শুক্রবার | সেপ্টেম্বর ২৪, ২০২১ | ৯ আশ্বিন ১৪২৮

সম্পাদকীয়

সময়ের ভাবনা

কৃষি উপকরণের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা প্রসঙ্গে

ওয়ায়েস কবীর

সঠিক কৃষি উপকরণ উৎপাদনের পূর্বশর্ত। মানসম্পন্ন নির্ভেজাল বীজ, সার, কীটনাশক, পশু মত্স্য খাদ্য, গবাদি পশুর চিকিৎসাসামগ্রী সরবরাহে নানা রকমের নেতিবাচক খবর বা রিপোর্ট গণমাধ্যমে জানতে পারা যায়; যা কৃষক, ভোক্তা বা সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকদের চিন্তার উদ্রেক করে। এসব মানহীন বা ভেজাল উপকরণ একদিকে উৎপাদনের ক্ষতি করে, কৃষক ফসল হারান বা ক্ষতিগ্রস্ত হন, অন্যদিকে ভেজাল কীটনাশক জনস্বাস্থ্য পরিবেশের জন্য ক্ষতি করে। পশুখাদ্যে-চিকিৎসায় অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার নিয়ে ভোক্তা পর্যায়ে ভীতি সঞ্চার করছে, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ব্যবসা। ভোক্তারা অনেক ক্ষেত্রে এসব খাদ্যপণ্য বর্জন করছে।

নিয়ে প্রচুর আলোচনা এবং ব্যবস্থাপনা উন্নয়নের জন্য নীতিমালা, আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। বিশেষ করে বীজের চারা না গজানো, মিশ্রিত বীজ, সীমান্ত এলাকায় ভেজাল সারের ব্যাপ্তি, চটকদার নামের ভেজাল বা অনিবন্ধিত সার নিয়ে অভিযোগ শোনা যায়। বিশাল বাজার সরবরাহ ব্যবস্থাপনা তদারকি আইন প্রয়োগ ছাড়াও সচেতনতা প্রশিক্ষণ দ্বারা জটিলতা বা প্রতিবন্ধকতা দূর করা সম্ভব।

দেশে ফসল উৎপাদন বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে কীটনাশক, আগাছানাশক ছত্রাকনাশকের ব্যবহার বাড়ছে। জ্ঞানের অভাবে মাত্রাহীনভাবে এসব ব্যবহার উদ্বেগের সৃষ্টি করছে। ঝুঁকিপূর্ণ কীটনাশক ব্যবহারের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে পরিবেশ দূষণ, বাড়ছে কৃষক পর্যায়ে ক্যান্সার, নানা রকমের ফুসফুসের সমস্যা, শরীরের ঘা, পাচড়া ইত্যাদিতে আক্রান্তের সংখ্যা। ঝুঁকিপূর্ণ কীটনাশক ব্যবহারের জন্য আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত নির্দিষ্ট পরিবহন, ব্যবহারবিধি, নিরাপত্তামূলক পোশাকবিষয়ক নির্দেশনা থাকলেও প্রায় ক্ষেত্রে তা মানা হয় না এবং ব্যবহারকারীর বিষয়ে কোনো প্রশিক্ষণও নেই। এক পরিসংখ্যানে জানা যায়, দেশে ৩৫০টি কোম্পানির প্রায় ৫০ হাজার কীটনাশক বা আগাছানাশকের ডিলার রয়েছে। অন্য এক গবেষণায় জানা যায়, বাংলাদেশে শতকরা মাত্র এক ভাগ কীটনাশক ব্যবহারকারী ব্যবহারের সময় পায়ে জুতা পরেন, মাত্র দুই ভাগ হাতে গ্লাভস, তিন ভাগ চোখে গ্লাস পরেন। এতে নানা রকমের শারীরিক অসুস্থতার কথা শোনা যায়। এক হিসাবে দেখা যায়, সারা দেশে প্রায় ২৯ হাজার খুচরা পর্যায়ের সার বিক্রেতা রয়েছে আর বিএডিসির প্রায় পাঁচ হাজার সারের ডিলার রয়েছে।

আমাদের কৃষি উপকরণ সরবরাহের সঙ্গে সরকারি-বেসরকারি সংস্থার ডিলার খুচরা পর্যায়ে বিক্রেতারা এসব উপকরণ সরবরাহ করেন। মাঠ পর্যায়ে এসব ডিলার খুচরা বিক্রেতা কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। স্থানীয় স্থায়ী বাসিন্দারাই উপকরণের ডিলার বা খুচরা বিক্রয় বণ্টনে জড়িত বলে স্থানীয় জনসাধারণের সঙ্গে তাদের নিবিড় যোগাযোগ থাকে। অনেক ক্ষেত্রে কৃষি-সংক্রান্ত বিভিন্ন সমস্যা বিষয়ে তারা উৎপাদনকারীদের পরামর্শ দেয়। তাছাড়া গ্রামীণ এলাকায় তাদের উপস্থিতি সার্বক্ষণিক। সেসব বিবেচনায় এসব ডিলার সার্বক্ষণিক কৃষি সম্প্রসারণের কাজে জড়িত। পক্ষান্তরে, এসব ডিলারের কৃষিবিজ্ঞান বিষয়ে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই। ফলে ভেজাল বা মানহীন উপকরণ বিষয়ে বা এসবের কার্যকারিতা সম্পর্কে তাদের সম্যক ধারণা থাকে না। তবে যে কোম্পানি কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত এসব ডিলার, তাদের সংশ্লিষ্ট কোম্পানির উপকরণের বিষয়ে হালকা ধারণা দেয়া হয়। তাছাড়া নিজস্ব পণ্য বিক্রিতেই স্বাভাবিকভাবে তাদের আগ্রহ বেশি। তাই এসব ডিলার এবং বিক্রেতার দক্ষতা সক্ষমতা বৃদ্ধি করে প্যারা  সম্প্রসারণ  কর্মী হিসেবে কাজে লাগানো যেতে পারে। এতে উপকরণ ব্যবস্থাপনায় সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হবে এবং এসব কর্মীর কৃষি উন্নয়নে আরো অবদান রাখার সুযোগ করে দেয়া যেতে পারে।

একই ডিলার বা খুচরা বিক্রেতা সাধারণত সার, কীটনাশক, বীজ একই দোকানে বিক্রি করেন এবং কৃষি যন্ত্রপাতিগুলো কোম্পানি নিয়োজিত আলাদা ডিলারশিপের মাধ্যমে বিক্রি করেন। কৃষি উপকরণগুলোর প্রতিটা আইটেমের নিজস্ব গুণাগুণ বা বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যা বজায় রেখে কৃষি উপকরণ সরবরাহের ধারা রক্ষা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এসব গুণাগুণের হেরফের হওয়ার কারণে উৎপাদন ব্যাহত হয় এবং অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আসাধু ব্যবসায়ীদের কারণে ভেজাল উপকরণ সরবরাহে প্রতারিত হচ্ছেন কৃষক। অনেক সময় ডিলার বা বিক্রেতার অজ্ঞতার কারণেও ভেজাল উপকরণ বিক্রয় করেন।

এসব বিবেচনায় নিয়ে সারা দেশের সব ডিলারকে কৃষি উপকরণবিষয়ক প্রশিক্ষণ কোর্স পরিচালনা করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। বিশেষ করে ডিলারশিপ গ্রহণের পূর্বশর্ত হিসেবে ডিপ্লোমা কোর্স বাধ্যতামূলক করার ব্যবস্থা গ্রহণ প্রয়োজন।

বিষয়ে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো যেতে পারে। ভারতের যেকোনো কৃষি উপকরণ ডিলারশিপ গ্রহণের জন্য ডিপ্লোমা কোর্সের সার্টিফিকেট নেয়ার আবশ্যকতা রয়েছে। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের কৃষি কৃষক উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের অধীনে কৃষি সম্প্রসারণ ব্যবস্থাপনা সংস্থা (National Institute of Agricultural Extension Management) বা এমএএনএজিই ২০০৩ সাল থেকে কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। এখানে এমএএনএজিই অর্ধেক খরচ বহন করে আর বাকি অর্ধেক খরচ ডিলার নিজে বহন করে। এগ্রিকালচারাল এক্সটেনশন সার্ভিস ফর ইনপুট ডিলারস (ডিএইএসআই) নামে এক বছরব্যাপী প্রশিক্ষণের বৈশিষ্ট্য হলো, বছরের ৪৮ সপ্তাহের ছুটির দিনে মোট ৪০টি ক্লাসরুম সেশন এবং আটটি মাঠ সফরের মাধ্যমে অভিজ্ঞ কৃষি বিশেষজ্ঞদের দ্বারা কোর্স পরিচালনা করা হয়। ডিলাররা বা বেসরকারি কোম্পানির নিজ উদ্যোগে আংশিক অর্থায়নে বিভিন্ন রাজ্যের জেলা পর্যায়ের কৃষি প্রযুক্তি ব্যবস্থাপনা এজেন্সি এবং কৃষিবিজ্ঞান কেন্দ্রের সহযোগিতায় এক বছরব্যাপী খণ্ডকালীন (সপ্তাহে এক বা ছুটির দিন) প্রশিক্ষণ চলমান রয়েছে। প্রশিক্ষণে শুধু যোগ্যতাসম্পন্ন ডিলাররাই আংশগ্রহণ করেন। কোর্সে বিষয়ভিত্তিক প্রশিক্ষণ ছাড়াও কৃষি-সংক্রান্ত আইন বিধিমালা সম্পর্কে জ্ঞান দান করা হয়।

এছাড়া বাংলাদেশে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাহায্য সংস্থার পরিচালনায় দক্ষিণাঞ্চলের ২০টি জেলায় অ্যাগ্রো ইনপুট প্রকল্পের মাধ্যমে চারটি উপকরণ কোম্পানির তিন হাজার উপকরণ বিক্রেতাকে প্রশিক্ষণ প্রদান করে সনদ প্রদান করা হয়। কৃষিতে উন্নত নিরাপদ উপকরণ সরবরাহ প্রকল্পটির উদ্দেশ্য। প্রকল্পে বিক্রেতাদের নেটওয়ার্ক তৈরি করা হয় এবং নারীদের অংশগ্রহণ লক্ষ করা যায়। প্রকল্পটি ২০১২ থেকে ২০১৭ পর্যন্ত পাঁচ বছরের জন্য বাস্তবায়িত হয়। কার্যক্রমে দেশের বীজ, সার কীটনাশকের সমিতি অংশগ্রহণ করে। ফলে সনদপ্রাপ্ত বিক্রেতার উপকরণ বিষয়ে কৃষকের আস্থা বৃদ্ধি পেয়েছে। তাছাড়া কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর প্রকল্প সহায়তায় ডিলার পর্যায়ে সংক্ষিপ্ত (একদিনের) প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে বলে জানা যায়, যা অত্যন্ত অপ্রতুল। বিশেষ করে অধিক পরিমাণ খাদ্য এবং বাণিজ্যিক কৃষি ব্যবস্থার প্রবর্তনে উপকরণ সরবরাহের আস্থা সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সর্বোপরি কৃষির আধুনিকায়নে মাঠ পর্যায়ের ডিলারদের সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি।

বাংলাদেশের আঞ্চলিক কৃষি গবেষণা কেন্দ্র এবং বিভিন্ন জেলায় কৃষি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটগুলোর মাধ্যমে রকম প্রশিক্ষণের আয়োজন করা আবশ্যক বলে মনে করা হচ্ছে। জাতীয় কৃষি প্রশিক্ষণ একাডেমি, গাজীপুরও কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করতে পারে। এসব সংস্থার সমন্বয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে। এসব কর্মকাণ্ডে দেশের অভিজ্ঞ কৃষি বিশেষজ্ঞদের কাজে লাগানো যেতে পারে।

বিষয়টি সংশ্লিষ্ট সংস্থা ভেবে দেখতে পারে।

 

ওয়ায়েস কবীর: সাবেক নির্বাহী চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন