বৃহস্পতিবার | জুন ১৭, ২০২১ | ৩ আষাঢ় ১৪২৮

শেষ পাতা

বাংলাদেশে করোনার ভারতীয় ধরন শনাক্ত

নিজস্ব প্রতিবেদক

বাংলাদেশে প্রাণঘাতী নভেল করোনাভাইরাসের ভারতীয় একটি ধরন শনাক্ত হয়েছে। গতকাল সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। দ্রুত ছড়িয়ে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করা ভারতীয় ভ্যারিয়েন্টটি বি .৬১৭. হিসেবে পরিচিত।

জানা যায়, সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) সম্প্রতি ভারতফেরত কয়েকজনের নমুনা পরীক্ষা করে। ভারতীয় ধরনটির (ভ্যারিয়েন্ট) আনুষ্ঠানিক নাম বি..৬১৭। পরিবর্তন বা মিউটেশনের কারণে এর তিনটি সাব টাইপ দেখা যায়। এর মধ্যে বাংলাদেশে পাওয়া গেছে বি..৬১৭. ধরনটি। ভারতের তিন ধরনের করোনাভাইরাসের মধ্যে ধরনটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে সক্ষম বলে মন্তব্য করছেন যুক্তরাজ্যের জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। করোনার ধরনটি প্রথম ভারতে শনাক্ত হয়েছে বলে এটি ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট হিসেবে পরিচিত। বিশ্বের অন্তত ১৭টি দেশে করোনাভাইরাসের ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট পাওয়া গেছে। ভারতে করোনার সংক্রমণ মারাত্মকভাবে ছড়িয়ে পড়ার ক্ষেত্রে ধরনটি ভূমিকা রাখছে এটি অতি সংক্রমণশীল বলে ধারণা করছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)

আইইডিসিআর সূত্রে জানা যায়, দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে সংগৃহীত আটটি নমুনার ছয়টিতে করোনার ভারতীয় ধরনটি শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে দুটি নমুনায় পুরোপুরি ভারতীয় ধরনটির বৈশিষ্ট্য পাওয়া গেছে। তবে এখনো পরিপূর্ণ জিনোম সিকোয়েন্সিং শেষ হয়নি বলে জানিয়েছে সরকারের গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি।

আইইডিসিআরের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, যে দুজনের মধ্যে পুরোপুরি ভারতীয় করোনার ধরন পাওয়া যায় তারা উভয়েই পুরুষ। তাদের নমুনা বিশ্লেষণের ফলাফল শুক্রবার জার্মানির গ্লোবাল ইনিশিয়েটিভ অন শেয়ারিং অল ইনফ্লুয়েঞ্জা ডাটার (জিআইএসএআইডি) জিনোম সিকোয়েন্স ডাটাবেজে জমা দেয়া হয়। আইইডিসিআর ২৮ ২৯ এপ্রিল তাদের নমুনা সংগ্রহ করে। ইনস্টিটিউট ফর ডেভেলপিং সায়েন্স অ্যান্ড হেলথ ইনিশিয়েটিভসে (আইডিএসএইচআই) নমুনাগুলোর জিনোম সিকোয়েন্সিং করা হয়।

ভারতের ধরন বাংলাদেশে শনাক্ত হওয়ার খবর প্রকাশের পর গতকাল এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. নাসিমা সুলতানা বলেন, সম্প্রতি যশোরের বেনাপোল বন্দর হয়ে ভারতফেরত কয়েকজনের নমুনা সংগ্রহ করে আইইডিসিআর এবং যশোর বিজ্ঞান প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে জিন বিন্যাস বিশ্লেষণ করা হয়। আইইডিসিআর এবং যশোর বিজ্ঞান প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় তাদের পরীক্ষায় ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট শনাক্ত করেছে। এটির সিকোয়েন্সিং এখনো শেষ হয়নি। তা সম্পন্নের আগে বলা যাচ্ছে না এটা ডাবল মিউট্যান্ট কিনা।

এদিকে যশোর বিজ্ঞান প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, গত মে যশোর ২৫০ শয্যার হাসপাতাল থেকে ভারতফেরত ১৬ জনের নমুনা পাঠানো হয়। নমুনা পরীক্ষা করে তাদের তিনজনের শরীরে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ পাওয়া যায়। এর মধ্যে দুজনের শরীরে ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট বি১.৬১৭. পাওয়া গেছে। তাদের মধ্যে একজন নারী একজন পুরুষ।

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক . মো. আনোয়ার হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, আমরা যে ধরনটি পেয়েছি তা ডাবল মিউটেশন করেছে। মিউটেশনের অবস্থানের নাম হলো এল৪৫২আর টি৪৭৮কে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনোম সেন্টারের সহযোগী পরিচালক অধ্যাপক মো. ইকবাল কবীর জাহিদের নেতৃত্বে গবেষকরা জেনেটিক সিকোয়েন্স বিশ্লেষণ করেন। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, আইইডিসিআর আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় আলাদাভাবে নমুনা সংগ্রহ করেছে। আমরা যে নমুনা বিশ্লেষণ করেছি, তাতেও ভারতের ভ্যারিয়েন্ট পাওয়া গেছে। এসব রোগী ভারত থেকেই আক্রান্ত হয়ে দেশে ফিরেছিলেন।

যবিপ্রবির গবেষক দলটি বলছে, বি১.৬১৭. নামের ধরনটি বর্তমানে ২০ শতাংশ মোট ভারতীয়দের মধ্যে বিদ্যমান। এছাড়া ভারতীয় ধরনটি ৫৯ শতাংশ যুক্তরাজ্যের করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে দেখা গেছে। ভারতীয় ধরনটি ২০ শতাংশের বেশি সংক্রমণের সক্ষমতা রাখে। ভ্যাকসিন পরবর্তী সেরাম এবং মনোক্লোনাল অ্যান্টিবডি ধরনকে কম শনাক্ত নিষ্ক্রিয় করতে পারে। ভারত থেকে আগত সবাইকে পরপর দুবার করোনা নেগেটিভ না হওয়া পর্যন্ত আইসোলেশনে (বিচ্ছিন্নকরণ) রেখে পরীক্ষা করার আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে ভারতীয় ধরনে আক্রান্ত রোগীরা যেসব ব্যক্তির সংস্পর্শে এসেছে, তাদের অতিদ্রুত পরীক্ষা করা আবশ্যিক বলে মনে করে গবেষক দলটি।

এর আগে চলতি বছরে বাংলাদেশে করোনার নাইজেরিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, যুক্তরাজ্যের ধরনের অস্তিত্বের কথা জানায় জিআইএসএআইডি। এর মধ্যে গত ২৫ এপ্রিল দেশে নাইজেরিয়ার ধরনের অস্তিত্বের কথা জানা যায়। দেশে পর্যন্ত অন্তত ১০ জনের শরীরে করোনার নাইজেরিয়ার ধরনের অস্তিত্ব শনাক্ত হয়েছে। এর আগে যুক্তরাজ্য থেকে করোনাভাইরাসের আরেক নতুন ধরনের অস্তিত্ব দেশে পাওয়া যায়। রূপান্তরিত নতুন ধরন বাংলাদেশে শনাক্তের কথা গত জানুয়ারি আইইডিসিআর থেকে জানানো হয়।

এরপর ফেব্রুয়ারিতে দেশে পাওয়া যায় করোনার দক্ষিণ আফ্রিকার ধরন। গত এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি), সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের যৌথ গবেষণায় বলা হয়, যুক্তরাজ্য, দক্ষিণ আফ্রিকা ব্রাজিল এই তিন দেশ থেকে ছড়িয়ে পড়া করোনাভাইরাসের তিনটি ধরন সবচেয়ে বেশি সংক্রামক।

এদিকে, গতকাল দেশে ৪৫ জন করোনা পজিটিভ রোগীর মৃত্যু হয়েছে। সময় হাজার ২৮৫ জনের শরীরে ভাইরাসটির সংক্রমণ শনাক্ত হয়। গত সাত সপ্তাহে এটিই দেশে দৈনিক শনাক্ত রোগীর সর্বনিম্ন সংখ্যা। এর আগে গত ১৪ মার্চ হাজার ১৫৯ জন রোগী শনাক্তের তথ্য দিয়েছিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন