সোমবার | আগস্ট ০২, ২০২১ | ১৮ শ্রাবণ ১৪২৮

দেশের খবর

খননে প্রাণ ফিরে পাচ্ছে গাজীপুরের পারুলী নদী

মো. হাজিনুর রহমান শাহীন, গাজীপুর

নদীকেন্দ্রিক কৃষি অর্থনীতির প্রাণ সঞ্চার, মৎস্য চাষ বৃদ্ধি, ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার হ্রাস করা পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করতে খনন করা হচ্ছে গাজীপুরের অন্যতম মৃতপ্রায় পারুলী নদী। নদীর খননকাজ শেষ হলে দুই পাড়ের মানুষ জীবনযাত্রা প্রকৃতিতে প্রাণ ফিরে আসবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। প্রায় ১৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নদীটির খননকাজ শুরু হয় গত মার্চে। এরই মধ্যে অর্ধেকের বেশি অংশে খনন করা হয়েছে। আগামী অক্টোবরে কাজ সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে।

জেলার যে কয়েকটি নদী ঐতিহ্য নাব্যতা হারিয়ে মৃতপ্রায় নদীতে পরিণত হয়েছে, সেসবের মধ্যে পারুলী নদী অন্যতম। এক সময়ের স্রোতস্বিনী নদী বর্তমানে মরা খালে পরিণত হয়েছে। ফলে নদীর দুই পাড়ের মানুষের নদীকেন্দ্রিক কৃষিকাজ, যোগাযোগ, মৎস্য শিকার বন্ধ হয়ে যায়। হুমকির মুুখে পড়ে পরিবেশের ভারসাম্য। এসব বিষয় মাথায় রেখে জেলার বেশকিছু খাল নদী পুনঃখননের উদ্যোগ নেয় জেলা প্রশাসন। এরই অংশ হিসেবে নদী পুনঃখনন করা হচ্ছে।

গাজীপুরের জেলা প্রশাসক এসএম তরিকুল ইসলাম জানান, খাল নদী পুনঃখনন মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর একটি উদ্যোগ। তার অংশ হিসেবে গাজীপুরে প্রথম পর্যায়ে প্রতিটি উপজেলায় একটি খাল জেলায় একটি নদী পুনঃখননের অনুমোদন করা হয়। আর দ্বিতীয় পর্যায়ে জেলায় মোট ২৭টি খাল পুনঃখননের জন্য প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে নদী এসব খাল পুনঃখনন সম্পন্ন হলে ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার হ্রাস পাবে এবং খাল নদীর পানির ব্যবহার বৃদ্ধি পাবে।

গাজীপুরের মৃতপ্রায় পারুলী নদীটি খননের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল স্থানীয় অধিবাসীদের। তাদের স্বপ্ন ছিল, একসময়ের স্রোতস্বিনী পারুলীতে আবার পানির ঢল নামবে। দুই তীরে আবার দেখা যাবে সবুজ ফসলের সমারোহ। নিজ পেশায় ফিরে যাবে জেলেরা। অবশেষে নদী পুনঃখননের মাধ্যমে সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে।

জানা গেছে, গাজীপুর জেলার শ্রীপুর গাজীপুর সদর উপজেলার বাড়িয়া ইউনিয়নের ওপর দিয়ে পারুলী নদী প্রবাহিত। সুতিয়া নদী থেকে শ্রীপুরে এর উত্পত্তি। শ্রীপুরের রাজাবাড়ী প্রহলাদপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে গাজীপুর সদরের বাড়িয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় প্রবাহিত হয়ে মিশেছে বালু নদীতে। একসময় এলাকার মানুষের নদীকেন্দ্রিক যাতায়াত ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল। নদীর উভয় পারের মাটি খুবই উর্বর। ফসলের প্রচুর আবাদ হতো। নদীর পারের সিংহভাগ মানুষ মাছ শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। তবে চার যুগেরও বেশি সময় ধরে মনুষ্যসৃষ্ট, প্রাকৃতিক দুর্যোগ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে নদীটি ভরাট হয়ে তার স্বাভাবিক ঐতিহ্য হারিয়েছে। ফলে এটি মরা খালে পরিণত হয়। নদীতে পানি না থাকায় কৃষি কৃষকের জীবনযাত্রা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে।

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (নরসিংদী) উপবিভাগীয় প্রকৌশলী      মো. সাজ্জাদ হোসেন জানান, গাজীপুরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি নদী পারুলী নদীটির দৈর্ঘ্য ২৩ কিলোমিটার। প্রস্থ ৫২ মিটার। নদীটির প্রকৃতি সর্পিলাকার। নদীটির অর্থনৈতিক গুরুত্ব অনুধাবন করে সরকার নদী পুনঃখননের উদ্যোগ গ্রহণ করে। ছোট নদী খাল জলাশয় পুনঃখনন প্রকল্পের মাধ্যমে নদীটি খননের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। প্রকল্পের অধীন নদীটির শ্রীপুর উপজেলার রাজবাড়ী ব্রিজ থেকে উজানের অংশে ১৪ কিলোমিটার ভাটার অংশে গাজীপুর সদরের বাড়িয়া ইউনিয়ন পর্যন্ত আট কিলোমিটার খনন করা হচ্ছে। মোট ২২ কিলোমিটার নদী খননে ব্যয় ধরা হয়েছে শ্রীপুর অংশে কোটি ৯৪ লাখ টাকা গাজীপুর সদর অংশে কোটি ৩৬ লাখ টাকা। খননকাজের দায়িত্ব পেয়েছেন যৌথভাবে তিনটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানপটুয়াখালীর মেসার্স আজাদ, মেসার্স মিজানুর মেসার্স আল মামুন। গত মার্চে শুরু হওয়া খননকাজটির এরই মধ্যে ১২ কিলোমিটার সম্পন্ন হয়েছে। চলতি বছরের অক্টোবর পর্যন্ত প্রকল্প কাজের সময় নির্ধারিত রয়েছে। নদীটি খননের আগে এর গভীরতা ছিল মাত্র তিন থেকে চার ফুট। আরো আট ফুট খনন করার ফলে এর গভীরতা দাঁড়াবে ১২ ফুটের মতো। 

শ্রীপুরের রাজাবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ফারুক হোসেন জানান, এক সময় পারুলী নদীর সঙ্গে তার এলাকার ১০ হাজারের অধিক মানুষের জীবন জীবিকা জড়িত ছিল। দেশীয় সুস্বাদু মাছের ভাণ্ডার ছিল নদী। অথচ সেই নদী নেই। মানুষের বেঁচে থাকার প্রয়োজনে নদীটি রক্ষার দাবি ছিল স্থানীয়দের। অবশেষে স্থানীয়দের দাবি অনুযায়ী খননকাজ শুরু হওয়ায় অন্তত কৃষি অর্থনীতিতে দারুণ ছোঁয়া লাগবে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী (নরসিংদী) বিজয় ইন্দ্র শংকর চক্রবর্তী জানান, সরকার খাল-বিল-নদী রক্ষায় গুরুত্বসহকারে কাজ করে যাচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় গাজীপুর জেলার প্রতিটি উপজেলায় প্রকল্পের অধীন একটি করে খাল পারুলী নদী পুনঃখনন করা হচ্ছে। এর ফলে গাজীপুরের অন্যতম নদী তার আগের প্রবহমান ধারায় ফিরে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

তিনি আরো বলেন, নদী খননের অন্যতম উদ্দেশ্য হচ্ছে, কৃষিতে সেচকাজ, মাছের উৎপাদন বাড়ানো, নদীকেন্দ্রিক যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলা। এর সঙ্গে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করতে সাধারণ মানুষ যাতে ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহার কমিয়ে এনে জলাশয়ের (ভূ-উপরিস্থ) পানি ব্যবহার করতে পারে। এছাড়াও আমরা নদী-তীরবর্তী এলাকায় সবুজায়ন করারও উদ্যোগ নিয়েছি।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন