শুক্রবার | সেপ্টেম্বর ২৪, ২০২১ | ৯ আশ্বিন ১৪২৮

দেশের খবর

চামড়া পাচার রোধে দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্তে সর্বোচ্চ সতর্কতা

বণিক বার্তা প্রতিনিধি, কুষ্টিয়া

ছবি : মো.মানিক

কোরবানীর পশুর চামড়া ভারতে পাচার হয়ে যাওয়া রোধ করতে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমের পুরো সীমান্ত জুড়ে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করা হয়েছে। এরইমধ্যে সীমান্তবর্তী বিভিন্ন জেলাগুলোর প্রশাসন এ বিষয়ে সমন্বয় সভা করে করণীয় ঠিক করেছে।

বিভিন্ন জেলার জেলা প্রশাসনের দফতর ও সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি সূত্রে এ তথ্য পাওয়া গেছে।

সূত্র জানায়, প্রতিবছরই কোরবানীর সময়টিতে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২৮৪ কিলোমিটার সীমান্তের কমপক্ষে ১১টি চোরাচালান পয়েন্ট দিয়ে বিপুল পরিমাণ চামড়া ভারতে পাচার হয়ে যায়। আইন শৃঙ্খলাবাহিনী সূত্র বলছে, এসব পয়েন্টগুলোতে প্রায় অর্ধশত চোরাকারবারী সক্রিয় রয়েছে চামড়া পাচারের কাজে। এদের মধ্যে ১৫ জন যশোরের, ১৮ জন সাতক্ষীরার, আটজন কুষ্টিয়ার, ছয়জন চুয়াডাঙা ও মেহেরপুর জেলার এবং সাতজন রয়েছে ঝিনাইদহ জেলার।

ভারতে চামড়ার দাম অপেক্ষাকৃত বেশী হওয়া ও বাংলাদেশের পশুর চামড়ার সেখানে ভালো চাহিদা থাকার কারণে সাধারভাবে সারা বছর জুড়েই এ পাচারের ঘটনা ঘটে থাকে। অন্যদিকে কোরবানীর এ সময়টিতে পাওয়া বিপুল পরিমাণ চামড়া সংরক্ষণের ব্যবস্থাও দেশের সব স্থানে নেই।

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন জেলাতেই রয়েছে চামড়ার হাট। তবে সব থেকে বেশী ট্যানারী রয়েছে যশোর জেলায়। যশোরের রামনগর, রাজারহাটের চামড়া হাটে যশোরসহ খুলনা বিভাগের ১০ জেলা ছাড়াও গোপালগঞ্জ, ফরিদপুরসহ বিভিন্ন জেলা থেকে আসা চামড়ার বিপণন হয়ে থাকে। এ হাট দুটিতে কোরবানীর সময়ে প্রায়৬০-৭০ হাজার পিচামড়া বেচা-কেনা হয়ে থাকে। এ চামড়ার প্রায় ৮০ শতাংশই ঈদ পরবর্তী কয়েক মাস ধরে ভারতে পাচার হয়ে চলে যায় বলে জানিয়েছে একটি সূত্র

যশোর জেলা প্রশাসক তমিজুল ইসলাম খান জানান চামড়া পাচার রোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়েছেন তারা। বিজিবি-পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা জানিয়ে দেয়া হয়েছে।

মেহেরপুরের জেলা প্রশাসক ড. মোহাম্মদ মনসুর আলম খান জানান চামড়া পাচারের বিষয়টি সব সীমান্ত দিয়েই ঘটা একটি সামাজিক প্রপঞ্চের মতো হয়ে গেছে। একটি নির্দিষ্ট সময়ে দেশের বাজারে বিপুল চামড়ার সরবরাহ হওয়ায় তা চামড়ার বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করে। তিনি বলেন, দেশে চামড়ার ব্যবসায়ীরা বেশী নজর দিয়ে থাকেন তাদের বিনিয়োগের উপর। যার কারণে যে কোনো উপায়ে তারা বিনিয়োগ তুলে আনতে সক্রিয় হয়ে ওঠেন। প্রয়োজনে সেটি অবৈধ উপায় হলেও তারা সে উপায় বেছে নেন।

দীর্ঘদিন চামড়া ব্যবসার সঙ্গে জড়িত যশোরের আকিল আহমেদ, কুষ্টিয়ার গোলাম মোস্তফা। তারা বলেন, পাচার রোধ করতে হলে চামড়ার স্থানীয়বাজার শক্তিশালী করতে হবে। চামড়া শিল্পকে নীতিমালার আওতায় আনতে হবে।

গোলাম মোস্তফা বলেন, চামড়া ব্যবসায়ীদের দীর্ঘদিনের দাবি ভারতের সঙ্গে সামঞ্জস্য করে দেশে চামড়ার দাম নির্ধারন করার। কিন্তু সেটা হয়না। এ বছরও চামড়ার দাম নিয়ে ব্যবসায়ীদের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে।

চামড়া ব্যবসার সঙ্গে জড়িত একাধিক ব্যক্তি বণিক বার্তাকে জানিয়েছেন যে, চামড়া পাচারের সঙ্গে দুই বাংলার শক্তিশালী একটি চক্র জড়িত রয়েছে।

ঝিনাইদহের চামড়া ব্যবসায়ী মজিবর রহমান জানান, করোনা মহামারির মধ্যে পুঁজির স্বল্পতা নিয়ে তারা দুরাবস্থায় আছেন। এবার লবণযুক্ত গরুর কাঁচা চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুট ঢাকার বাইরে ৩৩ থেকে ৩৭ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ ছাড়া প্রতি বর্গফুট খাসির চামড়া ১৫ থেকে ১৭ টাকা, বকরির চামড়া ১২ থেকে ১৪ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ দামে গ্রামে গ্রামে ঘুরে চামড়া কিনলে লাভ হবে না। আর  সেকারণেই অঞ্চলের ব্যবসায়ীরা ভারতে ব্যবসা খুঁজে নেন।

চুয়াডাঙার চামড়ার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী আরব উদ্দিন বলেন, ঈদ মৌসুমে নগদ টাকায় চামড়া কিনতে হয়। সেগুলো বড় ট্যানারি মালিকদের কাছে বিক্রি করে মাসের পর মাসও টাকা ফেরত পাওয়া যায় না। অন্যদিকে ভারতের ব্যবসায়ীদের কাছে চামড়া বিক্রি করলে বেশি লাভ হয় ও নগদে টাকা পাওয়া যায়।

কুষ্টিয়ার গোলাম মোস্তফা জানান, ভারতেচামড়া ব্যবসায়ীদের জন্য গরুর চামড়া জোগাড় করা কঠিন। তাই তারা প্রতিবছরবাংলাদেশের এ সময়টির অপেক্ষায় থাকেন।অনেক ক্ষেত্রে তারা এদেশের অনেক ব্যবসায়ীকে অগ্রিম টাকাও দিয়ে রাখেন। যাদের মধ্যে কেবল সীমান্ত এলাকার নয়, ঢাকার কিছু ব্যবসায়ীও রয়েছেন।

এ বিষয়ে কথা হয় খুলনা ২১ বিজিবি ব্যাটালিয়নের কমান্ডিং অফিসার লে. কর্নেল মুনজুর এলাহীর সঙ্গে। তিনি জানান, এ পাচার রোধ করতে তারা সব রকমের চেষ্টা করে যাচ্ছেন। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা একটি শক্ত চক্রের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো কঠিন। প্রতিবছরই বিজিবি প্রচুর চামড়া পাচারের সময় জব্দ করে। তারপরেও পরের বছর একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে।

৪৯ বিজিবি ব্যাটালিয়নের কমান্ডিং অফিসার লে. কর্নেল সেলিম রেজা বলেন, তারা উদ্যোগ নিয়েছেন।বিজিবিকে সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় রাখা হয়েছে। বিভিন্ন সীমান্ত পয়েন্টে বিজিবি পোস্টে কড়া নজরদারি রাখা হবে।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন