বৃহস্পতিবার | জুলাই ২৯, ২০২১ | ১৩ শ্রাবণ ১৪২৮

সম্পাদকীয়

রেলে বিনিয়োগের আগ্রহ বাড়ছে উন্নয়ন সহযোগীদের

সেবার মান ও দক্ষতা বাড়ুক

স্বাধীনতা-পরবর্তী একটা দীর্ঘ সময়ে উন্নয়ন সহযোগীরা আমাদের রেল ব্যবস্থার উন্নয়নে এগিয়ে আসেনি। করেনি বিনিয়োগ; বরং তাদের পরামর্শে বাংলাদেশ রেলওয়ে অনেকটাই সংকুচিত হয়েছে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় উন্নয়ন সহযোগীদের দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আসছে। চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ভারতের পাশাপাশি এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) মতো উন্নয়ন সহযোগীরা বিনিয়োগ করছে রেলের বিভিন্ন প্রকল্পে। নতুন উন্নয়ন সহযোগীরাও আগ্রহী হচ্ছে রেল ব্যবস্থায় বিনিয়োগে, যা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। তবে পরক্ষণেই হতাশ হতে হয় বিনিয়োগ বাড়িয়েও রেল সেবার মান দক্ষতা বৃদ্ধি না পাওয়ায়। রেলকে লাভজনক পরিবহনে রূপান্তর জনগণের আস্থা প্রতিষ্ঠায় ব্যবস্থাপনার উন্নতির বিকল্প নেই।

স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে সড়কের প্রতি বাড়তি মনোযোগের কারণে রেলের প্রাধান্য অনেকটা কমে আসে। সড়ক ব্যবস্থা ঢেলে সাজাতে বিপুল বিনিয়োগ করা হয় সময়ে। বিপরীতে অসমানুপাতিক হারে বরাদ্দ দেয়া হয় রেল খাতে। ফলে সড়কভিত্তিক যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রভূত উন্নতি ঘটে। সংগত কারণে পণ্য পরিবহন যাত্রী পরিবহন উভয়ই ব্যয়বহুল সড়কমুখী হয়। আর অপ্রতুল বরাদ্দ, সংস্কারহীন অবকাঠামো, জরাজীর্ণ ইঞ্জিন কোচ, মেয়াদোত্তীর্ণ যন্ত্রপাতি, অব্যবস্থাপনা, অনিয়মসব মিলিয়ে লোকসানি খাতে পরিণত হয় রেল। তবে রেলকে পুনরুজ্জীবিত করতে এগিয়ে আসে বর্তমান সরকার। ২০১১ সালে আলাদা মন্ত্রণালয় গঠন করা হয়। নেয়া হয় দুই দশকের মহাপরিকল্পনা। পাঁচ বছর করে চার ভাগে বিভক্ত মহাপরিকল্পনায় শতাধিক প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে। গত এক যুগে নতুন রেলপথ নির্মাণ, রোলিংস্টক সংগ্রহ, রেলপথ স্টেশন ভবন নির্মাণ পুনর্বাসন, সিগন্যালিং ব্যবস্থার আধুনিকায়নসহ বিভিন্ন খাতে বিপুল পরিমাণ অর্থ খরচ করেছে সরকার। দুঃখজনকভাবে এত বিনিয়োগ সত্ত্বেও বাংলাদেশ রেলওয়ের সেবার মান খুব একটা বদলায়নি। শিডিউল বিপর্যয়, দুর্ঘটনা, অবকাঠামোগত দুর্বলতার মতো বিষয়গুলো কাটিয়ে উঠতে পারেনি সংস্থাটি। ফলে লোকসানের চক্র ভেঙে এখনো লাভজনক হতে পারেনি রেল, যা হতাশাজনক।

রেলকে সেবামূলক বললেও সেবা বাড়েনি মোটেও। বরং ট্রেনের শিডিউল বিপর্যয়, বারবার রেল দুর্ঘটনা, টিকিট কালোবাজারি, প্রকল্পে ধীরগতি এবং নানা ধরনের দুর্নীতি, রেলের বগি অপরিষ্কার, বাথরুমে পানি-আলো না থাকা, ট্রেনের সিট ভাঙা, সিটে ছারপোকা, বিনা টিকিটের যাত্রীদের দৌরাত্ম্য ইত্যাদি কারণে রেলের কাঙ্ক্ষিত সেবার মান বাড়ছে না। রেলে গত কয়েক বছরে যে পরিমাণ বিনিয়োগ প্রকল্প নেয়া হয়েছে, তা বাস্তবায়নের মতো দক্ষ কর্মকর্তার অভাব রয়েছে। আরেকটি বড় সমস্যা হচ্ছে, যাত্রী সুবিধা বা আয়বর্ধক প্রকল্প না নিয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ কেনাকাটার প্রকল্প নেয়া। প্রকল্প নেয়ার ক্ষেত্রে পরিকল্পনার যে অভাব রয়েছে, তা রেলওয়ের যাত্রী পণ্য পরিবহনের চিত্র থেকেই স্পষ্ট। ভারতেও একসময় রেলের অবস্থা খারাপ ছিল। ভারত সরকারের মোহন কমিটির রিপোর্টে বলা হয়েছিল, যেভাবে চলছে, তাতে ভারতীয় রেলওয়ে খুব দ্রুত দেউলিয়া হয়ে যাবে এবং আগামী ১৫ বছরের মধ্যে ভারত সরকারকে সংস্থার জন্য ৬১ হাজার কোটি টাকার দেনার ভার বহন করতে হবে।...পরিচালনার পর্যায় থেকে দেখলে প্রতিষ্ঠানটি চির ঋণের ফাঁদে পড়েছে এবং শুধু ভর্তুকির মাধ্যমেই এটিকে বাঁচিয়ে রাখা যাবে। এরপর ২০০৪ থেকে ২০০৮ সালের মধ্যে ভারতীয় রেলওয়ে ঘুরে দাঁড়ায়। আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাগুলোর প্রস্তাব অগ্রাহ্য করে দেশটির রেল যাত্রী ভাড়া কমায়। প্রস্তাবিত কর্মচ্যুতির বদলে ২০ হাজার মানুষকে কর্মে নিয়োজন করে। কারখানা বেসরকারীকরণের বিপরীতে ডিজেল ইলেকট্রনিক ইঞ্জিন, চাকা, যাত্রীবাহী কোচ তৈরির সক্ষমতা বাড়ানোর পদক্ষেপ নেয়া হয়। নতুন কারখানা নির্মাণের পাশাপাশি রুগ্ণ কারখানা অধিগ্রহণ করা হয়। পণ্য পরিবহনের উন্নয়ন ঘটিয়ে রেলের আয় বাড়ানো হয় কয়েক গুণ। এটি সম্ভব হয়েছে সুষ্ঠু পরিকল্পনা ব্যবস্থাপনা উন্নয়নের মাধ্যমে। এক্ষেত্রে ভারতের অভিজ্ঞতা অনুসরণ করে বাংলাদেশের রেল ব্যবস্থাপনাও ঢেলে সাজাতে হবে, মনোযোগ দিতে হবে যাত্রীসেবার মান উন্নয়নে। একই সঙ্গে পণ্য পরিবহনে ব্যবসায়ীদের আকৃষ্ট করতে রেলে আধুনিক সুবিধাসংবলিত পণ্যবাহী কোচের সংযোজন ঘটাতে হবে।

পর্যালোচনায় দেখা যাচ্ছে, রেলওয়ের অনুমোদন পাওয়া প্রকল্পের মধ্যে অনেকগুলোই হলো অপ্রধান শ্রেণীভুক্ত, যার মধ্যে আছে পাঁচতারা হোটেল, হাসপাতাল শপিংমল নির্মাণ। ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশ রেলওয়ের বিপুল জমি রয়েছে। নীতিনির্ধারকরা সেসব জমিতে বিভিন্ন ধরনের স্থাপনা তৈরি করে এবং সেগুলো ভাড়া দিয়ে স্বাবলম্বী হওয়ার চেষ্টা করছেন। অপ্রধান কাজে মনোযোগ দেয়ায় গুরুত্ব হারাচ্ছে প্রধান কাজগুলো। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের উচিত ছিল রেললাইন সম্প্রসারণ করে অধিক পরিমাণ পণ্য পরিবহন অধিকসংখ্যক যাত্রী পরিবহনে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া। আধুনিক মানসম্পন্ন সেবা নিশ্চিতে ব্যবস্থাপনা উন্নত করতে পদক্ষেপ নেয়া। তা না করে গৌণ কাজে বেশি অর্থ সময় ব্যয় করা হচ্ছে বলে বিশেষজ্ঞরা বলছেন। বিপুল বিনিয়োগ সত্ত্বেও সেবার মানে উন্নতি না হওয়ার পেছনে এটিও একটি কারণ। রেলওয়েতে বিগত সময়ে বিনিয়োগ বাড়লেও তা সুপরিকল্পিত হয়নি। কেননা রেলপথে যাত্রী বাড়ানো, আয় বাড়ানো লাভজনক করা তিন বিবেচনা প্রকল্পগুলোয় গুরুত্ব পায়নি। অবস্থার পরিবর্তন জরুরি।

রেলের অবকাঠামোগত উন্নয়নে অর্থ ব্যয়ের আগে উচিত ছিল সুষ্ঠু পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং প্রতিষ্ঠান হিসেবে সামর্থ্য বাড়াতে সচেষ্ট হওয়া। রেলে যখন স্বল্প অর্থের বিনিয়োগ ছিল, তখনো লোকসান, অপচয় ব্যবস্থাপনাগত দীনতা ছিল, এখনো আছে। অদক্ষতার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো, বিনিয়োগের অর্থ রেল খরচ করতে পারে না। রেল যদি তার এই সামর্থ্যহীনতা ঘোচানোর চেষ্টা না করে, তাহলে এই করুণ দৃশ্যপট রাতারাতি বদলাবে না। রেল কর্তৃপক্ষ যেভাবে খরচ করে চলেছে, তার যথার্থতার প্রশ্ন তো কম জ্বলন্ত নয়। সড়ক, আকাশ নৌপথে বেসরকারি পরিবহন খাতে বিপুল বিনিয়োগের কারণে যাত্রীসেবার মান বেড়েছে এবং খাতগুলো লাভজনক। অন্যদিকে রেলের লোকসান বেড়েই চলছে। অতঃপর অহরহ রেল দুর্ঘটনা, অপরিচ্ছন্ন অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে ভ্রমণ এবং সময়সূচি বিপর্যয় তো রেলের পিছু ছাড়ছে না।

কর্তৃপক্ষকে অবকাঠামোগত উন্নয়নে জোর দেয়ার নীতি বদলাতে হবে। সুষ্ঠু রক্ষণাবেক্ষণ, দক্ষ জনশক্তি তৈরি এবং সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার ওপরই রেলকে সর্বোচ্চ জোর দিতে হবে। উন্নয়ন দরকার, তবে তা সামর্থ্য যাত্রীসেবার মান বাড়িয়ে রেলকে একটি অধিকতর নিরাপদ বাহনে পরিণত করার নীতি বাদ দিয়ে নয়।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন