়ের কর্তৃপক্ষকে সংশ্লিষ্ট নির্দেশনা প্রদান করতে হবে। কৃষকের স্বার্থ রক্ষা করে ভূমি সঠিকভাবে ব্যবহার করে কৃষি উৎপাদন বাড়ানোর সুযোগ বাংলাদেশের রয়েছে। বিপুলসংখ্যক কৃষিনির্ভর জনশক্তির কর্মসংস্থান উৎপাদন বাড়াতে কৃষিজমি সুরক্ষা আইন প্রণয়ন এবং বর্গাচাষ আইন দ্রুত প্রণয়ন করা প্রয়োজন। ভূমি সংস্কারেরও উদ্যোগ নিতে হবে। তবে ভূমি সংস্কার হলেই উৎপাদন শক্তির বিকাশ আপনাআপনি ঘটবে না। ভূমি সংস্কারের পরও প্রযুক্তি পরিবর্তনের প্রয়াস নিতে হবে। ভূমি সংস্কার বা উৎপাদন সম্পর্ক যেমন প্রযুক্তি ব্যবহারকে প্রভাবিত করে, প্রযুক্তি ব্যবহারও তেমনি উৎপাদন সম্পর্কের পরিবর্তন ঘটাতে পারে। তাই দুই বিষয়কে বিচ্ছিন্নভাবে নয়, বরং পরস্পরের ওপর নির্ভরশীল করে অথবা অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে কৃষি/পল্লী উন্নয়নের কর্মকৌশল নির্ধারণ করতে হবে।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন