শুক্রবার | জুন ১৮, ২০২১ | ৪ আষাঢ় ১৪২৮

সম্পাদকীয়

বসবাসের অযোগ্য শহরের তালিকায় চতুর্থ ঢাকা

নগরীকে বাসযোগ্য করতে পরিবেশসম্মত পরিকল্পিত উদ্যোগ নেয়া হোক

চারশ বছরের পুরনো ঢাকা এখন বিশ্বের বসবাসের অযোগ্য শহরের তালিকায়, অনিরাপদ শহরগুলোর তালিকায় প্রথম সারিতে। যুক্তরাজ্যভিত্তিক আন্তর্জাতিক জরিপ গবেষণা সংস্থা দি ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (ইআইইউ) পরিচালিত সর্বশেষ জরিপে বিশ্বের বসবাসের অযোগ্য শহরগুলোর তালিকায় ঢাকা চতুর্থ। বিশ্বের ১৪০টি শহরের স্থিতিশীলতা, স্বাস্থ্যসেবা, সংস্কৃতি পরিবেশ, শিক্ষা আর অবকাঠামোপাঁচটি সূচকের ভিত্তিতে জরিপ পরিচালিত হয়। অধিকাংশ সূচকে বাংলাদেশের অবস্থা শোচনীয়। সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধে বিধ্বস্ত নগরী দামেস্কসহ অন্য নগরীগুলো থেকে লাখ লাখ মানুষ পালিয়ে ইউরোপে অভিবাসী হওয়ায় যে সংকট তৈরি হয়েছে, তার প্রেক্ষাপটে দামেস্ক নগরী ১৪০তম বাসযোগ্য শহরের স্থান লাভ করেছে। গত বছরের তুলনায় ঢাকার এক ধাপ অগ্রগতির মানে এই নয় যে ঢাকা শহরের নাগরিক সুযোগ-সুবিধা, নিরাপত্তা বাসযোগ্যতার উন্নয়ন ঘটেছে। বরং এর উল্টোটাই ঘটেছে। ঢাকা শহরের পরিবেশগত নিরাপত্তা, জীববৈচিত্র্য রক্ষা, যানজট আবাসন সমস্যা নিরসনসহ নাগরিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না, তার বড় কারণ ঢাকার ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা অপরিকল্পিত উন্নয়ন।

দুঃখজনক বিষয় হলো, রাজধানী ঢাকা গড়ে উঠেছে একেবারেই অপরিকল্পিতভাবে। নাগরিক সুযোগ-সুবিধার অনেক কিছুই এখানে অনুপস্থিত। ঢাকা ভূমিকম্প ঝুঁকিতে রয়েছে। এর আগে অন্য জরিপে প্রকাশ পেয়েছে ঢাকা বিশ্বের দূষিত নগরগুলোর মধ্যে অন্যতম। ঢাকার চারপাশের নদীগুলোর করুণ অবস্থাই জরিপের সত্যতা প্রমাণে যথেষ্ট। জলাভূমি ভরাট হয়েছে, খাল দখল ভরাট হয়েছে, কোথাও বক্স কালভার্ট বানানো হয়েছে। ফলে বৃষ্টির পানি নামার কোনো পথ নেই। জলাবদ্ধতা বর্ষাকালে ঢাকার নিত্য সমস্যা। ঢাকার প্রাণ বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, শীতলক্ষ্যা বালু চার নদ-নদীই আজ ভয়াবহ দূষণের শিকার। খালগুলো দখল হয়ে আছে। আবার যে খালগুলো টিকে আছে, সেগুলোও মারাত্মক দখল-দূষণের শিকার। ঢাকায় সুউচ্চ অট্টালিকার সংখ্যা বাড়ছে। উড়াল সড়কও হয়েছে এবং হচ্ছে। কিন্তু ঢাকার জীবনযাপন সুগম সুন্দর হয়েছে বলে মনে হয় না। নগরীতে পানিদূষণ বায়ুদূষণের ফলে নতুন নতুন রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিচ্ছে। ক্ষতিকর বায়ু গ্রহণ করেই শহরে জীবনযাপন করতে হচ্ছে! ভারী ধাতুর দূষণ মারাত্মক পর্যায়ে পৌঁছেছে। অতিমাত্রায় শব্দদূষণ নগরবাসীকে মারাত্মকভাবে ভোগাচ্ছে। বিল্ডিং কোড না মেনে অপরিকল্পিতভাবে ভবন গড়ে তোলার ফলে ভূমিকম্পে ক্ষয়ক্ষতির ব্যাপক ঝুঁকিতে রয়েছে রাজধানী ঢাকা।

বস্তুত শহরের সুনির্দিষ্ট কোনো চরিত্র নেই। যে যেখানে পারছে যেকোনো প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলছে। এতে নগরী তার বিশিষ্টতা হারাচ্ছে। ফলে অনেক নাগরিক সুবিধা থেকেই তারা বঞ্চিত হচ্ছে। টেকসই বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অভাবে শহরবাসীর জন্য স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। যানজটের কারণে নগরবাসীর প্রতিদিন নষ্ট হচ্ছে ৩২ লাখ কর্মঘণ্টা! ঢাকায় যানবাহনের গতি ধারাবাহিকভাবে কমছে। ২০০৪ সালে ঢাকায় যানবাহনের গতি ছিল ঘণ্টায় ২১ কিলোমিটার। এখন তা সাত কিলোমিটারে এসে দাঁড়িয়েছে। যানবাহন কল-কারখানার কালো ধোঁয়া, খাদ্যে ভেজাল, সেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর নিম্নমানও ঢাকার জীবনযাত্রায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। অধিক জনসংখ্যার চাপে ন্যুব্জ শহরে নেই পয়োনিষ্কাষণের সুষ্ঠু ব্যবস্থা। বাতাসে সিসা, খাদ্যে ভেজাল, গ্যাস পানির সমস্যা বহুদিন ধরে চলে আসছে। গণপরিবহন বলতে যা বোঝায়, ঢাকায় তা নেই। উচ্চ খরচে চিকিৎসাসেবা পাওয়া গেলেও তার মান নিয়ে রয়েছে প্রশ্ন। গুটিকতক বিদ্যালয় বিশ্ববিদ্যালয় থাকলেও আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা এখানে অনুপস্থিত। মাঠ পার্কগুলো দখল হয়ে যাচ্ছে। মূলত সবকিছু ঢাকাকেন্দ্রিক হওয়ায় ঢাকার জনসংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে। বুয়েটের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, ঢাকার ৬৫ শতাংশ ভূখণ্ড সবসময় তপ্ত থাকে। প্রচণ্ড দাবদাহের অবস্থার মূলে রয়েছে পরিবর্তনশীল আবহাওয়া অপরিকল্পিত নগরায়ণ। একটু বৃষ্টি হলেই জলাবদ্ধতায় পড়তে হয় নগরবাসীকে। লাখ লাখ টাকা খরচ করে শহরের রাস্তার ফুটপাতের ড্রেনগুলো প্রতি বছর নতুন করে তৈরি খনন করা হচ্ছে। কিন্তু যথাযথ পরিকল্পনা নগরবাসীর সচেতনতার অভাবে তা আবার অকেজো হয়ে পড়ছে। ঢাকার ফুটপাত যাদের জন্য, সেই পথচারীরা ফুটপাত দিয়ে হাঁটতে পারে না। সবকিছুতেই পরিকল্পনাহীনতার ছাপ। অথচ রাজধানী ঢাকাই দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রাণকেন্দ্র।

ভারতে শিক্ষা, চিকিৎসার জন্য মানুষ কেবল রাজধানী দিল্লি অভিমুখী হয় না। দিল্লিতে যেসব সুযোগ-সুবিধা রয়েছে, মুম্বাই, বেঙ্গালুরু, চেন্নাই, পুনে এমনকি কলকাতায়ও সেসব সুযোগ-সুবিধা রয়েছে। কলকাতার মতো একটি রাজ্যের রাজধানী যদি আধুনিক সুযোগ-সুবিধায় সজ্জিত হতে পারে, তবে আমাদের দেশের রাজধানীকে কেন তা করা যাবে না? আমরা অর্থনীতিতে ক্রমেই উন্নতি করছি, মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হতে যাচ্ছি, অথচ রাজধানী অচল অবাসযোগ্য হয়ে আছে। উন্নয়ন দেখানোর মতো কোনো পরিস্থিতি নেই। যে শহরগুলো সেরা বাসযোগ্য শহরের তালিকায় উপরের দিকে আছে, করোনা নিয়ন্ত্রণে সেই শহরগুলো কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিল। অকল্যান্ড, ওসাকা, অ্যাডিলেডের মতো শহরগুলোয় নাগরিকদের এখনকার জীবনযাত্রা রয়েছে প্রাক-মহামারীর মতোই। পাশের কয়েকটি দেশের সুন্দর রাজধানীর কথা বলা যেতে পারে, যেমন কুয়ালালামপুর, ব্যাংকক, সিঙ্গাপুর বা দিল্লি। কর্তৃপক্ষের সুষ্ঠু পরিকল্পনা নগরের অধিবাসীদের ইতিবাচক সহযোগিতায় বসবাসের জন্য এসব শহর নিরাপদ আকর্ষণীয় বলে পরিচিতি লাভ করেছে। প্রশ্ন হলো, স্বাধীনতার এত বছর পরও কেন ঢাকাকে আধুনিক বসবাসযোগ্য শহর হিসেবে গড়ে তোলা গেল না?

বলা বাহুল্য, এখানে উন্নয়নের নামে বেশুমার অর্থ ব্যয় হয় ঠিকই, তবে সে অনুযায়ী উন্নয়ন দেখা যায় না। মূলত অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে ঢাকার এই করুণ দশা। দক্ষ নেতৃত্বের অভাব আর ব্যবস্থাপনাগত ব্যর্থতার কারণেই কোনো পরিকল্পনাই পুরোপুরি আলোর মুখ দেখেনি। ঢাকা শহরকে বসবাসের উপযোগী করে তুলতে হলে থানা জেলা শহরগুলোয় সুযোগ-সুবিধা বাড়িয়ে ঢাকামুখী মানুষের চাপ কমাতে হবে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য ব্যাংকিং সেবা বিকেন্দ্রীকরণের ব্যবস্থা করতে হবে। আমরা আশা করব, সরকার ঢাকাকে বাসযোগ্য করতে এর যত সমস্যা তা চিহ্নিত করে একেকটি প্রকল্প হাতে নিয়ে সমাধানের উদ্যোগ নেবে। আমরা যে অর্থনীতিতে বিস্ময়কর অগ্রগতি সাধন করছি, তা ঢাকার চিত্র দিয়ে বোঝাতে হবে। রাজধানী ঢাকাকে নগরবান্ধব বাসযোগ্য নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে হলে একটি সুষ্ঠু পরিকল্পনার প্রয়োজন। যেকোনো উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সামাজিক সাম্য, সামাজিক ন্যায়বিচার, আর্থসামাজিক অবস্থা, পরিবেশ, আর্থিক সামর্থ্য ইত্যাদি বিবেচনায় এনে সঠিকভাবে শহরের অন্তর্ভুক্তিমূলক জনবান্ধব পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে। তাই প্রস্তাবিত ড্যাপ গণশুনানির মতামত অংশীজনদের মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা প্রয়োজন। এর পূর্ণাঙ্গ সঠিক বাস্তবায়নের মাধ্যমে নাগরিকবান্ধব বাসযোগ্য নগরী হিসেবে রাজধানী ঢাকাকে নগরবাসী পাবে বলে আমাদের প্রত্যাশা। বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় ব্যক্তি থেকে রাষ্ট্রসব পর্যায়ে সবাই নিরন্তর ছুটে চলছে। গড়ে উঠছে বহুমাত্রিক শিল্পায়ন। শিল্প বিপ্লব অপ্রতিরোধ্য গতিতে প্রসারিত হচ্ছে প্রতিনিয়ত। অন্যদিকে বিপুল জনগোষ্ঠীর নগরমুখী যাত্রা বর্ধিত হচ্ছে। জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট (এসডিজি) বাস্তবায়ন করতে হলে পরিবেশবান্ধব শিল্পায়ন টেকসই বসবাসযোগ্য নগর গড়তে হবে।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন