শুক্রবার | সেপ্টেম্বর ২৪, ২০২১ | ৯ আশ্বিন ১৪২৮

সম্পাদকীয়

হাওর পর্যটন বিকাশে চাই পরিকল্পিত উন্নয়ন

ড. মোহাম্মদ বদরুজ্জামান ভূঁইয়া

বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পের রয়েছে অপারসম্ভাবনা বৈচিত্র্যপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ হাওর ঠিক তেমনই একটি বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সম্পদ, যার রয়েছে অপারসম্ভাবনা এক দশক আগেও বাংলাদেশের পর্যটন সম্পদ ছিল অনেকের কাছে অজানা গত কয়েক বছরে হাওর পর্যটন ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেছে এর মাধ্যমে হাওর এলাকায় গড়ে উঠেছে বিভিন্ন প্রকার অবকাঠামো ফলে আর্থসামাজিক উন্নতি হয়েছে এবং হচ্ছে হাওর এলাকায় তাছাড়া হাওর এলাকায় বর্তমানে যেসব অবকাঠামোগত উন্নয়ন হচ্ছে, তা পর্যটন বিকাশে সহায়ক

দ্বীপের মতো করে গড়ে ওঠা ঘরবাড়িগুলো বর্ষাকালে যেমন চোখ জুড়ানো দৃশ্যপট তৈরি করে, তেমনি শীতের কুয়াশায় আচ্ছন্ন হাওরাঞ্চলে পাখপাখালির কলতান কিংবা শুষ্ক মৌসুমের পড়ন্ত বিকালের মিষ্টি রোদের ছড়াছড়ি হাওরকে এক শিল্পীর হাতের সুনিপুণ চিত্রপটের রূপ দেয় বৈকি বর্ষায় হাওরের দক্ষিণা বাতাস পাল তোলা নৌকাগুলোকে শনশন শব্দে উড়িয়ে নিয়ে চলে এবং সেই সঙ্গে বিস্তীর্ণ জলরাশির ছন্দের তালে তালে ভেসে যাওয়া প্রকৃতিতে যোগ করে সরলতার নতুন মাত্রা রাতের হাওর এলাকায় ডিঙি নৌকাগুলোর ভরপানিতে কুপি বাতি জ্বালিয়ে মাছ ধরার দৃশ্য কিংবা চাঁদের আলোয় আলোকিত চঞ্চল ঢেউগুলোর চিকমিক করা হূদয়কাড়া সৌন্দর্য যে কারো স্মৃতিপটে দাগ কাটবে আর এই মোহনীয় প্রকৃতির রূপ বৃদ্ধি পায় শ্রাবণের দমকা বাতাসের সঙ্গে গর্জে ওঠা জলরাশির মেলবন্ধনে

হাওরের সুপ্রাচীন জাগরণ আমাদের সংস্কৃতিকে করেছে সমৃদ্ধ; সৃষ্টি করেছে হাছন রাজা, উকিল মুন্সী, বাউল সম্রাট শাহ আবদুল করিমের মতো সংগীতজ্ঞ, যা একাংশ হিসেবে যুক্ত হয়েছে হাওর অঞ্চলের মহিমা বৃদ্ধিতে সবুজের সমারোহে ভরপুর হলুদ শর্ষে ফুলের দৃশ্যে পরিপূর্ণ হাওরের ধু-ধু মাঠ শুষ্ক মৌসুমে পরিণত হয় এক নয়নাভিরাম নৈসর্গিক লীলাভূমিতে

হাওর সংক্রান্ত সঠিক পরিপূর্ণ তথ্য কোথাও পাওয়া যায় না তবে বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া তথ্যানুযায়ী বাংলাদেশের জেলাগুলোর মধ্যে সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, নেত্রকোনা, সিলেট, কিশোরগঞ্জ ব্রাহ্মণবাড়িয়া সাত জেলার লাখ ৮৪ হাজার হেক্টর জলাভূমিতে ৪২৩টি হাওর নিয়ে হাওরাঞ্চল গঠিত এর মধ্যে সুনামগঞ্জে সর্বোচ্চ ১৩৩টি, কিশোরগঞ্জে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১২২টি, নেত্রকোনায় ৮০টি, সিলেটে ৪৩টি, হবিগঞ্জে ৩৮টি, মৌলভীবাজারে চারটি এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় তিনটি হাওর রয়েছে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাতটি জেলার ৪৮টি উপজেলা নিয়ে গঠিত বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চলের আয়তন প্রায় ২৪ হাজার বর্গকিলোমিটার এই বিশাল অঞ্চলে পর্যটনের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে, যার সুবিধা আমরা এখনো উপভোগ করতে পারিনি

মূলত আমাদের দেশে হাওর পর্যটনের ব্যাপক সম্ভাবনা থাকলেও এর শুরু কিন্তু খুব বেশি দিনের নয় মূলত দেশীয় কিছু তরুণ পর্যটক নিজ উদ্যোগে হাওরের সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্য নৌকা নিয়ে হাওরের বুকে ভেসে বেড়াতেন তারপর ধীরে ধীরে এর ব্যাপকতা লাভ করতে শুরু করে কিন্তু এখন পর্যন্ত হাওরাঞ্চলে পর্যটকদের জন্য তেমন কোনো অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধা গড়ে ওঠেনি ফলে পর্যটকদের থাকা-খাওয়া, নিরাপত্তাসহ অন্য আরো অনেক সমস্যার সম্মুখীন হতে হয় বর্তমানে দু-একটি বেসরকারি ট্যুর অপারেটর সিলেট অঞ্চলে হাওরভিত্তিক ট্যুর প্যাকেজ চালু করেছে

আমাদের পাশের দেশ ভারত তাদের এই উন্মুক্ত জলাশয়ে পর্যটনের ব্যাপক প্রসার ঘটিয়েছে মূলত ভারতের কেরালায় এর প্রচলন খুব বেশি দেখা যায় সেখানে জলাশয়ের বুকে ভেসে ভেসে একজন পর্যটক প্রাণ-প্রকৃতি চারপাশের মানুষের জীবন অবলোকন করতে পারেন আর তার জন্য বিশেষ ধরনের জলযান ব্যবহার করা হয়, যাতে পাঁচ তারকা মানের সব প্রকার সুযোগ-সুবিধা থাকে পাশাপাশি পর্যটকের জন্য স্থানীয় শিল্প-সংস্কৃতি উপভোগ করার ব্যবস্থা থাকে এতে প্রচুর পরিমাণ বিদেশী পর্যটক প্রতি বছর কেরালা ভ্রমণ করেন আমাদের দেশেও রকম সুযোগ-সুবিধা তৈরি করা গেলে হাওরকেন্দ্রিক পর্যটনের ব্যাপক চাহিদা তৈরি হবে

হাওরের সৌন্দর্য উপভোগ করতে পর্যটকরা নৌকায় বসে বিস্তীর্ণ নীল জলরাশির মায়ায় যেমন ডুব দিতে পারেন, তেমনি রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা পেতে সাঁতার কাটতে পারেন নির্দিষ্ট স্থানগুলোয় সংস্কৃতিপ্রেমীদের কাছে রাতের চাঁদের আলোর নিচে নৌকায় বসে স্বাদ নিতে পারেন বাউল মরমি কবি-সাধকদের গানগুলোর সুর তুলে কিংবা হাওরের শীতল হাওয়া পূর্ণিমার আলোয় রাত্রিযাপন করে বর্ষাকালে হাওরের কোলঘেঁষে থাকা সীমান্ত নদী, পাহাড়, পাহাড়ি ঝরনা, হাওর-বাঁওড়ের হিজল, করচ, নলখাগড়া বনের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, নানা প্রজাতির বনজ, জলজ প্রাণী আর হাওরপাড়ের বসবাসকারী মানুষের জীবন-জীবিকার নৈসর্গিক সৌর্ন্দযে মুগ্ধ হওয়ার মতো খোরাক মিলবে পর্যটক দর্শনার্থীদের আর হাজার হাজার দেশী-বিদেশী পাখির মিলনমেলা সবুজের সমারোহ শীতের মৌসুমে গড়ে ওঠা চোখ জুড়ানো সৌন্দর্যে মন-প্রাণ ছুঁয়ে যাবে পর্যটকদের

বাংলাদেশের বৃহত্তম মিঠা পানির জলাভূমি হিসেবে পরিচিত সিলেট মৌলভীবাজারের পাঁচটি উপজেলা নিয়ে বিস্তৃত হাকালুকি হাওর প্রায় ২৩৮টি বিল ১০টি নদীর সমন্বয়ে গঠিত হাকালুকি হাওরে শীতকালে অতিথি পাখির আগমন স্থানীয় প্রায় ১০০ প্রজাতির পাখির কলতান মুখরিত পরিবেশ ভ্রমণপিয়াসুদের আহ্বানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে ২০০০ সালে রামসার সাইটের তালিকায় স্থান করে নেয়া সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওরে ছোট-বড় প্রায় ৩০টি ঝরনা ভারতের মেঘালয় থেকে এসে মিশেছে, সেই সঙ্গে হাওড়জুড়ে ৪৬টির মতো দ্বীপ-সদৃশ ছোট ছোট গ্রাম এক অপরূপ লীলাক্ষেত্র সৃষ্টি করেছে ১২০টি বিল ১৮০টি নিম্নাঞ্চল মিলে তৈরি হওয়ায় স্থানীয়ভাবে পরিচিত নয় কুড়ি কাঁদার ছয় কুড়ি বিল বলে খ্যাত টাঙ্গুয়ার হাওরের স্বচ্ছ পানির সঙ্গে ১৪০ প্রজাতির মাছ, ১২ প্রজাতির ব্যাঙ, ১৫০ প্রজাতির বেশি সরীসৃপ এবং শীতকালে প্রায় ২৫০ প্রজাতির

অতিথি পাখির বিচরণ এক অকল্পনীয় জীববৈচিত্র্য গড়ে তুলেছে বাংলার কাশ্মীর হিসেবে পরিচিত সুনামগঞ্জ জেলার তাহিরপুরের নীলাদ্রি লেক বা টেকের ঘাট পাথর কোয়ারি নামে পরিচিত স্থান ছোট-বড় টিলা, নীল পানি পাহাড়কে সমন্বয় করে এক আকর্ষণীয় পর্যটন স্থানে পরিণত হয়েছে

ঢাকা থেকে কিশোরগঞ্জের দূরত্ব মাত্র ৯০ কিলোমিটার জেলা হাওর-বাঁওড়ের জেলা নামে অধিক পরিচিত এখানে হাওর ঘিরে তৈরি হয়েছে পর্যটনের অপার সম্ভাবনা পানিতে দ্বীপের মতো ভেসে থাকা ছোট ছোট গ্রাম, স্বচ্ছ জলের খেলা, মাছ ধরতে জেলেদের ব্যস্ততা, ছোট ছোট জলাবন খাওয়ার জন্য তরতাজা মাছের স্বাদএমনসব অভিজ্ঞতার খোরাক পেতে চাইলে কিশোরগঞ্জের নিকলী উপজেলার নিকলী হাওরে নৌকায় ঘুরে বেড়ানোর বিকল্প নেই

কিশোরগঞ্জের আরেকটি বিখ্যাত হাওরাঞ্চল হলো মিঠামইন হাওর হাওরে নৌকা ভ্রমণের পাশাপাশি মালিকের দরগা দিল্লির আখড়ার মতো জায়গায় ঘুরতে প্রতিনিয়ত পর্যটকদের সমাগম ঘটছে কিশোরগঞ্জের পানিবেষ্টিত অষ্টগ্রাম উপজেলাটি অষ্টগ্রাম হাওরের মাঝে অবস্থিত, বর্ষাকালে দ্বীপের মতো মাথা উঁচু করে থাকা গ্রামগুলো শীতকালে নতুন রূপ ধারণ করে জেলেজীবন গ্রামীণ জীবনের স্বাদ পেতে প্রতিদিন পর্যটকরা ভিড় জমাচ্ছেন অষ্টগ্রাম হাওরে

বর্ষাকালে পানিতে আবদ্ধ হাওরবাসীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে হাওর এলাকায় পর্যটন সুবিধা বৃদ্ধি করে নতুন নতুন পর্যটকদের ভ্রমণে উত্সাহিত করে শুধু সুনামগঞ্জ জেলার প্রায় হাজার ৬৭০ বর্গকিলোমিটার এলাকার মধ্যে বর্ষায় প্রায় সবটুকুই ডুবে যায়, যেখানে প্রায় ৩০ লাখ মানুষের মধ্যে বর্ষায় সাত-আট লাখ মানুষ অলস সময় কাটায় জেলায় সে অর্থে বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টি করার ক্ষেত্রে পর্যটন বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারে

তাই হাওর এলাকায় পর্যটন বিকাশ ঘটাতে সবচেয়ে যেটি বেশি প্রয়োজন, তা হলো জনমনে সচেতনতা সৃষ্টি করে পর্যটন শিল্পের সম্ভাবনা তুলে ধরা পর্যটকদের স্বাভাবিক যোগাযোগ সুবিধা দিতে প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করে তা বাস্তবায়নে সরকারি বেসরকারি উদ্যোগে ব্যবস্থা গ্রহণ করা; হাওরের পর্যটন তুলে ধরতে বিভিন্ন অনলাইনভিত্তিক মাধ্যম ব্যবহার; পর্যটনসেবা প্রদানকারী সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে নিয়মিত আলোচনা; হাওর জেলাগুলোয় স্যানিটেশনের সব সুবিধা নিশ্চিত করা এবং সেই সঙ্গে পর্যটন টাওয়ার স্থাপন করে পর্যটকদের সেবার ব্যবস্থা করা, নিয়মিত বিরতিতে হাওর এলাকায় সচেতনতা বাড়াতে বার্ষিক উৎসবের আয়োজন করা এবং সর্বোপরি হাওর অঞ্চলে পর্যটন সমস্যা সম্ভাবনা নিয়ে গবেষণা এবং পাঠপরিক্রমা চালু করা এখন সময়ের দাবি

হাওর এলাকার পর্যটনের উন্নয়নের জন্য সরকারি বেসরকারি বিভিন্ন প্রকার উন্নয়ন প্রকল্প প্রণয়ন করা হচ্ছে এসব উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা অবকাঠামোগত উন্নয়ন হতে হবে পরিকল্পিতভাবে বর্তমানে হাওর একালায় অপরিকল্পিতভাবে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড সংঘটিত হচ্ছে এতে হাওর এলাকার সৌন্দর্য নষ্ট হচ্ছে ফলে প্রাকৃতিক সম্পদও নষ্ট হচ্ছে হাওর এলাকার জীববৈচিত্র্য রক্ষার জন্য এখনই পরিকল্পিত উন্নয়ন পরিকল্পনা নিতে হবে এজন্য পর্যটনের সঙ্গে সম্পৃক্ত সব পক্ষকে সঙ্গে নিয়ে উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন করা প্রয়োজন পর্যটন-সমৃদ্ধ স্থানগুলো নিয়ে বাস্তবমুখী, দীর্ঘমেয়াদি সুচিন্তিত পরিকল্পনার মাধ্যমে হাওরবেষ্টিত জেলাগুলোকে আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্রে রূপান্তর করে পর্যটন শিল্প বিকাশে ইতিবাচক ভূমিকার পাশাপাশি হাওরবাসীর জন্য বিকল্প আয় সৃষ্টি, হাওরের পরিবেশ উন্নয়ন জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে অনন্য ভূমিকা রাখতে হাওরের পর্যটন বিস্তার একান্ত প্রয়োজন

. মোহাম্মদ বদরুজ্জামান ভূঁইয়া: অধ্যাপক, ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন