বুধবার | আগস্ট ০৪, ২০২১ | ২০ শ্রাবণ ১৪২৮

শেষ পাতা

আমের আবাদ দ্রুত বাড়ছে নওগাঁয়

রাজশাহীতে সংকুচিত, স্থবিরতা চাঁপাইনবাবগঞ্জে

সাইদ শাহীন ও ফেরদৌস সিদ্দিকী

শতবছর ধরেই আমের জন্য জগেজাড়া খ্যাতি রাজশাহী চাঁপাইনবাবগঞ্জের। আমের রাজধানী নিয়ে কয়েক দশক ধরেই শক্ত অবস্থান নিয়েছে জেলা দুটি। তবে মাত্র পাঁচ বছরের ব্যবধানে আমের আবাদ কমে গেছে রাজশাহীতে। অন্যদিকে চাঁপাইনবাবগঞ্জে আবাদ বৃদ্ধিতে স্থবিরতা নেমে এসেছে। তবে দেশের শীর্ষ দুটি জেলার দুর্বল অবস্থানে দ্রুত আমের আবাদ বাড়ছে বরেন্দ্রখ্যাত নওগাঁয়। দেশের শীর্ষ আম উৎপাদনকারী জেলা এখন নওগাঁ।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের রাজশাহী আঞ্চলিক কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, গত পাঁচ বছরের ব্যবধানে রাজশাহী অঞ্চলের চারটি জেলা রাজশাহী, নওগাঁ, নাটোর চাঁপাইনবাবগঞ্জে আমের আবাদ বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় ৪০ শতাংশ। যেখানে রাজশাহীতে পাঁচ বছরের ব্যবধানে আমের আবাদ উল্টো কমেছে হাজার ৫৭১ হেক্টর। নওগাঁ জেলায় আমের আবাদ বৃদ্ধি পেয়েছে ১৬০ শতাংশ। একই সঙ্গে চাঁপাইনবাবগঞ্জে আমের আবাদ পাঁচ বছরের ব্যবধানে ৩৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে এক বছর আগের তুলনায় বৃদ্ধি প্রায় শূন্যের কোটায়। অন্যদিকে নাটোর জেলায় স্বল্প পরিমাণে আবাদ হলেও সেখানে কমে এসেছে আমের উৎপাদন। ২০১১-১২ মৌসুমে রাজশাহীর চার জেলায় মোট লাখ ৮৪ হাজার ৭৩ টন আম উৎপাদন হয়। তবে ২০১৯-২০ মৌসুমে উৎপাদন হয়েছে লাখ ৭৫ হাজার ৬৯৮ টন। এর মধ্যে উৎপাদনে শীর্ষে চলে এসেছে নওগাঁ জেলা।

বিশ্লেষকরা বলছেন, রাজশাহী চাঁপাইনবাবগঞ্জের অধিকাংশ আমবাগান শতবর্ষী। এখানে সনাতন আমের জাতের আবাদ বেশি হয়। কিন্তু নওগাঁর আমবাগানগুলো নতুন উচ্চফলনশীল জাতের আবাদের মাধ্যমে গড়ে তোলা হয়েছে। পাশাপাশি এসব বাগান বাণিজ্যিকভাবে পরিচালনা করা হচ্ছে। ফলে গড় ফলন বেশি হচ্ছে। কারণে বাড়তি মুনাফা পাচ্ছেন নওগাঁর কৃষকরা। আমের রাজ্য দখলে নওগাঁর উত্থান তাই খুব দ্রুত হচ্ছে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জে বর্তমানে খুব বেশি পরিমাণে আমের বাগান বাড়ছে না বলে জানান জেলার আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব আম গবেষণা কেন্দ্রের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা আবু সালেহ মোহাম্মদ ইউসুফ আলী। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, জেলায় নতুন বাগান তৈরির জন্য তেমন আর কোনো ফাঁকা বা পতিত জায়গা নেই। তবে বরেন্দ্র অঞ্চলের অংশবিশেষ জেলার নাচোল গোমস্তাপুর উপজেলায় গত কয়েক বছরে কিছু বাণিজ্যিক আমের বাগান হয়েছে। আবার রাজশাহী অঞ্চলে নগরায়ণ বাণিজ্যিক অন্যান্য কৃষির কারণে জমির অপ্রতুলতা রয়েছে। ফলে আমের বাগান দ্রুত কমে যাচ্ছে। সব মিলিয়ে দ্রুতই আমের আবাদে শীর্ষে উঠে আসবে নওগাঁ জেলা।

আঞ্চলিক কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, রাজশাহী অঞ্চলের চারটি জেলায় রাজশাহী, নওগাঁ, নাটোর, চাঁপাইনবাবগঞ্জে ২০১৪-১৫ অর্থবছরে মোট ৫৪ হাজার ৭২২ হেক্টর জমিতে আমের উৎপাদন ছিল লাখ ৯৮ হাজার টন। এর মধ্যে রাজশাহী জেলায় ১৬ হাজার ৫৮৩ হেক্টর জমিতে লাখ ৭২ হাজার ৬৩৪ টন, নওগাঁ জেলায় হাজার ১৪৬ হেক্টর জমিতে লাখ ১৭ হাজার ১৮৯ টন, নাটোরে হাজার ৭৩৩ হেক্টর জমিতে ৫৮ হাজার ১১৩ টন এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় ২৪ হাজার ২৬০ হেক্টর জমিতে লাখ ৫০ হাজার টন আম উৎপাদন হয়। অন্যদিকে ২০১৯-২০ অর্থবছরে রাজশাহীর চার জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি আমের আবাদ বৃদ্ধি পেয়েছে নওগাঁ জেলায়।

এদিকে গত ২০১৯-২০ মৌসুমে অঞ্চলে মোট আমবাগান বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৬ হাজার ২৮৬ হেক্টর। এর মধ্যে রাজশাহীতে ১৫ হাজার ১২ হেক্টর, নওগাঁয় ২৩ হাজার ৮২৫, নাটোরে হাজার ৬৮৫ এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৩২ হাজার ৭৬৪ হেক্টরে আমের আবাদ হয়েছে। যদিও ২০১৮-১৯ অর্থবছরে চাঁপাইনবাবগঞ্জে আমের আবাদ হয়েছিল প্রায় ৩১ হাজার ৯০০ হেক্টর জমিতে। ফলে এক বছরের ব্যবধানে আবাদ বৃদ্ধি পেয়েছে মাত্র শতাংশ। অন্যদিকে রাজশাহী নাটোরে আমের আবাদ কমে গেছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জে আবাদ বেড়েছে আড়াই গুণের বেশি।

নওগাঁ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, নওগাঁ জেলায় চলতি মৌসুমে ২৫ হাজার ৮৫০ হেক্টর জমিতে আমের বাগান আছে। যেখানে গত বছর ছিল ২৪ হাজার ৭৭৫ হেক্টর জমিতে। সেই হিসাবে গত বছরের তুলনায় চলতি বছর জেলায় হাজার ৭৫ হেক্টর বেশি পরিমাণ জমিতে আমের বাগান গড়ে উঠেছে। আর গত বছর জেলাটিতে তিন লাখ টন আম উৎপাদন হয়। তবে চলতি বছর আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় লাখ ৭০ হাজার টন আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে কৃষি বিভাগ।

জানা গেছে, জেলার পোরশা, সাপাহার, নিয়ামতপুর পত্নীতলা উপজেলার আংশিক এলাকা বরেন্দ্র এলাকা হিসেবে পরিচিত। এসব উপজেলায় পানিস্বল্পতার কারণে বছরে একটি মাত্র ফসল আমনের ওপর নির্ভর করতেন কৃষক। এতে কৃষিজমি দীর্ঘ সময় ফেলে রাখতে হতো চাষীদের। কিন্তু  কয়েক বছর ধরে ধানের আবাদ ছেড়ে আম চাষে ঝুঁকেছেন চাষীরা। দেশে যত ধরনের আম উৎপাদিত হয়, অঞ্চলে তার প্রায় সব ধরন আকৃতি-প্রকৃতির আম উৎপাদিত হয়। এক যুগ আগে যে জমিতে শুধু ধান চাষ করা হতোসেখানে এখন আম চাষ করা হচ্ছে।

বিষয়ে নওগাঁর সাপাহারের গোয়ালা গ্রামের আমচাষী মনিরুল ইসলাম বলেন, আম চাষ লাভজনক হওয়ায় ধান বাদ দিয়ে আম চাষ শুরু করেছি। একটা ধানের আবাদ করে আয় হয় কম। কিন্তু কয়েক বছর ধরে আমের আবাদ করে বেশ লাভবান হয়েছি। যদিও চলতি বছর আমের ব্যবসায়ী না থাকায় দাম একটু কম পাচ্ছি। তবে ভালো ফলন পেয়েছি। আমের প্রক্রিয়াজাত কোম্পানিগুলো আম কিনলে অঞ্চলের কৃষক আরো বেশি আবাদ করতে পারবেন বলে জানান কৃষক।

নওগাঁ জেলায় উপজেলাভিত্তিক আমবাগানের মধ্যে পোরশা উপজেলায় সর্বোচ্চ ১০ হাজার ৫৫০ হেক্টর সাপাহার উপজেলায় হাজার ৫২৫ হেক্টর, পত্নীতলায় হাজার ১৫ হেক্টর, নিয়ামতপুরে হাজার ১৩০ হেক্টর, ধামইরহাটে ৬৭৫ হেক্টর এবং মান্দায় ৪০০ হেক্টর জমিতে আমের বাগান রয়েছে।

বিষয়ে নওগাঁ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক শামশুল ওয়াদুদ বণিক বার্তাকে বলেন, জেলাটিতে দ্রুত আমের বাগান বৃদ্ধি পাচ্ছে। ভালো জমি অনুকূল আবহাওয়া ছাড়াও মাটির কারণে জেলায় আমের বাগান গড়ে উঠছে। গত বছর থেকে চলতি বছরে এক হাজার হেক্টরের বেশি জমিতে আমের বাগান গড়ে উঠেছে। জেলায় সবচেয়ে বেশি আম্রপালি আম উৎপাদন হয়ে থাকে।

 

প্রতিবেদন তৈরিতে সহযোগিতা করেছেন বণিক বার্তার নওগাঁ প্রতিনিধি আরমান হোসেন রুমন

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন