সোমবার | মে ২৩, ২০২২ | ৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯ 

শেষ পাতা

এডিবি প্রস্তাবিত টাকা লিংকড বন্ড

ইস্যুর পক্ষে বিএসইসি, বিপক্ষে বাংলাদেশ ব্যাংক

মেসবাহুল হক

দেশে বিনিয়োগ বাড়ানোর লক্ষ্যে বাংলাদেশ অফশোর টাকা লিংকড বন্ড নামে একটি বন্ড ছাড়তে চায় এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) বৈদেশিক মুদ্রায় বন্ড ছেড়ে আন্তর্জাতিক বাজারে বিক্রি করবে তারা। বন্ড থেকে পাওয়া অর্থ টাকায় রূপান্তর করে বাংলাদেশে বিনিয়োগ করবে সংস্থাটি। ব্যাপারে অনুমোদন চেয়ে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগে (ইআরডি) দুই দফা চিঠি দিয়েছে এডিবি। সংস্থাটির প্রস্তাবিত বন্ড ইস্যু নিয়ে সংশ্লিষ্টদের উপস্থিতিতে সম্প্রতি একটি বৈঠক করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। বৈঠকে বিএসইসির প্রতিনিধি বন্ড ইস্যুর পক্ষে মতামত দিলেও বিপক্ষে মতামত দিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিনিধিরা।

আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের অতিরিক্ত সচিব অরিজিৎ চৌধুরীর সভাপতিত্বে ভার্চুয়ালি পর্যালোচনামূলক সভাটি অনুষ্ঠিত হয়। সভায় আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মফিজ উদ্দীন আহমেদ, যুগ্ম সচিব . নাহিদ হোসেনসহ অর্থ বিভাগের প্রতিনিধি, বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিনিধি বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন।

বিষয়ে জানতে চাইলে যুগ্ম সচিব . নাহিদ হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, আমরা এরই মধ্যে অর্থ বিভাগ, বাংলাদেশ ব্যাংক বিএসইসির প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেছি। বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছে, এডিবির অফশোর বন্ড ইস্যুর বিষয়ে অর্থ বিভাগ, বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) বিএসইসি লিখিত মতামত দেবে। তারপর প্রাপ্ত মতামতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিয়ে ইআরডির মাধ্যমে এডিবিকে জানানো হবে।

আর্থিক বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, এডিবি প্রথম ২০২০ সালের ২৬ জানুয়ারি বন্ড ছাড়ার ব্যাপারে ইআরডির মাধ্যমে জানিয়েছিল। তখন তারা অফশোর কিংবা অনশোর যেকোনো বন্ড ছাড়ার কথা জানিয়েছিল। তাদের প্রস্তাবের ভিত্তিতে অর্থ বিভাগ, বাংলাদেশ ব্যাংক, বিএসইসি এনবিআরের মতামত নিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ২০২০ সালের ১০ মার্চ এডিবিকে জানিয়েছিল আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। অনশোর বন্ড তথা দেশের স্থানীয় বাজারে বন্ড ছাড়ার ক্ষেত্রে ভ্যাট-ট্যাক্সের বিষয়গুলো সংযুক্ত করতে বলা হয়েছিল। তাই পরবর্তী সময়ে এডিবি আর অনশোর বন্ড ইস্যুর কথা বলেনি। গত ২৫ মে এডিবি দ্বিতীয়বার যে প্রস্তাব দেয়, তাতে শুধু অফশোর বন্ড ইস্যুর কথা উল্লেখ রয়েছে। বন্ড ইস্যুর ক্ষেত্রে কোন প্রকল্পের আওতায় কত টাকার বন্ড ইস্যু করা হবে, তাও উল্লেখ থাকার কথা। কিন্তু এডিবি এসব কিছুও উল্লেখ করেনি। তবে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের কর্মকর্তারা মনে করছেন, বাংলাদেশে এডিবির যেসব বিনিয়োগ রয়েছে, বন্ড ছাড়ার অর্থ সেসব জায়গায় সম্ভবত বিনিয়োগ করা হবে।

সভায় আপাতত বন্ড ইস্যুর বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেট ম্যানেজমেন্ট ডিপার্টমেন্টের মহাব্যবস্থাপক রুপ রতন পাইন জানান, এডিবি বৈদেশিক মুদ্রায় বন্ড ইস্যু করবে, সেখান থেকে পাওয়া অর্থ টাকায় রূপান্তর করে বাংলাদেশে বিনিয়োগ করবে। এতে দেশের রিজার্ভ বাড়বে। এমনিতেই আমাদের স্থানীয়ভাবে অনেক অর্থ অলস অবস্থায় রয়েছে। মুহূর্তে বৈদেশিক মুদ্রা এলে আমাদের তারল্যের পরিমাণ আরো বেড়ে যাবে। বর্তমান সময়ে এডিবি যদি স্থানীয় মুদ্রায় অনশোর বন্ড ইস্যু করে, তাহলে আমাদের দেশের জন্য ভালো।

তিনি আরো বলেন, অফশোর বন্ড ইস্যু মুহূর্তে দেশের জন্য ভালো হবে না। তাছাড়া বন্ডের কুপন রেট কত হবে, এর ভলিউম কী রকম হবে এবং ঠিক কী পরিমাণ বিনিয়োগ কোথায় করা হবে, তা এডিবি জানায়নি। বাংলাদেশ ব্যাংক সাধারণত সরকারি বন্ড নিয়ে কাজ করে। স্থানীয় টাকা অনশোর বন্ড ইস্যু করলে বিনিয়োগকারীরা আগ্রহী হবেন এবং বাংলাদেশের বন্ড মার্কেট উন্নত হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের আরেক প্রতিনিধি ফরেন এক্সচেঞ্জ পলিসি ডিপার্টমেন্টের উপমহাব্যবস্থাপক বায়েজিদ সরকারও বন্ড ইস্যুর বিপক্ষে মত দেন। তিনি বলেন, ২০১৫ সালের বাংলাদেশ সরকার বাংলাদেশ ব্যাংক তত্কালীন অর্থনৈতিক অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে বিদ্যমান আইন-কানুন বিধিবিধান শিথিল করে ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স করপোরেশনকে (আইএফসি) অফশোর বন্ড ইস্যুর অনুমোদন দেয়। কিন্তু তাতে তেমন সুফল পাওয়া যায়নি বলেও সভায় তিনি মন্তব্য করেন। বর্তমানে কভিড-১৯ মহামারীকালীন বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অবস্থা তেমন একটা সুবিধাজনক পর্যায়ে নেই।

তিনি আরো বলেন, এছাড়া এডিবি বৈদেশিক মুদ্রায় আলোচ্য অফশোর বন্ড বিক্রি করবে। পরবর্তী সময়ে ওই মুদ্রা টাকায় রূপান্তর করে বাংলাদেশে বিনিয়োগ করবে। বৈদেশিক মুদ্রার হার মাথায় রেখে বিবেচনা করা হলে বন্ডের কুপন রেটের ঝুঁকি বাড়বে বলেও সভাকে জানান তিনি। তাছাড়া এখন বাংলাদেশ ব্যাংকে প্রচুর পরিমাণ তারল্য অলসভাবে পড়ে আছে উল্লেখ করে তিনি অফশোর বন্ড ইস্যুর বিষয়টি মুহূর্তে বিবেচনায় না নেয়ার অনুরোধ জানান।

তবে বন্ড ইস্যুর পক্ষে মতামত দিয়ে বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক রেজাউল করিম সভায় জানান, এডিবির ক্রেডিট রেটিং ভালো থাকায় অনশোর বন্ড ইস্যু করলে বেশি পরিমাণ অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগকারী পাওয়া যাবে। তিনি আরো জানান, মধ্যম আয়ের দেশ থেকে উচ্চ আয়ের দেশে যেতে আমাদের প্রচুর পরিমাণে বৈদেশিক বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে। যদিও বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংকে অতিরিক্ত তারল্য রয়েছে। তবে ভবিষ্যতে তা নাও থাকতে পারে। তাই ভবিষ্যতের দিকে লক্ষ্য রেখেই আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

তিনি বলেন, এডিবি যদি অফশোর বন্ডও ইস্যু করে, তাহলেও আমাদের রিজার্ভ সমৃদ্ধ হবে। এছাড়াও সভায় তিনি উল্লেখ করেন, বাংলা বন্ড যেমন বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের পরিচিতি বাড়িয়েছে, তেমনি এডিবিও অফশোর বন্ড ইস্যুর মাধ্যমেও বিশ্ববাজারে আমাদের পরিচিতি ভাবমূর্তি বাড়বে।

সভায় অর্থ বিভাগের উপসচিব রুহুল আমিন বলেন, বর্তমানে দেশে প্রচলিত যে আইন-কানুন রয়েছে, সেক্ষেত্রে বন্ড ইস্যুর ব্যাপারে কোনো বাধা নেই। সেক্ষেত্রে ফিসক্যাল পলিসি মানিটরি পলিসির বিষয়গুলো ভেবে আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তিনি আরো বলেন, ভবিষ্যতে আমরা বড় বিনিয়োগের দিকে যাব। তাই সেক্ষেত্রে মুদ্রাস্ফীতির দিকটা বিবেচনায় নিয়ে এগোতে হবে।

প্রসঙ্গে ব্র্যাক ব্যাংকের চেয়ারম্যান বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক . আহসান এইচ মনসুর বণিক বার্তাকে বলেন, আমি মনে করি আন্তর্জাতিক বাজারে বন্ড ইস্যু করা প্রয়োজন। এটা টাকা বন্ড কিংবা ডলার বন্ড যেকোনোটার একটি হতে পারে। আন্তর্জাতিক ক্যাপিটাল মার্কেটে আমাদের উপস্থিতি থাকাটা জরুরি। শুধু টাকা আনার জন্যই নয়, এক্ষেত্রে প্রথমে মার্কেট তৈরি করতে হবে। বন্ড ছাড়ার ক্ষেত্রে এখন থেকেই আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ করলে পাঁচ বছর পর এক শক্তিশালী জায়গায় যেতে পারব। এখন বাংলাদেশের রিজার্ভ ভালো, বাইরের টাকার দরকার নেই। তারপর অল্প কিছু নেয়ার জন্য হলেও আন্তর্জাতিক বাজারে বন্ড ইস্যু করার দরকার আছে। কারণ দেশ দুর্বল অবস্থায় থাকলে তখন বন্ড ছাড়লে কেউ কিনবে না। তাই এখনই আন্তর্জাতিক বন্ড মার্কেটে একটা জায়গা তৈরি করা দরকার।

প্রসঙ্গত, লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জে (এলএসই) প্রথমবারের মতো ২০১৯ সালের নভেম্বরে তালিকাভুক্ত বাংলা বন্ডের মাধ্যমে প্রায় কোটি ৯০ লাখ ডলারের সমপরিমাণ অর্থ সংগ্রহ করেছে বিশ্বব্যাংক গ্রুপের বেসরকারি খাতসংক্রান্ত প্রতিষ্ঠান আইএফসি।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন