শুক্রবার | সেপ্টেম্বর ২৪, ২০২১ | ৮ আশ্বিন ১৪২৮

প্রথম পাতা

হার্ভার্ডের মহামারী বিশেষজ্ঞের পর্যালোচনা

টিকাদান ও স্বাস্থ্যবিধি মানা ছাড়া ডেল্টা মোকাবেলা অসম্ভব

বণিক বার্তা ডেস্ক

কভিডের শুরুর ধরন আলফা ভ্যারিয়েন্টের চেয়ে ডেল্টার সংক্রমণ সক্ষমতা প্রায় ৬০ শতাংশ বেশি। নভেল করোনাভাইরাসের ধরনগুলোর মধ্যে এটিই সবচেয়ে বেশি প্রাণঘাতী। জনসাধারণের মধ্যে ব্যাপক মাত্রায় টিকাদান ও স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করা ছাড়া এর মোকাবেলা অসম্ভব —উইলিয়াম হ্যানেজ সহযোগী অধ্যাপক, এপিডেমিওলজি

বিশ্বব্যাপী কভিড মহামারীর তাণ্ডব এখন মারাত্মক আকার নিয়েছে। এরই মধ্যে গোটা বিশ্বে করোনায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪১ লাখের কাছাকাছি। করোনার সবচেয়ে মারাত্মক ধরন ডেল্টার সংক্রমণজনিত বর্তমান প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে হিমশিম খেয়ে যাচ্ছে বিভিন্ন দেশের সরকার।

বর্তমানে অতীতের প্রবাহগুলোর চেয়েও অনেক বেশি দ্রুতগতিতে ছড়িয়ে পড়ছে ডেল্টার সংক্রমণ। নতুন সংক্রমণ প্রবাহ প্রতিরোধে লকডাউনসহ নানা ধরনের কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করছে বিভিন্ন দেশ। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জনসাধারণের মধ্যে ব্যাপক মাত্রায় টিকাদান কর্মসূচির প্রয়োগ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা ছাড়া করোনার ডেল্টা ধরনকে মোকাবেলা করা একেবারেই অসম্ভব। হার্ভার্ড টিএইচ চ্যান স্কুল অব পাবলিক হেলথের সেন্টার ফর কমিউনিকেবল ডিজিজ ডায়নামিকসের এপিডেমিওলজি বিষয়ের সহযোগী অধ্যাপক উইলিয়াম হ্যানেজের এক সাম্প্রতিক বিশ্লেষণেও বিষয়টি উঠে এসেছে।

হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব সংবাদমাধ্যম দ্য হার্ভার্ড গেজেটে সম্প্রতি -সংক্রান্ত এক পর্যালোচনা দিয়েছেন উইলিয়াম হ্যানেজ। সেখানে বৈশ্বিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় করোনার ডেল্টা ধরনের সংক্রমণজনিত হুমকি তা মোকাবেলা-সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন তিনি। উইলিয়াম হ্যানেজের মতে, গোটা বিশ্বকেই এখন মারাত্মক দুর্যোগপূর্ণ এক জরুরি অবস্থার দিকে ঠেলে দিয়েছে কভিডের ডেল্টা ধরন। বৈশ্বিক মহামারীর শুরুর ধরন আলফা ভ্যারিয়েন্টের চেয়ে এর সংক্রমণ সক্ষমতা প্রায় ৬০ শতাংশ বেশি। এছাড়া নভেল করোনাভাইরাসের ধরনগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রাণঘাতী ধরন ডেল্টা। জনসাধারণের মধ্যে ব্যাপক মাত্রায় টিকাদান স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করা ছাড়া এর মোকাবেলা অসম্ভব বলে মনে করছেন উইলিয়াম হ্যানেজ।

করোনার ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট প্রথম শনাক্ত হয় ভারতে। বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া তথ্য বলছে, গত বছরের শেষ দিকে প্রথম ধরনটি শনাক্ত করা হয়। সার্স-কভ- ভাইরাসের (নভেল করোনাভাইরাসের) স্পাইক প্রোটিনের জিনগত মিউটেশনের মধ্য দিয়ে আবির্ভাব ঘটে কভিডের ডেল্টা ধরনের।

উইলিয়াম হ্যানেজের ভাষ্যমতে, ডেল্টার দ্রুত ছড়ানোর সক্ষমতা দেখে মনে হচ্ছে, জনসাধারণের মধ্যে টিকার সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারার আগেই বিশ্বব্যাপী ব্যাপক মাত্রায় সংক্রমণ ঘটাবে ধরনটি। বিশ্বের অধিকাংশ মানুষ এখনো টিকার আওতার বাইরে রয়ে গিয়েছে। কভিডের তাণ্ডব সৃষ্টিকারী পূর্ববর্তী ধরনটির সঙ্গে তুলনায় দেখা যাচ্ছে, সংক্রমণের পর ডেল্টা দেহের মধ্যে দ্রুততম সময়ের মধ্যে আগের ধরনগুলোর চেয়ে অনেক বেশি মাত্রায় ভাইরাস তৈরি করতে পারে। অর্থাৎ কেউ সংক্রমিত হওয়ার পর কিছু বুঝে ওঠার আগেই তা অন্যদের মধ্যে আরো দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

এমনকি টিকা নেয়া ব্যক্তিদের মধ্যেও দেহের সুরক্ষাবলয় অতিক্রম করে সংক্রমণ ঘটাতে সক্ষম (ব্রেক থ্রু ইনফেকশন) ডেল্টা। তবে এক্ষেত্রে ধরনটির সংক্রমণজনিত রোগের ভয়াবহতা হয় তুলনামূলক লঘু মাত্রার। অন্যদিকে টিকা না নেয়া ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে সংক্রমণ মারাত্মক অসুস্থতার কারণ হয়ে দেখা দিতে পারে। ডেল্টার সংক্রমণে টিকা না নেয়া ব্যক্তিদের হাসপাতালে ভর্তির প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়ার আশঙ্কা কভিডের আগের ধরনগুলোর তুলনায় দ্বিগুণ। কারণে অন্যান্য ধরনের তুলনায় ডেল্টা স্বাস্থ্য খাতে আরো বেশি মাত্রায় চাপ সৃষ্টির আশঙ্কা তৈরি করে বলে মনে করছেন উইলিয়াম হ্যানেজ।

এখন পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী কভিডের সংক্রমণ সবচেয়ে বেশি ঘটেছে যুক্তরাষ্ট্রে। জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের গতকাল রাত ৮টা পর্যন্ত হালনাগাদকৃত তথ্য অনুযায়ী, গোটা বিশ্বে এখন পর্যন্ত নভেল করোনাভাইরাসের মোট সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে ১৯ কোটি লাখের বেশি। এর মধ্যে প্রায় কোটি ৪১ লাখ শনাক্ত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে। মহামারীর ধাক্কা কাটিয়ে দেশটির অর্থনীতি এখন পুনরায় চালু হয়েছে। তবে এখনো যুক্তরাষ্ট্র মহামারীর ঝুঁকি পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারেনি। দেশটির দক্ষিণাঞ্চলীয় অঙ্গরাজ্যগুলোয় এখনো প্রচুর মানুষ টিকাদান কর্মসূচির আওতার বাইরে রয়ে গিয়েছে। আবার এসব এলাকাতেই স্থূলতা ডায়াবেটিসের মতো অসংক্রামক অন্যান্য রোগের প্রাদুর্ভাবও বেশি। করোনার সংক্রমণ এসব রোগে আক্রান্তদের জন্য মারাত্মক হয়ে দেখা দিতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিষয়টি নিয়ে শঙ্কিত উইলিয়াম হ্যানেজও। এছাড়া বিশ্বব্যাপী টিকার প্রাপ্যতা নিয়ে যে সংকট দেখা দিয়েছে, সেটিও ঘরের বাইরে গিয়ে কাজ করা মানুষের জন্য সংক্রমণের আশঙ্কাকে আরো বাড়িয়ে তুলছে বলে মনে করছেন তিনি।

যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি) দেশটির নাগরিকদের জন্য এরই মধ্যে ডেল্টার সংক্রমণ প্রতিরোধ নিয়ে এক গাইডলাইন জারি করেছে। এতে বলা হয়েছে, টিকা নেয়ার পরও মার্কিন নাগরিকদের মাস্ক পরে চলাচল করতে হবে। সিডিসির গাইডলাইনের সমর্থনে উইলিয়াম হ্যানেজ বলেছেন, টিকা গ্রহণকারী ব্যক্তিরা করোনায় আক্রান্ত হলে তাদের পরিস্থিতি মারাত্মক দিকে যাওয়ার সম্ভাবনা কম। কিন্তু টিকা না নেয়া ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিন্ন। আমার উপদেশ হলো, মহামারী এখনো শেষ হয়নি। যদি কেউ টিকা না নিয়ে থাকে তবে তাকে অবশ্যই তা নিতে হবে। এছাড়া স্থানীয় পরিস্থিতির দিকে নজরও রাখতে হবে। যদি কেউ ডেল্টায় সংক্রমিত না হতে চায়, তাকে অবশ্যই জনসমাগমের স্থানগুলোয় মাস্ক পরতে হবে। এবং যেসব এলাকায় ডেল্টার সংক্রমণ ছড়াচ্ছে, সেসব এলাকায় সামাজিক দৈহিক দূরত্বের বিষয়টি অবশ্যই বজায় রাখতে হবে।

বর্তমানে বিশ্বব্যাপী নভেল করোনাভাইরাসের ধরনগুলো নিয়ে অনেকটা খাপছাড়াভাবে গবেষণা চলছে বলে মনে করছেন উইলিয়াম হ্যানেজ। মহামারীর বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট নিয়ে পর্যালোচনায় তিনি বলেন, ভারতের গত কয়েক মাসের ভয়াবহতার জন্য দায়ী প্রধানত ডেল্টা। এর কারণে মে মাসের শুরুর দিকে দেশটিতে দৈনিক সংক্রমণ শনাক্তের সংখ্যা লাখ ছাড়িয়ে যায়। হাজার অতিক্রম করে যায় দৈনিক মৃতের সংখ্যা। সম্ভবত উভয় ক্ষেত্রেই সংখ্যাগুলোকে কমিয়ে দেখানো হয়েছে। এপ্রিলে ডেল্টার ধরন যুক্তরাজ্যে এসে পৌঁছার আগ পর্যন্ত সেখানকার গবেষকরা ধরনটিকে ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলেন না। তবে তারা এরই মধ্যে প্রমাণ করেছেন, ডেল্টায় আক্রান্তদের হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়ার আশঙ্কা অন্যান্য ধরনের তুলনায় দ্বিগুণ। এছাড়া ডেল্টার সংক্রমণের গতিও অন্যদের তুলনায় অনেক বেশি। করোনার আরেক ধরন লাম্বডার সঙ্গে দক্ষিণ আমেরিকায় মহামারী পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেয়ার সংযোগ রয়েছে। যদিও এটিকে বিজ্ঞানীরা ডেল্টার মতো করে এখনো তেমন একটা বুঝে উঠতে পারেননি। অন্যদের মতো এতটা গভীরে গিয়ে অনুসন্ধান না চালালেও যুক্তরাষ্ট্রে সিডিসি একটি জিনোমিক সার্ভেল্যান্স প্রোগ্রাম হাতে নিয়েছে। ফলে এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি দ্রুত কার্যকর তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। এর ভিত্তিতেই আমি বলতে পারি, যেসব স্থানে এখনো ডেল্টা পৌঁছাতে পারেনি, সেখানে এর সংক্রমণ অবশ্যই ছড়াবে এবং তা ঘটবে ধারণার চেয়েও দ্রুততম সময়ের মধ্যে।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন