শুক্রবার | সেপ্টেম্বর ২৪, ২০২১ | ৯ আশ্বিন ১৪২৮

টকিজ

উত্তম কুমার কেন বলিউডে ব্যর্থ হয়েছিলেন?

উত্তম কুমারের কয়েকটি হিন্দি ছবির পোস্টার

উত্তম কেবলই উত্তম। তাকে সম্মান জানানোর আয়োজনে অংশ নিতে পেরে আমি আনন্দিত। আমি তার প্রায় সব বাংলা ছবিই দেখেছি। সেগুলো অসাধারণ। সাচমুচ, উত্তম সাব লাজবাব কালাকার হ্যায় (সত্যিই উত্তম সাহেব তুলনাহীন অভিনেতা)’—সন্দেহ নেই উত্তম কুমারের কানে কথাগুলো মধুবর্ষণ করেছিল, কারণ তার সামনেই যিনি কথাগুলো বলছিলেন তিনি আর কেউ নন, স্বয়ং দিলীপ কুমার। সেদিন ছিল ১৯৭৬ সালের সেপ্টেম্বরে মুম্বাইয়ের এক বৃষ্টিস্নাত সন্ধ্যা। উত্তম তার অমানুষ ছবির সাফল্য উদযাপনে হাজির হয়েছিলেন শহরের নামি এক হোটেলে। শক্তি সামন্তর ছবিটি মুক্তি পেয়েছিল বাংলা হিন্দি সংস্করণে এবং হিন্দি ছবির দুনিয়ায় এটিই বাংলা ছবির মহানায়কের একমাত্র সাফল্য।

অমানুষের ঠিক ১০ বছর আগে উত্তমের হিন্দি ছবি ছোটি সি মুলাকাত একেবারে ব্যর্থ হয়েছিল। অমানুষের সাফল্য উদযাপনের সঙ্গে সঙ্গে তখন ৫০ বছরের উত্তম হয়তো এটাও বুঝে গিয়েছিলেন ভারতের তথাকথিত সিনে রাজধানী বলিউডের ট্রেন তার মিস হয়ে গেছে। তার পরও সেদিন দিলীপ কুমারের প্রশংসা তাকে আনন্দিত করেছিল নিঃসন্দেহে।

দিলীপ কুমার উত্তমের চেয়ে চার বছরের বড় ছিলেন। স্টারডমে দিলীপ উত্তমকে ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন। ৫০ বছর বয়সে এসে উত্তম তখনো শুধু বাংলা ছবির সম্পদ হয়ে ছিলেন। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই উত্তম দিলীপ কুমার ছিলেন পরিপূরক। ছবির জনরা কিংবা চরিত্রে তারা অবলীলায় যাতায়াত করতেন, নিজেদের ছবিকে বিকশিত করতে পারতেন সহজেই। সেদিন সেখানে ছিলেন মুম্বাইয়ের বড় তারকা, প্রযোজক, পরিচালকরা। দিলীপ কুমার সে অনুষ্ঠানের পেছনে আন্তরিক ভূমিকা রেখেছিলেন। উত্তম বিনয়ের সঙ্গে প্রতিক্রিয়া দেখালেন। জানালেন অমানুষ ছবিতে স্বাক্ষরের আগে তিনি বেশ উদ্বিগ্ন ছিলেন, কারণ তিনি তখন মধ্যবয়সে আর তাই তার মনে হচ্ছিল কোনো ছবির মুখ্য চরিত্রের জন্য তিনি আর উপযুক্ত নন। কিন্তু ছবিটি ছিল তার সবচেয়ে বড় সাফল্য; হিন্দি দুনিয়ায় তো বটেই, একটু বিস্ময় লাগলেও বাংলা ছবিতেও। ছবিটি ফিল্মফেয়ারে নয়টি মনোনয়ন পেয়েছিল আর জিতেছিল দুটো। ছবিটি পরবর্তী সময়ে তেলেগু তামিল ইন্ডাস্ট্রিতে রিমেক হয়েছিল।

সেবার উত্তম মুম্বাইয়ে ছিলেন ছয়দিন। সময় তিনি ছয়টি নতুন ছবি স্বাক্ষর করেন, যেগুলো বাংলা হিন্দি উভয় ভাষাতেই তৈরি হবে। সেদিন সান অ্যান্ড স্যান্ডের জমায়েতে শক্তি সামন্তের আজনবি ছবির সাফল্যও উদযাপন করা হয়েছিল। ছবিতে মুখ্য চরিত্রে ছিলেন রাজেশ খান্না জিনাত আমান। কৌতূহলোদ্দীপক ব্যাপার হচ্ছে, আজনবির আগে সামন্ত-রাজেশ জুটির ছবি অমর প্রেম (১৯৭২) ছিল উত্তম কুমারের নিশিপদ্ম (১৯৭০) ছবির রিমেক। উত্তমের দুর্দান্ত অভিনয় আর ছবিটি দেখে শক্তি সামন্ত এর হিন্দি রিমেক করতে আগ্রহী হয়েছিলেন।

রাজেশ খান্না দিলীপ কুমার উত্তমের প্রশংসায় পঞ্চমুখ ছিলেন। তবে এটা কোনো ভিন্ন চিত্র ছিল নামুম্বাইয়ে উত্তমের ভক্ত তখন কম নয়গুরু দত্ত, শশী কাপুর, ধর্মেন্দ্র, অমিতাভ বচ্চন, তারা সবাই উত্তমের ছবির রিমেকে কাজ করেছেন, নয়তো বাংলা ভাষাটা বুঝতেন এবং সে সূত্রে উত্তমের ভক্ত হয়েছিলেন।

১৯৫৬ সালে নির্মিত জাগতে রাহোর বাংলা সংস্করণে রাজ কাপুর চেয়েছিলেন উত্তম কুমারকে। কিন্তু ব্যস্ত উত্তম সময় দিতে না পারায় সে ছবিতে ছবি বিশ্বাসের সঙ্গে রাজ কাপুর নিজেই অভিনয় করেন। রাজ কাপুর তার সংগম (১৯৬৪) ছবির জন্য খুব করে চেয়েছিলেন উত্তম কুমারকে। ছবির গোপাল চরিত্রটি করার জন্য তিনি উত্তমকে প্রস্তাব দেন, কিন্তু ছবিতে আত্মোৎসর্গ করা চরিত্রটি উত্তম করতে রাজি হননি। দিলীপ কুমারও চরিত্রটি করতে রাজি হননি। অবশ্য শোনা যায়, উত্তম সুযোগ হাতছাড়া করার জন্য পরবর্তীকালে আফসোস করেছিলেন। ছবিটি ব্লকবাস্টার হয়েছিল। ১৯৬৭ সালে মুম্বাইয়ে প্রথম ছবি ছোটি সি মুলাকাতের ব্যর্থতার পর সংগমের বাস মিস করার তীরটি উত্তমকে আরো গভীরে আঘাত করেছিল। ছোটি সি মুলাকাত ছিল বেশ ব্যয়বহুল ছবি, এতে উত্তম নিজেও বিনিয়োগ করেছিলেন। কিন্তু ছবির চরম ব্যর্থতা উত্তমকে হতাশা আর আর্থিক ক্ষতির মধ্যে ডুবিয়ে দিয়েছিল; সঙ্গে হলো প্রথমবার হার্ট অ্যাটাক।

ছোটি সি মুলাকাতের পরিচালক ছিলেন আলো সরকার। পরিচালক হিসেবে তখন তিনি নড়বড়ে। উত্তম ভুল থেকে শিখলেন না; বরং আলোর মিষ্টি কথাতেই ভরসা করলেন। ১৯৭৮ সালে আলো সরকার উত্তমকে নিয়ে বানালেন বন্দি। ছবিটি ছিল নিম্নমানের এবং তা উত্তমকে হিন্দি ছবির ইন্ডাস্ট্রিতে আরো ডুবিয়ে দিল।

১৯৫৪ সালে উত্তম কুমারের বয়স ছিল ২৮ বছর এবং তিনি তখনই তারকা। ৩৮ বছর বয়সেও তিনি বাংলা সিনেমার প্রধান নায়ক। ইন্ডাস্ট্রির বক্স অফিস হিটের নিশ্চিত বাজি। এমনকি পরিস্থিতি তাই থাকল তার ৫০ বছর পর্যন্ত। পরিচিতরা জানেন, সারা দিন কঠোর পরিশ্রমের পর উত্তম মাঝ রাত্রিরে জেগে উঠতেন একা একা রিহার্সেল করার জন্য। সত্তরের দশকের মধ্যভাগে বাংলা চলচ্চিত্র জগেক এগিয়ে নেয়ার চাপটা উত্তমের ঘাড়ে চেপে বসেছিল। তখনো তাকে সঙ্গে নিয়ে বিকশিত হওয়ার মতো নতুন তারকা হাজির হননি ভারতীয় বাংলা চলচ্চিত্রে।

১৯৮০ সালে একদিন উত্তম কুমার সত্যজিৎ রায়ের দীর্ঘদিনের সহকারী পুনু সেনকে টালিগঞ্জের এক স্টুডিওতে বসে বললেন, পুনু, মানিকদাকে (সত্যজিৎ রায়) জিজ্ঞেস করো আমার জন্য কোনো চরিত্র আছে কিনা। খুব সামান্য কোনো চরিত্র হলেও চলবে। যেসব কাজ আমি এখন করছি, সেগুলো আর করতে চাই না। বাংলা ছবির এমন শক্তিশালী নায়ক, সত্যজিতের নায়কের কথাগুলো বুঝিয়ে দেয় তিনি শেষ দিকে কী পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন। পুনু সেনকে কথাগুলো বলার ঠিক দুদিনের মাথায় হার্ট অ্যাটাকে উত্তম কুমার চিরকালের জন্য বিদায় নিলেন।

 

সায়ান দেব চৌধুরীর উত্তম কুমার:

লাইফ ইন সিনেমা গ্রন্থের নির্বাচিত

অংশ অবলম্বনে এস এম রশিদ

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন