শুক্রবার | মে ০৭, ২০২১ | ২৩ বৈশাখ ১৪২৮

দেশের খবর

নড়াইলে এগিয়ে চলেছে পদ্মা সেতুর রেল সংযোগ প্রকল্পের কাজ

মো. ইমরান হোসেন, নড়াইল

পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পের আওতায় ঢাকা-যশোর রেললাইনের নড়াইল অংশের কাজ শুরু হয়েছে। দেশের বৃহৎ স্থলবন্দর বেনাপোল, বাণিজ্যিক শহর নওয়াপাড়া শিল্পাঞ্চল খুলনাসহ দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের যোগাযোগে, এমনকি ভারতের পশ্চিম বাংলায় যাতায়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে রেললাইন। স্বাধীনতার ৫০ বছর পর হলেও জেলায় প্রথম রেললাইনের কাজ শুরু হওয়ায় খুশি সর্বস্তরের মানুষ। এদিকে প্রকল্পের কাজ শুরু হওয়ায় কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়েছে স্থানীয় কয়েক হাজার মানুষের। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে সাবকন্ট্রাক্ট নিয়ে বিভিন্ন প্রকার ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে এলাকার অনেকেই। সব মিলিয়ে জেলার অন্তত ১০ হাজার মানুষের কর্মমংস্থানের ব্যবস্থা হয়েছে প্রকল্পের মাধ্যমে।

জানা গেছে, ২০১৯ সালের এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে নড়াইল অংশের কাজ শুরু হয়েছে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জমি অধিগ্রহণ করে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে বুঝে দিয়েছেন জেলা ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা। এরই মধ্যে অধিগ্রহণ হওয়া জমির মালিকরা ক্ষতিপূরণও পেয়েছেন। তবে মামলা জটিলতার কারণে বেশ কয়েকজন জমির মালিক এখানো টাকা পাননি।

প্রকল্প সূত্র জানায়, ঢাকা থেকে যশোর ১৭২ কিলোমিটারজুড়ে চলছে রেললাইন নির্মাণকাজ, করছে চীনের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না রেলওয়ে গ্রুপ লি. কাজ শেষের মেয়াদ ২০২২ সালের ৩১ ডিসেম্বর। নয়টি জেলার ওপর দিয়ে এটি যাবে। নড়াইল জেলার লোহাগড়া পৌর এলাকার নারানদিয়ায় নড়াইল পৌর এলাকার দুর্গাপুরে রেলস্টেশন হবে। ঢাকা থেকে লোহাগড়ার রেলস্টেশনের দূরত্ব ১২৩ নড়াইল রেলস্টেশনের দূরত্ব ১৩৮ কিলোমিটার।

নড়াইল জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, নড়াইল জেলায় রেললাইনের মধ্যে পড়েছে ২৮টি মৌজা। এতে ৪০৬ দশমিক ৭১ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, লোহাগড়া উপজেলা সদরের নির্ধারিত এলাকাজুড়ে রেললাইন নির্মাণের বিশাল কর্মযজ্ঞ শুরু হয়েছে। সেখানে ফসলি জমিতে বালি ভরাট করে রোলার দিয়ে সমান করা হচ্ছে। ভাটিয়াপাড়ায় মধুমতীতে এবং লোহাগড়ার নবগঙ্গায় রেলসেতুর নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে। এখানে চীনের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এবং বাংলাদেশ রেলওয়ের কর্মকর্তা শ্রমিকদের পদচারণায় আনন্দঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে। আশপাশের গ্রামের মানুষ কর্মযজ্ঞ দেখতে ভিড় করছে।

পানচাষী রহমত শেখ জানান, ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে পান চাষ করছি। ঢাকাতে যে পান ২৫০ টাকা পোন (৮০ পিস) বিক্রি হয়, সেই পান নড়াইলে ৫০ টাকার বেশি বিক্রি করতে পারি না। সরাসরি ট্রেন যোগাযোগ না থাকায় তার মত শত শত পানচাষী দীর্ঘদিন ধরে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। ট্রেনলাইন চালু হলে সরাসরি ঢাকায় নিয়ে পান বিক্রি করতে পারবেন। এতে তার মতো অনেক কৃষক উৎপাদিত পানসহ বিভিন্ন ফসলের নায্য মূল্য পাবেন বলে মনে করেন প্রান্তিক কৃষক।

মাছচাষী জিরু জানান, ট্রেনলাইন চালু হলে তার মতো জেলার অন্তত ছয় হাজার মাছচাষী লাভবান হবেন। তখন ট্রেনে মাছ পরিবহন করে রাজধানী ঢাকাতে নিয়ে নিজেরাই পাইকারদের কাছে বিক্রি করতে পারবেন। তখন তারা মাছের নায্য মূল্য পাবেন।

লোহাগড়া বাজারের ব্যবসায়ী শাহ জামাল মীর জানান, ঢাকা থেকে বিভিন্ন পণ্য কিনে কয়েক গুণ বেশি পরিবহন খরচ দিয়ে নড়াইলে আনতে হয়। এতে সময়ও অনেক বেশি লাগে। এতে ঝুঁকিও আছে। ট্রেনলাইনটি চালু হলে তাদের আর সমস্যা থাকবে না। তখন তারা অনেক কম সময়ে এবং কম খরচে বিভিন্ন মালপত্র আনা-নেয়া করতে পারবেন।

নড়াইল চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি মো. হাসানউজ্জামান বলেন, স্বাধীনতার ৫০ বছর পরে নড়াইল জেলার মানুষ পেতে যাচ্ছে সরাসরি রেল সেবা। জেলায় এখন চলছে রেললাইন নির্মাণকাজ। রেললাইন নির্মাণ শুরু হওয়ায় নড়াইলবাসীর মধ্যে আনন্দ বিরাজ করছে। লাইন চালু হলে সব থেকে বেশি উপকৃত হবে ব্যবসায়ীরা। তখন ঢাকা, স্থলবন্দর বেনাপোলসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অল্প খরচে সহজেই বিভিন্ন পণ্য এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে পরিবহন করতে পারবেন নড়াইলের ব্যবসায়ীরা।

নড়াইল উন্নয়ন কমিটির নেতা শরীফ মূনির চৌধুরী জানান, লাইনটি চালু হলে দেশের বৃহৎ স্থলবন্দর বেনাপোল, বাণিজ্যিক শহর নওয়াপাড়া শিল্পাঞ্চল খুলনাসহ দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের যোগাযোগে, এমনকি ভারতের পশ্চিবঙ্গে যাতায়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পের উপপরিচালক (রিসেটেলমেন্ট) মহাব্বতজান চৌধুরী জানান, পদ্মা সেতু যেদিন থেকে চালু হবে, সেদিন থেকেই যেন ঢাকা-যশোর ট্রেন চালানো যায় সেভাবে কাজ চলছে।

  বিষয়ে নড়াইলের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মো. ফকরুল হাসান জানান, রেললাইনে অধিগ্রহণকৃত জমির মালিকদের ক্ষতিপূরণ কোনো রকমের হয়রানি ছাড়া বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে। বেশ কয়েক জন জমির মালিক আদালতে মামলা জটিলতার কারণে এখনো টাকা পাননি। মামলা নিষ্পত্তি করে এলে তাদের ক্ষতিপূরণ বুঝিয়ে দেয়া হবে। প্রকল্পটির বাস্তবায়ন হলে নড়াইল তথা দক্ষিণ অঞ্চলের মানুষ অনেক উপকৃত হবে।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন