শুক্রবার | সেপ্টেম্বর ২৪, ২০২১ | ৮ আশ্বিন ১৪২৮

শিল্প বাণিজ্য

বিজেএমসির গোল্ডেন হ্যান্ডশেক সুবিধা

বাদ পড়ছেন ভুয়া পরিচয়ে স্থায়ী হওয়া শ্রমিকরা

সুজিত সাহা, চট্টগ্রাম ব্যুরো

রাষ্ট্রায়ত্ত ২৫টি পাটকল বন্ধ করে দেয়া হয় গত বছরের জুলাইয়ে। বন্ধের পর গোল্ডেন হ্যান্ডশেকের আওতায় স্থায়ী ২৫ হাজার শ্রমিকের পাওনা পরিশোধের উদ্যোগ নেয়া হয়। এরই মধ্যে অধিকাংশ শ্রমিকের পাওনা পরিশোধ করা হয়েছে। কিন্তু জাতীয় পরিচয়পত্রের ভুলে এক বছর আটকে ছিল প্রায় তিন হাজার শ্রমিকের পাওনা। এসব পাওনা পরিশোধে বিশেষ উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। তবে তালিকায় ভুয়া নাম-পরিচয় ব্যবহার করে স্থায়ী হওয়া অনেক শ্রমিক রয়েছেন, যারা গোল্ডেন হ্যান্ডশেক সুবিধা থেকে বাদ পড়ছেন। তাদের বকেয়া পরিশোধ করছে না বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশন (বিজেএমসি)

জানা গেছে, সারা দেশে স্থায়ী বদলিসহ পাটকলগুলোর শ্রমিক সংখ্যা প্রায় ৮০ হাজার। এর মধ্যে স্থায়ী শ্রমিক ২৪ হাজার ৫৯৭ জন। এসব শ্রমিকের মধ্যে জাতীয় পরিচয়পত্রে তথ্যবিভ্রাটের কারণে পাওনা আটকে ছিল হাজার ৮০৪ জন শ্রমিকের। তাদের মধ্যে সম্প্রতি ৭৩৮ জন শ্রমিকের জাতীয় পরিচয়পত্রে অস্বাভাবিক বিভ্রাটের কারণে তাদের পাওনা পরিশোধ কার্যক্রম আটকে দিয়েছে বিজেএমসি। করপোরেশনের ধারণা বদলি শ্রমিক থেকে স্থায়ী শ্রমিকে রূপান্তরকালীন অন্যায্য সুবিধা নিয়ে একজনের পরিবর্তে অন্যজন স্থায়ী হয়েছেন, যার কারণে এসব শ্রমিককে পাওনা পরিশোধ করা হবে না। তবে মিলে রক্ষিত নথির সঙ্গে জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য সংশোধন করা সাপেক্ষে তাদের পাওনা পরিশোধের বিষয়টি বিজেএমসি বিবেচনা করবে। 

অনুসন্ধানে জানা গেছে, দেশের সরকারি পাটকলগুলোয় স্থায়ী শ্রমিকের দ্বিগুণেরও বেশি বদলি শ্রমিক কাজ করেন। দীর্ঘদিন বদলি হিসেবে কাজ করার পর পর্যায়ক্রমে তারা স্থায়ী শ্রমিক হন। চাকরি স্থায়ী না হওয়া, পেশা পরিবর্তন, অনিশ্চয়তা, বিদেশে চলে যাওয়ার কারণে অনেক বদলি শ্রমিক কাজ ছেড়ে দেন। তবে পাটকলের কর্মকর্তা শ্রমিক নেতাদের যোগসাজশে বদলি শ্রমিকের তালিকায় থাকা নামে অন্য কাউকে কাজ দেয়া হয়। অর্থের বিনিময়ে করা দুর্নীতি দীর্ঘদিন ধরে পাটকলগুলোয় হয়ে এসেছে। কিন্তু ভুয়া নাম-পরিচয় ব্যবহার করে বদলি শ্রমিক হিসেবে কাজ করা কোনো ব্যক্তির চাকরি যখন স্থায়ী হয়, তখন তিনি তার নিজের প্রকৃত নাম-ঠিকানা প্রকাশ করতে পারেন না। মূলত ধরনের স্থায়ী শ্রমিকরাই গোল্ডেন হ্যান্ডশেক সুবিধা পেতে সমস্যায় পড়ছেন।

তথ্যমতে, বন্ধ হয়ে যাওয়ার আগে পর্যন্ত বিজেএমসির মিলগুলোয় স্থায়ী শ্রমিক ছিল ২৪ হাজার ৫৯৭ জন। অস্থায়ী শ্রমিক ছিল প্রায় ৫০ হাজার। বন্ধ হয়ে যাওয়া মিলের স্থায়ী শ্রমিকদের গ্র্যাচুইটি, পিএফ, ছুটি নগদায়নসহ গোল্ডেন হ্যান্ডশেক সুবিধার পাওনা টাকার অর্ধেক সঞ্চয়পত্র এবং বাকি অর্ধেক টাকা নগদে পরিশোধের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। কারণে দীর্ঘদিন কাজ করা শ্রমিকদের জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্যের সঙ্গে মিলগুলোর নথির সামঞ্জস্য জরুরি হয়ে পড়ে। এরই মধ্যে প্রায় ২২ হাজার শ্রমিক আর্থিক সুবিধা পেয়েছে। তবে হাজার ৮০৪ জন শ্রমিকের পাওনা আটকে যায়। মূলত জাতীয় পরিচয়পত্রে শ্রমিকের নাম, পিতার নাম, জন্মতারিখসহ আনুষঙ্গিক তথ্য ভুল থাকায় দীর্ঘদিন ধরে আটকে রয়েছে এসব শ্রমিকের পাওনা। তবে মানবিক দিক বিবেচনায় শ্রমিকদের অর্থ ছাড় করতে উদ্যোগ নিয়েছে বিজেএমসি। তুলনামূলক কম বিভ্রান্তি রয়েছে এমন হাজার ৬৬ জন শ্রমিকের অনুকূলে বিশেষ বিবেচনায় অর্থ ছাড় করতে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে অনুমতি নিয়েছে বিজেএমসি। 

-সংক্রান্ত নথি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, শ্রমিক বা শ্রমিকের জাতীয় পরিচয়পত্রের সঙ্গে মিলের নথিতে থাকা নামের ভিন্নতা/গরমিল থাকা শ্রমিকদের সি ক্যাটাগরি, আংশিক ভিন্নতা/গরমিল থাকা শ্রমিকদের বি এবং যেসব শ্রমিকের নাম অথবা পিতার নাম সম্পূর্ণ ভিন্নতা রয়েছে সেগুলোকে শ্রেণীভুক্ত করা হয়।

অবসায়নকৃত অবসরকৃত শ্রমিকদের নামের ভিন্নতা নিরূপণে বিজেএমসির তিন সদস্যের গঠিত কমিটির দেয়া প্রতিবেদন অর্থ মন্ত্রণালয়ে জমা দেয়।  প্রতিবেদনপ্রাপ্তির পর চলতি বছরের ২৩ মে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে বস্ত্র পাট মন্ত্রণালয়কে এনআইডির সঙ্গে তথ্যের অসামঞ্জস্য থাকা শ্রমিকদের পাওনা বিদ্যমান আইন বিধিবিধানের আলোকে পরিশোধের কথা জানানো হয়। এক্ষেত্রে উইথ ডিও প্রোসেস অ্যান্ড ডিলিজেন্স অনুসরণ করে যথাযথ যাচাই-বাছাইপূর্বক প্রকৃত শ্রমিকদের অনুকূলে বরাদ্দ দিতে নির্দেশনা দেয়া হয়। পরিপ্রেক্ষিতে শুধু বি শ্রেণীভুক্ত হাজার ৩৬৬ জন এবং সি শ্রেণীভুক্ত ৭০০ জন শ্রমিকের অর্থ পরিশোধে বিজেএমসিকে নির্দেশনা দেয় বস্ত্র পাট মন্ত্রণালয়। একই সঙ্গে শ্রেণীভুক্ত ৭৩৮ জন শ্রমিকের নামের সঙ্গে পিতার নাম সম্পূর্ণ ভিন্ন থাকায় তাদের পাওনাদি পরিশোধের কার্যক্রম স্থগিত করা হয়। মিলের নথিপত্রের সঙ্গে জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য সংশোধন সাপেক্ষে তাদের পাওনা পরিশোধের ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে ওই চিঠিতে। মূলত ক্যাটাগরির শ্রমিকরাই ভুয়া নামে বা বদলি হিসেবে অন্যের নামে চাকরি করার পর স্থায়ী হয়েছেন বলে মনে করছে বিজেএমসি। 

মিলের তথ্য জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্যের ভিন্নতা রয়েছেএমন শ্রমিকদের পাওনার বিষয়ে জানতে চাইলে বিজেএমসির চেয়ারম্যান মো. আব্দুর রউফ বণিক বার্তাকে বলেন, বিজেএমসি স্থায়ী শ্রমিকদের পাওনা পরিশোধে আন্তরিক। জাতীয় পরিচয়পত্রে নাম কিংবা বিভিন্ন তথ্য ভুল থাকলেও অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমতি নিয়ে বিশেষ বিবেচনায় প্রকৃত শ্রমিকদের পাওনা পরিশোধের উদ্যোগ নিয়েছে। দেশের সব মিলে তথ্যের আংশিক গরমিল থাকা শ্রমিকদের পাওনা দ্রুত পরিশোধ করতে নির্দেশও দেয়া হয়েছে। বর্তমানে বদলি শ্রমিকদের পাওনা পরিশোধ দ্রুত সময়ের মধ্যে নিষ্পত্তি করা হচ্ছে। কিন্তু মিলের তথ্যের সঙ্গে জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য শতভাগ ভিন্ন থাকায় বেশকিছু শ্রমিকের পাওনা দেয়া সম্ভব হচ্ছে না।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন