শুক্রবার | সেপ্টেম্বর ২৪, ২০২১ | ৯ আশ্বিন ১৪২৮

সম্পাদকীয়

আলোকপাত

বঙ্গবন্ধু, স্বাধীনতা, শেখ হাসিনা: অর্জনে বিরাটত্ব ও ঘাটতি!

ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালির জন্মশতবার্ষিকী। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ৫০ বছরের বিশাল অর্জনে কিছু বড় ঘাটতি! নেত্রী সাহসিকা জনবন্ধু শেখ হাসিনার প্রধানমন্ত্রিত্বের ১৮ বছরের অসামান্য সফলতায়ও কপালে অসম্পূর্ণতাজনিত দুশ্চিন্তার ভাঁজ। ঠিকুজি জানা ছিল না। কিন্তু ব্যাখ্যার দাবি করাই যায়।

পটভূমি: স্বাধীনতার সুপ্ত বাসনার ক্রমঃপ্রকাশ

লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান আওয়াজের একজন বুলন্দ উচ্চারণকারী শেখ মুজিবুর রহমান প্রতিভাধর অলি আহাদের দ্বিমত উপেক্ষা করে পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ নামটাই বেছে নিলেন জানুয়ারি ১৯৪৮।  আবার জেলে থেকেই মওলানা ভাসানী-শামসুল হকের আস্থাভাজন ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হিসেবে নির্বাচিত শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম নামটাই পছন্দ করলেন। দ্বিজাতিতত্ত্বের বিশাল ধোঁকায় আচ্ছন্নতা এবং মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর জনপ্রিয়তার ঢেউকালে কৌশলগত কারণেই বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের মাধ্যমগুলোর এমন নামকরণ করেন। সাতচল্লিশের ১৪ আগস্ট পাকিস্তানের জন্মের পরই তিনি কলকাতা ইসলামিয়া কলেজের সিরাজউদ্দৌলা হোস্টেলে সুহূদ কে. জি মোস্তফাদের বললেন, মাউরাদের সাথে বেশিদিন থাকা যাইব না (সৈয়দ আনোয়ার হোসেন) ১৯৭২ সালে স্বাধীনতার নতুন ভোরেই শ্রী অন্নদা শংকর রায়কে দেয়া সাক্ষাত্কারে বঙ্গবন্ধু জানালেন সেই ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ বিতাড়নের পর পরই বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন। অন্তত দুটো বড় কারণ মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, খাজা নাজিমুদ্দিন, নূরুল আমিন, ফজলুর রহমান গংরা উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার ষড়যন্ত্রের নীলনকশার আরো গভীরে গিয়ে আরবি হরফে বাংলা লেখার হীন ষড়যন্ত্র আঁটে। সদ্য সৃষ্ট পূর্ববঙ্গ সচিবালয়ের মুখ্য সচিব/চিফ সেক্রেটারি হিসেবে মাউরা আজিজ আহমেদকে নিয়োগ দেয়া হলো তুখোড় মেধাবী বাঙালি গোলাম মুর্শেদকে ডিঙিয়ে। উদ্দেশ্য: বাঙালি মন্ত্রীদের বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদন চিফ সেক্রেটারি বিশ্বস্ততার সঙ্গে কেন্দ্রীয় সরকারে পাঠাবেন।

স্থিতিপত্র বৈষম্য: সংকল্পে স্বাধীনতা উচ্চারণে সতর্কতা

লাহোর প্রস্তাবে পূর্ব বাংলায় স্বায়ত্তশাসনের ব্যবস্থাকে পরবর্তী সময়ে বানচাল করা, উত্তর-পশ্চিম, উত্তর-পূর্ব (বঙ্গদেশসহ) এবং কেন্দ্র অঞ্চলীয় স্বায়ত্তশাসিত ফেডারেশন ব্যবস্থাসহ ক্যাবিনেট মিশন প্ল্যান প্রত্যাখ্যান করা এবং সোহরাওয়ার্দী-কিরণ শংকর-শরৎ বসুর বৃহত্তর স্বাধীন বাংলার স্বপ্নগুলো একে একে ব্যর্থ হতে দেখে শেখ মুজিবুর রহমান ছাত্রলীগ আওয়ামী লীগকে মনের গহনে একান্তে বাঙালির স্বাধীনতার বাহন হিসেবে গড়ে তোলার সংকল্প গ্রহণ করেন কাউকে না জানিয়ে। ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ ভাষা আন্দোলনে প্রথম বড় প্রতিবাদ তথা স্বাধীনতার পথে প্রথম মহড়ায় শেখ মুজিবুর রহমান যে নেতৃত্ব দেন, অলি আহাদ গাজীউল হকরা উচ্চকণ্ঠ স্বীকৃতি দিয়েছেন। এরপর চুয়ান্নর নির্বাচনের মূল সংগঠন হিসেবে তিনি বাঙালিকে জাগ্রত করাকে আরো এক ধাপ এগিয়ে নিলেন। ১৯৫৫ সালে তরুণ সদস্য শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের গণপরিষদকে জানান দিলেন, আমরা পূর্ব বাংলা-পূর্ব পাকিস্তান নই। আমাদের নিজস্ব ভাষা, ঐতিহ্য সংস্কৃতি আছে, এর পরিবর্তন করতে হলে বাঙালিদের সম্মতি নিতে হবে। ওই সময় তিনি পূর্ব বাংলার জন্য বন্যা নিয়ন্ত্রণসহ বিভিন্ন খাতে অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দের দাবি জানালেন। ওই রকম একটি বরাদ্দ নিয়ে শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৫৬ সালে পূর্ব পাকিস্তান ক্ষুদ্র কুটির শিল্প করপোরেশন স্থাপন করেন ভবিষ্যতে বাংলাদেশের শিল্পায়ন কর্মসংস্থানের কথা মাথায় রেখে। ১৯৫৫ সালে এক ব্যক্তি এক পদ নীতি অধীনে শেখ মুজিবুর রহমান প্রাদেশিক মন্ত্রিত্বে ইস্তফা দিয়ে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক থাকলেন (ওই বছরই মুসলিম শব্দটি বাদ দেয়া হয়) ধীরে ধীরে তবে নিশ্চিতভাবে বাঙালির নয়নমণি হয়ে ওঠা বঙ্গবন্ধুর ওপর জেল-জুলুম অত্যাচার বাড়িয়ে দেয়া হয় ১৯৫৮ সালের সামরিক শাসন জারি করে পূর্বনির্ধারিত দেশব্যাপী প্রথম সাধারণ নির্বাচন বাতিল করে।

স্থির লক্ষ্য স্বাধীনতা: কৌশল বদলের কাল

১৯৬০-এর দশকের শুরুতেই ছাত্রলীগের বড় নেতাদের কাছে শেখ মুজিবুর রহমান প্রথম স্বাধীনতার সুপ্ত বাসনার কথা প্রকাশ করেন। ১৯৬২-৬৩ সালে আগরতলা গিয়ে ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী শচীন্দ্র সিনহার মাধ্যমে ভারতের প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত জওহরলাল নেহরুর সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করেন। একতরফা স্বাধীনতা ঘোষণা করে লন্ডনে প্রবাসে সরকার গঠনের চিন্তা বাদ দিলেন। ১৯৬৬ সালে ফেব্রুয়ারি লাহোরে একটি বিরোধীদলীয় সম্মেলনের সময় দুঃসাহসিক কিন্তু ধাপে ধাপে স্বাধীনতা অর্জনের পথে একটি বড় পদক্ষেপ বাংলার আর্থসামাজিক মুক্তি সনদ ছয় দফা ঘোষণা করেন। দৃঢ়তর হলো স্বাধীনতা অর্জনের স্তম্ভ। জুন, ১৯৬৬ থেকে শেখ মুজিবুর রহমান-আওয়ামী লীগ- ছাত্রলীগ (এবং ছাত্র ইউনিয়ন) জনতার ওপর অত্যাচার নির্মমতা যতই বাড়তে থাকে ততই স্বাধীনতার শক্তিশালী স্রোত আরো তীব্রতর হয়। ঘাবড়ে গেল পাকিস্তানের সেনা শাসকরা। নিষ্ফল চেষ্টায় ১৯৬৮-৬৯ সালের আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার বিচারক উনসত্তরের তীব্র গণঅভ্যুত্থানের তোড়ে পালিয়ে বাঁচলেন। সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে ছাত্রলীগ সভাপতি তথা ডাকসুর সহসভাপতি তোফায়েল আহমদ ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি লাখ লাখ ছাত্র-জনতার সমাবেশে বঙ্গবন্ধু হিসেবে বরণ করে নেন।

১৯৭০-এর নির্বাচন বন্ধুর পথে স্বাধীনতার দ্বার উন্মোচন

সত্তরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে ছাড়িয়ে বঙ্গবন্ধুর অসাধারণ সাংগঠনিক ক্ষমতা, উদ্ভাবনী সাহসী নেতৃত্ব মানবতার গুণ (১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বর ভয়ালতম প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর তিনি সবকিছু ভুলে গিয়ে উপকূলীয় এলাকার মানুষের পাশে থাকেন) এবং রাজনীতির গুটি খেলায় এক ব্যক্তি এক ভোট-এর প্রত্যাশিত জাদুতে ৩০০ আসনের পাকিস্তানি পার্লামেন্টে আওয়ামী লীগের জন্য ১৬৭টি আসন দখল করেন। ততদিনে ইয়াহিয়া-ভুট্টো অশুভ আঁতাত সব রকমের ছল-চাতুরির আশ্রয় নিয়ে জনগণের নির্বাচিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের অসম্মতি জানাল। বাতিল হলো সংসদ অধিবেশন। মার্চ বঙ্গবন্ধুর জগদ্বিখ্যাত রাজনীতির কবিতায় ঘোষিত হলো স্বাধীনতা। শুরু হলো ২৫ মার্চ দিবাগত রাতে নিরস্ত্র তবে বঙ্গবন্ধুর মার্চের নির্দেশে ভয়ডরহীন বাঙালির ওপর বর্বর পাকিস্তানি বাহিনীর হত্যা, লুণ্ঠন, ধর্ষণ অগ্নিসংযোগ। সারা বিশ্ব মেনে নিল বঙ্গবন্ধু সঠিক, পাকিস্তানি শোষকরাই গণহত্যা করে বাংলাদেশের অভ্যুত্থান অনিবার্য করে দেয়

দেশ শাসনে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান

১০ জানুয়ারি ১৯৭২ পাকিস্তানিদের বন্দিশালার জিঞ্জির চুরমার করে দিয়ে বঙ্গবন্ধু বীরের বেশে জাতির পিতা হিসেবে তার দেশবাসীর কাছে প্রথমে রেসকোর্স ময়দানে গেলেন। ১০ লাখ লোকের সমাবেশে বললেন, আমার জীবনের সাধ পূর্ণ হয়েছে, বাংলাদেশ আজ স্বাধীন। তবে একথাও স্মরণে আনলেন যে স্বাধীন বাংলার একজন লোকও যদি অনাহারে মারা যায় অথবা থাকে গৃহহীন এবং চিকিৎসা শিক্ষাবিহীন তাহলে স্বাধীনতা অর্থহীন হয়ে যাবে।

ডেভিড ফ্রস্টের তোমার সবচেয়ে সবল দিক কী জিজ্ঞাসিত হয়ে বঙ্গবন্ধু বললেন, আই লাভ মাই পিপল। আর দুর্বলতা! উত্তরে জাতির পিতা: আই লাভ দেম টু মাচ।

সেই ভালোবাসা হূদয় গভীরে ধারণ করে বাঙালির রক্তমূল্যে কেনা স্বাধীনতাকে সার্থক করতে জাতির পিতা তিন বছর সাত মাস পাঁচদিন অক্লান্ত পরিশ্রম, মেধা, মনন আন্তরিক ভালোবাসা দিয়ে একটি সফল এবং মানবতায় সম্পৃক্ত শাসনকাল চালিয়েছিলেন। সংবিধান, শিক্ষানীতি, পরিকল্পিত উন্নয়ন, কৃষিতে উন্নয়ন, শিল্প খাত বিশেষ করে কুটির ক্ষুদ্র গ্রামীণ শিল্প বিকাশে পল্লী বিদ্যুৎসহ সব সুবিধা, নারী পুনর্বাসন, পরিবার পরিকল্পনা, স্বাস্থ্য শিক্ষা খাতে বিপুল শক্তিতে কর্মকাণ্ড শুরু করে জাতির পিতার সরকার। সবার সঙ্গে সখ্য, কারো সাথে বৈরী নয় এবং জোটনিরপেক্ষ নীতি গ্রহণে বিশ্বময় ইতিবাচক ভাবমূর্তি আনেন তিনি। গণচীন, সৌদি আরবসহ কয়েকটি দেশ ছাড়া প্রায় সব দেশই বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশকে স্বীকৃতি জ্ঞাপন করে। ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হয়। বড় চারটি অপরাধে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত থাকা ছাড়া অন্যদের সাধারণ ক্ষমা করেন জাতির পিতা। ২৫ সেপ্টেম্বর ১৯৭৪ জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে নতুন সদস্য দেশের সরকারপ্রধান হিসেবে জাতির পিতা বিশ্বের তাবৎ নির্যাতিত মানুষের মুক্তির দাবিতে আলোড়ন সৃষ্টিকারী ভাষণ দিয়ে বিশ্ববন্ধুরূপে আবির্ভূত হন। ভারত বার্মার (মিয়ানমার) সঙ্গে সম্ভাব্য সমুদ্রসীমা বিরোধে বঙ্গবন্ধু জাতিসংঘের সাহায্য প্রার্থনা করেন এবং সম্ভবত প্রথম দেশ হিসেবে সমুদ্রসীমা আইন প্রণয়ন করেন। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য ১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধুর সরকার যে আন্তর্জাতিক আইন পাস করে, তারই যুগোপযোগী সংশোধন করে মানবতাবিরোধীদের বিচারের আওতায় আনা হয়।

সোনার বাংলায় কল্যাণরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাকল্পে যা যা করা দরকার, তার সব কয়টির সূচনা হয় জাতির পিতার হাতে। বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ, বাকশাল একের মধ্যে বহুর মিলন সাধনে বাংলাদেশকে সমতাপ্রবণ সর্বোচ্চ সমৃদ্ধিতে উঠিয়ে নেয়ার শেষ চেষ্টা ছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের।

দুটো তাত্পর্যপূর্ণ প্রত্যাবর্তন

বঙ্গবন্ধুর প্রদর্শিত পথে তার নামে এবং নেতৃত্বের কারিশমার মহিমায় চলে এবং সফল হয় স্বাধীনতার বিজয় সংগ্রাম। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি দেশে প্রত্যাবর্তন করেই বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার সুফল ঘরে তোলার সর্বাত্মক কর্মকাণ্ড শুরু করেন। উল্লেখ্য বাংলাদেশের প্রথম মন্ত্রিসভায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানই ছিলেন একমাত্র রাষ্ট্র পরিচালনার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তি। পঁচাত্তরের নৃশংস, ঘৃণ্য এবং জঘন্যতম হত্যাকাণ্ডে ১৮ জন পরিবার-পরিজনসহ জাতির পিতা শাহাদাৎ বরণ করেন। দৈবশুভে শেখ হাসিনা শেখ রেহানা বেঁচে থাকেন। ৩০ জুলাই বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিবের বুকফাটা কান্নার রোলের মাঝে তারা পশ্চিম জার্মানি চলে যান।

জনবন্ধু শেখ হাসিনার হাতে বাংলাদেশের যত অর্জন

আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের বিচক্ষণ দূরদর্শিতার সৌভাগ্যে ১৭ মে ১৯৮১ সাল শেখ হাসিনা যেদিন ঢাকায় অবতরণ করেন, তখন সদ্য নির্বাচিত আওয়ামী লীগ সভাপতি মা-বাবা ভাই স্বজন হারার বেদনায় ভারাক্রান্ত। সেসব কথা স্মরণ করে বিশাল জনতার উদ্দেশে বলেছিলেন যে তারাই (জনগণই) আমার সবকিছু এবং তাদের কল্যাণেই  দেশকে অগ্রগতির শীর্ষ শিখরে নিয়ে জাতির পিতার দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানো হবে তার একমাত্র ধ্যান-ধারণা সাধনা। সত্যি হয়েছেও তাই। অসম সাহসে সামনে থেকে বিচক্ষণ নেতৃত্বে উদ্ভাবনী দক্ষতায় জাতির পিতার সুযোগ্য জ্যেষ্ঠ সন্তান জনবন্ধু শেখ হাসিনা অনেক চড়াই উতরাই পার হয়ে আজ মানবতার মাতা, বিশ্বের অন্যতম প্রধান একজন সফল রাষ্ট্রনায়ক। ১৯৭২ সালের ৮৫ মার্কিন ডলারের মাথাপিছু আয় (জিএনআই) এখন হাজার ২২৭ মার্কিন ডলার, যা ভারত পাকিস্তানের চেয়ে বেশি। ৮০০ মার্কিন ডলারের বাংলাদেশ অর্থনীতি এখন ৩৪ হাজার ৫০০ ডলারে উন্নীত। এরই মধ্যে বাজেটের সাইজ ৬৮৭ কোটি থেকে ৮৭৯ গুণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে লাখ হাজার ৬৮১ কোটি টাকায়। ১৯৭৫ সালে জাতির পিতার প্রচেষ্টায় অসম্মানজনক অনুন্নত বাংলাদেশকে স্বল্পোন্নত দেশে প্রমোশন দেয় জাতিসংঘ। আর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতে আমরা উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদাপূর্ণ আসনে যাওয়ার ছাড়পত্র পেয়েছি। ১৯৭২ সালের শতকরা ৮০ ভাগ অর্থাৎ ছয় কোটি লোক দারিদ্র্যসীমার নিচে থেকে কভিড-১৯ পূর্ব সময়ে শতকরা ২০ দশমিক ভাগ অর্থাৎ তিন কোটির কিছু বেশি। নারীর ক্ষমতা সমতায়নে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার সর্বোচ্চ স্থানে চিহ্নিত করে। বিশ্ব শান্তি সূচকে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় তৃতীয়ভারত-পাকিস্তানের চেয়ে এগিয়ে। মানুষের গড় আয়ু এখন ৭৩ বছর (১৯৭২ সালে ৪৩ মতান্তরে ৪৭) শিশুমৃত্যুর হার হাজারে ২০০ থেকে ২৯-এ। বিদ্যুৎ এখন শতকরা ৯৭ ভাগ মানুষের ঘরে। সুপেয় পানি এখন জুটছে শতকরা ৯৮ ভাগ মানুষের ভাগ্যে। স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা  সুবিধা এখন শতকরা ৮০ ভাগ মানুষের আয়ত্তে।

বিগত সাড়ে ১২ বছর ধরে একাধিক্রমে সমষ্টিক আয় বৃদ্ধির ধারাবাহিকতায় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এখন হাজার ৫০০ কোটি ডলারে। সুদানকে সম্প্রতি ৮৫ লাখ ডলারের বৈদেশিক বাণিজ্য লেনদেনে মঞ্জুরি সাহায্য দেয়া হয়েছে। আর শ্রীলংকাকে ২০ কোটি ডলারের ঋণ সহযোগিতা। বোস্টন কনসালন্টিং গ্রুপের ২০১৬ সালের সমীক্ষা অনুসারে বাংলাদেশে মাথাপিছু আয় হাজার মার্কিন ডলার আছে দশমিক কোটি লোকের হাতে (অথচ কর দিচ্ছেন মাত্র ২৫ লাখ) একই বছর মাস্টার কার্ড একটি সমীক্ষায় বলেছে যে উচ্চ ক্রয়ক্ষমতার একটি বৃহৎ মধ্যবিত্ত বাংলাদেশকে স্থায়ী ভোগ্যপণ্য (কনজিউমার ডিউরেবলস) উৎপাদনের একটি আকর্ষণীয় বিনিয়োগযোগ্য দেশ বলে মনে করছে সবাই।

১৯৭৫ সালের পর অবাধ বাজার অর্থনীতি চালু করার ফলে একশ্রেণীর ব্যবসায়ী শিল্পপতি তাদের মুনাফা লক্ষ্য হাসিলের জন্য দেশকে একটি আমদানিনির্ভর অবস্থানে চিরায়ত করার চেষ্টা চালাচ্ছেন। সবচেয়ে বড় উদাহরণ, করোনার টিকা উৎপাদনে দেশজ সক্ষমতার (অন্যান্য টিকার ক্ষেত্রে প্রমাণিত) সুযোগ না দিয়ে কেবলই আমদানি করতে চেয়ে সরকার দেশকে এখন বিরাট অসুবিধায় ফেলে দিয়েছে। অনুরূপভাবে তৈরি পোশাকে পশ্চাৎ সংযোগ বস্ত্রসহ প্রায় সব উপকরণ, ডিজাইন, উচ্চমাপের পণ্য এবং বৈদেশিক বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করে সিংহভাগ রফতানি আয় কর্মসংস্থানের সর্ববৃহৎ খাতটি বিশালতর সম্প্রসারণকে বিলম্বিত করছেন তারা। বৃহত্তর শিল্পপতি-ব্যবসায়ীগোষ্ঠী অবশ্য ব্যাপক সংস্কারে বাংলাদেশের অর্থনীতির সর্বোচ্চ সম্ভাবনাকে বিকশিত করার পক্ষে। কিন্তু সুযোগসন্ধানী গোষ্ঠীটি তথ্য গোপন করে অথবা কারচুপি করে ব্যাংকে খেলাপিদের আরো সুবিধা দিয়ে ঋণের টাকা বিদেশে পাঠানোর ক্ষেত্র প্রস্তুত করে রাখছেন। ব্যাপক করখেলাপ উৎসাহদানে পারঙ্গম অপ্রদর্শিত কালো টাকাকে নিয়মিত করদাতাদের তুলনায় কম হারে কর দিয়ে সাদা করার সুযোগে সম্পদ দেশান্তরে সহায়তা করছেন। দেশের সামষ্টিক আয়ের বাইরে আরো শতকরা ৮০ ভাগ লুকানো আছে বলে অনুমানে আছে অর্থাৎ ২৮ লাখ কোটি সামষ্টিক আয়ের ২১ লাখ কোটি কালো টাকা; সেখান থেকে অতি ক্ষুদ্র একটি অংশ লাখ ৪৫ হাজার কোটি টাকা অর্থাৎ শতকরা শূন্য দশমিক ৬৭ ভাগ বর্তমান অর্থবছরে সাদা করা হয়েছে। যদি প্রক্রিয়া চালু রাখতে হয় তাহলে স্ট্যান্ডার্ড রেটে কর দেয়া এবং বছরান্তে সাদা না করা টাকাকে বাজেয়াপ্ত করার বিধান রাখা জরুরি। সাম্প্রতিককালে রাজস্ব আদায়ে মনোযোগ না দিয়ে (রাজস্ব: জিডিপি অনুপাত শতকরা ১০ ভাগের নিচে) ভবিষ্যতের টেকসই সমৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত করা হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমাদের মায়ের ভাষা বাংলাকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষার মর্যাদায় বসিয়েছেন। তার যত অর্জন সেগুলো মজবুত করার জন্য কয়েকটি সংস্কার জরুরি হয়ে পড়েছে। সমতাপ্রবণ বিতরণ ছাড়া উৎপাদন তথা প্রকৃতি টেকসই হয় না। তাই আয়, সম্পদ সুযোগে এখন যে দৃষ্টিকটু যন্ত্রণাদায়ক বৈষম্য বিরাজমান, তা কমিয়ে আনার জন্য জাতির পিতার ভাষায়, বিত্তবানদের ওপর বেশি বেশি ট্যাক্স বসিয়ে কম ভাগ্যবানদের কল্যাণে বিনিয়োগ করতে হবে (প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা ১৯৭৩-৭৮) বেশি ট্যাক্স নয়, ধার্য করা কর আদায়ের লক্ষ্যে () একক হারে ১৫ শতাংশ মূসক আদায়ে কোনো গড়িমসি করা যাবে না। () মূসক আদায় করে শতকরা ৮০ ভাগ আদায়কারী তা কোষাগারে জমা দেন না; কড়াকড়ি করা দরকার এবং শতকরা ভাগ জরিমানা সুদে মাফ করা উচিত হবে না। ২০১৭ থেকে প্রতিশ্রুত ইএফটি/এমডিসি মেশিনগুলোর সিংহভাগ ২০২১-২২ অর্থবছরেই বসানো প্রয়োজন। () রাজস্ব প্রশাসনে অটোমেশন সম্পূর্ণ করা, কর্মকর্তাদের ডিসক্রিশন কমানো এবং রাজস্ব প্রশাসনে দক্ষ দৃষ্টিনন্দন অবকাঠামো খুবই জরুরি ভিত্তিতে করা দরকার। () নীতি কৌশল বাস্তবায়নে আলাদা করে কর প্রশাসনকে ঢেলে সাজাতে হবে। () করজাল বিস্তারের কোনো বিকল্প নেই বিষয়ে সব কয়টি শিল্প বণিক সমিতির সহায়তা নেয়া যেতে পারে। ২০২৫ সাল নাগাদ শতকরা ১৫ ভাগ এবং ২০৩০ সালে রাজস্ব:জিডিপি অনুপাতকে শতকরা ২০ ভাগে উন্নীত করা জরুরি। বিটুমিন, গুঁড়ো দুধ, সিরামিকস, হালকা ইঞ্জিনিয়ারিং পণ্য, সিএনজি, দেশী ফল প্রক্রিয়াজাত শিল্প ইত্যাদি ক্ষেত্রে শুল্ক ছাড়ে যৌক্তিকতা এনে দেশজ শিল্পের ব্যাপক প্রসার তথা কর্মসংস্থান, আয় রোজগার বৃদ্ধি আয়-সম্পদ-সুযোগ বৈষম্য কমানোর সংকল্পবদ্ধ পদক্ষেপ জরুরি। অতি ক্ষুদ্র, কুটির ক্ষুদ্র শিল্পে প্রদত্ত সরকারপ্রধানের ঘোষিত প্রণোদনা চলছে না। বিকল্প সাংগঠনিক সংস্কার প্রয়োজন। করোনায় ছিন্নমূলদের জন্য ১৯৯৮-এর ভিজিডি/ভিজিএফ ব্যবস্থায় বাঁচিয়ে রাখা জরুরি।

বাংলাদেশের কৃষাণ-কৃষাণীরা ১৯৭২ সালের তুলনায় চার গুণ ফসল ফলিয়ে আমাদের বাঁচিয়ে রেখেছেন। আর শ্রমজীবীরা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে সামষ্টিক আয়ে শতকরা ১৭ ভাগের বদলে এখন শতকরা ৩২ ভাগ অবদান রাখছেন। করছেন কর্মসংস্থান দেশে-বিদেশে এবং বিপুল পরিমাণ রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন প্রবাসীরা। তাদের নতশির শ্রদ্ধা জানাই।

 

. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন: অর্থনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ সমাজকর্মী

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর

ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির প্রতিষ্ঠাতা উপাচার্য

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন