শুক্রবার | সেপ্টেম্বর ২৪, ২০২১ | ৯ আশ্বিন ১৪২৮

সম্পাদকীয়

অতিরিক্ত ব্যয়েও বিশ্বমানের সড়ক সূচকে পিছিয়ে বাংলাদেশ

নকশা ও নির্মাণে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড নিশ্চিত করা হোক

অর্থনৈতিক লক্ষ্য অর্জনে প্রয়োজন শক্তিশালী যোগাযোগ অবকাঠামো। কারণেই সরকার প্রতি বছর বাজেটে অবকাঠামো উন্নয়নকে সর্বাধিক গুরুত্বারোপ করে অধিক বরাদ্দ দিয়ে আসছে। সরকারের উন্নয়নের বড় জায়গাজুড়েও রয়েছে এটি। কিন্তু ত্রুটিপূর্ণ নকশা, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ না করা, নিম্নমানের নির্মাণকাজের কারণে দেশের সড়ক-মহাসড়কগুলো অর্থনীতি বাণিজ্য সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারছে না। বণিক বার্তায় প্রকাশিত তিন পর্বের ধারাবাহিকে দেশের সড়ক মহাসড়কের এমন চিত্রই উঠে এসেছে। একদিকে সড়ক নির্মাণে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করা হচ্ছে না, অন্যদিকে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করায় দ্রুতই ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। বিপুল অর্থ ব্যয়ে নির্মিত দেশের সড়ক আন্তর্জাতিক মান অর্জন করতে পারছে না। দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণ উৎপাদনে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে, যা অর্থনৈতিক লক্ষ্য অর্জনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে।

উন্নত অর্থনীতির পথে আমদানি-রফতানি বাণিজ্য পণ্য পরিবহন যে হারে বাড়বে, তার জন্য প্রয়োজন গতিশীল আধুনিক মহাসড়ক। অথচ বাংলাদেশের মহাসড়কগুলো মান অর্জন করতে পারছে না। নিম্নমানের সড়কের কারণে অর্থনৈতিক ক্ষতি বাড়ছে। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) প্রতিযোগিতা সক্ষমতা-বিষয়ক সমীক্ষায় সড়কের মান একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কেননা অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রতিযোগিতায় কোন দেশের সক্ষমতা কেমন, তা অন্যান্য বিষয়ের পাশাপাশি সড়ক অবকাঠামোর গুণগত মানের ওপরও নির্ভরশীল। অথচ বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন মহাসড়ক নেই বললেই চলে। যতটুকু-বা রয়েছে, তাও দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে আন্তর্জাতিক মান অর্জন করতে পারছে না। সড়ক-মহাসড়কের দিকে দৃষ্টি দিলে কর্তৃপক্ষের উপেক্ষা অবহেলা আরো প্রকটভাবে চোখে পড়বে। বিশ্বব্যাংক প্রকাশিত বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট-২০১৯ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সড়ক অবকাঠামোর মান বিবেচনায় বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় কেবল নেপালের তুলনায় এগিয়ে আছে। অথচ সড়ক-মহাসড়ক নির্মাণে প্রতি বছর বড় অংকের অর্থ বিনিয়োগ করছে সরকার। কিন্তু পরিস্থিতির দৃশ্যমান কোনো উন্নতি হয়নি। মানসম্পন্ন সড়কের অভাবে যেমন দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেড়ে উঠছে, তেমনি ব্যবসা-বাণিজ্যেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম করিডোরকে অর্থনীতির লাইফলাইন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। পথ ব্যবহার করে দেশের আমদানি-রফতানি কার্যক্রম চলে। অথচ দুর্বল সড়কের কারণে পণ্য পরিবহনে সময় অর্থ উভয়ই ব্যয় হচ্ছে বেশি। এতে রফতানিকারকরা তো বটে স্থানীয় উৎপাদকরাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। এর অভিঘাত গিয়ে পড়ছে ভোক্তার ওপর। 

নকশাজনিত ত্রুটির কারণে সড়ক দুর্ঘটনা বাড়ছে। অথচ নকশা প্রণয়নের জন্য সওজ অধিদপ্তরের স্বতন্ত্র মানদণ্ড রয়েছে, যা আন্তর্জাতিক মানের। দুঃখজনক বিষয় হলো, এর অস্তিত্ব শুধু কাগজে-কলমে, বাস্তবে এটি মানা হয় না কোথাও। দেশের কোনো কোনো সড়কে রয়েছে শতাধিক অপ্রয়োজনীয় বাঁক। অপরিকল্পিত ভুল নকশার কারণে অনেক সড়ক হয়ে উঠেছে ঝুঁকিপূর্ণ। কোথাও সড়ক অনেক অপ্রশস্ত হয়ে গেছে, কোথাও নিচু, কোথাও বা আঁকাবাঁকা। আবার কোথাও সড়কে রয়ে গেছে ঝুঁকিপূর্ণ সংযোগস্থল। সড়ক-মহাসড়কের নকশা প্রণয়নের সময় বেশকিছু বিষয় বিবেচনায় নিতে হয়। এসব বিষয়ের মধ্যে রয়েছে সড়কের গতিপথ, বর্তমান ভবিষ্যৎ ট্রাফিক, যানবাহনের গতি, নিরাপত্তা ইত্যাদি। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সড়কের গতিপথ। সওজের মানদণ্ড অনুযায়ী, নতুন সড়ক নির্মাণের ক্ষেত্রে সেটিকে যতটা সম্ভব সোজা রাখতে হবে। পুরনো সড়ক উন্নয়নের ক্ষেত্রেও একই পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে। কিন্তু বাস্তবে এর তেমন কোনো প্রতিফলন দেশের সড়ক-মহাসড়কগুলোয় চোখে পড়ে না।  কারণে দুর্ঘটনাও বাড়ছে। এতে প্রাণ পণ্যের ক্ষতি বাড়ছে। জনসংখ্যা বিবেচনায় সড়ক দুর্ঘটনায় এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রাণ হারায় বাংলাদেশের মানুষ।

উন্নত সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা যেকোনো দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম পূর্বশর্ত। বিশ্বব্যাংক পরিচালিত ইজ অব ডুইং বিজনেস সূচকেও বাংলাদেশের সড়ক অবকাঠামোর নিম্নমানের বিষয়টি উঠে এসেছে। বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রেও এটি বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সড়কে যানজট, দুর্ঘটনা, আর্থিক ব্যয়ের কারণে বিনিয়োগকারীরা পিছিয়ে যাচ্ছেন। নিম্নমানের সড়কের কারণে পরিবহনের অর্থনৈতিক আয়ুষ্কালও কমছে। ফলে পরিবহনের বিনিয়োগ উঠিয়ে আনতে বাড়তি অর্থ ধার্য করছেন সংশ্লিষ্টরা। এতে পণ্য পরিবহন ব্যয়ও বাড়ছে। বিশ্বের যেকোনো দেশের চেয়ে বাংলাদেশে পণ্য পরিবহন ব্যয় বেশি। আর এটি হয়েছে নিম্নমানের সড়কের কারণে। গবেষণায় দেখা গেছে থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া সিঙ্গাপুরে উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে সেখানে বিদেশী বিনিয়োগ বেড়েছে। প্রাপ্যতা, সাশ্রয়ী, দক্ষতা, সুবিধা টেকসইত্ব বিবেচনায় এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে উন্নত সড়ক সিঙ্গাপুরের। দেশটিতে বিনিয়োগ, উৎপাদন, জীবনযাত্রার মান প্রভৃতিতে এর প্রভাব ইতিবাচক।

উন্নয়নশীল থেকে উন্নত হওয়ার পথে থাকা অন্য দেশগুলো সড়ক অবকাঠামোয় যেভাবে এগিয়ে, সে তুলনায় বাংলাদেশ অনেকটাই পিছিয়ে। কিন্তু সড়ক নির্মাণ ব্যয়ের দিক থেকে বাংলাদেশ বিশ্বে সবচেয়ে এগিয়ে। কিন্তু মানের দিক দিয়ে সবচেয়ে পিছিয়ে। অতিরিক্ত ব্যয় করেও আন্তর্জাতিক মানের সড়ক তৈরি করা যাচ্ছে না। এতে সম্পদের অপচয় হচ্ছে, সুযোগ ব্যয় বাড়ছে। মানসম্পন্ন সড়ক নিশ্চিতে বিভিন্ন সময়ে উদ্যোগ নেয়া হলেও তাতে তেমন সুফল মেলেনি। সম্প্রতি সড়ক নির্মাণের সঙ্গে গ্যারান্টি ক্লজ যুক্ত করা হয়েছে। এটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হলেও এর সুফল নিশ্চিত করতে তদারকি আইনের কঠোর প্রয়োগ প্রয়োজন। সংগত কারণেই সড়ক নির্মাণে মানসম্পন্ন নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার, ওজনবাহী যানবাহনের ব্যবস্থাপনা, আন্তর্জাতিক মান অনুসরণ করে সড়কের নকশা প্রণয়ন ইত্যাদি নিশ্চিত করার জন্য জবাবদিহির ব্যবস্থা থাকা দরকার। এক্ষেত্রে তাই মহাসড়ক নির্মাণ নকশা প্রণয়নে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণে কঠোর তদারকি নিশ্চিত করতে হবে। শক্তিশালী নজরদারি জবাবদিহি নিশ্চিত করা না হলে বছর বছর জনগণের বিপুল অংকের অর্থ ব্যয়েও সড়ক-মহাসড়কগুলোর দুর্দশা ঘুচবে না।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন