শুক্রবার | সেপ্টেম্বর ২৪, ২০২১ | ৯ আশ্বিন ১৪২৮

প্রথম পাতা

ইমরান খানের দুর্নীতিবিরোধী প্রচারণা মুখ থুবড়ে পড়ছে

বণিক বার্তা ডেস্ক

দুর্নীতি প্রাচীন বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত একটি বিষয়। বিশ্বের সব দেশেই কোনো না কোনো চেহারায় এটি বিরাজমান। পার্থক্য হলো কোথাও তা বেশি, কোথাও কম। কোথাও দুর্নীতির বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষ সরব আবার কোথাও দুর্নীতিকেই নিয়ম বানিয়ে ফেলা হয়েছে। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, প্রাচীনকাল থেকে সমাজে ঘুষ-দুর্নীতির প্রবেশ ঘটেছে। দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশই দুর্নীতির বেড়াজালে আটকে আছে। তেমনই একটি দেশ পাকিস্তান।

দুর্নীতি পাকিস্তানের জন্য খুবই স্বাভাবিক একটি বিষয়। আর এর শেকড় গ্রোথিত হয়েছে সেই ব্রিটিশ শাসনামলে। ব্রিটিশ শাসকরা সে সময় তাদের অনুগতদের উপহার হিসেবে জমি উপাধি দিত। আর এসব উপহার পেতে দুর্নীতির আশ্রয় নিতেও পিছপা হতো না অঞ্চলের মানুষ। সেই থেকেই শুরু।

ইউনিভার্সিটি অব মেলবোর্নের স্কুল অব সোস্যাল অ্যান্ড পলিটিক্যাল সায়েন্সের শিক্ষক . নাদিম মালিক বিষয়টির বিস্তৃত ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি বলছেন, বিশ্বের অংশে দুর্নীতি বিস্তারে দুটি গুরুত্বপূর্ণ সংকট মূল ভূমিকা পালন করেছিল। এর প্রথমটি হলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় পরে প্রতিরক্ষা-সংক্রান্ত ক্রয় কার্যক্রম। পরেরটি হলো ১৯৪৭ সালে ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নতুন দেশ হিসেবে পাকিস্তানের আত্মপ্রকাশ হিন্দুদের ফেলে যাওয়া জমির বণ্টন। জমির মালিকানা পেতে বহু ছলচাতুরী বা দুর্নীতির আশ্রয় নেয় সাধারণ মানুষ। ছিল ক্ষমতার অপপ্রয়োগও।

সেই থেকেই শুরু। এরপর দুর্নীতি দেশটির বিভিন্ন স্তরে ছড়িয়ে যায়। ১৯৭০ সালের জাতীয়করণ নীতি পাকিস্তানে দুর্নীতির নতুন নতুন সুযোগ তৈরি করে। জন্ম নেয় দুর্নীতিগ্রস্ত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী। অবস্থা ১৯৮০ সাল পর্যন্ত স্থায়ী ছিল। কিন্তু সরকারি ক্ষেত্রে দুর্নীতি উন্নয়নের পথে প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করে। সুশাসন না থাকলে আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাগুলোও বিনিয়োগ করতে চায় না। সুশাসনের অভাব হলে উন্নয়নশীল দেশগুলোর সরকারকে অদক্ষ বলে ধরে নেয়া হয়। তাই দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে আর বিদেশী দাতাদের আকৃষ্ট করতে তত্কালীন প্রেসিডেন্ট জেনারেল পারভেজ মোশাররফ ১৯৯৯ সালে একটি জাতীয় জবাবদিহি ব্যুরো (এনএবি) গঠন করেন। আন্তর্জাতিক দাতাদের পরামর্শ অনুযায়ী সুশাসনভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করাই ছিল তার লক্ষ্য।

এরপর বহুভাবে পাকিস্তানে দুর্নীতি কমানোর চেষ্টা করা হয়েছে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান তার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বেশ উচ্চাভিলাষী দুর্নীতি প্রতিরোধী পরিকল্পনা হাতেও নিয়েছেন। তবে লক্ষ করার মতো বিষয় হলো, পাকিস্তানের জন্য সব পরিকল্পনাই ব্যর্থ হয়েছে। দেশটিতে দুর্নীতি তো কমেইনি, বরং বেড়েছে। বিশেষ করে ইমরানের পাকিস্তান তেহরিক ইনসাফ (পিটিআই) দলের শাসনকালে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দুর্নীতির খবর প্রকাশ পেয়েছে। যেমন সম্প্রতি রাওয়ালপিন্ডি রিং রোড প্রকল্পে বড় দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। সন্দেহের তালিকা থেকে বাদ পড়েননি খোদ ইমরান খানও।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের (টিআই) সূচকে বিশ্বের ১৮০টি দেশের মধ্যে পাকিস্তানের অবস্থান ১২৪ নম্বরে। সংস্থাটি বলছে, দুর্নীতি রোধ করার বদলে পিটিআই সরকার গত আড়াই বছরে দুর্নীতির পরিমাণ আরো বাড়িয়েছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, ইমরান খানের এত ভালো ভালো উদ্যোগ কেন ব্যর্থ হচ্ছে? কেন রাষ্ট্রটির বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুর্নীতি ছড়িয়ে পড়ছে? কেন সেখানে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জোরালো প্রতিবাদ গড়ে উঠছে না?

বিশ্লেষকরা বলছেন, এতসব ভালো উদ্যোগের মুখ থুবড়ে পড়ার কিছু কারণ রয়েছে। সেগুলো হলো দুর্নীতিবিরোধী কৌশল তৈরির জন্য যথাযথ পদ্ধতি অনুসরণ না করা। যাদের জন্য উদ্যোগ তাদের স্বভাব বা প্রকৃতিকে বুঝতে না পারা, চরিত্র বিশ্লেষণে ব্যর্থ হওয়া সাংগঠনিক কাঠামোর দুর্বলতা। এসবের অভাবই পাকিস্তানকে আদতে দুর্নীতিমুক্ত হতে দেয় না।

দুর্নীতির বিস্তারের পেছনে পশ্চিমা একটি ধারণা রয়েছে। সেখানে বলা হয়, রাষ্ট্র সমাজের মধ্যে একটি স্বতন্ত্র পার্থক্য থাকা উচিত। রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে সুবিধাভোগী বা জ্ঞাতি সম্পর্ককে প্রাধান্য দেয়া উচিত নয়। তবে পাকিস্তানের মতো দেশগুলোতে আত্মীয়তার সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। সেখানে কোনো মানুষই আত্মীয়তার সম্পর্ক থেকে মুক্ত নয়। ফলে যেকোনো প্রয়োজনে কাজের ক্ষেত্রে মানুষ নিজের আত্মীয়কে গুরুত্ব দেয়। গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের জন্য পরিবারের সদস্যদের মতামত চাওয়া হয়। আবার নিজের রক্তের সম্পর্কের ব্যক্তিকে সুবিধা দিতে প্রয়োজনে বিকল্প পথ বা দুর্নীতিরও আশ্রয় নেয়া হয়।

একই সম্পর্ক যখন রাজনৈতিক ক্ষেত্রে রূপ নেয়, তখনো একই পথে এগোয় মানুষ। ভোট দেয়ার ক্ষেত্রে বা জনপ্রতিনিধি বেছে নেয়ার ক্ষেত্রেও আত্মীয়তার সম্পর্ককেই গুরুত্ব দেয়া হয়। তারা রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে ভোট দেয় না, বরং পরিবার বা সম্প্রদায়ের ওপর ভিত্তি করে ভোট দেয়। অনেক সময় বর্ধিত পরিবারগুলোর প্রধানরা ঠিক করে দেন যে নির্বাচনে কাকে ভোট দিতে হবে বা আরো স্পষ্ট করে বললে কোন মার্কায় সিল দিতে হবে।

একটা দীর্ঘ সময় পাকিস্তান স্বৈরশাসনের অধীনে ছিল, যার দীর্ঘমেয়াদি ফলাফল দেশটির স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা রাজনীতির ওপর বেশ গভীরভাবে পড়েছে। রাজনৈতিক দলগুলো তাদের মতাদর্শ অনুযায়ী সাধারণ মানুষকে একজোট করতে পারে না। কারণ দলের মতাদর্শ নয়, সেখানকার সাধারণ মানুষ স্থানীয় সরকার নির্বাচনে গোত্র গোষ্ঠীগত পরিচয়কে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করে। ফলে বিষয়টি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বর্ণ-গোত্রের আনুগত্যের রাজনীতি বেশি কাজ করে। আনুগত্য দিনশেষে পৃষ্ঠপোষকতার রাজনীতিকে শক্তিশালী করে। স্থানীয় পর্যায় থেকে রাজনৈতিক শক্তিগুলো কখনো কখনো বর্ণ-গোত্রের শক্তিতে আবার কখনো সামরিক পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে ক্ষমতায় আসে। এরপর যখন তারা জাতীয় প্রাদেশিক সংসদের সদস্য হন তখন তারা নিজেদের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা অনুযায়ী কাজ করতে শুরু করেন। আর তাদের অভিজ্ঞতা তো আদতে বর্ণ-গোত্রভিত্তিক রাজনীতি। ফলে তারা পৃষ্ঠপোষকতার রাজনীতি শুরু করেন এবং নিজের বর্ণ-গোত্রের মানুষের উন্নয়নের জন্যই কেবল প্রাপ্ত তহবিল খরচ করেন। এতে লাভ যেটা হয় সেটা হলো, তাদের পুনরায় নির্বাচনের পথ সুগম হয়। কারণ তাদের ওপর খুশি হয়ে নিজ বর্ণ-গোত্রের লোকজন দিনশেষে তাদেরই ভোট দেন। কিন্তু আসলে সমাজের বা রাষ্ট্রের কোনো উন্নয়ন সে অর্থে হয় না। আবার সাধারণ মানুষের কাছেও এটিই স্বাভাবিক। তারা দীর্ঘদিন ধরে বর্ণ-গোত্র-জ্ঞাতি সম্পর্কের ভিত্তিতে জনপ্রতিনিধি নির্বাচন করে আসছে। ফলে তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধি তাদের জন্য সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টি করবেন, প্রয়োজনে দুর্নীতির আশ্রয় নিয়ে হলেও তাদের স্বার্থ অনুযায়ী কাজ করবেন, এটিই সেখানে স্বাভাবিক। বরং এটি যে দুর্নীতি বা অনুচিত সে বোধটিই তাদের ভেতর ঐতিহাসিকভাবে তৈরি হয়নি।

পশ্চিমা দেশগুলো শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বিভিন্ন রূপান্তরের মধ্য দিয়ে গেছে। গোত্রভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থা থেকে জাতিরাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। কিন্তু উন্নয়নশীল অনেক দেশের কাছেই এখনো জাতিরাষ্ট্রের বিষয়টি স্পষ্ট নয়। আত্মীয়তা বা রক্তের সম্পর্কের বাইরেও যে বিরাট একটি রাজনীতির ক্ষেত্র আছে সেটি সম্পর্কে তারা এখনো অজ্ঞাত। আর বিষয়টিই পাকিস্তানের মতো দেশের জন্য সবচেয়ে সত্য। যেখানে বছরের পর বছর ধরে কেবল সামরিক শাসন চলেছে। এমনকি বর্তমান রাজনীতিতেও এর হস্তক্ষেপ রয়ে গেছে।

২০০২ সালের আগ পর্যন্ত দেশটির গণমাধ্যমগুলো ছিল সরকার নিয়ন্ত্রিত। পারভেজ মোশাররফের সরকার পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করত কোন সংবাদ প্রকাশ হবে আর কোনটি হবে না সে বিষয়টি। ২০০২ সালের পর দেশটির ইলেকট্রনিক গণমাধ্যম স্বাধীন হয় এবং সরকারের বিভিন্ন দুর্নীতির খবর প্রকাশ করতে শুরু করে। একে একে বেরিয় আসে রেন্টাল পাওয়ার প্রজেক্ট বিতর্ক, পাকিস্তানের মেডিকেল ডেন্টাল কাউন্সিলের দেয়া ভুয়া নিবন্ধনের দুর্নীতি, হজ সম্পর্কিত দুর্নীতির খবর, ন্যাটো কনটেইনার, পাকিস্তান স্টিল মিলসের দুর্নীতিসহ নানা ঘটনা। তবে ২০১৩ সালের নির্বাচন ঘিরে নানা অনিয়মের বিষয়টি উঠে আসে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। নাগরিক সাংবাদিকতা তার ক্ষমতা দেখিয়ে দেয়।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, পাকিস্তানের প্রশাসন সামরিক বেসামরিক কর্মকর্তাদের দ্বারা পরিচালিত। শুরু থেকেই পাকিস্তানে রাষ্ট্র সমাজের মধ্যে স্পষ্ট কোনো সীমারেখা গড়ে ওঠেনি। পূর্ণাঙ্গ আদর্শ রাষ্ট্র বলতে যা বোঝায় তা দেশটি হয়ে উঠতে পারেনি। ফলে সেখান থেকে দুর্নীতি নিশ্চিহ্ন করতে হলে রাজনীতিতে বাহ্যিক হস্তক্ষেপমুক্ত অরাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠা নিশ্চিত করতে হবে।

তবে এটি অবশ্যই করতে হবে টেকসই উপায়ে। এমন একটি গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যেখানে সরকারকে দিনশেষে জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে হয়। আর মানুষও জ্ঞাতি সম্পর্কের বাইরে গিয়ে বৃহত্তর পরিসরে ভাবনাচিন্তা করবে। আর সেটি মোটেও সহজ নয়। এর জন্য রাজনীতিবিদদের সদিচ্ছা যেমন প্রয়োজন তেমনি সাধারণ মানুষের মধ্যেও শিক্ষা-সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন